দরজার ওপারে অর্পণের ঘ্রাণ, এপাশে কলিংবেলের শব্দে জং ধরা
দীর্ঘশ্বাস—নামহীন অবশিষ্ট।
অহল্যা এবার নিজেই পাথর, রামের অপেক্ষা নেই—বাক্য
ভেঙে পড়ে কমার পরে। নদী শুকিয়ে গেলে পাথরও তৃষ্ণার্ত হয়
জল নামলেই চেনা দূরত্বে ভেসে ওঠে গোপন প্রতিধ্বনি।
দ্রৌপদীর পাঁচটা স্বপ্ন ভোরে মুছে যায়—এখনো সভাঘরে
বসে থাকে বিচার, অথচ শরীর জানে একাকিত্বের ব্যাকরণ।
অবাধ্য মানিপ্লান্ট জানলার কাচে মেঘ খোঁজে, অবাধ্যতাও
একরকম নিঃসঙ্গতার প্রার্থনা। ‘অনিত্য’—উচ্চারণের আগের
শূন্যতাটুকুই জীবন।
গণিত বলে শূন্য, পাকস্থলী খাদ্য।
আর নীলকণ্ঠ?
নির্বিকার—
বিষটা এখনো আটকে আছে নীলচে অ্যাডামস অ্যাপলে।
স্বয়ং ও পর—এই দ্বন্দ্বে মানুষ হয়ে ওঠা।
উপনিষদের ‘নেতি নেতি’—এই নয়, ওই নয়
সে খোঁজে। কী খোঁজে? হাইডেগারের অস্তিত্বের প্রশ্ন
নাকি বুদ্ধের দুঃখনিরোধের পথ?
খোঁজাটাই হয়তো উত্তর। অথবা প্রশ্নটাই জীবনের
একমাত্র সত্য। জল ছুঁতে গেলে হাত কেবল ভিজে ওঠে,
কিন্তু ধরা দেয় না উৎস।
কোথাও একটি ঘণ্টা বাজে—অতীত থেকে নাকি
ভবিষ্যৎ থেকে—অস্পষ্ট। আয়নাভাঙা মুখ ছড়িয়ে
পড়ে কাচের টুকরোয়। প্রতিটি খণ্ডে একেকটি জীবন,
কোনটা সত্য, কোনটা স্বপ্ন—সে তো জানে না।
হাওয়ায় ভেসে যায় শূন্যতার গন্ধ, আর সময়
দাঁড়িয়ে থাকে অচিন্ত্য বিস্ময়ে।
প্রতিটি জিজ্ঞাসাকে ছিঁড়ে ফেললে, শব্দ ঝরে পড়ে—
‘এই নয়।’
আবার—
‘ওই নয়।’
হাতের তালুতে রুটি অথবা পাথর—দুটোই ক্ষুধা।
পাখিরা কখন উড়ে গেল? জানালা খোলা ছিল না।
তবু পালক, তবু শূন্যতার গন্ধ। ছায়া দাঁড়িয়ে থাকে নিজের আগে।
কে বলেছিল ঘর মানে ফেরা?
তৃষ্ণা জলের চেয়ে আদিম। প্রজাপতি নাকি পাখি—
শরীর জানে না, কী হারিয়েছে। শুধু খোঁজে স্বপ্নটা হয়তো প্রজাপতির,
আর আমি শুধু এক দিনের ঘুম। একটি শব্দ অসমাপ্ত থেকে যায়—
যেমন থাকে জল, গ্লাসের বাইরে।
রাত্রি ২টা ৪৭—ফোনের স্ক্রিনে সমুদ্রের ভাঙা সময়। পুরোনো জং
ধরা কম্পাসটা কেবলই উত্তরের বদলে বিস্মরণের দিকে ঝুঁকে থাকে।
শেষে: একটা দরজা। দরজার পর দরজা। কোথাও পৌঁছানো নেই—
যেন বার্দোর সেই মধ্যবর্তী স্থান। দূরত্ব—স্বচ্ছতার নাম।
পৌঁছানো নেই, শুধু ভেসে থাকা।
দুঃখ, দহন, দুধকলা—জন্ম নিল প্রজাপতির ছাই থেকে কালসাপ শীতঘুমে। এখন কে কাকে খায় বা পোষে আপোষে? এই প্রশ্ন ঝুলে থাকে খাবার টেবিলে, প্রেমিকার ঠোঁটে, শিশিরবিন্দুতে। চায়ের কাপে চিনি গলে মিষ্টতা ছড়ায় না, সেখানে জমাট বাঁধে নৈমিত্তিক আপস। ইউজ-অ্যান্ড-থ্রো কাপে উপচে পড়ে তান্তালাসের তৃষ্ণা—লবণাক্ত সমুদ্র, ভেতরে মরুভূমি। দাঁড়িপাল্লায় বসে থেমিস, চোখবাঁধা ফাঁক দিয়ে মাপে হৃদয়, ক্ষুধা তখনো ভারী, অপরাধ ভারহীন। ঘুমন্ত পাথরের পাশে কে শোনে শিলার শ্বাস, শব্দহীন সংলাপ? ফ্রিজের হিমঘরে বাসি মাংসের পাশে ঘুমিয়ে থাকে হিমায়িত কামনা—টিউপারওয়্যারে সিল করা, তারিখ লেখা, এক ভুলে যাওয়া রাতের ক্ষুধা। চিত্রগুপ্তের খাতা কি তবে এই কি–বোর্ডের ক্লান্ত বোতাম? ক্লিক। নিস্তব্ধ। শয্যায় পড়ে থাকে দুই মেরুর নিশ্বাস। পাশের ফ্ল্যাটের ছায়া হাঁটে এই ঘরের দেয়ালে, নার্সিসাস তখনো ফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরায় নিজের বিচ্ছুরিত লিবিডো খোঁজে।
রাত নামলে নিজেকে পিং করি ক্রমাগত, উত্তর আসে না,
বৃষ্টি থেমে আছে শিরার ভেতর—যেন লেথের বিস্মৃতির জল।
ফ্রিজের ভেতর রাখা আপেলগুলো একে অপরকে স্বপ্ন দেখছে।
কিন্তু আমার হাতে যেটি পচে গেল!
পাশের ফ্ল্যাটে টেলিভিশনের নীল আলোয় কেউ দেবী হয়,
কেউ অপরাধী। তবু মেঝেতে পড়ে থাকা লিপস্টিকের মুখোশ—
যেন অর্ধেক রথচক্র।
ঘ্রাণ। স্পর্শ। ক্লান্তি। ঘাম। ঘুম।
সিঁড়িতে পায়ের শব্দ—কারও ফেরা,
কিংবা কারও চলে যাওয়া।
শেষে শুধু থাকে:
গুঞ্জন, অন্ধকারের ওজন
...কারণ ঠিক থাকা একটি ক্রিয়া—আমি শুধু বিশেষণ