অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গুচ্ছকবিতা

অনাদিক্রমের ছায়া পার হয়ে নদী চলে যায়

নিহিতার্থ

অর্থ ভরো অর্থ ভরো—
যত পারো অর্থ পুরে দাও
নিরীহ নিষ্প্রাণ যত অভিধানে থাকা মূক শিশু-শব্দদের মুখে মুখে, নিহিতার্থ ঋদ্ধ করো তার,
মাত্রায় বিস্তৃত করো অনিবার্য ঢেউগুলো তার।

এবার তৈরি সে-ও ইগলের মতো
ডানা বিস্তারের সব কারুকাজ আপাতত শেষ—
এবার উড়বে শব্দ, ঝড় হবে—ভূমিকম্প হবে,
পৃথিবীর সব ধূলি উড়ে উড়ে মেঘ হয়ে যাবে।

ইগল উড়তে থাকবে আকাশের এপার–ওপার আর সবচেয়ে উঁচু যত পর্বতের শীর্ষ দেশে-দেশে,
ছুঁয়ে আসবে অনন্ত বিদেশ আর উড্ডীন সমর্থ শক্ত চঞ্চুর আঘাতে সময়ের সব গিঁট কেটে কেটে যাবে।

এ রকম অযাচিত ভোরে

এ রকম অযাচিত ভোরে,
বাক্যে মোচড় দিলে তোমার সমাজ
ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে, মাকে ভুলে গিয়ে—
অফুরান নিজের গৌরবে,
তোমার ধূর্ত শব্দ-প্রকৌশলে ব্যাপক বেজার বুদ্ধিজীবী,
নানা ক্ষেত্রে লজ্জাহীন আত্মপরায়ণ নট, দলদাস—
সীমার ভেতরে বসা অসীম ক্ষমতাধর রাজন্য ও পারিষদ
নানা মন্ত্র জপে যায় শীর্ষাসনে সমাসীন সুদূরের ভিন্নতর কানে।
তোমার শব্দের তীক্ষ্ণ শিস সেখানেও বেজে ওঠে ধারাবহা আলো-ঠিকরানো এক তরবারি হয়ে।

তোমার ম্যাজিক দ্যাখে অনন্ত মানুষ।
তোমার ম্যাজিক দ্যাখে মানুষ, অনন্ত আর স্ববীজের যাত্রাপথ ধুলোয় রঙিন প্রতিদিন।

কন্যাস্তুতি

যদি জল ভাঙে, ছেলে, তোর জন্ম হবে তবে। মেয়েটিরও হতে পারে।

মেয়েটি বৃক্ষ হবে, শাখা ফুল লতা পাতা ফল—সম্ভাবনা জাগাবে শিকড়।
তুই তবে কী হবি রে ছেলে?

তোর জ্ঞান সীমাবদ্ধ, ভোঁতা অনুভূতি—
নিজেকে এক স্বভাবে ভেবে নিস প্রজাপতি-ঋদ্ধ-ভবভূতি,
তোর সৃজনক্ষমতা রিক্ত, সিক্ত তোর উদ্ভাবনী-স্বর্ণ-মায়াজাল,
যারা পারে তারা অনেক নীরব থেকে নানা রকমের বৃষ্টিভেজা হয়
আর জন্ম দিতে থাকে সব গৌরব-মাখানো মুখ,
সূর্যসমাগমেবিদ্ধ হাজারো আলোর রেখা, লক্ষ-ধাপ বর্ণালির অজস্র ফোয়ারা।

সমুদ্র-সংগমে মৎস্য
নদী-মোহনায় অনর্গল স্রোতে স্রোতে যত ডিম ছাড়ে,
তা তো অগণন, তার প্রজননক্ষম যোগ্যতার চেয়ে সেই মেয়েটির সকল কর্মের যোগ্যতা অনেক বেশি।
তার মায়া বেশি, তৃষ্ণা বেশি, আঁকড়ে-ধরা বেশি, অশ্রু বেশি, করুণাধারাও বেশি, বেশি স্তব্ধতাও।

তার স্তব্ধতার সূত্র ধরে তাকে আমি মা বলেই ডাকি।

মসলা

মসলার ভেতরে থেকো মেয়ে।
মসলা ভীষণ উপকারী।
ঘ্রাণ ও মিষ্টত্ব আছে ওতে।
আছে বহু গুণ আর অলৌকিক কৃৎকৌশলের দিশা।
আমরা সামান্য মসলা চিনি।
সারা পৃথিবীতে ছড়ানো রয়েছে ধরো হাজার মসলা।
তুমি তাতে ডুবে থাকো।

তোমার শরীরেও নানা মসলার ঘ্রাণ হবে।
তুমিও উদ্ভিদ হয়ে উঠবে ক্রমে।
তোমার প্রতিও ঝুঁকে পড়বে লক্ষ লক্ষ লোক।

উদ্ভিদের মহিমা এমনই।

খোলা আকাশের প্রশ্ন

খোলা আকাশ থেকে প্রশ্ন এসে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে তোমার ঈপ্সিত যত রন্ধ্রে ঢুকে যায়।

তুমি ভাবো এর পর যাবতীয় জটিল জবাব—
আগুনের কোষকলা, মেঘের গুঞ্জনমালা আর তার গোপন ভেতরে থাকা লগ্ন সূক্ষ্ম তন্তুর উৎসব

খানিক বিরতি-নেওয়া অজাচারে ভেসে যাওয়া সভ্যতার রঙিন ফুঁৎকার,
কাঠচেরা শব্দের কর্কশে জাগা ধ্যানভঙ্গ পাখিদের তীব্র প্রতিবাদ।

মোমের গলনাঙ্কে কত স্বপ্ন-পাপড়ির ভ্রমণ-চূড়ার যত আদ্যাক্ষর,
অক্ষয়ের বুদ্ধাসনে বসে থাকে উত্তাপের সবটুকু সয়ে—
ছায়ারা বুঝেছে বটে,
ছায়ারা ভেতরে ছায়া, উপচ্ছায়া, প্রতিচ্ছায়া,
তারও ভেতরের ছায়া, অনাদিক্রমের ছায়া পার হয়ে নদী চলে যায়—
সে প্রশ্ন কি বিভ্রান্তির অযুত আলোকপথ খুলে দেয়?

তবে, সব পথ খুলে গেলে পথের ধুলোরা সব যেতে থাকে আলোকবর্ষের দিকে অচিন যাত্রায়?

তুমি জানো, তুমি জানো, তুমিই তো জানো।

শরীর

শরীর উল্লেখযোগ্য বিন্দুতে পৌঁছেছে।
একটুও নিচে বা উপরে নয়।
সব ঠিক ঠিক।

তুমি কি সঠিক জানো ঠিক কাকে বলে?

মেঘে মেঘে ছোপ ছোপ রং।
পারিজাত উঠোনে ফুটেছে।
সে–ও কিন্তু শরীরের প্রতি যত্নবান।
কত ঝড়–ঝঞ্ঝা ছোটে।
পার হয় নিজস্ব নিয়মে।
জ্ঞানকোষ খসে পড়ে সৌন্দর্যের সিক্ত সন্নিধানে।

আকাশ গুঞ্জনভরা কিন্তু সে পাহাড় নয়,
সমীকরণের শত কল্পদোষে।
পাহাড়ও সমুদ্র নয় বিকল্প অক্ষরে।

প্রত্যেকে আলাদা আর সবকিছু তার মতো নিজস্ব নিয়মে।

শরীরেরও ভাষা তাই আলাদা আলাদা।
কখন সে জেগে ওঠে কখন ঘুমায়,
কখন ঘুমাতে গিয়ে জাগে আর জাগতে চেয়েও তার খুব ঘুম পায়, সে কেবল শরীরই তো জানে।