অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গুচ্ছকবিতা

তানপুরাবেষ্টিত হাত কি অসাড়, নাকি মুষ্টিবদ্ধ

প্রেম, বিচ্ছেদবাহিত

প্রতিটি প্রেম অভিনব অভিজ্ঞান
নুড়িপাথরের গদ্য শুষে নেয়া গান

পোড়োজমি খুঁড়ে জাগরূক বিচিত্র বাগান
শতবার মৃত্যুকূপে ধ্বস্ত, সমাহিত
শতবার নবজন্ম লাভ, বিচ্ছেদ-বাহিত

প্রেমগর্ভে সুপ্ত অসহ্য অনভিপ্রেত শাঁস
          শাশ্বত আকাশ
                   দীর্ঘতম দীর্ঘশ্বাস

কণ্ঠা চূর্ণ করা উৎকণ্ঠা
আবেগ-ঝড়ের ক্রোড়ে উৎক্ষিপ্ত উদ্বেগ
          ভূপাতিত অনুভূতি

মনের মঞ্জিলে বিচ্ছুরিত প্রেম তবু মেরুপ্রভা
টানাপোড়েনের রাত্রিশেষে চিরকাল সুপ্রভাত।

ব্লাড মুন

বলছি শরতের রক্ত-চাঁদের কথা। চন্দ্রগ্রস্ত হৃদয়ে রক্তক্ষরণের গল্প।

সন্ধে না হতেই প্রকাণ্ড বেলুনের মতো চাঁদ নেমে এসেছিল মহানগরীর ফ্লাইওভারের ওপর। শহুরে কোনো কবিই তার খোঁজ পেলেন না। ভিজলেন না রহস্যময় জোছনায়।

মধ্যরাত থেকে দর্শনীয় এক চন্দ্রগ্রহণ হলো, রুপোলি সুগোল টিপ ধীরে ধীরে অর্ধবৃত্ত হয়ে উঠল, তারপর ক্ষয়ে যেতে যেতে হলো ঈদের চাঁদ, এরপর প্রায় মিলিয়ে যাওয়ার দশা। কখনো আশ্চর্য অঙ্গুরীয়, কখনো–বা কাতর নিপল, স্খলিত স্তনবৃন্ত। প্রবারণা পূর্ণিমা রাতে এমন অভিজ্ঞতা আমাদের প্রথম।

‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ/ এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই।’ মহাপ্রেমিক নজরুলের গান কে গাইছেন বিস্ত্রস্ত বসনে। রাত ফুরোবার আগেই একযোগে শ্বেতশুভ্র শেফালিরা আত্মাহুতি দেবে নাকি।

চাঁদজ্বলা অপার্থিব রাত অর্থহীন,
যদি না দুজনে থাকি জড়াজড়ি শর্তহীন।

বন্ধ্যা সন্ধ্যা

‘সন্ধ্যাগুলোকে বন্ধ্যা করে দিও না’—
কে বলে গেল ফিসফিস স্বরে!

চোখ তুলে দেখি দেয়ালের চিত্রকর্ম থেকে রং রেখা
মোটিফ নকশা সব উবে গেছে, ধু-ধু শূন্যতা সেখানে

তবু জানি কোথাও কার্পেটে নয়, মেঘে বসে মধ্যবয়সিনী
রাগ গায়তীর গূঢ় গরিমায় স্নানরতা
পান-পেয়ালায় কোথাও ছলকে ওঠে নক্ষত্র ঝলক
উজ্জ্বল আলোয় ভেসে যায় স্তন ও গোরস্তান

আবাসিকের গলি অকস্মাৎ সুনসান
নেই বেয়াদব ব্যাটারি-রিকশার কর্কশ চিৎকার
পথকুকুরেরা অলস তন্দ্রায়, আর টেবিলে ঘুমিয়ে
              রিলকে নাকি লরেন্স

এ গ্রহের শির ধুয়ে দেবে বলে নামছে শিশির
জানি ঠিক জানি কতিপয় ধর্মব্যবসায়ী
              ছক কাটছেন সহিংসতার

সন্ধ্যাগুলো বন্ধ্যা না হোক চাইছি প্রাণপণ...

যে রাতে ওরা আমাদের ঘরে আগুন দিল

বই পুড়ছিল, আর আমার লেখার কম্পিউটার
চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপির কবিতায় ছুঁই-ছুঁই আগুনের ছোবল

আমি ভয় পাইনি
কবিকে পোড়ায় এমন সাধ্য কার

ঢাকাজুড়ে অন্ধ দানবের আক্রোশ
গানের গৌরব তীর্থভূমি জ্বলছে নিঃসঙ্গ
তানপুরাটা নিশ্চয়ই ভস্ম হবে
কাঁপা কাঁপা হাতে আমি টেক্সট করি
তানপুরাবেষ্টিত হাত কি অসাড়, নাকি মুষ্টিবদ্ধ?

‘কোনো কিছুতেই আমি ভয় পাই না,
আজ কেন এত অস্বস্তি!’

তার কণ্ঠ শুনে হতাশা লুকিয়ে অভয় দিতে
শব্দ হাতড়ে ফিরি
আগুনের সর্বগ্রাসী শক্তিকে অস্বীকার করা আমার শব্দেরা
আজ রাতে কি কিছুটা বিপর্যস্ত

সুঘ্রাণে যারা হয় অজ্ঞান, আলোয় দেখে অন্ধকার
তারা আজ আমাদের সাধ ও সাধনা পোড়ানোর মচ্ছবে মেতেছে
উন্মাদদের উল্লাসের মাঝে
আমরা—অগ্নিমানব আর অগ্নিমানবী
সকালের দিকে যাত্রা-করা অদ্ভুত রাত্রিকে বলছি:
অসুরের কাছে সুর পরাস্ত হয়েছে,
ইতিহাসে এমন একটাও দৃষ্টান্ত নেই।

বসন্ত দ্রোহের ঋতু

বসন্ত প্রেমের ঋতু, বসন্ত দ্রোহের
বসন্ত সৃজন ঋতু, বসন্ত দাহের

রক্তরঞ্জিত ফাগুন রক্তে তোলে আগুন
বাহান্নর একুশ তাই আজও নিরঙ্কুশ

উদ্ভট উন্মত্ততার মধ্যে এল আরেকটি ফাল্গুন
দঙ্গল-দাপটে আরেকটি ভালোবাসা দিবস  

সময়টা অসময়, ঘৃণার আগ্রাসনে
সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলও শুকিয়ে যাচ্ছে

তাই আরও বেশি চাই ভালোবাসবার মানুষ
বসন্তে রঙিন হোক নতুন প্রেমের দিন

বসন্তবিরোধী শ্বাপদেরা দাপাক প্রতিটি প্রাঙ্গণ
ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় উড্ডীন দ্রোহের আঁচল

প্রেমের বিপক্ষে সাপেদের কুশ্রী ফোঁস ফোঁস
প্রতিটি সড়কে উদ্যানে হাত ধরাধরি করে উড়ুক যুগল

এবারের বসন্ত হোক বহুবর্ণিল ব্যতিক্রমী
ভালোবাসা দিবস হোক অভূতপূর্ব বিপ্লব।