0১ নভেম্বর ছিল কালি ও কলম-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আবুল হাসনাতের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর শূন্যতা অনুভব করে তাঁকে স্মরণ করেছেন পত্রিকাটির বর্তমান সম্পাদক

ঠিক দুই বছর আগে এই নভেম্বরের পয়লা দিনে কবি এবং কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। অসুস্থ ছিলেন তিনি, কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে অসুস্থ কিংবা শয্যাশায়ী ছিলেন না। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কিছুদিন পর শুনতে পেলাম, ভালো হয়ে উঠছেন তিনি। হাসপাতালে তাঁকে দেখতে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু অসুস্থতা কাটিয়ে ওঠার সংবাদে আর যাওয়া হলো না। ভাবলাম, সুস্থ মানুষটিকেই দেখতে যাব একদিন। তখন আমরা বাসায় বসেই কালি ও কলম-এর কাজগুলো করি; অবশ্যই করোনা প্রতিরোধে সাবধানতা হিসেবেই। এ রকম একটা অবস্থায় আবুল হাসনাত চলে গেলেন—আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিতভাবে।
আমি কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদে যোগ দিই ২০১৪ সালের শেষের দিকে, মূলত হাসনাতের আগ্রহে ও আমন্ত্রণে। আমার কাজ ছিল মূলত পত্রিকায় প্রকাশের জন্য আসা লেখাগুলো (গদ্য) পড়ে দেখা এবং মতামতসহ সম্পাদকের বিবেচনার জন্য পেশ করা। পত্রিকায় কোন লেখা ছাপা হলো, কার লেখা ছাপা হলো—সে বিষয়ে আমার নাক গলানোর প্রয়োজন পড়ত না। কিন্তু একেবারে যে পড়ত না, তা–ওবা বলি কীভাবে। হাসনাত মাঝেমধ্যে কোনো কোনো বিশেষ লেখা এগিয়ে দিতেন, বিশেষ জায়গার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানতে চাইতেন, লেখাটি ছাপা হলে কোনো বিপত্তি ঘটার আশঙ্কা আছে কি না। প্রয়োজনে সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গেও আলোচনা করেন। আবার অনেক সময় কোনো কোনো লেখা ছাপার জন্য অনুরোধ, তাগিদ কিংবা নাছোড়বান্দা তদবির এলে বিপাকে পড়ে আমাদের মতামত চাইতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের বিবেচনাই প্রাধান্য পেত। নরম স্বভাবের বিনয়ী মানুষ হলেও পত্রিকার লেখার মানের সঙ্গে আপস করতেন না কখনো।
আসলে সাহিত্য সাময়িকী বা সাহিত্যপত্র সম্পাদনার কাজে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে হাসনাত নিজেকে যে অবস্থানে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন, তেমনটা খুব বেশি চোখে পড়ে না। বিশেষত তাঁর পঠন-পাঠনের ব্যাপ্তি এবং উন্নত রুচির সঙ্গে সঙ্গে কবি-লেখক ও শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গতা একটি উন্নত মানের সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনার কাজে বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছিল। কিন্তু এ জন্য কখনোই তাঁর মধ্যে কোনো অহমিকা দেখিনি।
আবুল হাসনাতের আকস্মিক মৃত্যুর পর কালি ও কলম-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন; এবং একই বছরে সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ও সম্পাদকের মৃত্যুর ফলে সে শঙ্কা সৃষ্টির যথার্থ কারণও ছিল। এই অবস্থায় অনেকে ভেবেছিলেন, পত্রিকাটির প্রকাশনা এবার হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে।
আমরা যাঁরা পত্রিকাটির সম্পাদকীয় পরিষদে কাজ করি, তাঁরাও সম্পাদক আবুল হাসনাতের আকস্মিক মৃত্যুতে হয়ে পড়েছিলাম কিছুটা বিচলিত ও নিরাশ। এমন এক অনিশ্চিত অবস্থায় সহকারী সম্পাদক মুহাম্মদ আশফাক খান আমাকে বললেন, ‘স্যার, আপনি যদি আমাদের গাইড করেন, তাহলে আশা করি পত্রিকা আমরা চালিয়ে নিতে পারব।’ আশফাকের কথায় উদ্দীপিত হলাম। কালি ও কলম-এর প্রকাশনা অব্যাহত থাকুক, এটা আমিও চাই। শুরু হলো আমাদের নতুন করে পথচলা—আবুল হাসনাতকে ছাড়া; আনিসুজ্জামানকে ছাড়া। তবে তাঁদের বাদ দিয়ে তো নয়। বিশেষত আবুল হাসনাত। সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদনার কাজটি তিনি করতেন মনপ্রাণ দিয়ে। মনে হতো, সারাক্ষণ বুঝি সে চিন্তাতেই আছেন। দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সাময়িকী, গণসাহিত্য সম্পাদনার দায়িত্ব তো তিনি আগেই পালন করেছেন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ-নবীন কবি-লেখকদের সঙ্গে ছিল তাঁর বিশেষ হৃদ্যতার সম্পর্ক। নিজে পড়তেনও প্রচুর, সংগ্রহ করতেন তারও বেশি।
আবুল হাসনাতের চলে যাওয়ার পর দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ে প্রায় নিয়মিতভাবেই কালি ও কলম প্রকাশিত হয়েছে। আর এ-ও ঠিক, হাসনাতের সম্পাদকত্বে পত্রিকাটি যে ছক মেনে বের হতো, আমরা তার তেমন কোনো ব্যত্যয় ঘটাইনি। সে চেষ্টাও করিনি। করার তেমন প্রয়োজন আছে বলেও আমাদের এখনো পর্যন্ত মনে হয়নি।
একটি উন্নত মানের সাহিত্যপত্রিকা কিংবা অন্য যেকোনো বিষয়ভিত্তিক সাময়িকপত্রের জন্য মানসম্পন্ন ভালো লেখা সংগ্রহ করা যে কত কঠিন, তা অভিজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রই হাড়ে হাড়ে জানেন। হাসনাত সেদিক থেকে কিছুটা সৌভাগ্যবান ছিলেন বলে আমার মনে হয়। আমাদের যেসব কীর্তিমান লেখক ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের অনেকেও বয়সের কাছে নতিস্বীকারে বাধ্য হয়েছেন। অতএব আমরা ক্রমাগত চাপের মধ্যে থাকতে বাধ্য হচ্ছি।
তবু বর্তমানকে তো এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় ভবিষ্যতের দিকে। এই যাত্রায় তখন কালি ও কলম সম্পাদনা করতে গিয়ে আরও বেশি করে বন্ধু আবুল হাসনাতকে মনে পড়ে, শুধু সম্পাদক হিসেবে নয়, সহযাত্রী হিসেবেও।