অরুন্ধতী রায়
অরুন্ধতী রায়

গাজায় ইসরায়েলি হত্যাকাণ্ড নিয়ে অরুন্ধতী রায়

যদি আমরা এরপরও নীরব থাকি...

হামাসের হামলার জবাবে মাস দেড়েক আগে ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা এখন জাতিনিধনে পরিণত। এ বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বন্ধের দাবি উঠেছে। সরব হয়েছেন লেখকেরাও। বুকারজয়ী ঔপন্যাসিক ও ভারতের নাগরিক অধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায় ১৬ নভেম্বর মিউনিখ সাহিত্য উৎসবে পঠিত তাঁর বক্তৃতায় তুলেছেন যুদ্ধবিরতির দাবি। লিটারারি হাব থেকে লেখাটি অনুবাদ করেছেন হাসান ইমাম

আমি কোনো জনপরিসরে উপস্থিত হতে পারি না! না, এমনকি জার্মানিতেও না, যেখানে আমার মতো মানুষের মত-অভিমত প্রকাশ কার্যত নিষিদ্ধ—আমি জানি। এ-ও জানি, আমার গলা তোলার অপেক্ষা না করেই লাখ লাখ মানুষ—ইহুদি, মুসলিম, খ্রিষ্টান, হিন্দু, কমিউনিস্ট, নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী—বিশ্বজুড়ে রাজপথে দুর্বার আলোড়ন তুলেছেন, গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাচ্ছেন।

আমরা যদি এই দুর্বিনীত নরহত্যা সংঘটিত হতে দিই, তাহলে আমরাও এ অন্যায় কর্মের সহযোগী হব। এমনকি এটি আমাদের ব্যক্তিজীবনের নিভৃততম স্থানে আসর ফেলছে, আমরা এর দায় এড়াতে পারি না। যদি আমরা এরপরও নীরব থাকি, তবে আমাদের নৈতিকতার মাঝখানে এমন কিছু অদলবদল ঘটে যাবে, যার কোনো মেরামতই সম্ভব হবে না—সেই বদল হবে চিরকালীন।

যখন হাসপাতালে বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে, এরই মধ্যে ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত, হাজার হাজার মৃত শিশুকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বের করে আনা হচ্ছে, তখনো কি আমরা কেবল স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে থাকব, দেখতে থাকব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে? আমরা কি আবারও একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেখব, যেখানে তাদের না–থাকাটা আমাদের কাছে কোনো মানে তৈরি করবে না?

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারত্ব ও গাজাকে অবরোধ করে রাখা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ—যারা এই দখলদারত্বের জন্য অর্থকড়ির জোগান দিচ্ছে, তারা অপরাধের পক্ষে। বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে চালানো হামাস ও ইসরায়েলের বিবেকবর্জিত যে নরহত্যা—আমরা এ মুহূর্তে যে ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করছি, তা অবরোধ ও দখলদারত্বের পরিণতি।

নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে যত যা-ই মন্তব্য করা হোক, উভয় পক্ষের দ্বারা সংঘটিত বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে যতই নিন্দার ঝড় বইয়ে দিই, এই নৃশংসতার মাত্রা সম্পর্কে যতই ভিত্তিহীন তুল্যবিচারের চেষ্টা করা হোক কেন, কোনোভাবেই তা সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে না। এর কারণ দখলদারত্ব।

দখলদারত্বই এ দানবত্বের জন্ম দিচ্ছে। অপরাধী ও ভুক্তভোগী উভয়ের প্রতিই এটি সহিংসতা ঘটাচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তিরা মৃত। নিজেদের কৃতকর্ম নিয়েই অপরাধীদের বেঁচে থাকতে হবে। তাঁদের সন্তানদেরও তেমন জীবন যাপন করতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।

সামরিক পন্থায় কোনো সমাধান হতে পারে না। এটি হতে পারে শুধু রাজনৈতিক, যেখানে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা—উভয়ই সমান অধিকার নিয়ে, সমান মর্যাদায় একসঙ্গে বা পাশাপাশি বসবাস করবে। এ জন্য বিশ্বকে অবশ্যই হস্তক্ষেপ করতে হবে। দখলদারত্বের অবসান ঘটাতে হবে। অবশ্যই ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি মাতৃভূমি থাকতে হবে, যা টেকসই ও কার্যকর।

যদি তা না হয়, তা হলে পশ্চিমা উদারনীতির ওপর ভর করে নির্মিত নৈতিক স্থাপত্য বিলুপ্ত হবে; যদিও এটা সর্বকালেই ভণ্ডামিপূর্ণ ছিল, আমরা জানি। কিন্তু তা-ও এটা একরকম আশ্রয় হতে পেরেছিল। সেই আশ্রয় আমাদের চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

তাই অনুগ্রহ করে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের জন্য, জীবিতদের স্বার্থে এবং মৃতদের নামে, ইসরায়েলের কারাপ্রকোষ্ঠে পুরে রাখা থাকা ফিলিস্তিনিদের কথা ভেবে, হামাসের হাতে জিম্মিদের কথা মনে রেখে—মানবতার দোহাই, সমস্ত মানুষের দোহাই, এখনই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করুন।