অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

গুচ্ছকবিতা

এসো হে অনন্ত, তোমাকে নিরর্থে ধারণ করি

কবন্ধ কেরানি

সংশয়ী সন্ধ্যেবেলায়, সুরাহীন পানশালাটায়
আচমকা ঢুকে পড়ত কিছু তরুণ; ইতস্ততায়
বুকপকেটে তাদের সহজ কোনো অর্থ ছিল না;
ধূর্ত কোনো শর্ত ছিল না। ফালি ফালি করে
কেটে রাখা ছিল শুধু অশ্রু।
ঘটনাটি আমি জেনেছি গত পরশু।
তখনো পর্যন্ত অশ্রুর বিনিময় মূল্য ছিল।
অশ্রুর বিনিময়ে সুরাহীন পানশালাটায় তারা
নিজের ছায়ার সাথে চুপচাপ
বসে থাকার সুযোগ পেত।
আজ আর সেই সুযোগ নাই।
ছায়াহীন একাকী ওই দেহগুলো
আমাকে দিয়ে কেবল
অতীতচারিতার কবিতা লেখায়।

রাকা শশী

যেখানেই হৃদয় রাখা
কিছু না কিছু হয়ে থাকে আঁকা—সেখানেও
মুহূর্তের ভেতর মুহূর্তের ঢেউ
ধরে আনে দৃশ্যহীন মনোলোগ
অতলান্তের সম্ভোগে শিখে নেয়
একান্ত পরিভ্রমণের গলিপথ
মনে মনে, মনে মনে, মনে মনে...
অন্ধ পৃথিবীর সব নৈঃশব্দ্য গুনে
বুকের ভেতর ধরে আনে প্রকাণ্ড এক রাক্ষস
আর অবশ প্রতিটি ক্ষণে
সে–ও পাড়ি জমায় একান্ত উড্ডয়নে
ইতিউতি খুঁজে স্তূপ করে সব ব্যথানুভূতি
এসো হে অনন্ত, তোমাকে নিরর্থে ধারণ করি
বেশি কিছু বলার নেই আর—এটাই নিদারুণ আইরনি
তবু শব্দের চেয়ে নৈঃশব্দ্যেরাই ঘোর সন্ত্রাসী
এ কথা মেনে নিয়ে লবণজলবিধৌত
জগদ্দল পাথরগুলোকেই ভালোবাসি
তাদের মতো আমিও সমুদ্রতটে শুয়ে
নিশ্চুপে দেখি দেদীপ্য অথচ অবলা রাকা শশী!

স্মৃতির তিমির

স্মৃতির ভেতর অর্ধেক দেখা স্বপ্নের মতো
আচমকা মনে এলে আজ।

পরক্ষণেই দেখলাম, বিষাদের কারুকাজ;
হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছ, বিষাদের কারুকাজ করা
একটা পর্দা উড়ে গেল ওই। তার পিছু নিয়ে ভেবেছি
এবেলা দিগন্তে মিলাবই।

তারপর চলে গেল শুধু দিন।
অজস্র অচেনা মুখের ভিড়ে, মলিন বিকেল এল।

জমকালো হাহাকার ছুঁয়ে বসে থাকলাম আমি।
আমার অন্তর্যামী সন্ধ্যার আগেই ঘুমিয়ে পড়ল।
শুনেছি সে–ও নিদ্রাকুসুম বড়ি খেয়েছে।

তাই এখন তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে পড়েছে
ফুর্তিবাজ বাসনাদল। আমিও জলঅচল
স্থবিরতার মধ্যে বসে দেখেছি কিছু টলমল দৃশ্য
হাসিমুখে কাঁদছে আর আকণ্ঠ মোচ্ছব করছে।

আমার ভালো লাগছে না আর।
নিঃসঙ্গ নীল তিমির মতো সাগরকেই মনে হচ্ছে
মৃত্যুঘন খামার। তবু কোলাহলের ভেতর
শুয়ে আছি আমি—অনতি শীতের সন্ধ্যায়।
যেন ক্রমশ ভেসে ওঠা তিমিদেহ—নিথর ও অসহায়।
সবুর বলো আর অপেক্ষা বলো—তোমাকে বয়ে বেড়ানো
আসলেই বড় দায়। বাদ বাকি যা বলেছি; সবই বাকোয়াজ।

সত্যি করে বলো তো, আচমকা তুমি কেন মনে এলে আজ?

হৃদকৈবল্য

যাতনার শেষে আর কোনো ঘটনা নাই।
শুধু নিজের সাথে নিজের স্থবিরতা
অযথা মুখ দেখাদেখি করে। যেন পুড়ে গেছে
মুহূর্তের ভেতর দুলতে থাকা ভবিতব্যের পর্দা।
স্পর্ধাহীন অক্ষমতায় আচমকা চমকায়;
নিজের ছায়া দেখে, ভয় পায় নিজেকেই
করুণাময় অবয়বে ভেঙে পড়ে বোবাকান্নায়
যেন অতর্কিতে অতীতচারিতার রাহাজানি
সর্বস্বান্ত করে রেখে যায় তাকে; বিভ্রান্ত দ্বিপ্রহরে
কিংবা অবশ মধ্যরাতে বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে
দেখে নিতে চায়; হৃদয় কি আজও নিঃশব্দ প্রলয়
নাকি আহত পারাবাতের পাখসাট—ক্লীব অথচ কোলাহলময়!

হলুদ মাফলার

আমার ছোটবেলা ছিল; ছোট ভেলা ছিল।
নিজেকে হারিয়ে ফেলার খুচরো কিছু খেলা ছিল।
হেলাফেলায় হাঁটতে থাকার ছোট্ট একটা জেলা ছিল।
ডিসেম্বরে বিকেল বিকেল একটা বিজয় মেলা ছিল।
ফিরতি পথের সন্ধ্যাজুড়ে অল্প অবহেলা ছিল।
ছিল কিছু হাতে গোনা, স্মৃতির ভেতর গল্প বোনা।
ঝড়ের রাতে ছিঁড়ে যাওয়া টেলিফোনের তার।
আর একটা পড়ে থাকা অকেজো প্রপেলার। জং ধরা।
খুঁজে পেয়েছিলাম সাগরপাড়ে। অথচ নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম কোনো এক শনিবারে।
এখন খুঁজে পাচ্ছি না আর।
খুঁজে পাচ্ছি না দাদির বোনা হলুদ মাফলার।