
‘সাহিত্য সাময়িকী’র নিয়মিত আয়োজন হিসেবে ২০০৮–এর অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত পাঁচটি নির্বাচিত বই সম্পর্কে লেখক/সম্পাদকদের সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল ২০০৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। সেই আয়োজনে ছিল ‘আমার সমাধিকালের প্রসাধন’ বইটি নিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের এ সাক্ষাৎকার। এত দিন ছাপা কাগজের পাতাজুড়ে থাকা সেই সাক্ষাৎকার আজ সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুদিনে অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৈমুর রেজা।
আমার সমাধিকালের প্রসাধন কাব্যগ্রন্থটিতে অস্তিত্বের জন্য আপনার বিপুল আকুতি আছে। সাধারণভাবে অস্তিত্বের স্পন্দন আমরা খুঁজে পাই জৈবদেহে। কিন্তু জৈবিকতার বাইরেও অমরতার বিশ্বাস আছে। আপনার কবিতা পড়ে মনে হয়েছে—কবিতা বা টেক্সট অস্তিত্বের স্পন্দন হতে পারে। আপনি নিজে অস্তিমানতার স্পন্দন কিসের ভেতর খুঁজে পান?
সৈয়দ শামসুল হক: অস্তিত্বের স্পন্দনের চেয়ে আমি বরং বলব অস্তিত্বের অনুভব। মানুষকে তার অস্তিত্ব সম্পর্কে বুঝতে হয়। অধিকাংশ মানুষ অস্তিত্বকে অনুভব করতে পারে না। আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি এবং চলে যাব—এই দুটি আমরা সর্বাংশে মেনে নিয়ে একটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারি। আবার এই আসা-যাওয়ার ভেতরে যখন দেখি—কেন আমি এলাম জানি না, তখন এই আসাটাকে আমি অর্থমণ্ডিত করতে চাই। কোনো অর্থ দিয়ে আসাটাকে কারণের ওপর প্রতিষ্ঠা করাটাই হলো অস্তিত্বের অনুভব। এই বইয়ে জীবন এবং মৃত্যু নিয়ে অনেক কবিতা আছে। কবিতাগুলোতে একটা জিনিস হয়তো স্পষ্ট ধরা পড়বে—এই অস্তিত্বের কারণ সন্ধান এবং জীবনের যখন শেষ তখন নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানো, নিজের সেই ক্ষীয়মাণ শারীরিক অস্তিত্বের সামনে দাঁড়ানো।
একটা আকুতিও তো আছে।
সৈয়দ হক: হ্যাঁ আছে—আমি যে ছিলাম, আমি যেন একেবারে হারিয়ে না যাই। অনেক সময় হয় কি, একটা গাছে হাওয়া এসে পড়ল, পাতারা নড়ে উঠল। আমরা বুঝলাম—হাওয়াটা এসেছিল। হাওয়া এসে চলে যাওয়ার পরও পাতায় সেই কম্পন থেকে যায়। এই কম্পনটুকুই বোধ হয় মানুষের আকাঙ্ক্ষা। মানুষ নিজেকে ছাড়িয়ে বেঁচে থাকতে চায়। তো এভাবে দেখা যেতে পারে। আমি যা কিছুই লিখি তা প্রবল একটা চাপের মুখে—সেটা হলো আমার অস্তিত্বকে অনুভব করা।
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করানো নয়, আমাদের সব কাজই মৃত্যুকে জয় করার জন্য। মানুষের ক্ষুধা পেলে মানুষ খায়—এটা গুরুত্বপূর্ণ। অনাহার দীর্ঘতর হলে সে থাকবে না। কাজেই ক্ষুধা একটা প্রবল তাড়না; রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রে এর প্রভাব আছে।
এই বইতে আপনি যেন মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করছেন, আক্রমণ করছেন। আপনি লিখছেন, ‘এ খেলায় মৃত্যুর বিপরীতে লড়বে আমার কবিতা ও নাটকের সব কুশীলব’—কবির এই সংবেদন কেমন, যখন তিনি নিজের সৃষ্টিকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন?
সৈয়দ হক: মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করানো নয়, আমাদের সব কাজই মৃত্যুকে জয় করার জন্য। মানুষের ক্ষুধা পেলে মানুষ খায়—এটা গুরুত্বপূর্ণ। অনাহার দীর্ঘতর হলে সে থাকবে না। কাজেই ক্ষুধা একটা প্রবল তাড়না; রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রে এর প্রভাব আছে। পশুশিকার থেকে মানুষ ক্রমে কৃষিকাজ শিখেছে ক্ষুধাকে জয় করার জন্য। নারী-পুরুষের যে সংসর্গ, যাকে বলা হয় যৌন সংসর্গ, সেটাও মৃত্যুকে পরাজিত করার জন্যই। কারণ, আমি প্রজনন করছি, আমার পরে থেকে যাবে আমার সন্তান, আমার একটা অংশ থেকে যাবে। কাজেই মানুষের যা কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত নয় তার সবটাই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করানো।
এক আশ্চর্য সংগমের স্মৃতি কিংবা বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা—এসব বইতে আপনার কবিতায় যে ভাবসমৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্য ছিল সেটা এই বইতে এসে কমে গেছে মনে হলো।
সৈয়দ হক: একেকটা সময় একেকটা অনুভব লিখিয়ে নেয়। বৈশাখে রচিত পংক্তিমালার ভেতর যদি বৈচিত্র্য আছে মনে করো, এ বইয়ে আরেক ধরনের বৈচিত্র্য আছে। অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করাটাই একটা বিশাল বৈচিত্র্যময় ব্যাপার। এই কাজটাই হয়তো এখানে করা হয়েছে। তুমি একজন তরুণ। আমার তরুণ সময়ের লেখাগুলো তোমার কাছে বেশি আবেদন রেখেছে। তোমার বয়স আরও কুড়ি বছর বেশি হলে আমার সমাধিকালের প্রসাধন তোমাকে বেশি টানবে। এটা আসলে যেকোনো শিল্পেই—বয়সের ওপরেও গ্রহণটা নির্ভর করে।
বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা আমি লিখেছি ৪০ বছর আগে। প্রায় আট শ পংক্তি। এই ৪০ বছরে দুটি প্রজন্ম চলে গেছে। তৃতীয় প্রজন্মে এসে তুমি বইটার কথা বলছ। একজন কবির কাছে এর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে যে তাঁর লেখা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছাচ্ছে। এখানেই তো জিত—কবিতার। ‘মৃত্যুর সঙ্গে আজ আমার ফাটাফাটি হয়ে যাবে’—আমি লিখেছি না কবিতায়? তার বড্ড বাড় বেড়েছে, আমাকে শুধু ভয় দেখাচ্ছে—তোমাকে আমি নিয়ে নেব, শেষ করে দেব। না। আমি দৈহিকভাবে শেষ হয়ে যেতে পারি, কিন্তু আমার উচ্চারণ তো থেমে যাবে না। এটাই আমার খেলা, আমার লড়াই।
সুর ও ছন্দে আপনার দখল অসামান্য। এই ক্ষমতা কি বিষয়কে ছাপিয়ে আপনার কবিতাকে দখল করে রাখে? বা এদের সম্পর্কটা কেমন?
সৈয়দ হক: না, না। এভাবে তো হয় না। কবিতা কীভাবে আসে? একটি দুটি বাক্য, শব্দ, বাক্যাংশ, আধভাঙা একটি লাইন যখন মাথার ভেতরে আসে, আমি বলি—করোটির ভেতরে আসে, তখন সেটাই কিন্তু নিরূপণ করে দেয় যে কী ভঙ্গিতে ব্যাপারটা আনতে চেষ্টা করতে হবে। ছন্দও এমন নয় যে যেকোনো ছন্দে যেকোনো কথা বলা যায়। প্রতিটি কথার উপস্থাপনার সঙ্গে কবির একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ আছে—দূরে বা কাছে, তির্যক বা সরল, ওপরে বা নিচ থেকে—এ রকম একটি অবস্থান থেকেই কথাটিকে নাচানো হয়, কথাটাকে বাজানো হয়। এভাবে কবিতা হয়। করণকৌশল বিষয়কে প্রভাবিত করে না, বরং বিষয়টাই ঠিক করে দেয় করণকৌশল।
কখনো হয়তো তিনটি-চারটি সনেট লিখলাম, তারপর হয়তো দেখা গেল সবটা মিলেই একটা দীর্ঘ কবিতা হয়। এটা তো কারিগরি দিক। এটা পুনরাবৃত্তি নয়। যদি একই চিত্রকল্প ব্যবহার করি, একই রূপকল্প ব্যবহার করি—তাহলে হয়তো পুনরাবৃত্তির অপবাদ দেওয়া বা সমালোচনা করা যেতে পারে।
আপনার এই বইতে পুনরাবৃত্তি আছে বলে মনে হয়েছে। একই কবিতা ঘুরেফিরে এসেছে বারবার। এ রকম কেন হয়?
সৈয়দ হক: আমার তা মনে হয় না। এবং এ নিয়ে যদি ইশকুলের ক্লাস করতে হয় তাহলে আমি দেখিয়ে দিতে পারব, অনেক সময় একই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন ভঙ্গিতে কথাটাকে পরীক্ষা করে দেখা হয়, কথাটাকে বাজিয়ে দেখা হয়, বলে দেখা হয়—এ রকম। কখনো হয়তো তিনটি-চারটি সনেট লিখলাম, তারপর হয়তো দেখা গেল সবটা মিলেই একটা দীর্ঘ কবিতা হয়। এটা তো কারিগরি দিক। এটা পুনরাবৃত্তি নয়। যদি একই চিত্রকল্প ব্যবহার করি, একই রূপকল্প ব্যবহার করি—তাহলে হয়তো পুনরাবৃত্তির অপবাদ দেওয়া বা সমালোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু তা নয়। আমরা মূলত একটা কথাই বলি—সে হচ্ছে আমি আছি, আমি স্পন্দিত হচ্ছি, অনুরণিত হচ্ছি। এটা বিভিন্ন ছন্দে, বিভিন্ন ভঙ্গিতে, বিভিন্ন চিত্রকল্পে, রূপকল্পে বলা হয়। মানুষের কোনো কথা কিন্তু নতুন নেই, নতুন করে বলার আছে।
আপনার এত দিনকার সৃষ্টি নিয়ে এই বইতে চোখা এবং পরিষ্কার অহংকার আছে, যা উদ্ধতভাবে মৃত্যুকে আক্রমণ করে। সাহিত্যে আপনার দীর্ঘদিনের পর্যটনই কি নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে আপনাকে অহংকারী করে তুলেছে?
সৈয়দ হক: অহংকারী নয়। শব্দটা বোধ হয় তুমি ঠিক বললে না। তোমাকে এই শব্দ আমি জোগাব না, তবে এটুকু বলি—তোমার কথা শুনে আমার ভালো লাগছে। ভালো লাগছে যে তাহলে বোধ হয় একেবারে পণ্ডশ্রম হয়নি। আমার কাছে মনে হয় যেকোনো ভাবই অহংকৃত উচ্চারণ। অহংকারের ভেতরে অহং কথাটা আছে। সেই অহংটাই যদি অনুভব করি, আমি আমি, আমি যেভাবে দেখেছি, আমি যেভাবে বুঝেছি—সেটা ১০ জনের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। আমি যদি সৎ থাকি, খাঁটি থাকি, বিশ্বস্ত থাকি, যদি অনুভব করে থাকি, প্রকাশ করে থাকি, তাহলে মনেই হতে পারে যে এটা তথাকথিত অহংকৃত উচ্চারণ। আসলে আমার কথাটা বলছি—ওইখানেই তো জিত।
এই বইটার সমালোচক যদি আপনি নিজেই হন—সে ক্ষেত্রে কী বলবেন?
সৈয়দ হক: এটা তো আমি বলতে পারব না। একটা বিরাট সময় ধরে আত্মসমালোচনা করার পরই আমি একটা কবিতা প্রকাশ করি। কাজেই তোমার প্রশ্নের উত্তরে আমি বলব—আমার শ্রম-ঘামের চিহ্ন দিয়ে এটা আছে, এবং যা হয়েছে তা–ই আছে। যদি কিছু না বলে থাকে এই বই, তাহলে আমি দুঃখিত তোমার সময় নষ্ট করার জন্য; আর যদি কিছু হয়ে থাকে তাহলে আমি আনন্দিত, খানিকটা হলেও, অনেকটা হলেও—বইটি বলতে পেরেছে।