
রিকশা, ভ্যান আর নৌকা পাশাপাশি চলছে। অথচ তা কোনো নদী বা বিলের দৃশ্য নয়, মহানগরের জলাবদ্ধ রাস্তায় হাহাকার। অন্য এক ছবিতে কোরবানির পশুর রক্তমিশ্রিত জলরাশির রক্তনদী—বীভৎস অথচ অনিবার্য নগরবাস্তবতার দলিল। আবার নিউমার্কেটের তলিয়ে যাওয়া শাড়ির দোকানে বেচাকেনার দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবন চালিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজে নেয়। এ এক আশ্চর্য স্থিতিস্থাপকতার নান্দনিক রূপ। বলছি, ঢাকার আকাশে বর্ষা নামার পরিণতিতে বিগত কুড়ি বছরের বাস্তব দৃশ্যের কথা। যে দৃশ্যের একদিকে রোমান্স, অন্যদিকে দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনার বৃত্তান্ত। আলোকচিত্রী আবির আবদুল্লাহ ‘ট্রাবলিং রেইন’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে এ দ্বৈত রূপকেই অনন্য দৃষ্টিতে ধরেছেন।
এ প্রদর্শনীতে ডকুমেন্টেশনই মূল ভরকেন্দ্র। জলাবদ্ধ রাস্তায় থেমে থাকা অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে রোগী, জল সাঁতরে রাস্তা পার হতে গাড়ির সামনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় কুকুর, পরিবহনের অপেক্ষায় ছাতার নিচে জড়সড় দলবদ্ধ পথিক, কোমরপানিতে আবালবৃদ্ধবনিতার ছুটে চলায় শরীর ও মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া—সবই একে অপরের ভেতর দিয়ে মিশে যায় এক অস্থির নগরযাত্রার ছন্দে।
তবু সবকিছুর মধ্যে কেবল দুর্ভোগ নয়, আছে আনন্দের খোরাকও। কে যেন জুতা হাতে ও মাথায় মুকুট পরে মজার ভঙ্গিতে হাঁটছে, কোথাও ব্যান্ড পার্টির সাজসজ্জা ভিজছে বৃষ্টিতে, কেউ–বা দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছে ডুবে যাওয়া রাস্তায় যেন সমুদ্রসৈকতের আবহে। এ দ্বন্দ্বই নগরজীবনের বৃষ্টিবিলাস—যেখানে কষ্টের ভেতর হাসি, দুর্যোগের ভেতরও রসিকতা জন্ম নেয়।
রাস্তায় চলতে গিয়ে ওত পেতে এসব দৃশ্য ধারণ নিশ্চয়ই আলোকচিত্রীর সময়সাধ্য ও শ্রমসাধ্য এক ঐতিহাসিক দলিল। শুধু কি দলিল? দলিলের বাইরেও কয়েকটি চিত্রে রয়েছে শৈল্পিক দক্ষতা ও মনন। আবার বেশির ভাগ চিত্রেই আলোছায়ার খেলা নেই, কম্পোজিশনের চমক নেই; তবে বিষয় বর্ণনে আলো-আঁধারির মাত্রা আছে। যে আলো-আঁধার মূলত বর্ষার বিড়ম্বনা ও আনন্দের। এমন অনেক ঘটনাচিত্র কখনো আনন্দিত করবে, বিষণ্ন করবে, কিংবা নগরের অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক দুর্নীতির ইঙ্গিত জোগাবে।
ডকুমেন্টারির খসখসে সত্যের বাইরে কয়েকটি আলোকচিত্রে শিল্পের মায়া ধরা পড়েছে। যেমন এক মা শিশুর হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে, পেছনে রিকশার ব্যাকড্রপ যেন ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ সিনেমার স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। আবার এক বৃষ্টিভেজা পথচারীর শরীর আলোকিত করে গাড়ির হেডলাইটের সোনালি ঝলকানি, যা মুহূর্তটিকে কেবল দলিল নয়, এক আবেগময় ভাস্বর রূপ দেয়।
অবশ্য প্রদর্শনীর উপস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়। ছবির ফ্রেম না থাকা কিংবা পিভিসি বোর্ডে মুদ্রণ হয়তো আবেগের তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। হয়তো ঐতিহ্যবাহী ফটো পেপারে ছাপালে ছবির শ্বাসপ্রশ্বাস আরও জীবন্ত হতো। তবু ভরসা হচ্ছে, শিরোনাম ছাড়াই ছবির ভাষা সহজপাঠ্য।
আলোকচিত্রশিল্পী আবির আবদুল্লাহ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন ঢাকার বৃষ্টির কুড়ি বছরের (২০০৫–২০২৫) ইতিহাস। এই ইতিহাসে যেমন আছে দুর্ভোগ, তেমনি আছে আনন্দ; আছে হাসি, তেমনি আছে মৃত্যু ও সংগ্রাম। এক অর্থে এটি নগরসভ্যতার জলছবি, যেখানে ঢাকার আকাশ ভিজে উঠলে সংকট ও সৌন্দর্যের আবেশে ভরে ওঠে জনজীবন।
আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে আলোকচিত্র প্রদর্শনীটি ১৪ আগস্ট শুরু হয়েছে, শেষ হবে ২৩ আগস্ট ২০২৫।