সুন্দর, একা ফুটে ছিল গোরনির্জন নদীর শীতরেখায়
নেমে এসে সূর্যের ভ্রাম্যমাণ জরায়ু থেকে একা আমি
কর্ষিত ও জাগ্রত চরে দেখি এক কলমির ফুল—একা ও সম্পূর্ণ জ্যোৎস্না
উতল ঘ্রাণের অমীমাংসা ছড়িয়ে দিয়েছে প্রান্তরে, দিগন্ত দ্রাঘিমায়;
কুহকবশত, আমি ধুলোর অবিরাম আলিঙ্গন নিয়ে
শনিবারে সন্তানের স্কুল বন্ধ বলে ফুলের কাছে একা গিয়ে
নির্জন ফুলের আত্মার সুড়ঙ্গে ঢুকে প্রচুর হাঁটি,
ফেলে আসা সংসারের পুতুলবাঘ তবু স্বপ্নে দেখি—বাঘচোখের খাদে
কবে যেন আমার কোনো করুণ মৃত্যু ছিল বলে
এইসব নদীর বালুচরে আহত হয়েছিল প্রশান্ত নক্ষত্রেরা;
নিহিত নির্জনে সমস্ত ছাই কুড়োতে কুড়োতে
পূর্বপুরুষ যে সমস্ত অরুন্ধতী শুয়ে আছে দুপুরের গোরস্তানে আমি তাদের নিকটে
তাদের বিলুপ্ত অস্থিচিহ্নের ওপর হেমন্তের পাতাদের
হলুদ প্রত্যাবর্তন দেখে মুগ্ধ হয়ে মরে যাই
আর এইখানে যেহেতু মরে আছে রক্তের নদীটিও, তার জন্যে শোক
এইখানে সিদ্ধান্তহীন, পুনর্জন্মের প্রকৃতি নিয়ে বিপন্ন আমি;
শীতের নদীর দিকে গোরস্তানের যে হাওয়া সংগীত
কিছু বেভুল পাতাদের ঝরিয়ে যায় সেই পাতার নিচে
ঝরে পড়া জলপাই পাতার নিচে ভ্রূণ হয়ে শুয়ে হীরণ্ময় স্বাতী-নক্ষত্র দেখি—
এত দিন এইসব বিশ্রান্ত পর্যটন বৃথা মনে হয় আমি
আসলে ফুলের কাছে একা গোরস্তানের শুকনো পাতার শরীরে
নিহিত সুন্দরকে
একা, একটি গভীর ভ্রমরের মতো লুফে নিই
অনেক ইঁদুর ধরা হলে এইবার ধরো সমস্ত আয়না যদি কেবল স্বচ্ছ কাচ—
সব পারদ ধরা যাক ফুসমন্তর কর্পূর; এবার তাকালে আয়নায়—তুমি নেই;
তাহলে অন্য কেউও নেই যাকে ঈর্ষা করে অকারণ করুণ হবে
অলংকারও নেই কোনো পোশাক কিংবা মুকুট যা তোমাকে কেবলই অহম ও দিয়েছিল অসুখ;
তুমি এবার তোমার বাগানে পরিযায়ী, চোখ বন্ধ করো
ধরো অবিরাম, আরও কিছু অবিরাম হাওয়ার পালক যেসব হতে পারে আকাশ
চকিতে মেঘ চকিতে বাগানের পরি আয়তনেত্র যার সমুদ্র
হতে পারে নরম সাঁকো বিদগ্ধ নক্ষত্রদের ওপারে
দেখবে—মানুষের, তোমাদের ও যারা বিপুল পুতুলের মতো
মঞ্চবিভূতি পেয়ে অনেক আনন্দ পেয়েছিল, পেতে চেয়েছিল প্রভূত হিরণ্য;
তাদের, তাদের ভারী হৃৎপিণ্ড থেকে অহমপাহাড় ধসে
গড়িয়ে পড়ছে অতিশয় নুড়ি যার শরীরে বিষাদ অতিশয় ঝিনুকচূর্ণ
যার কোনো দিন মুকুতার স্বপ্ন জানা ছিল না এমন জড়
আয়না সরিয়ে নিলে যাবতীয় তুলনার অগ্নিডানা-অশ্ব যে ঘৃণা যে রাক্ষস
যে কেবল যুদ্ধ আর বারুদ—
তার জন্যে ফুলেরা সত্য হতো বাগান যেভাবে
বাক্সময়, যেভাবে পৃথিবী পেয়ে যেতে পারে প্রচুর ময়ূরের সেরেনাদ
চোখ পাওয়ার আগেই গভীর করুণ এক কচ্ছপ আমি
পৃথিবীর ধাক্কা লেগে জ্যোৎস্না খেয়ে ফেলেছিলাম খেয়ে শিখেছি
পা ও চাকার কিমিতি;
মায়ের রক্তসমুদ্র নেয়ে উঠে ব্রহ্মাণ্ডের বিবর থেকে কুড়িয়েছি যেইসব চোখ
মূলত পাথরসমস্ত, হিম; ঘুমন্ত ক্রন্দনধ্বনি নিয়ে ঝুলে আছে বাতাসের বেহালায়
সেইসব পাথর দিয়ে দেখেছি আকস্মিক উলকা ও আলেয়ার অজস্র পতন—
বিভ্রান্ত আলোদের উল্লম্ফনের নিচে তাদের হৃদয়হীন ডানা
করুণ, পড়ে থাকে, যেভাবে মৃত কীটের শুকিয়ে যাওয়া হৃৎপিণ্ডের অন্ধকার—নিকষ;
দেখেছি দলে দলে পৃথিবীর সন্তানেরা—যারা প্রচণ্ড মানুষ, পা থেকে ক্রমশ চাকায়, পাখায়
ছুটে যাচ্ছে কেবলই গতি, প্রপঞ্চপ্রচুর; তাদের ওড়ানো ধুলোর অঙ্কুশে আহত সূর্যের ফুল
হৃত বনভূমির পাখি ও অনেক ময়ূরের নিহত নীলে পড়ে থাকে
যে সমস্ত কোরক, অনাদি—তাদের গহিন জন্মতৃষ্ণার ভিতরে ভ্রমণ আমার
খায় জ্যোৎস্নার নির্ঝর প্রসূন, ভরে কমণ্ডলু ও করপুট আমি শ্লথ হেঁটে যাই
আমারই পায়ের কাছে কেবলই আরও যাই যেভাবে পরিদের ঘুম থকে
রসিক সিঁধেল সোনা নিয়ে উড়ে যায় জ্যোৎস্নার বাগানে
রাজপুত্র হবে
হাঁটি
পায়ের শব্দ যেন পায়ের কাছে অশ্রুত থাকে
শীতার্ত চাঁদকে ইশারা করে এক কামরাঙা গাছ, ক্ষুধার্ত সে এমন
সে বাঘিনী নয় যে ব্যগ্র, গহিন হরিণী—রূপে তার মুদ্রিত কুহক
বনের ভিতরে আরও নিরন্ধ্র কুয়াশার গন্ধের গভীরে মায়া সে, মৃত্যু নাকি—
মৃত্যুর ওম থেকে পুনর্জন্মের প্রেরণায় চাঁদ নিকটে যেতে চায়
যেভাবে ফুল যায় প্রণয়িনী সমীপে; হতে চুম্বন, পরিণত অঙ্গার;
কামরাঙা গাছ ততোধিক কুহক, মানুষের মতো, দূরে যায়
নারীর মতো স্ত্রীর মতো সরে সরে কুয়াশার বুদ্বুদ
অথর্ব মাংসের বিবমিষা
বরং এই শীতরোদে নিজের ভেতরে শুয়ে দূরান্ত থেকে
কামরাঙা গাছের কথা ভাবাই ভালো, চিরদিন
মৃত্যুর—মৃত্যুর আয়নায় নিজেকে দেখে
মরে যাবার মোহন উত্তেজনা, তাই—
শীতরোদের ফরাশে চাঁদ, শুয়ে, কাম–রাঙা
শীর্ষানন্দে ছুটে চলা অশ্বের স্বপ্নের ভিতরে আসলে সে আর্ত
আসলে বিধুর সংবর্ত, কেবল কান্না