লেন ডাইটন (১৯২৯—২০২৬)
লেন ডাইটন (১৯২৯—২০২৬)

দেশে–বিদেশে

স্কুল ফাঁকি দেওয়া ছেলেটাই হলেন দক্ষ গুপ্তচর লেখক

ব্রিটিশ লেখক লেন ডাইটন তার গুপ্তচর উপন্যাসগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন। গত ১৭ মার্চ ৯৭ বছর বয়সে মারা গেছেন। সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ ১৯৬২ সালের দ্য ইপক্রেস ফাইল, যা থেকে বাফটা-জয়ী চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, যেখানে অভিনয় করেছিলেন মাইকেল কেইন। চার বছর আগে এটি আবার আইটিভি সিরিজ হিসেবে নির্মিত হয়, যেখানে অভিনয় করেন জো কোল।

গল্পটিতে শীতল যুদ্ধকালীন ব্রেনওয়াশিং এবং পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়ন ও পরীক্ষার বিষয় উঠে আসে। তবে জেমস বন্ডের মতো নয়, ডাইটনের গুপ্তচররা ছিলেন সাধারণ কর্মজীবী মানুষ।

ডাইটন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু ঐতিহাসিক বইও লিখেছেন এবং একজন রান্নাবিষয়ক লেখক হিসেবে যুক্তরাজ্যে ফরাসি খাবারের পরিচিতি বাড়াতে সহায়তা করেছেন। চিত্রকলায় আগ্রহী ডাইটন দুই শতাধিক বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন।

১৯২৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি লিওনার্ড সিরিল ডাইটন জন্মগ্রহণ করেন লন্ডনের মেরিলিবোনে। তাঁর বাবা-মা একটি ধনী পরিবারে জন্য কাজ করতেন। মা ছিলেন রাঁধুনি এবং বাবা ছিলেন গাড়িচালক।

দ্য ইপক্রেস ফাইল

১৯৪০ সালে তিনি দেখলেন তাঁর মায়ের নিয়োগকর্তা আনা ভলকফকে ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থা ধরে নিয়ে যাচ্ছে, যাকে যুদ্ধকালীন নাৎসি গুপ্তচর হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।

পরে তিনি একবার বলেছিলেন, এ ঘটনা ছিল আমার গুপ্তচর কাহিনি লেখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি বড় কারণ।

ডাইটন স্কুল পছন্দ করতেন না। এজন্য বাবাও বেশ বিরক্ত ছিলেন। প্রায়ই স্কুল ফাঁকি দিতেন। তবে লাইব্রেরিতে গিয়ে সারাদিন বই পড়তেন।

তিনি রয়্যাল এয়ার ফোর্সে চাকরির সময় ফটোগ্রাফি, উড়োজাহাজ চালানো এবং স্কুবা ডাইভিংসহ গুপ্তচরবৃত্তির নানা দক্ষতা শেখেন। এরপর অল্প সময়ের জন্য রেলওয়ে ক্লার্ক ও এয়ার স্টুয়ার্ড হিসেবে কাজ করেন।

একসময় প্রেস ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করার পর রয়্যাল কলেজ অব আর্টে পড়ালেখা করেন এবং বইয়ের চিত্রকর হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। ভালো খাবারের প্রতি আগ্রহ থেকে তিনি ডেইলি এক্সপ্রেসে কার্টুনধর্মী রান্নার কলাম লিখতেন, যা ১৯৬২ সাল থেকে দ্য অবজারভারে ছাপা হতো। এগুলো পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়।

বন্ড চলচ্চিত্রের প্রযোজক হ্যারি সল্টজম্যান দ্য ইপক্রেস ফাইলের চলচ্চিত্র অধিকার কিনে নেন এবং ডাইটন হঠাৎ করেই বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। এই চরিত্রটি পরে আরও চারটি বইয়ে ফিরে আসে। ফিউনারাল ইন বার্লিন ছয় মাস ধরে নিউইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার তালিকায় ছিল।

ছুটির সময় তিনি একটি গুপ্তচর গল্প লেখা শুরু করেন। এটিই পরে দ্য ইপক্রেস ফাইল হয়ে ওঠে। যদিও তখন এটি প্রকাশের কথা ভাবেননি। তখন প্রথম বন্ড চলচ্চিত্র ড. নো সদ্য মুক্তি পেয়েছে, যা গুপ্তচর ঘরানার প্রতি সবার আগ্রহ তৈরি করেছিল। পরে এক সাহিত্যিক এজেন্ট ডাইটনের গল্পটি একজন প্রকাশকের কাছে বিক্রি করেন।

এর কিছুদিন পরই বন্ড চলচ্চিত্রের প্রযোজক হ্যারি সল্টজম্যান দ্য ইপক্রেস ফাইলের চলচ্চিত্র অধিকার কিনে নেন এবং ডাইটন হঠাৎ করেই বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। বইয়ে নায়কের কোনো নাম ছিল না, তবে চলচ্চিত্রে চরিত্রটির নাম রাখা হয় হ্যারি পামার, এবং এতে অভিনয় করেন মাইকেল কেইন। এই চরিত্রটি ছিল বন্ডের সম্পূর্ণ বিপরীত।

এই চরিত্রটি পরে আরও চারটি বইয়ে ফিরে আসে—হর্স আন্ডার ওয়াটার, ফিউনারাল ইন বার্লিন, বিলিয়ন ডলার ব্রেইন এবং অ্যান এক্সপেনসিভ প্লেস টু ডাইফিউনারাল ইন বার্লিন ছয় মাস ধরে নিউইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার তালিকায় ছিল।

তাঁর সাফল্য তাঁকে ১৯৬০ দশকের শিল্প-সংস্কৃতির অংশ করে তোলে। রান্নার দক্ষতার কারণে তিনি প্রায়ই তারকাদের জন্য ডিনার পার্টির আয়োজন করতেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ব্যঙ্গাত্মক মিউজিক্যাল ওহ! হোয়াট অ্যা লাভালি ওয়ারের চলচ্চিত্র সংস্করণের সহ-প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন।

১৯৬৯ সালে ডাইটন বোম্বার লেখেন, যা জার্মানির ওপর বিমান হামলার গল্প। এই বইটিকে সেরা যুদ্ধবিরোধী উপন্যাসগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি গল্পটি আরএএফ বোমারু বিমানচালক, জার্মান যুদ্ধবিমান চালক এবং হামলার শিকার সাধারণ মানুষদের চোখ দিয়ে তুলে ধরেন। ঘটনার মাত্র পঁচিশ বছর পর প্রকাশিত এই বইটি জার্মান বেসামরিক নাগরিকদের ভোগান্তি তুলে ধরায় বিতর্ক সৃষ্টি করে।

১৯৭৭ সালে তিনি ফাইটার প্রকাশ করেন। এটি ছিল ব্রিটেনের যুদ্ধ নিয়ে একটি নন-ফিকশন বই। এক বছর পরে এসএস-জিবি প্রকাশিত হয়। যেখানে দেখানো হয়, যদি জার্মানি ব্রিটেনের যুদ্ধ জিতে যেত তাহলে কী হতো।

১৯৮০ দশকে ডাইটন বার্লিন গেম প্রকাশ করেন, যেখানে নতুন চরিত্র বার্নার্ড স্যামসনকে দেখা যায়। এই উপন্যাসটি ছিল তিনটি ‘স্যামসন ট্রিলজি’র প্রথম, যা তিনি ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে লেখেন। গ্রানাডা টেলিভিশন প্রথম ট্রিলজির ওপর ভিত্তি করে গেম, সেট অ্যান্ড ম্যাচ নামে ১২ পর্বের একটি ব্যয়বহুল সিরিজ নির্মাণ করে। কিন্তু এটি ভালো সাড়া ফেলতে পারেনি এবং ডাইটন পুনঃপ্রচার করতে অনুমতি দেননি।

১৯৯৬ সালে ফেইথ, হোপ অ্যান্ড চ্যারিটি শেষ করার পর ডাইটন এক বছরের বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু তিনি আর লেখালেখিতে ফিরে আসেননি।

২০০৬ সালে বিবিসি রেডিও ৪–এ একটি সাক্ষাৎকারে তিনি প্যাট্রিক হামফ্রিজকে বলেন, ‘লেখালেখি বোকাদের কাজ এবং তিনি এটি মিস করেন না।’

এরপর দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়াসাবেল ও দুই ছেলেকে নিয়ে আয়ারল্যান্ডে চলে যান। পরে তারা পর্তুগাল ও গার্নসির বাড়িতে সময় কাটান এবং ২০১৬ সালে ডাইটন আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণের ঘোষণা দেন।

তবে ২০১৭ সালে বিবিসি এসএস-জিবির নাট্যরূপ প্রচার করলে তাঁর কাজের প্রতি আগ্রহ আবার ফিরে আসে। ২০২২ সালে দ্য ইপক্রেস ফাইলের নতুন সংস্করণ তৈরি হয়, যেখানে অভিনয় করেন জো কোল, লুসি বয়ন্টন এবং টম হল্যান্ডার।

ডাইটন খুব কম সাক্ষাৎকার দিতেন এবং নিজেকে কখনো স্বাভাবিক লেখক মনে করতেন না।

সূত্র: বিবিসি
গ্রন্থনা: রবিউল কমল