
‘প্রথমা’ থেকে প্রকাশিত মাসউদ আহমাদের—স্মৃতিকথা ও সাক্ষাৎকার ভিত্তিক ‘অন্য হাসান আজিজুল হক’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত এই সাক্ষাৎকারে হাসান আজিজুল হক ধরা দিয়েছেন এক স্মৃতিকাতর মানুষ হিসেবে, স্মৃতির ভেতর দিয়ে হাঁটতে থাকা এক জীবন্ত কণ্ঠে। জন্মতারিখের অনিশ্চয়তা থেকে শুরু করে যৌথ পরিবারের অবহেলা-ভরা আদর, দোর্দণ্ডপ্রতাপ দাদি, খুঁতখুঁতে অথচ মানবিক বাবা, নির্বাক সারল্যের মা, গ্রামবাংলার ছেলেবেলা, দুর্ভিক্ষের দগদগে ছবি, সব মিলিয়ে এ কথোপকথন ব্যক্তিগত ইতিহাসের এক অনাড়ম্বর মানচিত্র।
• আলাপচারিতা: মাসউদ আহমাদ
আপনার জন্ম বর্তমান ভারতের বর্ধমান জেলায়, কটোয়া মহকুমার মঙ্গলকোট থানার আওতাধীন যবগ্রামে; ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু কোথাও কোথাও ১৯৩৮-এর সেপ্টেম্বরও দেখেছি?
হাসান আজিজুল হক: আমার বড় ভাইবোন যাঁরা ছিলেন, তাঁদের জন্মসাল-তারিখ-নক্ষত্র ইত্যাদি আমার বাবা সুন্দর করে লিখে রেখেছিলেন। কিন্তু আমার বেলায় সেটা উনি করেননি। কাজেই আমি নির্দিষ্টভাবে আমার জন্মতারিখটা জানি না। মায়ের কাছে শুনেছি, আমি ভাদ্র মাসে জন্মেছি। সে জন্য আমার ধারণা, সেপ্টেম্বর; সেপ্টেম্বরই যদি হয় এবং সেটা ১৯৩৯-এর কাছাকাছি হয়, তাহলে ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসই হবে। তবে এটা যে একেবারে সঠিক, তা-ও বলা যাবে না। আর ১৯৩৯ যেটা—তখন স্কুলে পড়তে গেলে ক্লাস নাইনে একটা ফরম পূরণ করতে হতো, পরীক্ষা দেবার জন্য। সেই ফরমে সব তথ্য থাকত। সেদিন আমার বাবাও এসেছিলেন স্কুলে, হেডমাস্টারের ঘরে বসে ফরম পূরণ করা হয়েছিল, তখন মোটামুটি একটা হিসাব করে ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ করা হয়েছিল। কাজেই সেটাই এখন হয়ে গেছে বলা যায় আমার নথিভুক্ত জন্মতারিখ।
অনেক বড়সড় পরিবারে আপনার শিশুকাল কেটেছে, যেখানে ৬০-৬৫ জন মানুষের জীবনযাপন। এমন পরিবার যে কে কখন খাচ্ছে কি না খাচ্ছে, কোথায় কোন শিশু সারা দিন কাটাচ্ছে, তার খোঁজ নেওয়ারও সুযোগ হয়ে ওঠে না মায়ের পক্ষে। পিতার সান্নিধ্য পাওয়া তো দূরের কথা, মায়ের কাছ থেকে আদরযত্ন পাওয়াও দুর্লভ ছিল?
হাসান আজিজুল হক: এভাবে জীবনযাপন করাটা যে কী মজার, আবার সেই সঙ্গে কোনো একটা দিক থেকে কত অবহেলার; সবটাই আমি খুলে লিখেছি আমার স্মৃতিকথায়। খুব বড় পরিবার তো, সম্ভবও ছিল না খোঁজ নেবার। তখনকার দিনে পরিবারের গঠনও ছিল ভিন্ন রকমের, এখনকার মতো গঠন নয়। যে এলাকাটাতে আমার জন্ম, সেটা মোটামুটিভাবে হিন্দু-অধ্যুষিত এবং প্রধানত হিন্দুদেরই বাস ছিল। তার একাংশ ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ, মানে আমরা আরকি। এখানে একধরনের সাংস্কৃতিক বিনিময় এসে গেছে, পরস্পর প্রবিষ্ট হয়ে গেছে। বড় বা যৌথ পরিবারের ধরনটা মূলত হিন্দু সম্প্রদায়েরই, এখনো যদি তা থেকে থাকে, সেখানেই রয়েছে। তুমি যদি কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে যাও, এখনো তুমি যৌথ পরিবারের দেখা ঠিক সেই অনুপাতে পাবে, যে অনুপাতে আমাদের এখানে এখন দেখা যায় না; শহরেও নয়, গ্রামেও নয়। কাজেই আমাদের পরিবারটা যৌথ পরিবারই ছিল। যেমন ধরো, আমার বাবারা পাঁচ ভাই, মা বেঁচে আছেন। তিনি বৃদ্ধা। আমার দাদি বেঁচে আছেন, তখন কিন্তু সংসারের কর্ত্রী তিনি। আর কারও সেখানে কোনোরকমেই শেষ কথা নেই। মন্তব্য করারও প্রায় অধিকার নেই। বউরা যে মন্তব্য করবে বা স্বামীকে আলাদা করে নিয়ে কিছু করবে বা বলবে, এটার সম্ভাবনা প্রায় ছিল না। এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সারা দিনে দেখা হতো কি না সন্দেহ। অনেক রাতে সব কাজ শেষ করে মা ঘরে ঢুকতেন। আমার ছিল এক বাল্যবিধবা ফুফু। নয় বছর বয়সে তিনি বিধবা হন।
মাত্র নয় বছর বয়সে ফুফু বিধবা হলেন?
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, মাত্র নয় বছরে। তখন চলও ছিল। স্বামী কলেরায় মারা গেলেন। তখন মারা যাওয়াটা দুমদাম করে হতো—কেউ বসন্ত, কেউ কলেরায়; সেই রোগগুলো এখন নেই বললেই চলে। আর তখন বিধবাবিবাহের চল ছিল না। বিদ্যাসাগরের আন্দোলনের ফলে, ঊনবিংশ শতাব্দীর পাঁচের দশকে সেটা আইনগতভাবে গৃহীত হয়েছিল বটে, কিন্তু সামাজিকভাবে সেটা কার্যকর হয়ে ওঠেনি; এটা বিদ্যাসাগর নিজেও জানতেন। আমাদের ওখানে হিন্দুসমাজে বিধবাবিবাহ তো কল্পনাতীত। এবং আমার ধারণা, সেই ধরনটাই যেগুলো বড়-বনেদি মুসলিম পরিবার, সেখানেও ওটা ছিল। সে কারণে আমাদের বাড়িতে দ্বিতীয় গৃহিণী ছিলেন আমার ফুফু। আর সত্যিকারের গৃহিণী ছিলেন আমার দাদি, তিনি মারা গেলেন।
দাদি মারা যাওয়ার সময় আপনার বয়স কত ছিল?
হাসান আজিজুল হক: দাদি যখন মারা যান, তখন আমার বয়স খুব বেশি নয়। তবে এটুকু দেখেছি, তিনি দোর্দণ্ড প্রতাপশালিনী ছিলেন। খুব আস্তে কথা বলতেন। ছোট্টখাটো মানুষ। কিন্তু তিনি যা বলতেন, তারপর আর কথা বলার কেউ ছিল না। আমার বাবাও খুব কড়া একজন মানুষ ছিলেন। কিন্তু তাঁর কাছে গিয়েও লাভ হতো না। কেননা তিনি, তেমন কোনো সিদ্ধান্ত হলে মায়ের কথার বাইরে যাবেন না। এর ফলে পাঁচ ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে, একটা ব্যবস্থা আছে। সকাল-দুপুর-রাতে খাওয়া, ঘুমানো; কিন্তু সেটা সাধারণভাবে এমন একটা ব্যবস্থা যে কারও কোনো আলাদা মনোযোগ পাওয়ার সুযোগ সেখানে ছিল না। ফলে সকালবেলা মুড়িটুড়ি খেয়ে ছেলেমেয়েরা যে যেদিকে পারত, চলে যেত।
বড় বা যৌথ পরিবারের ধরনটা মূলত হিন্দু সম্প্রদায়েরই, এখনো যদি তা থেকে থাকে, সেখানেই রয়েছে। তুমি যদি কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে যাও, এখনো তুমি যৌথ পরিবারের দেখা ঠিক সেই অনুপাতে পাবে, যে অনুপাতে আমাদের এখানে এখন দেখা যায় না; শহরেও নয়, গ্রামেও নয়।হাসান আজিজুল হক
গমের বস্তায় ফুটো করে দিয়ে যেমন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, ওটাও ঠিক তেমন। একসময় সবাইকে দেখা যাচ্ছে, তারপরে কে কোথায় ছড়িয়ে পড়ল আরকি। আর মায়ের পক্ষে কারও কোনো খবর নেওয়ার কারণ ছিল না। সংসারের কাজে এতই ব্যস্ত থাকতে হতো যে ছেলেমেয়েদের খাওয়াদাওয়া সবই আমার ফুফু করতেন, খোঁজখবর তিনি নিতেন, অসুখ-বিসুখ হলে তাঁর কাছেই আমরা যেতাম। মায়ের চেয়ে তাঁকে অনেক কাছের মানুষ বলে মনে হতো। তাঁর কাছেই সব আদর। বকুনিও তাঁর কাছে। এটা গেল এক দিক। আর লেখাপড়ার কথা যদি বলো, এটা একেবারেই ছেড়ে দেওয়া জিনিস। এটা নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল না।
বাবা মোহাম্মদ দোয়া বখ্শ, তাঁর কথা বলুন।
হাসান আজিজুল হক: আমার মনে হয়, তিনি আমার দেখা বিশিষ্ট মানুষদের একজন। আমি খুব নির্মোহভাবে আমার দেখার জায়গা থেকে বলছি, বিশিষ্ট একজন মানুষ ছিলেন।
তিনি কী করতেন?
হাসান আজিজুল হক: কিছুই করতেন না। সেই অর্থে তাঁর কোনো পেশা ছিল না। আর প্রাতিষ্ঠানিক যে শিক্ষা, সেটাও তাঁর বেশি সম্ভবত ছিল না, কারণ সেটা নিয়ে কেউ কখনো জিজ্ঞাসা করেনি। অথচ তিনি হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবার কাছে পণ্ডিতমশাই বলেই খ্যাত ছিলেন।
তাঁর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?
হাসান আজিজুল হক: তখনকার দিনে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক যেমন থাকে, সেটা মনে হয় তোমরা এখন কল্পনাও করতে পারবে না। আমি মনে করতে পারি না, বাবা কখনো আমার গায়ে আদর করে হাত দিয়েছেন কি না; কিংবা আদৌ হাত দিয়েছেন কি না। হাত দিয়েছেন একটা কারণে, যখন কোনো কারণে পেটানোর দরকার হতো। হা...হা...। তা ছাড়া উনি আমার গায়ে আদর করে হাত দিয়েছেন, এটা মনে হয় না। তার বেশি আদর ছিল নাতি-নাতনিদের ওপর এবং বাড়ির ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে। সেটা কেমন (তাদের ডেকে নিয়ে সুন্দর করে চুলটা আঁচড়ে দেওয়া। থুতনিটা ধরে চুলটা আঁচড়ে দিতেন। তেমন করে চুল আঁচড়ে আমাকেও দু-একবার দিয়েছেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর বিরক্তি) এতটুকু মাথাটা নড়ালেই ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিতেন। মাথাটা স্থির রাখতে পারিস না, চুল আঁচড়াচ্ছি; সঙ্গে নড়াচড়া করছিস কেন? হ্যাঁ, এমন ছিলেন।
তিনি একই সঙ্গে শৌখিন এবং খুঁতখুঁতে মানুষ ছিলেন, সবকিছু ভালো ও নিখুঁত চাইতেন। হয়তো বাড়ি বানাবেন, তিনি চাইতেন, বাড়ি এমন হবে, যা এই তল্লাটে নেই...
হাসান আজিজুল হক: ঠিকই বলেছ, ভীষণ খুঁতখুঁতে মানুষ ছিলেন। শৌখিন মানুষ ছিলেন, কিন্তু বিলাসবহুল জীবনের অভ্যাস ছিল না। তাঁর শৌখিনতার কতকগুলো বিশেষ বিষয় ছিল, সব বিষয়ে শৌখিনতা ছিল না। খাওয়াদাওয়া এবং পোশাক-পরিচ্ছদ সাধারণ ছিল, ধুতি পরতেন। যখন এ দেশে চলে এলেন, পায়জামা ও শার্ট, পাঞ্জাবি এবং কখনো শেরওয়ানি পরতেন। কিন্তু ওখানে তিনি মূলত ধুতি ও পাঞ্জাবি পরতেন। কাপড়টা থাকত ভালো আর সেই সঙ্গে ইস্তিরির ব্যবস্থা গ্রামে না থাকলেও শহর থেকে ইস্তিরি করিয়ে আনতে হতো। এই হচ্ছে তাঁর শৌখিনতা। অপরিচ্ছন্ন পোশাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় তাঁকে দেখা যেত না। বাইরে তো নয়ই, বাড়িতে এলেও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় তিনি থাকতেন না। কাজেই তিনি পরিচ্ছন্ন, একটু শৌখিন-খুঁতখুঁতে এবং অসম্ভব বদমেজাজি ছিলেন, যে বদমেজাজটা একধরনের অশিষ্টতার মধ্যে পড়ে। আর তিনি এমন তীক্ষ্ণধী মানুষ ছিলেন যে অন্য কোনো মানুষ তাঁর কাছে কিছু বলতে গেলে হাঁ করার আগে তিনি বুঝে ফেলতেন, সে কী বলতে এসেছে। একটু বলতেই তিনি বলতেন, তারপর কী বলো। ও হ্যাঁ, বুঝেছি, যা। এ রকম মানুষ ছিলেন, খুব বদমেজাজি। কিন্তু স্থায়ী বদমেজাজি নয়। আমাদের কাছে বদমেজাজি, বাইরের মানুষের কাছে তা ছিলেন না।
আপনার নিজের চোখে বাবা ছিলেন এক বিস্ময়কর চরিত্র, রোগাপাতলা, বেঁটেখাটো মানুষ, কিন্তু দশ গ্রামে মান্যগণ্য; ইতিহাস-সংস্কৃতি এবং সমস্ত রাঢ় ধারণ করেছিলেন। তিনি যদি লিখতেন, অনায়াসেই তারাশঙ্কর হতে পারতেন...
হাসান আজিজুল হক: তিনি অসাধারণ কথক ছিলেন। কথক মানে গল্পকথক নয়, তাঁর সঙ্গে যারাই কথা বলত, মুগ্ধ হয়ে শুনত। এর কারণ হচ্ছে কথায় স্পষ্টতা ছিল, বাক্যগঠনগুলো ছিল ছোট, মৃদুভাষী ছিলেন। আর কোনো মুদ্রাদোষ ছাড়াই একটানা শুদ্ধ উচ্চারণে সুন্দরভাবে কথা বলতেন। আমি তাঁর মতো কথা বলতে পারা মানুষ খুবই কম দেখেছি। আর এসব জিনিস ধারণ করতেন একটার জায়গার যে বৈশিষ্ট্য বা বিশিষ্টতা, নিজস্ব সংস্কৃতি-অভ্যাস-আচার এসব জিনিসের মধ্যে থাকলে তুমি নিজেই বুঝতে পারবে না, সেসব কখন তোমার ভেতরে ঢুকে গেছে। এদিক থেকে তিনি ওই এলাকার প্রতিনিধি স্থানীয় মানুষ। তাঁকে দেখলে বোঝা যেত, এ রকম বোধ হয় রাঢ়ের খাদ্য হয়, এমন করে সেখানকার মানুষ কথা বলে। এই হয়তো তাদের জীবনযাপনের রীতি। এই ব্যাপারগুলো তাঁর ভেতরে ছিল।
বাবার কোন কথা বা স্মৃতিটি আপনাকে আজও ভাবনায় আপ্লুত করে, নাড়া দেয়?
হাসান আজিজুল হক: এটা বলা খুব মুশকিল, কোন বিশেষ কথা তিনি বলেছেন, তার চেয়ে বলা ভালো যে কীভাবে তিনি আমাদের শাসন করতেন। একটা শাসন তাঁর এমন ছিল যে মিথ্যা বলা চলবে না। কোনোভাবে মিথ্যা কথা বললে অত ক্রুদ্ধ তিনি আর কিছুতে হতেন না। যেমন তাঁর কোনো নিষেধ অমান্য করলে অপরাধ গণ্য করতেন। তিনি বলতেন, আমার কোনো জিনিসে তোমরা হাত দেবে না। কিন্তু কতকগুলো খুব লোভের জিনিস থাকত, সেগুলোতে হাত না দিয়ে পারা যেত না। তাঁর একটা একনলা বন্দুক ছিল, আমাদের স্পর্শ করতে দিতেন না। তখনকার দিনে চমত্কার একটা ফিনিক্স সাইকেল ছিল, বাড়িতে ঘোড়া ছিল, পালকি ছিল (সেই সময় বংশের সুনামের জন্য এসব জিনিস থাকত)। উনি বলতেন, তোমরা এসব জিনিসে হাত দেবে না। হাত দিলে উনি বুঝতে পারতেন। কীভাবে বুঝতেন, জানি না। তখন যদি অস্বীকার করতাম, তিনি বুঝতে পারতেন মিথ্যা বলছি, এত ক্ষুব্ধ হতেন! বরাবরই উনি খুব ঘৃণা করতেন মিথ্যা বলাটাকে। সেই জন্য আমি পারতপক্ষে জীবনে মিথ্যা কথা বলিনি।
যখন এ দেশে চলে এলেন, পাজামা ও শার্ট, পাঞ্জাবি এবং কখনো শেরওয়ানি পরতেন। কিন্তু ওখানে তিনি মূলত ধুতি ও পাঞ্জাবি পরতেন। কাপড়টা থাকত ভালো আর সেই সঙ্গে ইস্তিরির ব্যবস্থা গ্রামে না থাকলেও শহর থেকে ইস্তিরি করিয়ে আনতে হতো। এই হচ্ছে তার শৌখিনতা।
এটা আমার অভ্যাসের মধ্যে ঢুকে গেছে। এটা আমার বাহাদুরি নয়, স্বভাবের অঙ্গ হয়ে গেছে। কোনো কিছু জিজ্ঞেস করলে ঠিক কথাটা বলা আরকি। এটাকে যদি বলো বাবা শিখিয়েছেন, হতে পারে। অন্য মানুষ যে আশপাশে আছে, সেটা কোনো বিষয় নয়, সব সময় নিজেরটা দেখো। এটা তিনি বলতেন। তোমরা যদি বলো সামাজিক কাজকর্ম করে বেড়ানো মানুষ, বলতে পারো। কিন্তু ব্যাপারটি আসলে তা নয়। তাঁর ভেতরে অদ্ভুত ধরনের একটা অন্তর্নিহিত মানবতা ছিল। সেটা তাঁর আপাতরুক্ষ একটা কঠিন আবরণে সাধারণত চাপা পড়ে থাকত। কিন্তু এটা আমি বুঝতে পারতাম, মানুষের সঙ্গে তার আচরণের সঙ্গে তা ফল্গুধারার মতো বইত। কী করে বুঝতাম? দরিদ্র মানুষের খবর নেওয়া, পাশের বাড়িতে খাবার হয়েছে কি না, না হলে রান্না করা খাবারই পৌঁছে দেওয়া; এসব ছোট ঘটনাগুলো মনে পড়ে। তুমি এখন জিজ্ঞেস করছ বলে এ কথাগুলো আমি ভেবে বলছি। আমার যা মনে হয়, আমার লেখার মূল চালিকা শক্তি কোথাও তো একটা আছে, সেটা বোধ হয় এটা—কেয়ার ফর ম্যানকাইন্ড। মানুষের ওপর তো কিছু নেই। তিনি ধর্মপ্রাণ লোক ছিলেন, তা-ও নয়, কিন্তু এই মানবতাগুলো ছিল।
আপনার মা জোহরা খাতুন, তাঁর কথাও বলুন।
হাসান আজিজুল হক: মাকে আমি একটা কথা বলতাম—মা, তোমার যখন মৃত্যু হবে, আল্লাহ সোজা তোমাকে বেহেশতে নিয়ে যাবে। তোমরা যেগুলোকে তথাকথিত পাপ বলো আরকি, কিংবা রিপু—এসব থেকে মুক্ত এত সহজ মানুষ কল্পনা করাই মুশকিল। আমি রেগেই যেতাম মাঝেমধ্যে—এ কী রকমের সারল্য! সারল্য অনেক সময় বোকামির পর্যায়ে চলে যেত। এ জন্য মায়ের কথা কোনো দিন শুনিনি, মান্য করিনি। মাকে আলাদাভাবে গণ্য করিনি। আজকে বুঝতে পারি যে তিনি কেমন ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাবা আমার সামনে থেকে একটু পেছনে গেলেন, মা-ই সামনে চলে এলেন। তখন মনে হলো যে এ রকম মানুষ—আপন-পরের ভেদ কখনো করতে পারলেন না? কোনো দিন না? আমি ঠিক বলে প্রকাশ করতে পারব না আমার মা কেমন ছিলেন।
মায়ের স্নেহ-মমতা-শাসন আপনার জীবনে-মননে কেমন ভূমিকা রেখেছে?
হাসান আজিজুল হক: মা কোনো দিন শাসন করেননি। মায়ের শাসনের তোয়াক্কাও আমি কোনো দিন করিনি। হয়তো একটু গাল দিলেন—পাজি, বদমাশ, হারামজাদা ছেলে। এই তো। তুই-তোকারি করতাম, তখন এসব প্রচলন ছিল। মায়ের উপদেশ হচ্ছে, সামান্যভাবে আরকি—হ্যাঁ বাবা, তুই এই কাজটা করে এলি? আল্লাহ তোর ভালো করুক বাবা। লেখাপড়া করতে গেলে বলতাম—মা, পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। তিনি বলতেন, সোনার দোয়াত-কলম হোক, বাবা। আর শাসন বা আদর? বাড়ির কাজ করতে করতে তাঁর আঙুলগুলো ফেটে মোটা হয়ে যেত। গায়ে হাত দিলে খড়খড় করত। আমার জ্বর হলে মা কপালে হাত দিলে বলতাম, ফুফুকে পাঠিয়ে দে। তোর খড়খড়ে আঙুলের আদর দরকার নেই। ফুফুর আঙুল খুব নরম ছিল। তখন ফুফু এসে হাত বুলিয়ে দিতেন। আদর-যত্নগুলো বুঝতে পারছ তো? উনি এতই সাধারণ ছিলেন যে ভালো করে ছোট বাচ্চাকে কোলেও নিতে পারতেন না।
আপনার জন্ম তো গ্রামে, সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর পরিবারেই বেড়ে ওঠা; আপনার এক চাচা কেবল বর্ধমান শহরে অফিসে কাজ করতেন। তাঁর কথা কিছু বলুন।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, ছোট চাচা শহরে কাজ করতেন। তাঁর নাম ছিল আবদুল হক। এই চাচা আমার বাবার থেকে প্রায় বাইশ বছরের ছোট ছিলেন। ফলে আমার ছোট চাচা বাবার সন্তানের মতো ছিলেন। তিনি আদালতে কাজ করতেন। কী কাজ করতেন জানি না, তবে তখনকার দিনে কোর্টে কেরানি বা এই সমস্ত কাজই ছিল। সেই কারণে উনি বাইরে থাকতেন, কখনো কখনো ছেলেমেয়ে নিয়ে বাড়িতে আসতেন। তাঁর সবচেয়ে ছোট যে ছেলেটি, মেয়ে পরে আরও দুটি হয়েছে; আমার কাছেই আছে। ওর বাবার অকালমৃত্যু হলে খুব ছোটবেলাতে আমার বাবার কাছে চলে আসে। এই ফাঁকে বলি, আমার ষোলো বছর বয়স হয়ে গেলে বাবা কিন্তু আমাকে আর তুই বলতেন না, তুমি করে বলতেন। সংস্কৃত শ্লোকে আছে না—প্রাপ্ত ষোড়শ বর্ষে পুত্র মিত্র মতো করে। অর্থাৎ পুত্র যখন ষোলো বছর বয়সে পদার্পণ করবে, তখন পুত্রকে মিত্র বলে বিবেচনা করবে। বাবা এসে আমাকে বললেন, হকের ছেলেটিকে নিয়ে এলাম, ক্লাস সিক্সে পড়ে। আমি বললাম, খুব ভালো করেছ। তাকে আমি মানুষ করেছিলাম। এখনো সে আমার কাছেই আছে। কাজেই, তার বাবার কথা বললে, তাকে দেখলে, তার সঙ্গে কথা বললেও তার বাবার কথা মনে পড়ত। এ রকম সুন্দর মানুষ দেখা যায় না। আর আমার বাবাকে উনি মনে করতেন, এই পৃথিবীতে ওর বাবা এবং তার কথা কোনো দিন অমান্য করা সম্ভব নয়। সেই মানুষ একবারই খেপে গিয়েছিলেন আমার বাবার ওপর। সেটা হচ্ছে যখন দেশ ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত হলো, আমাদের দায়িত্ব আমার বাবা নেবেন, হ্যাঁ যাব, ঠিক আছে। তখন উনি বলেছিলেন, কেন যাবে তুমি? সেই প্রথম আমি খেপতে দেখেছিলাম আমার ছোট চাচাকে। বাবাকে তিনি বলেছিলেন, তোমার এই ৭২ বছর বয়স অতিক্রম হয়েছে, তুমি দেশ থেকে চলে যাচ্ছ?
তখনো স্কুলে যেতে শুরু করেননি, সেই সময়ের কথা মনে পড়ে?
হাসান আজিজুল হক: সেই সময়ের কথাই তো বেশি মনে পড়ে হা...হা...। স্কুল তো দূরের কথা, পাঠশালা বলো। রণ পণ্ডিতের পাঠশালায় যাচ্ছি আমি পাঁচ বছর বয়সে। তার আগের ঘটনা—মামার বাড়ি যাচ্ছি-আসছি, কাঠবিড়ালির মতো আমগাছে উঠছি, আম পাড়ছি, কখনো হয়তো সাপের ছোবলের মুখ থেকে বেঁচে গেলাম; তারপর সাপটাকে না মেরে সেখান থেকে সরলাম না। মাঠে যাচ্ছি, ধান কুড়োচ্ছি, সেই ধান রেডি করে তা দিয়ে জুতো কেনার টাকা সংগ্রহ করছি। এমন বহু ঘটনাই আছে। তবে তুমি যদি বলো যুগান্তকারী কোনো ঘটনা—সেসব কিছু বলতে পারব না। উনচল্লিশের দুর্ভিক্ষের কথা মনে পড়ে—পাশের কোনো গ্রামের অজস্র মানুষ শহরে চলে যাবে, খেতে পায়নি তারা; আমাদের গ্রামে এসেছে। কিন্তু বের হওয়ার মতো শরীরে পোশাক নেই বলে রাতের আগে বাড়িতে বা বস্তায় ঢোকেনি। বাইরে জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে ছিল সেই সমস্ত অর্ধ উলঙ্গ নারী-পুরুষ-শিশুরা।
উনচল্লিশের দুর্ভিক্ষের কথা মনে পড়ে—পাশের কোনো গ্রামের অজস্র মানুষ শহরে চলে যাবে, খেতে পায়নি তারা; আমাদের গ্রামে এসেছে। কিন্তু বের হওয়ার মতো শরীরে পোশাক নেই বলে রাতের আগে বাড়িতে বা বস্তায় ঢোকেনি। বাইরে জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে ছিল সেই সমস্ত অর্ধ উলঙ্গ নারী-পুরুষ-শিশুরা।হাসান আজিজুল হক
খাবার চাইতেও আসতে পারেনি এমনই তাদের পোশাকের অবস্থা। এরই মধ্যে একটি মেয়ে বেরিয়ে এসেছিল, সেই মেয়েটি আমাদের বাড়িতে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল, ভিক্ষা চায়নি। এখনো মনে পড়ে, ভরা যুবতী ছিল সে। তার দুটো স্তনই দেখা যাচ্ছিল, প্রায় খোলা। হাঁটুর ওপরে কাপড়ের অনেকটাই ছেঁড়া, চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। তুমি যদি বলো, কিছু মনে পড়ে কি না—এটা মনে পড়ে; মেয়েটি কীভাবে ঘাড়টা একটু বাঁকা করে, যুবতী একটা মেয়ে—লজ্জা বা ইয়ে কিছুই সে বোধ করছিল না। তারপর কিছু খাবার দেওয়া হলো। খুব কষ্ট আমাদেরও হয়েছে, মধ্যবিত্ত পরিবার। তবে অমুক বেলা ভাত হলো না বা খাদ্য জুটল না, এমন হয়নি।
মানুষ তো অসম্ভব স্মৃতিধর। ৯০ বছর বয়সের মানুষও তার ছেলেবেলার কথা হুবহু মনে করতে পারে। হাসান আজিজুল হক নামের লোকটি, জীবনের ৭৪টি বসন্ত পেরিয়ে, আকাশ নামক এই ছাদের নিচে বিশাল পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে চলেছেন...। এই বিশ্বায়নের যুগে আপনার ছেলেবেলা, বেড়ে ওঠার সঙ্গে কীভাবে সমান্তরাল করবেন?
হাসান আজিজুল হক: তুমি যেভাবে কঠিন কঠিন প্রশ্ন করছ, এভাবে কি আর চটচট করে জবাব দেওয়া যায়? ধরে নাও, আমি নিজের সঙ্গে তুলনা করছি না, উপমাটা দিচ্ছি। একটা খুব বড় গাছ, তুমি নিশ্চয়ই জানো ওটা একদিন এতটুকুন চারা ছিল; এখন অতটুকু চারাটা কীভাবে অত বড় মহিরুহ হলো, তা কি দেখতে পাওয়ার বিষয়? যদি হয়েই থাকে, আমি মহিরুহ না হই একটা বুড়ো মানুষ তো হয়েছি। আমি তো কাঁচা বাঁশ থেকে পাকা বাঁশ হয়েছি, নাকি (অট্টহাসি)। এতটুকু কড়া বাঁশ, গায়ে তখন অনেক ছিলকা। বাঁশ বড় হচ্ছে ছিলকা পড়ে যাচ্ছে। এভাবে কঞ্চি হয়েছে। একদিন বাঁশটা পাকা বাঁশে পরিণত হয়েছে। বাঁশ কি বলতে পারে কখন কীভাবে হয়েছে। আমি নিজেও কি বলতে পারব?
অন্য হাসান আজিজুল হক
গদ্য–সাক্ষাৎকার–স্মৃতিকথা
মাসউদ আহমাদ
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
পৃষ্ঠা: ১০২
মূল্য: ৩০০ টাকা
যখন পরিভ্রমণটা পেছন থেকে দেখি, অনেক রকম ব্যাপার মনে হয় বৈকি। শুধু এইটুকু মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের সেই কথাটা সম্পূর্ণ মেনে নিয়েও (বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি); তারপরও বলব, আমি নিজেকে বহুদর্শী লোক বলি না। কিন্তু আমার নিজের কাছে আমার অভিজ্ঞতার ভান্ডারটা, বোধের সঞ্চয়টা, চিন্তায় যাকে বলে নানান দিকে ছড়িয়ে যাওয়াটা—বেশ বড় একটা ভান্ডার একটু একটু করে তৈরি হয়ে গেছে। তার একটা কারণ, জীবনটা দুই বাংলায় বিভক্ত না হয়ে যদি এক বাংলা থাকত, তাহলে কথাটা এতটা গুরুত্বের সঙ্গে বলতে হতো না। যেহেতু ১৯৪৭ সালে একদম রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ হয়ে গেল, আমার জীবনটা এর সবটাই বিস্তারিত। অর্থাৎ আমার গণ্ডিটা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত। আর আমাদের এখানে যে প্রশ্নগুলো বারবার উঠেছে, যে প্রশ্নগুলোর কোনো সমাধান হয়নি; সে প্রশ্নগুলো ওঠা উচিত কি না জানি না। আমি ইংরেজ, ইংল্যান্ডে কোনো ইংরেজকে এটা পষ্ট করে বলতে হয়? দরকার হয় বলার, আমি ইংরেজ? আমাদের এই বাংলাদেশে, পশ্চিম বাংলাতেও, তুমি গিয়েছ কি না জানি না।
আমার কখনো যাওয়া হয়নি।
হাসান আজিজুল হক: যা-ই হোক, পশ্চিম বাংলায় এই প্রশ্ন কি খুব জাগ্রত প্রশ্ন, আমরা কি বাঙালি? সমস্যা হলে তা কথাগুলো উঠবে, বাঙালি হওয়াতে কারও তো কোনো সমস্যা নেই। বাঙালি হওয়ার ব্যাপারে ওখানে কোনো বাধাও নেই, সমস্যাও নেই। কাজেই পশ্চিম বাংলায় বাঙালির কথাও নেই। আর আমরা যেটা বলি, হিন্দুরা আমাদের বাঙালি বলে কোনো দিন স্বীকৃতি দেয়নি, এটা আমরা দোষারোপ করি তাদের সংকীর্ণতা বলে; কিন্তু ছবির আর একটা দিক আছে, সেটা কি জানো? মুসলমান যদি নিজেকে বাঙালি বলে দাবি না করে? পশ্চিম বাংলায় বহু জায়গায় আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারি, যাদেরকে জিজ্ঞেস করলে বলবে, এই গাঁয়ে আমরা থাকি আর বাঙালিরা থাকে। কথাটা বুঝতে পারছ, মাসউদ? কথাটা খেয়াল করো, আমরা থাকি আর বাঙালি থাকে। বাঙালি মানে কী? হিন্দু। তুমি কলকাতায় গেলে দেখবে সেখানে যত মুসলমান আছে, তার ৬০ শতাংশ অবাঙালি। সেখানে বাঙালিত্বের ব্যাপারটা সেভাবে নেই। কিন্তু আমাদের এখানে পুরো রাষ্ট্রটাই তৈরি হয়েছে এটার ওপর ভিত্তি করে।
এখনকার ছেলেমেয়েদের ছেলেবেলা দেখলে, তাদের জন্য আমার যে কী দুঃখ-কষ্ট-করুণা হয়, সেটা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। তাদের কোনো ছেলেবেলা নেই। আমরা যত শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, তত এই বিষয়টা ঘটছে। যত গ্রামের দিকে যাবে, ততই ছোট শিশুর জন্য একটু ছেলেবেলা বাঁধা থাকবে।
তোমার কি মনে হয়, এটা কি খুব বিরল বিষয় নয় যে এখানে দাবি করতে হয় আমি বাঙালি? সে জন্যই প্রসঙ্গটা তুলছি, আজকের এখানকার জাগ্রত যে প্রশ্ন, সেসব বিষয়ের খুব গভীরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। দুই বাংলাতেই, যেটাকে বলে গঠনের শুরু এবং গঠন প্রায় শেষ, এটা পশ্চিম বাংলায় ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত এবং ৭৪ বছর বয়স পর্যন্ত এই বাংলায়। আমার ভেতরে দুটোই বিশদভাবে কাজ করেছে।
‘শকুন’ গল্পে আপনি কয়েকজন গ্রামীণ বালকের দেখা যে প্রতীকী আখ্যানটি নির্মাণ করেছেন, তা কি আপনার নিজের ছেলেবেলার গল্প?
হাসান আজিজুল হক: অবিকল ঘটনা বলে একটা কথা আছে না, এটা ঠিক তা-ই। আর গল্প লেখার সময়, এই ঘটনাকে অবিকল ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি মাত্র। এটা একটি পিকটোরিয়াল গল্প। আমি চেয়েছিলাম, যা যা ঘটেছিল, ঠিক যেমনটি ঘটেছিল তার ছবিটা লেখাটাতে ফুটে উঠুক। আমি বেশির ভাগ লেখাতেই কিন্তু চিত্রণের দিকে যাই। আর সেই চিত্রণটা শুধু দেহের বা বহিরঙ্গের নয়; পারলে মনটাকেও চিত্রিত করি। এখন তোমাদের কাছে গল্পটি বহুবর্ণিল হতে পারে, কিন্তু লেখার সময় আমি অতটা সচেতন ছিলাম না।
আপনার ভাইবোনের কথাও কিছু বলুন। তাঁরা এখন কে কোথায় আছেন?
হাসান আজিজুল হক: আমার বড় ভাই মারা গেছেন ৭৫ বছর বয়সে, ২০০১ সালে। আর যেটা আমার কাছে উচ্চারণ করাই কঠিন, সেটা আমার ছোট ভাই এমদাদুল হক, এই ১০ আগস্ট দুই বছর হয়ে গেল। ওর মৃত্যুটা ছিল আকস্মিক।
আপনার ভাইবোন কিংবা বংশের মানুষের কথাই বলি, সবাই দীর্ঘজীবী!
হাসান আজিজুল হক: এটা তুমি বলতে পারো। প্রথম ভাইকে বাদ দিলে আমরা চার ভাইবোন একসঙ্গেই ছিলাম। আমার বড়, আমি, জাহানারা নওশিন (চেনো তো তাঁকে?)
হ্যাঁ, লেখক ও প্রাবন্ধিক।
হাসান আজিজুল হক: এরপর এমদাদুল।
ভাইবোনের সঙ্গে মজার কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?
হাসান আজিজুল হক: ভাইবোনের সঙ্গে সব স্মৃতিই মজার। বড় ভাইয়ের সঙ্গেও মজার। তিনি খুব রাশভারী লোক ছিলেন। তাঁর সামনে যাওয়া এবং তাঁর সঙ্গে গল্পগুজব করা অসম্ভব ছিল। খুব ভয় পেতাম। বাবার চেয়েও বড় ভাইকে ভয় পেতাম বেশি। সে জন্য হয়তো বড় ভাইয়ের সঙ্গে মজার কিছু নেই, হা... হা...। পুরোনো ফ্যামিলি তো, আমাদের সময়ে বড়-ছোটর বিষয়টা খুব মানা হতো। আমার এবং জাহানারা আপার বয়সের পার্থক্য চার বছরের, তুমি কল্পনা করতে পারবে না আমাদের সম্পর্কটা কেমন। ছোট ভাই খুব মজা করে কথা বলত। অনেকেই আমাকে বলেছে, স্যার, ও আপনার চেয়েও বড় কথক।
আপনার ছোট ভাই এমদাদুল হক, যে দাসীমায়ের দুধ খেয়ে বড় হয়েছিল...
হাসান আজিজুল হক: ঠিকই ধরেছ। এটা ছোট একটা ঘটনা। আমার মায়ের শেষ বাচ্চা ওটা, তখন বলা হতো কোলপোঁছা। সে হয়তো ঠিকমতো দুধ পেত না। আমাদের ওখানে একটা আশ্রিত পরিবার ছিল। তার বড় দুই ছেলে, একজন গরু-ছাগল চরাত, আরেকজন অন্যান্য কাজ করত। তাদের অনেকগুলো মেয়ে ছিল। আর ওই মহিলা খুব আলুঝালু পোশাকে কেমন করে থাকত। কিন্তু সে আমাদের ভাইটাকে বুকের দুধ খাওয়াত। তার একটা ছোট মেয়ে ছিল, দুজনকে সে ভাগ করে খাওয়াত। আমার ভাইটা তার খুব ভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একদিন গভীর রাতে বলে বসল, আমি দাসীমায়ের কাছে যাব।
আপনার ছেলেবেলা এবং এখনকার ছেলেবেলার মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্যগুলো চোখে পড়ে?
হাসান আজিজুল হক: এখনকার ছেলেমেয়েদের ছেলেবেলা দেখলে, তাদের জন্য আমার যে কী দুঃখ-কষ্ট-করুণা হয়, সেটা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমি স্রেফ বলব, তাদের কোনো ছেলেবেলা নেই। আমরা যত শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, তত এই বিষয়টা ঘটছে। যত গ্রামের দিকে এখনো তুমি যাবে, যত প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাবে, ততই ছোট শিশুর জন্য একটু ছেলেবেলা বাঁধা থাকবে। শহর ছেলেবেলাকে লোপ করে দিয়েছে, আক্ষরিক অর্থে। খেলার জায়গা পর্যন্ত রাখেনি, খেলা বলে কোনো ব্যাপার নেই। আমি এটাকে বলি গোয়াল আর মুরগি। আর একটা জগতে তাদের আমরা ঢুকিয়ে দিয়েছি—কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট। আমরা বড় হয়ে হুইস্কি-টুইস্কি অনেকে খাই, কিন্তু এখন পাঁচ বছরের শিশুকে হুইস্কির চেয়ে বড় জিনিস ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সফট ড্রিংকস, ফাস্ট ফুড। এটার আরও কুফল সামনে পাবে।
২০১৩