অলংকরণ: অশোক কর্মকার
অলংকরণ: অশোক কর্মকার

গুচ্ছকবিতা

নিঃসীম নীলিমায় মুগ্ধ মনের পবন

শেষ হয়ে হয় না নিঃশেষ

মনে হয়—শেষ হয়ে হয় না সবকিছু নিঃশেষ

ফুরিয়ে যায় চন্দ্রনন্দন রাগের দিব্য বিস্তার—

নীরব জ্যোৎস্নায় ছড়িয়ে থাকে মৃদু আবেশ,

অবহেলায় পড়ে থাকে দিনযাপনের যৎসামান্য যখের ধন,

বালুচরে পড়ে থাকে শখের পানসি

উড়ে যায়…নিঃসীম নীলিমায় মুগ্ধ মনের পবন;

দাবদাহে অরণ্য পুড়ে হলে খাক

যুগ যুগ পর…খুঁজে পায় মানুষ কাঠকয়লা, জ্বলে বিদ্যুৎ,

চলমান দৃশ্যভোজ হয় সময়ের জঠরে পরিপাক—

উবে যায়…যা কিছু করেছি সৃজন শোণিতের সঞ্চালনে নিখুঁত;

কবে…সুদূরের কোন দ্রাঘিমায় ক্রমাগত ছুটিয়ে অশ্ব,

এসেছিল যারা …তাদের লুণ্ঠিত নবরত্ন হয়েছে ছাইভস্ম—

বিকোয় বাজারে স্ফটিক-প্রতিম কার্বননিঃসৃত কোমল হীরক

ইতিহাসের পৃষ্ঠায় থেকে গেছে কেবল দুটি শব্দ…হুন ও শক;

অশোকের ডালে বসে নিরজনে গান করছে যে হলুদ-পা হরিয়াল

বিলুপ্ত হলেও বিরল এ প্রজাতি

থেকে যাবে পরিযায়ী বলাকার পথরেখা—

অজস্র কীট মরে গিয়ে সহস্র বছরে তৈরি হয়েছে পুঞ্জ পুঞ্জ প্রবাল,

নির্দিষ্ট তিথিতে ফিরে আসবে সর্পিল জ্যোতিষ্ক

ধূমকেতুটির পাওয়া যাবে ফের দেখা;

প্রাক্‌-পৌরাণিক যুগে প্রয়াত হয়েছে যে হিংস্র শার্দূল

জীবাশ্মে আঁকা হয়ে আছে তার নিটোল থাবা

রাশিমণ্ডল ছাপিয়ে পৃথিবীতে নিত্যদিন পাঠাচ্ছে যে সাবুজিক আভা,

মৃত সে নক্ষত্র…ভগ্নস্তূপের স্কেচে স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে বিলুপ্ত তন্দুল—

শেষ হয়েও হয় না নিঃশেষ

থেকে যায় কিছুকাল,

প্রত্নতাত্ত্বিকের খোরাক হয়ে চাপ চাপ মাটির তলা থেকে

বেরিয়ে আসে মায়ান যুগের কঙ্কাল।

নীল কাঁকড়ার কাসিদা

শৈলশহর শ্যাফশাওনে…

গলিঘুঁজির সিঁড়িবহুল পথে চলতে হয় নিদারুণ সাবধানে হে

ভোরবিহানে বেরিয়ে পড়ছে নীল রঙের কাঁকড়াগুলো—

খেয়াল করে দ্যাখো…দাঁড়া হাঁকড়িয়ে

গুটি গুটি পায়ে চলছে কাতারে কাতার,

ধুনুরির যন্ত্র থেকে খালাস পেয়ে

উড়ছে অরুণিমায় পুঞ্জ পুঞ্জ পেঁজা তুলো,

একটি-দুটি নয় হে…গুনে দ্যাখো শতাধিক

সংখ্যায় কাঁকড়াগুলো হতে পারে বেশুমার;

চলাচলে আঁকা হচ্ছে ফুটপাতে নীলাভ আলপনা

ফুটে উঠছে রেখাবহুল করতলের প্রতীক—

সিসাহুঁকোর হাশিশঋদ্ধ ধূম্রজালে বিপন্ন বিড়ালাক্ষী বিধুমুখী মেম

অস্ফুটে ফুঁকারে

‘ব্লু ক্র্যাব…হোয়াট আ বিউটিফুল সাইট’,

সুদীপ্ত হচ্ছে ল্যাম্পপোস্ট, ছড়িয়ে পড়ছে

চেরাগ-শিহরিত হেম,

হেঁটে যেতে যেতে

থামো না একটু…তাড়া কি আজ…

মাথার ওপরে

ঘুরে চক্রকারে…শঙ্খচিল নয় হে—অমিষভুক এ খেচরকে

পক্ষিতত্ত্ববিদেরা সস্নেহে নামকরণ করেছেন কাইট,

রুকাশুকা বৃক্ষটিকে দেখে নাও নজর করে

প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো ঝুলছে

ফল নয়তো ফুল,

অপেক্ষা করো

গড়িয়ে যেতে দাও দিনটিকে

কর্কটক্রান্তিময় রেখায় চোখ রাখো

বারেক তাকাও অনিমিখে,

বিশ্বাস রাখো…সাঁজগোধূলিতে

শ্যাফশাওনের গলিঘুঁজিতে

ঝরে পড়বে থোকা থোকা নীল বকুল।

তিব্বতি ঐতিহ্যের ম্যান্ডেলায়

তিব্বতি ঐতিহ্যের ম্যান্ডেলায় বিধৃত রেখাবিন্যাসের মতো জটিল

কোন রহস্যের নিষ্পত্তি হতে দেখে কবে কোন বালক বয়সে

ভেবেছিলাম…কেমন হয় হতে পারলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ—

জোগাড়যন্ত্রে জড়ো করেছিলাম পেনসিল টর্চ…আতশি কাচ,

শিখতেও শুরু করেছিলাম কীভাবে—

লক্ষ্যভেদী কিরিচের মতো ব্যবহার করা যায় কলমের নিব,

সংখ্যাজ্যোতিষের পুঁথিপত্র ঘেঁটে

লেটারহেডের লোগো হিসেবে কায়দা করে এঁকেছিলাম পাঁচ,

নিজেকে ভেবেছিলাম…আত্মানুসন্ধানী—

জোগাড় করেছিলাম ওস্তাদ করিম খাঁর বন্দিশঋদ্ধ রেকর্ড

কলের গানের সামনে শ্রবণরত কুকুরের ছবিওয়ালা গোলকটিকে

ভেবেছিলাম আমার সংগীতসঞ্চয়ের মহার্ঘ টোড়ি বিলাসখানি;

মাসের পর মাস দ্রব্যগুলো প্রাণপণে খুঁজি

পরিবর্তিত হয় ঋতুচক্র

বৃহস্পতির বাতাবরণে উদিত হয় জোড়া চাঁদ বক্র,

দেরাজ না আলমারি…নাকি রেখেছিলাম সিন্দুকে

বিস্মৃতির ডিমনের সাথে কেবলেই যাই যুঝে—

নিদান-নিলয়ে নিনাদিত হয় প্রতিধ্বনি

মৃদু হাসে নিন্দুকে।