গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বাউল সুনীল কর্মকারের সাক্ষাৎকার

লোকসংগীত আর বাউলগানকে গুলিয়ে ফেললে কিন্তু সমস্যা

বাউল সুনীল কর্মকার ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকসংগীত, বাউলগান এবং জালালগীতিকে নিয়ে গেছেন বিশ্বদরবারে। গান গেয়েছেন তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতে। তাঁর সঙ্গে এই কথোপকথন ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর দীপাবলি কিংবা কালীপূজার সন্ধ্যায়। আজ ৬ ফেব্রুয়ারি বাউল সুনীল কর্মকারের দেহাবসান হয়।

আলাপচারিতা: ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

বাংলাদেশের প্রখ্যাত বাউল সুনীল কর্মকারের জন্ম ১৫ জানুয়ারি ১৯৫৯ সালে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার বারনাল গ্রামে। সাত বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চোখের আলো হারান তিনি। সেই অন্ধ ছেলেটিকে বাবা দীনেশ কর্মকার তুলে দেন বাউল গায়ক ইস্রাইল মিয়ার হাতে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে দোতারা, বেহালা, তবলা ও হারমোনিয়াম বাজাতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন সুনীল কর্মকার। তখন থেকেই পেশাদার শিল্পী হিসেবে গান গাইতে থাকেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামের আসরে। তাঁর হাতের পরশে যেন একলাই গেয়ে ওঠে একতারা, স্বরাজ, খমক, খুনজরি, ঢোল ও ঢাক। তাঁর বেহালা যেন তাঁর মতোই দরাজ কণ্ঠে ডুকরে ওঠে।

প্রশ্ন

দাদা, কেমন আছেন?

সুনীল কর্মকার: আছি, ভালো আছি।

প্রশ্ন

সত্যজিৎ রায়ের ‘গোপী গায়েন বাঘা বায়েন’ সিনেমায় আছে কথাটা, যখন থেকে জ্ঞান তখন থেকে গান। আপনারও তো সেই রকম।

সুনীল কর্মকার: হ্যাঁ, সাত-আট বছর বয়স থেকে।

প্রশ্ন

কেমন লাগল পুরো জীবনটা গানে গানে?

সুনীল কর্মকার: জীবন তো আসলে...গানের কথা বলতে গেলে—আমি তো গান শুরু করেছি প্রায় ৪৮ বছর। তো ভালোমন্দেই গেছে। পুরোটা ভালো গেছে, এটাও বলার সুযোগ নেই। খুব খারাপ গেছে, এটাও বলতে পারব না।

প্রশ্ন

আপনার গানের মধ্যে আমরা অধিকাংশ সময় দেখি, ভাটি অঞ্চলের গানের একটা বিরাট বিস্তার আছে। এই যে বিস্তার, এটা এই অঞ্চলের ওপর, বাংলার যে ভাব, সেই ভাবের ওপর কিংবা আপনার ওপর কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছে?

সুনীল কর্মকার: এখানে আমরা যদি বলি, আমাদের উল্লেখযোগ্য যাঁরা পূর্বপুরুষ, রশিদউদ্দিন, জালালউদ্দিন খাঁ, উকিল মুন্সি, জং বাহাদুর শাহ, তাঁদেরও আগে যদি বলি, দীন শরৎ, এ ধরনের উল্লেখযোগ্য সাধক ও লেখক, তাঁরা আমাদের এই অঞ্চলের, তাঁরা এখন নেই যদিও, তাঁদের এই প্রভাবটা এখনো আছে, এটা সারা জীবনই থাকবে। ময়মনসিংহ গানেরই অঞ্চল, গানেরই জেলা এটা, বৃহত্তর ময়মনসিংহ।

প্রশ্ন

এই গানগুলোকে আপনারা যেভাবে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, একজন লিখছেন, একজন গাইছেন, হাজার বছর ধরে এভাবেই চলছে, এই গানগুলো কি কখনো বদলে যায়, এখনকার বা অন্য কোনো সময়ের প্রভাব সেটার ওপর পড়ে বদলায় কি না?

সুনীল কর্মকার: না, এটা সুরের একটু–আধটু এদিক–ওদিক হয়। কালের বিবর্তনে সুরের একটু এদিক–ওদিক হতে পারে। এসব গানের বাণী যদি কেউ নষ্ট করে, তাহলে আর গানটা থাকে না। এটা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কম, আর যদিও মাঝেমধ্যে কেউ কেউ করে থাকে, তাহলে সেই দর্শনটা সে বোঝে না।

প্রশ্ন

গানের এই দর্শন আমাদের কীভাবে প্রভাবিত করছে? মানে, আমরা এখন এসে যে সমাজে এবং যে ব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করি, আমরা নানা ধরনের দাঙ্গাফ্যাসাদ, হাঙ্গামা দেখি, পরস্পরের বিরোধ দেখি, এই যে বিরোধ, গান তো সবাইকে মেলাতে চায়, গান নিজেও নানা বাদ্যে-যন্ত্রে-কণ্ঠে মিলে গান হয়ে ওঠে, সমাজে এই ব্যাপারটা সবাইকে কীভাবে মেলায়? আপনার জীবন দিয়ে কেমন দেখলেন, এটা আমাদের কীভাবে কতটা মেলাল, কিংবা কীভাবে এই মিলন আরও বেশি পোক্ত করা সম্ভব হতো?

সুনীল কর্মকার: আমরা যে বিষয়টা নিয়ে কাজ করি, আমাদের মূল বিষয়টা কিন্তু মানবতাবাদ। আমাদের পূর্বপুরুষ যাঁরা ছিলেন, আমাদের যাঁরা গুরু, তাঁদের যে রচনা, সেটা তাঁদের মানবতাবাদ এবং আত্মদর্শন, নিজেকে জানার জন্য এবং মানুষ যে সৃষ্টির সেরা, মানুষ যে একটা বিষয়, এটা বোঝানোর জন্যই আমাদের সাধকদের রচনা, তাঁদের লেখা, তাঁদের গাওয়া আর আমরা যাঁরা গাইছি আমাদেরও অবস্থা একটাই।

প্রশ্ন

আমরা এখন দেখছি যে কিছু গান নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক ও কথাবার্তা হয়, এসব কথাবার্তা কেন হয়, এটা কি আমরা উপলব্ধি করতে পারি না বলে হয়?

সুনীল কর্মকার: এগুলো উপলব্ধি করতে না পারার কারণে হয়। তা না হলে সাধকদের যে গান, এগুলো নিয়ে বিতর্ক থাকার কোনো কারণ নেই। অনেক সময় তার ভাষাটা অনেকেই বুঝতে পারেন না কিংবা বিষয়টা বুঝতে পারেন না, যে জন্য একটু সমস্যা তৈরি হয়।

প্রশ্ন

আমাদের বাউল ও সাধন সংগীতে যেটা দেখি, কিছু কোড থাকে, একধরনের বার্তা থাকে, যেটা পরিভাষার মধ্যে লুকানো থাকে, যেমন লালনের বারামখানা, লোকে হয়তো সেটা বোঝে না, একটা মোড়কের মধ্যে একটা বার্তা থাকে। আপনার কি মনে হয়, এই কোড পাবলিকের কাছে ভেঙে দেওয়ার দরকার আছে?

সুনীল কর্মকার: আমরা যখন পালাগান করি, তখন কিন্তু এগুলো বুঝিয়েই বলা হয়। এখন ধরেন, বারামখানা বলতে, এটা তো একটা ঠিকানা, এটা একটা ঘর, আপনি যেদিক থেকেই বিবেচনা করেন, ঈশ্বর নিয়ে আমরা যদি চিন্তা করি, ঈশ্বরের আসন যদি হৃদয়ে হয়, হৃদয়টা বারামখানা হতে পারে, আপনাদের নিয়ে এখন যেখানে বসছি, এটাও একটা বারামখানা ধরেন।

প্রশ্ন

জালাল খাঁর গানেও কিন্তু এমন অনেক কিছু আছে।

সুনীল কর্মকার: আছে। লালন শাহর গানে আছে। মনমোহনের অনেক গানে আছে। সাধকদের গানে বারামখানার মতো ব্যাপার থাকবেই। কারণ, মূল বিষয়টাই তো এটা।

প্রশ্ন

এখন যে অবস্থার মধ্যে আমরা আছি। গত ১৫ বছরে আমরা দেখব, এখানে গানজনা, এগুলোর চর্চা খুব একটু সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এটা হয়তো আপনিও খেয়াল করেছেন। কিন্তু এখন এসে আমরা আরেকটা ধাক্কার মধ্যে পড়ে গেছি। এখন এসে যে পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি, সেখানে গানবাজনা ইত্যাদির জায়গা যে খুব উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে, ব্যাপারটা এ রকমও নয়। এই যে একটা দোটানা পরিস্থিতি, এদিকে গেলেও হচ্ছে না, ওদিকে গেলেও হচ্ছে না, এ রকম পরিস্থিতি আপনাদের কাছে তো নতুন নয়, এ রকম পরিস্থিতির মধ্যেই আপনারা বহু বছর ধরে মাঠেঘাটে গান গেয়েই চলেছেন।

সুনীল কর্মকার: এভাবেই চলতে হবে আসলে।

প্রশ্ন

সেই প্রক্রিয়াটাই আমরা জানতে চাই। এই রকমের পরিস্থিতিকে এড়িয়ে গিয়ে নিজের গানকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, এটা আসলে কীভাবে সম্ভব হয় বা কী প্রক্রিয়াগুলো অবলম্বন করেন, আপনার স্মৃতি থেকে যদি দু–একটা কথা বলতেন।

সুনীল কর্মকার: এখন আমরা যারা দেশে বা দেশের বাইরে গানবাজনা করি, গান নিয়ে সমস্যাটা আসলে আমাদের এই অঞ্চলে, আমাদের এই বাংলাদেশেই হয়। আমার জানামতে, অন্য কোথাও এমন হয় না। আমি তো মোটামুটিভাবে আমেরিকা, ইংল্যান্ডে ঘোরা মানুষ। কোথাও সমস্যা নেই। আমাদের এখানে অজ্ঞ কিছু সম্প্রদায় আছে, মানুষই ওরা, এ বিষয়টা এরা বুঝতে পারে না।

আমি তো তাকে গানটা বোঝানোর জন্য চেষ্টা করিনি। আমি তো চেষ্টা করেছি তাকে ফিউশনটা দেখানোর জন্য। এই গানটা সে বুঝল না। যাকে বোঝাতে চাইছেন তার এটা বুঝতে হলে বয়সের দরকার তো। আপনি ১৮ বছরের একটা ছেলেকে এই গান ফিউশন করে কীভাবে বোঝাবেন? এটা সম্ভব? এটা আসলে সে বুঝবে না।

বুঝতে পারে না বলেই আমরা সমস্যায় পড়ি। এটার মধ্যে অবশ্য একটা ভালো জায়গাও আছে। এরা বুঝতে না পারাতে আমাদের জ্ঞানচর্চাটা হয়। এদের বোঝানোর জন্য আমরা কিন্তু একটা কৌশল অবলম্বন করি, সেটা বই পড়ে হোক বা অন্য কোনোভাবে। যে দর্শন থেকে সেটা বুঝতে পারছে না, আমি তার দর্শনটা জানি, জেনে চেষ্টা করি তাকে বোঝানোর। কারণ, তারটা না জানলে তো আমার তাকে বোঝানো সম্ভব নয়।

প্রশ্ন

বাউল বা মালজোড়া গানে নিজেদের মধ্যে জ্ঞানচর্চার ব্যাপার থাকে, আবার সব সময়ই তাতে সাধারণ মানুষকে বোঝানোরও একটা ব্যাপার তো থাকে, নানা জিজ্ঞাসা ও উত্তরে?

সুনীল কর্মকার: এটা কেমন হয়, এটা হয় হলো, আমরা যখন গান করি, আমরা দুটি পক্ষ নিয়ে গান করি, গুরুশিষ্য হতে পারে, দেহতত্ত্ব হতে পারে, শরিয়ত-মারফাত হতে পারে, হিন্দু-মুসলমান হতে পারে; এই যে পালাগানটা করা, এটা তো আসলে বোঝানোর কারণেই করা, দর্শককে বিষয়টা বোঝানোর জন্যই পালাগান বলেন, কিংবা সিলেট অঞ্চলে এটাকে মালজোড়া গান বলে, এটা তো বোঝানোর জন্যই করা আসলে।

প্রশ্ন

এই বোঝাতে বোঝাতে নিজেরও তো বুঝটা বেড়ে যায়।

সুনীল কর্মকার: হ্যাঁ, নিজেরও বাড়ে। আপনাকে বোঝাতে হলে তো আমার নিজেরও চর্চা করতে হবে। আমি যদি চর্চা না করি, আমার যদি পড়াশোনা না হয়, তাহলে আমি দশটা মানুষের সামনে বলব কী!

প্রশ্ন

যাঁরা লোকসংগীত নিয়ে গবেষণা করেন, যাঁরা লোকসংগীত বা অন্যান্য বিষয় নিয়ে আপনার কাছে জানতে চান, অথবা আমার মতো যারা, এমনকি হয়েছে যে তাদের কারণে আপনি বিরক্ত হয়েছেন?

সুনীল কর্মকার: এখন প্রশ্ন যদি কেউ করতে না পারে, যদি কেউ আসে যে আমি এক ঘণ্টা আপনার সঙ্গে কথা বলব, তো কথা বলতে এসে যদি কথা বলতে না পারে, আমি বলতে না চাইলেও মোটামুটিভাবে একটু বিরক্ত তো হই-ই। বলতেই পারল না, এল কেন? এ রকম হয় তো।

প্রশ্ন

যেটা বলছিলাম, বাউলগান নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন...

সুনীল কর্মকার: ও, আরেকটা বিষয় আপনাকে বলি, লোকসংগীত আর বাউলগান, দুইটাকে যদি গুলিয়ে ফেলেন, তাহলে কিন্তু সমস্যা হবে। ময়মনসিংহের আঞ্চলিক গান, সেটা লোকসংগীত হতে পারে, কিন্তু বাউলগানটা তো আসলে আঞ্চলিক গান না, এটা সারা বাংলারই গান। বাংলাভাষী যেখানে আছে সেই মানুষেরই গান। এটা শুধু ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কুষ্টিয়া, সিলেট—এ রকম নয়। এটাকে আপনি মূলধারার গান বলতে পারেন। আমাদের শিকড়ের গান যেটা, সেটাই এটা।

প্রশ্ন

এই শিকড়ের গানটাকে এখন এসে আমরা যখন ফিউশন করি, সেই ফিউশনটাকে আপনি কীভাবে দেখবেন?

সুনীল কর্মকার: এই কিছুদিন আগে একটা গান, আপনারা বোধ হয় জানেন সবাই, ‘মা গো মা ঝি লো ঝি করলাম কী রঙ্গে’, এই গানটা, আমার চল্লিশ বছরের জীবনের সঙ্গী, আরিফ দেওয়ান সাহেব গানটা করেছেন, গান করেছেন খালেক দেওয়ান সাহেবের নামে। গানটা যাঁরই হোক, সেটা বিষয় নয়; সত্তর বছর আগে এইচএমভির রেকর্ডে ছিল গানটা, খালেক দেওয়ান সাহেব করেছেন, গানটা তিনি আবার নতুন করে করলেন, আমার অসন্তুষ্টির জায়গা এটাই যে এত সুন্দর গানটা, গানটা খালেক দেওয়ান সাহেবের রচনা ধরে নিলাম, কিন্তু গানটাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে আরিফ দেওয়ানের মতো মানুষ দাঁড় করিয়েছেন, এ বিষয়টাতে আমি বিরক্ত হয়েছি। এই ফিউশনটার কারণে। এখন আমরা গান শুনলাম নাকি ফিউশনটা দেখলাম, কোনটা?

লোকসংগীত আর বাউলগান, দুইটাকে যদি গুলিয়ে ফেলেন, তাহলে কিন্তু সমস্যা হবে। ময়মনসিংহের আঞ্চলিক গান, সেটা লোকসংগীত হতে পারে, কিন্তু বাউলগানটা তো আসলে আঞ্চলিক গান না, এটা সারা বাংলারই গান। বাংলাভাষী যেখানে আছে সেই মানুষেরই গান।
বাউল সুনীল কর্মকার
প্রশ্ন

অনেকে কিন্তু ফিউশনটা করছে এভাবে যে এটা এখনকার ছেলেপিলে যারা, যারা ওয়েস্টার্ন তাল-বাদ্য-যন্ত্র, এগুলো না থাকলে গানটার মজাটা পায় না, সে জায়গা থেকে হয়তো তাঁরা চিন্তা করেছেন, গানটা এভাবে করা যেতে পারে।

সুনীল কর্মকার: আমি তো তাকে গানটা বোঝানোর জন্য চেষ্টা করিনি। আমি তো চেষ্টা করেছি তাকে ফিউশনটা দেখানোর জন্য। এই গানটা সে বুঝল না। যাকে বোঝাতে চাইছেন তার এটা বুঝতে হলে বয়সের দরকার তো। আপনি ১৮ বছরের একটা ছেলেকে এই গান ফিউশন করে কীভাবে বোঝাবেন? এটা সম্ভব? এটা আসলে সে বুঝবে না। এটা আসলে ফিউশনের জিনিস না। এটা ডেকে একজনকে, বাবা রে এই গানটা এই, এটার বিষয় হলো এই, এটা আপনি ফিউশন করে সাজিয়ে, আরও দশটা মানুষ নাচিয়ে এই গানের ভাব আপনি কী করে বোঝাবেন? গানটা ভালো গেয়েছেন তিনি, সেটা না; কিন্তু এভাবে এ বিষয়টা আমার পছন্দ হয়নি।

প্রশ্ন

আপনি যাঁদের সঙ্গে গান গাইলেন এই দীর্ঘ জীবনে, তাঁদের মধ্যে কার কার কথা আপনার মনে লেগে থাকে?

সুনীল কর্মকার: এরা এখনো অনেকে আছেন, অনেকে চলেও গেছেন। যেমন মাখন দেওয়ান সাহেব ছিলেন, চলে গেছেন, ফতুল্লার আবুল সরকার সাহেব ছিলেন, ময়মনসিংহের মাহতাব মিয়া তো আমার একদম নাবালক কালের সঙ্গী। আমি যখন প্রায় ছোটই, তখন থেকেই তাঁর সঙ্গে গান করেছি। উনিও চলে গেছেন।

বেহালা তো আসলে আমাদের এখানকার জিনিস না, এটা ওয়েস্টার্ন জিনিস, কিন্তু আমাদের এখানে বেহালাটা চলে এসেছে প্রায় আড়াই শ-তিন শ বছর। এটা যদিও ওয়েস্টার্ন হয়ে থাকে, তো এটা আমাদের হয়ে গেছে। যেমন হারমোনিয়াম বাজাই আমরা, হারমোনিয়ামটা তো আসলে আমাদের না। এটা পিয়ানোর সংস্কার।

বর্তমানে যাঁরা গাইছেন তাঁদের মধ্যে আরিফ দেওয়ান সাহেব আছেন, ঢাকার দেওয়ানবাড়ির। এরপরে ফকির আবুল সরকার আছেন ফরিদপুরের, মানিকগঞ্জের ছোট আবুল সরকার, আছেন অনেকে, গাই সবার সঙ্গেই। ভালো, ওনারা ভালো গান করেন, জ্ঞানী মানুষ, তাঁদের সঙ্গে গাই। চেষ্টা করি জ্ঞানীদের সঙ্গেই গাওয়ার জন্য।

প্রশ্ন

অনেক বাদ্যযন্ত্র আপনার হাতে খুলে যায় বলা যেতে পারে। আপনার বেহালার কিন্তু অনেক ভক্ত আছে, শুধু গানের নয়। বেহালার সঙ্গে বাউলগানের সম্পর্কটা আসলে কীভাবে?

সুনীল কর্মকার: হা হা হা, বেহালা তো আসলে আমাদের এখানকার জিনিস না, এটা ওয়েস্টার্ন জিনিস, কিন্তু আমাদের এখানে বেহালাটা চলে এসেছে প্রায় আড়াই শ-তিন শ বছর। এটা যদিও ওয়েস্টার্ন হয়ে থাকে, তো এটা আমাদের হয়ে গেছে। যেমন হারমোনিয়াম বাজাই আমরা, হারমোনিয়ামটা তো আসলে আমাদের না। এটা পিয়ানোর সংস্কার। বিশাল বড় একটা জিনিস ছিল, এটাকে ছোট করা হয়েছে।

প্রশ্ন

বাউলগানেও তো সে রকম অনেক ধরনের কথাবার্তার মিশেল আছে। বাউলগান বা আমরা যে গানের ধারাটার কথা বলছি, আপনি যেটাকে বললেন মানুষের গান, সে গানেও তো অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির মতো লোক এসে মিশে গেছে। তো এই মিলমিশটাকে এখনকার সময়ে এসে শুদ্ধতার জায়গা থেকে যদি দেখি, এই মিলমিশটাকে কত দূর নেওয়া যায়, কত দূর নেওয়া যায় না?

সুনীল কর্মকার: এটা নেওয়া যায়। চলছে। এটা যাবেই সামনে।

প্রশ্ন

ময়মনসিংহ অঞ্চলেরই একজন গায়ক আছেন, এখন জীবিত নেই। আবদুস সাত্তার। বাজারে বাজারে গান গাইতেন। ‘পারভেইচ্যারে এত কইরা কইলাম তোরে ফুটবল খেলাটা ছাড়’—এমন অনেক অনুষঙ্গ নতুন করে তো আসে।

সুনীল কর্মকার: বিশুদ্ধতার জায়গায় বিশুদ্ধ কোনো কিছু যদি এসে ঢোকে তাহলে তো কোনো সমস্যা নেই। যদি জ্ঞানের অভাবে অন্য কিছু ঢুকে যায়, তাহলে তো আবার সমস্যা।

প্রশ্ন

আপনার সবচেয়ে দুঃখের মুহূর্তে কোন গানটা বা কোন গানগুলো বেশি বাজে?

সুনীল কর্মকার: মনের অবস্থা যখন যেমন থাকে গানের বিষয়বস্তুটা তখন তেমনই খুঁজে নেওয়া হয়। বিপদে পড়লে হয়তো সাঁইজির গান, ‘এসো হে পারের কান্ডারি’ বা এ রকম গান, একটু বিরহ হলে উকিল মুন্সির গান করি। উকিল মুন্সির টাইটেলই ছিল ‘বিরহী’। বিরহ ভাবটা উকিল মুন্সির গানে খুব বেশি।

প্রশ্ন

বড় একটা প্ল্যাটফর্মে যখন গান করেন, কোনো টেলিভিশনে কিংবা বিশ্বমঞ্চে তখন তো ব্যাপারটা এক রকম। আবার যখন একটা সামাজিক পরিসরে গান গাইতে থাকেন তখন কিন্তু অন্য রকম। ব্যক্তিগত কোনো সামাজিক পরিসরে গান গাওয়ার সময় নিজের রিঅ্যাকশনের জায়গাটা নিজের মধ্যে প্রবল থাকে, তখনকার পরিস্থিতিতে আমাদের সাধকদের কার বা কাদের গান দিয়ে সেই প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা সহজ হয়?

সুনীল কর্মকার: আমাদের আসলে সবারই আছে। জালালউদ্দিন খাঁরও গান আছে এমন। অনেক ডাইমেনশন। লালন শাহরও অনেক গান আছে এমন। মনমোহনেরও অনেক গান আছে। উকিল মুন্সির যেমন একটা সাইড বেশি। জালালউদ্দিন খাঁর হলো চতুর্সাইড। লালন শাহরটা মনে করেন চতুর্সাইড।

প্রশ্ন

দাদা, এই যে আমি এতক্ষণ কথা বললাম, সেখানে আমার বেয়দাবির জায়গা থাকতে পারে, বেয়াক্কেলির জায়গা থাকতে পারে, আপনার ভালো লাগার জায়গা থাকতে পারে, সেসব জায়গা থেকে আপনি আমাকে একটা গানের দুটো লাইন শোনাবেন, যেটা দিয়ে আসলে আপনি আমাকে একটা বার্তা দিলেন, এ রকম মনে করব।

সুনীল কর্মকার: আমরা জালালউদ্দিন খাঁর গানের মধ্যে, অনেকগুলো গান তাঁর, আমি তুলেছি জালালউদ্দিন খাঁর অনেক গান, পৃথিবীর অনেক লোকজন জানে যে আমি জালালউদ্দিন খাঁর গান করি। ওনার সবচেয়ে জনপ্রিয় একটা গান। এই গানের মুখটা, স্থায়ীটা, একটু শোনাতে পারি।

‘মানুষ ভজো কোরআন খুঁজো, পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে। মানুষ থুইয়া খোদা ভজো, এ মন্ত্রণা কে দিয়াছে।’ এই যে গানটা, এই গানটার নয়টা অন্তরা। এই গানটাতে শুধু মানুষ যে কী, মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত, মানুষ শ্রেষ্ঠ হলো কেন, এটা বোঝানোর জন্যই সাধক চেষ্টা করেছেন, যে কারণে জালালউদ্দিন খাঁর এ গানটা আমার কাছে খুব উল্লেখযোগ্য।