ছবি: বুকারপ্রাইজ.কম
ছবি: বুকারপ্রাইজ.কম

আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার ২০২৬

দীর্ঘ তালিকায় স্থান পেয়েছে ১১ ভাষার ১৩টি বই

বুকার পুরস্কারের নাম শুনলেই বিশ্বসাহিত্যের পাঠকেরা চমৎকৃত হয়ে ওঠেন। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিকভাবে দারুণ সব বইয়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হচ্ছে এই পুরস্কারের বদৌলতে। অনেক সময় নোবেল পুরস্কার ঘোষিত হলে আমরা দেখি লেখক হয়তো বহু বছর আগেই কখনো বুকার পুরস্কার পেয়েছিলেন! সব সময় না হলেও এমন ঘটনার সংখ্যা নিতান্ত কমও নয়। ফলে বিশ্বসাহিত্যের খোঁজখবর যাঁরা রাখেন, নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বুকার পুরস্কার নিয়েও তাঁদের আগ্রহ দিন দিন বেড়েছে। দিন যত গড়িয়েছে বুকার পুরস্কার কমিটিও হয়েছে আরও চৌকস। বছরে একটি বা দুটি পুরস্কার ঘোষণা করলেও নানাভাবে পুরো বছরই তাঁদের কার্যক্রম ছড়িয়ে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি প্রকাশিত হলো আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার ২০২৬-এর দীর্ঘ তালিকা।

সচেতন পাঠক জানেন, বুকার পুরস্কার আর আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার দুটি আলাদা পুরস্কার। একই কমিটি কর্তৃক; কিন্তু দেওয়া হয় ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে। এ বছরই বুকার পুরস্কার কমিটি নতুন আরও একটি ক্যাটাগরি যোগ করেছে—২০২৬ থেকে প্রথমবারের মতো দেওয়া শুরু হচ্ছে চিলড্রেন্স বুকার প্রাইজ।

২৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হওয়া দীর্ঘ তালিকাটি এই বছরের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার বা ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজের জন্য। আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার দেওয়া হয় অন্য ভাষায় রচিত এবং ইংরেজিতে অনূদিত কথাসাহিত্যকে। নতুন সংযোজন চিলড্রেন্স বুকার প্রাইজ তো বোঝাই যাচ্ছে শিশুকিশোরদের উপযোগী সাহিত্যের জন্য। এ ছাড়া মূল বুকার পুরস্কার দেওয়া হয় ইংরেজি ভাষায় রচিত এবং যুক্তরাজ্য বা আয়ারল্যান্ডে প্রকাশিত কোনো উপন্যাসকে।

আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের ক্ষেত্রে লেখক ও অনুবাদক দুজনই সমান স্বীকৃতি পান, পুরস্কারের অর্থও তাঁদের মাঝে সমান ভাগে ভাগ করা হয়। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার পেয়েছেন বানু মুশতাক এবং তাঁর বইয়ের অনুবাদক দীপা ভাস্তি। কন্নড় ভাষায় রচিত তাঁদের বই হার্ট ল্যাম্প এবং তার ইংরেজি অনুবাদের জন্য এই সম্মান প্রদান করা হয়।

এবার আসা যাক ২০২৬ সালের দীর্ঘ তালিকায়। এ বছরের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের জন্য জমা পড়েছিল ১২৮টি বই। কয়েক মাস ধরে পাঠ, আলোচনা ও বিতর্কের পর বিচারকমণ্ডলী সেখান থেকে বেছে নিয়েছেন ১৩টি বই। বিভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট এবং ভিন্ন সাহিত্যিক ভঙ্গির এই বইগুলো দিয়ে তৈরি হয়েছে এক বৈচিত্র্যময় তালিকা।

এ বছরের বিচারকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান ব্রিটিশ লেখক নাতাশা ব্রাউন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন গণিতবিদ ও লেখক মার্কাস দ্যু সোতোয়, অনুবাদক সোফি হিউজেস, লেখক ও সম্পাদক ট্রয় অনিয়াঙ্গো এবং ঔপন্যাসিক-সমালোচক নীলাঞ্জনা এস রায়। সাহিত্য, অনুবাদ, একাডেমিক চিন্তা এবং সমকালীন প্রকাশনা জগৎ—এসব ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার নির্যাসেই সমন্বয় করা হয়েছে দীর্ঘ তালিকাটি। বিচারকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ বছরের নির্বাচিত বইগুলো ভাষাগত বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বয়ান ও কাঠামোগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য।

ছবি: বুকারপ্রাইজ.কম

আসুন জেনে নিই এ বছর দীর্ঘ তালিকায় স্থান পাওয়া ১৩টি বইয়ের লেখক-অনুবাদক এবং ভাষা ও দেশ সম্বন্ধে:

১. দ্য নাইটস আর কোয়ায়েট ইন তেহরান—লেখক: শিদা বাজিয়ার; অনুবাদক: রুথ মার্টিন, ভাষা: জার্মান, লেখকের দেশ: জার্মানি (ইরানি বংশোদ্ভূত)

২. উই আর গ্রিন অ্যান্ড ট্রেম্বলিং—লেখক: গাব্রিয়েলা কাবেসোন কামারা; অনুবাদক: রবিন মায়ার্স, ভাষা: স্প্যানিশ, লেখকের দেশ: আর্জেন্টিনা

৩. দ্য রিমেম্বার্ড সোলজার—লেখক: আনিয়েত দান্যে; অনুবাদক: ডেভিড ম্যাককে, ভাষা: ডাচ, লেখকের দেশ: নেদারল্যান্ডস

৪. দ্য ডেজার্টার্স—লেখক: মাতিয়াস এনার; অনুবাদক: শার্লট ম্যান্ডেল, ভাষা: ফরাসি, লেখকের দেশ: ফ্রান্স

৫. স্মল কমফোর্ট—লেখক: ইয়া জেনবার্গ; অনুবাদক: কিরা জোসেফসন, ভাষা: সুইডিশ, লেখকের দেশ: সুইডেন

৬. শি হু রিমেইন্স—লেখক: রেনে কারাবাশ; অনুবাদক: ইজিদোরা অ্যাঞ্জেল, ভাষা: বুলগেরীয়, লেখকের দেশ: বুলগেরিয়া

৭. দ্য ডিরেক্টর—লেখক: ড্যানিয়েল কেলমান; অনুবাদক: রস বেনজামিন, ভাষা: জার্মান, লেখকের দেশ: অস্ট্রিয়া (জার্মানিতে বসবাসকারী)

৮. অন আর্থ অ্যাজ ইট ইজ বিনিথ—লেখক: আনা পাওলা মাইয়া; অনুবাদক: পদ্মা বিশ্বনাথন, ভাষা: পর্তুগিজ, লেখকের দেশ: ব্রাজিল

৯. দ্য ডিউক—লেখক: মাত্তেও মেলকিওরে; অনুবাদক: আন্তোনেলা লেত্তিয়েরি, ভাষা: ইতালীয়, লেখকের দেশ: ইতালি

১০. দ্য উইচ—লেখক: মারি এনদিয়ায়ে; অনুবাদক: জর্ডান স্টাম্প, ভাষা: ফরাসি, লেখকের দেশ: ফ্রান্স

১১. উইমেন উইদাউট মেন—লেখক: শহরনুশ পারসিপুর; অনুবাদক: ফরিদুন ফাররোখ, ভাষা: ফারসি (পার্সিয়ান), লেখকের দেশ: ইরান

১২. দ্য ওয়েক্স চাইল্ড—লেখক: ওলগা রাভন; অনুবাদক: মার্টিন আইটকেন, ভাষা: ড্যানিশ, লেখকের দেশ: ডেনমার্ক

১৩. তাইওয়ান ট্রাভেলগ—লেখক: ইয়াং শুয়াং-জি; অনুবাদক: লিন কিং, ভাষা: চীনা (তাইওয়ানি ম্যান্ডারিন), লেখকের দেশ: তাইওয়ান

ছবি: বুকারপ্রাইজ.কম

তালিকাটি দেখলেই বোঝা যায়, ভাষা ও ভূগোলের বিস্তার বেশ ব্যাপক। আন্তর্জাতিক বুকারের মাহাত্ম্যও অবশ্য এই ব্যাপারটিতেই। পুরো পৃথিবীর নানা ধরনের সাহিত্যকে একসঙ্গে দেখতে পারি বুকারের তালিকায়।

আগামী ৩১ মার্চ প্রকাশ করা হবে এই পুরস্কারের হ্রস্বতালিকা। সেখানে স্থান পাবে ছয়টি বই। এরপর ১৯ মে লন্ডনের টেট মডার্নের অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হবে বিজয়ীর নাম। পুরস্কারের অর্থ ৫০ হাজার পাউন্ড, যা লেখক ও অনুবাদক সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। এভাবেই তিন ধাপে বুকার কমিটি তাদের পুরস্কারগুলো দিয়ে থাকে।

তত দিন পর্যন্ত এই ১৩টি বই নিয়েই আলোচনা চলবে। পাঠকদের জন্য এ সময়টা বরাবরের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘ তালিকা থেকেই আমরা অনেক সময় খুঁজে পাই আমাদের নিজেদের পাঠ তালিকার জন্য আবশ্যকীয় রসদ।