
‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র ওই দৃশ্যটি এত সজীব আর সুন্দর যে আসলেই ভোলা কঠিন। না, শশী ও কুসুম নয়, শশী ও মতির সহোদর-সহোদরাপ্রতিম সম্পর্কের একটি দৃশ্য, যেখানে সূক্ষ্মভাবে মড়কের কথা আসছে। পুকুরঘাটে বন্ধুর বোন তথা কিশোরী মতিকে যুবক ডাক্তার শশী জিজ্ঞাসা করছে যে সে কলেরার টিকা নিয়েছে কি না? উত্তরে মতি সহজভাবে জানায় যে কলেরার টিকা লাগবে কেন? মা শীতলার দয়া থাকলেই সে বেঁচে যাবে। উত্তরে শশী স্বভাবতই বিক্ষুব্ধ হয়। কয়েক মাস আগে বাসা বদলের কারণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমগ্র খুঁজে পাচ্ছি না বলে লেখকের অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ এখানে ‘অন্য আলো’র পাঠকদের জন্য তুলে দিতে পারছি না। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তো বহু আগেই তাঁর ‘বোধন’ কবিতায় বলে গেছেন ‘মারী ও মড়ক মন্বন্তর, ঘন ঘন বন্যার/ আঘাতে আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন/ ভাঙা নৌকার পাল/ এখানে দারুণ দুঃখে কেটেছে সর্বনাশের কাল’-এর কথা। বঙ্কিম চন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’-এ ১৭৭৬-এর মন্বন্তর এবং মন্বন্তরের সঙ্গী হিসেবেই মারি বা মড়কের বিবরণ আসছে উপন্যাসের শুরুতেই। মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য ‘আনন্দমঠ’ (রচনা: ১৮৮২) অবশ্যই সমালোচনার যোগ্য, তবে ১৭৫৭ সালে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের সূচনার অল্প কিছু বছরের ভেতরেই বা ১৭৭৬ নাগাদ কীভাবে এক মহাদুর্ভিক্ষ নেমে আসে এবং ক্রমে দুর্ভিক্ষের প্রভাব পড়ে জনস্বাস্থ্যেও, সে বিষয়ে ‘আনন্দমঠ’ আজও বিশ্বস্ত রেফারেন্স হতে পারে। ১৭৭৬-এর দুর্ভিক্ষের এক শ বছর পরে উইলিয়াম হান্টারের ‘দ্য অ্যানালস অব রুরাল বেঙ্গল’ (১৮৬৮) থেকে জানা যায়: ‘১৭৭০ সালের মে মাসের পূর্বেই বাংলার ‘এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ীই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।’ বঙ্কিম তাঁর উপন্যাস রচনায় হান্টারের বইটি থেকে প্রচুর তথ্যগত সাহায্য নিয়েছেন। বাংলায় দুর্ভিক্ষের বিস্তার নিয়ে ‘আনন্দমঠ’-এর সূচনার কিছু পংক্তি এখানে উদ্ধৃত করছি:
‘১১৭৬ সালে গ্রীষ্মকালে একদিন পদচিহ্ন গ্রামে রৌদ্রের উত্তাপ বড় প্রবল। গ্রামখানি গৃহময়, কিন্তু লোক দেখি না। বাজারে সারি সারি দোকান, হাটে সারি সারি চালা, পল্লীতে পল্লীতে শত শত মৃন্ময় গৃহ। মধ্যে মধ্যে উচ্চ-নীচ অট্টালিকা। আজ সব নীরব। বাজারে দোকান বন্ধ, দোকানদার কোথায় পালাইয়াছে ঠিকানা নাই। আজ হাটবার, হাটে হাট লাগে নাই। ভিক্ষার দিন, ভিক্ষুকেরা বাহির হয় নাই। তন্তুবায় তাঁত বন্ধ করিয়া গৃহপ্রান্তে পড়িয়া কাঁদিতেছে। ব্যবসায়ী ব্যবসা ভুলিয়া শিশু ক্রোড়ে করিয়া কাঁদিতেছে। দাতারা দান বন্ধ করিয়াছে। অধ্যাপকে টোল বন্ধ করিয়াছে; শিশুও বুঝি আর সাহস করিয়া কাঁদে না। রাজপথে লোক দেখি না, সরোবরে স্নাতক দেখি না, গৃহদ্বারে মনুষ্য দেখি না। বৃক্ষে পক্ষী দেখি না। গোচারণে গরু দেখি না। কেবল শ্মশানে শৃগাল-কুকুর।’
এরপরই দুর্ভিক্ষ কীভাবে ছোঁয়াচে রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে সে প্রসঙ্গে লিখছেন যে কীভাবে বাংলার মানুষ ‘খাদ্যাভাবে গাছের পাতা খাইতে লাগিল, ঘাস খাইতে আরম্ভ করিল, আগাছা খাইতে লাগিল। ইতর ও বন্যেরা কুক্কুর, ইন্দুর, বিড়াল খাইতে লাগিল। অনেকে পলাইল, যাহারা পলাইল, তাহারা বিদেশে গিয়া অনাহারে মরিল। যাহারা পলাইল না, তাহারা অখাদ্য খাইয়া, না খাইয়া রোগে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল। রোগ সমর পাইল, জ্বর, ওলাওঠা, ক্ষয়, বসন্ত। বিশেষতঃ বসন্তের প্রাদুর্ভাব হইল। গৃহে গৃহে বসন্তে মরিতে লাগিল। কে কাহাকে জল দেয়, কে কাহাকে স্পর্শ করে। কেহ কাহার চিকিৎসা করে না; কেহ কাহাকে দেখে না, মরিলেও কেহ ফেলে না।’
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’উপন্যাসে বার্মায় জাহাজঘাটায় নেমেই নায়ক শ্রীকান্ত জানতে পারে যে রেঙ্গুনে মড়ক ছড়িয়েছে এবং সে জন্য জাহাজঘাটায় জাহাজের, বিশেষত দরিদ্র ও শ্রমিকশ্রেণির নারী-পুরুষের দশ দিনের কোয়ারেন্টিনের বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে:
‘পরদিন বেলা এগারো-বারোটার মধ্যে জাহাজ রেঙ্গুন পৌঁছিবে; কিন্তু ভোর না হইতেই সমস্ত লোকের মুখচোখে একটা ভয় ও চাঞ্চল্যের চিহ্ন দেখা দিল। চারিদিক হইতে একটা অস্ফূট শব্দ কানে আসিতে লাগিল, কেরেন্টিন। খবর লইয়া জানিলাম, কথাটা quarantine: তখন প্লেগের ভয়ে বর্মা গভর্নমেন্ট অত্যন্ত সাবধান। শহর হইতে আট-দশ মাইল দূরে একটা চড়ায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়া খানিকটা স্থান ঘিরিয়া লইয়া অনেকগুলি কুঁড়েঘর তৈয়ারি করা হইয়াছে; ইহারই মধ্যে সমস্ত ডেকের যাত্রীদের নির্বিচারে নামাইয়া দেওয়া হয়। দশ দিন বাস করার পর, তবে ইহারা শহরে প্রবেশ করিতে পায়।’
শুধু ‘শ্রীকান্ত’নয়, শরৎচন্দ্রের একাধিক উপন্যাসে বারবার মহামারি বা মড়কের প্রসঙ্গ আসছে। ‘গৃহদাহ’ নামে লেখকের যে উপন্যাস টলস্টয়ের ‘আন্না কারেনিনা’ দ্বারা প্রভাবিত বলে অনেক সমালোচক মনে করেন এবং বন্ধু মহিমের প্রথমে দয়িতা ও পরে আইনগত স্ত্রী অচলার প্রতি ডাক্তার সুরেশের অবোধ্য ভয়ানক আকর্ষণ সুরেশকে দিয়ে যে প্রবল অনৈতিক সব কাজ করিয়ে নেয়, ছলে-বলে-কৌশলে কোনো না কোনোভাবে অচলাকে জয় করার তার মরিয়া চেষ্টার এই আখ্যানেও প্লেগ বা মহামারি মাঝেমধ্যেই উপন্যাসের ক্যানভাস হিসেবে আসছে। উপন্যাসের শেষে সুরেশ যেন তার যাবতীয় অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করতেই কঠোর প্লেগের মাঝে রোগীদের সেবা করতে গিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখেই নিজেকে ঠেলে দেয়। শরৎচন্দ্রের ‘বিরাজ বৌ’ উপন্যাসে কলেরা বা ভেদবমির সংক্রমণের কথা জানা যাচ্ছে। গোটা আঠারো ও উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের শুরু অবধি বাংলা কথাসাহিত্য প্রায়ই প্লেগ, নিউমোনিয়া, কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও সেসব এড়াতে সম্পন্ন মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ‘হাওয়া বদলে’ পশ্চিম বা বিহার ও উত্তর ভারতে যাত্রার বিবরণে পরিপূর্ণ।
‘চতুরঙ্গ’-তে প্লেগে তো জ্যাঠামশাইয়ের মৃত্যুর কথাও লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘গোরা’ উপন্যাসে পালক পিতা-মাতার ঘরে কট্টর হিন্দু হিসেবে বড় হওয়া আইরিশ যুবক গৌরচাঁদ বা গোরা মড়কের সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে দেখতে পায় ও কষ্ট হলেও নিজের মনের কাছে স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে দুর্যোগ-দুর্বিপাক বা মড়কের সময় বাংলার গ্রামে মুসলিম সমাজ যেমন তাদের ধর্মীয় শিক্ষাতেই একতাবদ্ধ, হিন্দু সমাজ জাতিভেদ প্রথার কারণে ঠিক ততটাই অনৈক্যে ভরা ও পরস্পরের প্রতি অসংবেদী। একই ভাবনা শরৎচন্দ্রের ‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসে নায়ক রমেশেরও। তারাশঙ্করের ‘ধাত্রীদেবতা’ উপন্যাসের নায়ক শিবনাথও কলেরার সময় গ্রামে গ্রামে আর্ত ও পীড়িতের মাঝে সেবাব্রত গ্রহণ করে।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উন্মেষের আগেই মধ্যযুগের লোকজ বাংলা কাব্যে শীতলা দেবী, ওলাইচণ্ডী বা ওলা বিবির ব্রত-মানতসহ নানা স্ত্রী আচারের বিবরণ পাওয়া যায়, যা হিন্দু-মুসলিমের যৌথ সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক উত্তারাধিকার। সংক্ষেপে বাংলা সাহিত্যের কথা বললাম। এবার একটু বিশ্ব সাহিত্যের দিকে চোখ ফেরানো যাক।
১৬৫৫ সালে লন্ডনে যখন মড়ক দেখা দিল, শহরের অধিবাসীরা শুরুতে একদম হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল। তারা জ্যোতিষী, হাতুড়ে ডাক্তার থেকে শুরু করে বাইবেল পাঠ, সবকিছুর মাধ্যমেই মড়ক তাড়াতে উদ্যোগী হলো। নিজেরাই নিজেদের শরীর হাতড়ে রোগের লক্ষণ খুঁজতেও শুরু করল, কোথাও কোনো পিণ্ড, ফুসকুঁড়ি বা কালো দাগ আছে কি না? তারা ভবিষ্যদ্গণনার দ্বারস্থ হলো, বদলে দক্ষিণাও দিল; তারা প্রার্থনা করল, কান্নাকাটি করল। চোখ বুজে, কান ঢেকে তারা কাঁদত রাস্তায় রাস্তায়। তারা অমঙ্গলের আশঙ্কাবাহী নানা পঞ্জিকা পাঠ করে ভাবত, ‘সামনে নানা কিছু খারাপ যে ঘটবে, এটা নিশ্চিত।’ সরকার তাই ‘জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে, এমন কিছু মুদ্রণ দমন করারও’ চেষ্টা চালায়। অন্তত ড্যানিয়েল ডিফোর ‘মড়কের বছরের জার্নাল (আ জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার)’ বইটিতে লেখক তেমন একটা ইতিহাসই রচনা করেছেন, যা কিনা তিনি ১৭২২ সালে ‘মড়কের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি’ নামক একটি পরামর্শ ম্যানুয়ালের সহায়তায় লেখেন। তখন সাধারণ মানুষ আশঙ্কা করছিল যে এই মহামারি আবার ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যাত্রা শুরু করে মার্সেই হয়ে এবং উত্তর সমুদ্রে বাণিজ্যতরিগুলোর মাধ্যমে এই রোগ হানা দিতে পারে ব্রিটেনে—এমন ভয়ই ছড়িয়ে পড়ছিল। ডিফো এমনটাও আশা করছিলেন যে এই বই ‘আমাদের এবং ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাজে আসবে, যদিও এই তিক্ত পেয়ালার পানীয়ের অংশ থেকে আমাদের পরিত্রাণ পাওয়া উচিত।’ সেই তিক্ত পেয়ালা অবশ্য ততক্ষণে আসবাব রাখার তাক থেকে বের হয়ে পড়েছে।
১৬৬৫ সালে মড়ক সর্বব্যাপ্ত হওয়ার পর এত দিন যারা গড়িমসি করছিল, তারাও স্থানত্যাগের জন্য অস্থির হয়ে উঠল এবং আগেই কেন এলাকা ছাড়েনি, এটা নিয়েও মন খারাপ করতে শুরু করে, ‘গোটা শহরে একটি ঘোড়া পাওয়া যাচ্ছিল না, যা কেনা যায় বা ভাড়া নেওয়া যায়,’ ডিফো পরে স্মৃতিচারণা করেন। ইতিমধ্যে শহরের প্রধান দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অধিবাসীরা সবাই আটকা পড়ে। আটকা পড়া অধিবাসীরা প্রায় প্রত্যেকেই মন্দ নানা আচরণ করে এবং এদের ভেতর বিত্তশালীরাই সবচেয়ে মন্দ আচরণ করে: আগেই যখন খাবার-দাবার মজুদ রাখতে বলা হয়েছিল, সেটা তো তারা শোনেনি। আর অবরুদ্ধ অবস্থায় তারা তাদের দরিদ্র চাকর-বাকরদের পাঠাল খাবারদাবার সংগ্রহ করতে, ‘এই যে খাবারদাবার কিনতে ঘরের বাইরে আমাদের যেতে হয়েছিল, এটাই পরে গোটা শহরের জন্য ভয়ানক বিপর্যয় ডেকে আনে,’ ডিফো লিখলেন।
লন্ডন শহরের প্রতি পাঁচজনে একজন অধিবাসী মারা গেলেন; ব্যবসায়ীদের আগাম কিছু সতর্কতাও তাদের বাঁচাতে পারেনি। কসাইরা রাঁধুনিদের একটুকরো মাংস দিতেও অস্বীকৃতি জানাল। রাঁধুনিকে নিজেই সেই মাংস ঝুলিয়ে রাখা তাক থেকে নিতে হয়েছে। এবং কসাই রাঁধুনির হাত থেকে সরাসরি টাকা নিতেও অস্বীকৃতি জানালে রাঁধুনিকে মুদ্রাগুলো ফেলতে হয়েছে এক বালতি ভিনেগারের ভেতর। আজ যখন আপনার হ্যান্ড স্যানিটাইজার ফুরিয়ে যাচ্ছে, তখন অতীতের এই কথা মনে করতে পারেন।
‘দুঃখ এবং যন্ত্রণা যেন প্রতিটি মুখে গেঁথে গিয়েছিল,’ ডিফো লিখেছিলেন। জনমনে ভীতি ছড়ায়, এমন বই মুদ্রণে সরকারের নিষেধাজ্ঞাও কাজে আসছিল না। পথে বের হলেই তো আতঙ্ক। প্রতি সপ্তাহে কত মানুষ মারা যাচ্ছে, তার সাপ্তাহিক খতিয়ান পথে টাঙানো অথবা গলিতে গলিতে মৃত শবদেহের স্তূপ। শহরের মেয়রের নির্দেশনামাগুলোও পাঠ করা যেত অতি সহজেই: ‘যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো মানুষকে দেখতে যায়, যার প্লেগ হয়েছে অথবা জেনে-শুনে, স্বেচ্ছায় বা সজ্ঞানে কেউ যদি কোনো মড়কে সংক্রমিত বাড়িতে সরকারের নিষেধ সত্ত্বেও ঢোকে, তবে যে বাড়িতে এই ব্যক্তির বসবাস, সেই বাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হবে।’ এবং এই মড়কে সংক্রমিত বাড়িগুলোর ওপর সাঁটা চিহ্নগুলো সহজেই দেখতে পাওয়া যেত, দারোয়ানরা বাড়িগুলো পাহারা দিত, প্রতিটি দরজাতেই এক ফুট লম্বা লাল রঙের ক্রুশ চিহ্ন আঁকা, যার ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকত, ‘হে প্রভু, আমাদের করুণা করো!’ দূর থেকেই এমন লেখা পড়া যেত।
পাঠও কিন্তু একধরনের সংক্রমণ, মস্তিষ্কে এক গর্ত খোঁড়ার মতই: বই সংক্রমিত করে, প্রতীকীভাবেই এবং এমনকি বীজাণুগতভাবেও। আঠারো শতকে, জাহাজের ক্যাপ্টেনরা বন্দরে এসে বাইবেল ছুঁয়ে, শপথ কেটে বলতেন যে তাঁরা তাঁদের গভীর সমুদ্রে থাকা জাহাজগুলো বীজাণুমুক্ত করেছে। যক্ষ্মার ভীতির সময়ে, পাবলিক লাইব্রেরি বা সাধারণ পাঠাগারগুলো ফর্ম্যালডিহাইড গ্যাসে ভরা ইস্পাতের ডালায় ভরে বইগুলো বীজাণুমুক্ত করত। আর বর্তমানকালে যেকোনো গ্রন্থাগারিকের অন্তর্জালে রেডিটের থ্রেড বা অন্তর্জাল সূত্র থেকেই আপনি জানতে পারবেন যে কীভাবে বই বীজাণুমুক্ত করতে হয়। অথবা এই করোনাভাইরাসের সময় যেমন পাঠাগার বা বইয়ের দোকানগুলো তাদের ঝাপ নামিয়ে ফেলেছে!
তবে অবশ্যই বই যেন আত্মার ঔষধি ও সান্ত্বনা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যখনই ইউরোপে মারি বা মড়কের বিস্তার ঘটেছে, কোয়ারেন্টিনে বন্দী মানুষেরা হাতের কাছে বই পেলে নিজেদের সৌভাগ্যবান ভেবেছে। বই পড়ে সময় কাটিয়েছে। যখন হাতের কাছে বই পাওয়া যায়নি, তখন তারা গল্প বলেছে। জিওভান্নি বোকাচ্চিওর ‘ডেকামেরন’ সেই চৌদ্দ শতকে ‘কালো মৃত্যু’ বা মড়ক থেকে পালিয়ে থাকা সাতজন নারী ও তিনজন পুরুষের দশ দিন ধরে বলতে থাকা গল্পের কথকতা। এই মড়ক ছিল এতটাই কুখ্যাত যে বোকাচ্চিও তাঁর পাঠকদের বই না নামিয়ে রাখার অনুরোধ করেছেন।
মড়কের সাহিত্য সব সময়ই কষ্টকর। মহামারি যেন মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের মতো দুরূহ কোনো বিষয়। মানুষকে তার উচ্চতর ভাবপৃথিবী ও মানবতার উত্তুঙ্গ সব শিখরাদেশ থেকে নামিয়ে এনে তার ভেতরের পাশববৃত্তিকেই যেন প্রকটিত করে দেখায় মড়কের সময়। মেরি শেলি যেমন ১৮২৬ সালে তাঁর ‘অন্তিম মানব (দ্য লাস্ট ম্যান)’-এ লিখেছেন, ‘মানুষের দানবীয় সব ক্ষমতাকে বিদায়,’ মড়কে বিধ্বস্ত এক সময়ের পর তিনি লেখেন, ‘শিল্পকে বিদায়, বিদায় বাগ্মিতাকেও।’ মারি বা মড়কের প্রতিটি গল্পই নিরক্ষরতার গল্প। ভাষা যখন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, মানুষ হয়ে ওঠে নিষ্ঠুর।
তবে তারপরও বইয়ের অস্তিত্ব নিজেই যেন মানবতার সহনক্ষমতার এক চিহ্ন, যতই নিষ্ঠুর হোক না কেন এক আখ্যানপর্ব, পাঠের সংক্রমণই আমাদের টিকিয়ে রাখে। পাঠই হতে পারে এক সংক্রমণ, লেখকের মনন যেন চুঁইয়ে পড়া ধারার মত পাঠকের হৃদয় ভিজিয়ে দেয়। মড়কের সময় পাঠই প্রমাণিত হতে পারে এক শক্তিশালী ও প্রমাণিত প্রতিষেধক হিসেবে, যা অপরাজেয় ও সূক্ষ্ম।
মড়ক সময়ের আখ্যান আমরা খুঁজে পাই ‘অয়দিপাউস রেক্স’ বা রাজা অয়দিপাউস থেকে ‘অ্যাঞ্জেলস ইন আমেরিকা’ অবধি বিশ্ব সাহিত্যের বিপুল গ্রন্থ সম্ভারের ধারাক্রমে। ‘তুমি নিজেই মড়ক,’ এক অন্ধ ব্যক্তি বলেন রাজা অয়দিপাউসকে। ‘এটা ১৯৮৬ সাল এবং চারপাশে মড়ক ছড়িয়ে পড়ছে, আমার চেয়ে তরুণতর বন্ধুরা মারা যাচ্ছে এবং আমার বয়স মাত্র ত্রিশ,’ একটি চরিত্র টনি কুশনার বলছে। মড়ক এখানে এবং সেখানে—থিবস থেকে নিউইয়র্ক অবধি সর্বত্র পরিদৃশ্যমান—ভয়ানক ও আতঙ্ক জাগানিয়া, কিন্তু ‘ফ্রাঙ্কেনস্টেইনে’র পর ‘দ্য লাস্ট ম্যান’-এ মেরি শেলি যেমনটা লিখেছেন, তেমন চতুর্দিকে রৌরব নরকের মতো আতঙ্কজাগানিয়া মড়কের বিবরণ আর কোথাও পাওয়া যায় না।
‘দ্য লাস্ট ম্যান’ উপন্যাসটি একুশ শতকের প্রেক্ষাপটে লেখা। মানব ইতিহাসে এটিই প্রথম উপন্যাস, যেখানে গোটা বিশ্বজুড়ে একটি মড়কের প্রেক্ষিতে মানব প্রজাতির ধ্বংসের কথা কল্পনা করা হয়েছে। মেরি শেলি এই উপন্যাসটি লিখেছেন উনত্রিশ বছর বয়সে, যখন তাঁর প্রায় প্রত্যেক প্রিয়জনের মৃত্যু হয়েছে আর তিনি সেই ব্যক্তিগত ক্ষতিকেই এভাবে সাজাচ্ছেন, ‘এক প্রিয় জাতির শেষ ধ্বংসাবশেষ, আমার সঙ্গীরা, আমার আগেই সবাই বিলুপ্ত হলো।’ এই বইয়ের কথক একজন দরিদ্র ও অশিক্ষিত ইংরেজ মেষপালক: আদিম মানব, সহিংস ও আইনকানুনহীন, এমনকি বলতে গেলে দানবীয় প্রকৃতির। এক ধনী বিদ্বজনের হাতে মানুষ হয় এবং কিছুটা লেখাপড়াও শেখে— ‘জ্ঞানের জন্য এক আন্তরিক ভালবাসা...আমাকে এই দিন ও রাতগুলো পড়ালেখায় কাটাতে সাহার্য করছে।’ ধীরে ধীরে প্রজ্ঞার পথে তার উত্তরণ ঘটে এবং সে হয়ে ওঠে এক পণ্ডিত, স্বাধীনতার এক রক্ষক, একজন রিপাবলিকান ও মহাবিশ্বের নাগরিক।
এরপর, ২০৯২ সালে, মড়ক আসে। প্রথমে ধ্বংস করে কনস্টান্টিনোপল। বছরের পর বছর ধরে প্রতি শীতে মড়ক কেটে যায় (শীতই যেন ‘এক যোদ্ধা ও অপরাজেয় ডাক্তার’) এবং প্রতি বসন্তে সে আবার দেখা দেয়, আরও তীব্র ও সর্বব্যাপ্ত চেহারায়। এই মড়ক অতিক্রম করে পাহাড়, পরিব্যাপ্ত হয় মহাসাগর পেরিয়ে। সূর্য ওঠে, কালো সেই সূর্য: এক অমঙ্গল চিহ্ন। ‘এশিয়া জুড়ে, নীল নদ থেকে কাস্পিয়ান সাগরের তীর হয়ে, হেল্লেসপন্ট থেকে এমনকি ওমান সাগর হয়ে, এক সহসা আতঙ্ক যেন সবাইকে তাড়িয়ে বেড়ায়,’ মেরি শেলি লিখেছেন। ‘পুরুষেরা মসজিদে ভিড় করে; নারীরা, বোরখাবৃতা, সমাধিসৌধে ছোটে এবং মৃতদের জন্য নৈবেদ্য দেয়, যেন এভাবেই তারা যা কিছু আজও জীবন্ত, সেসব বাঁচাবে।’ এই মড়কের প্রকৃতি কিন্তু থাকে খুবই রহস্যজনক। ‘একে সবাই মহামারি বলছিল। তবে বড় প্রশ্নটি হলো, কেউই নিশ্চিত ছিল না যে কীভাবে এই মারির বীজাণু ছড়াল এবং ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।’ শুরুতে এই মড়ক কতটা ভয়ানক হবে, সেটা বুঝতে না পেরে এবং ভুল আত্মবিশ্বাসে, আইনপ্রণেতারা কাজ শুরু করতেই অনেক দেরি করে ফেলেন বা দ্বিধাগ্রস্থ থাকেন। ‘ইংল্যান্ড তখনো নিরাপদ ছিল। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেন তত দিনে সংক্রমিত হয়ে পড়ছে, আমাদের ও মড়কের ভেতর তখনই কোনো লঙ্ঘন ছাড়াই দেয়াল তোলা হয়েছিল।’ এরপর আসে পৃথিবীর নানা জাতির প্রতিবেদন, যারা মড়কে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও জনশূন্য হয়ে পড়ছে। ‘আমেরিকার বিশাল নগরীগুলো, ভারতবর্ষের উর্বরা সমতলভূমি, চীনের ঘনবসতিপূর্ণ যত বাসস্থান, সবই ধ্বংসের পথে চালিত।’ ইতিহাসের ভয়ানক বাঁক মেরির উপন্যাসের পাতায় স্থান পায়, যেমন পায় ডেকামেরনেও, ‘আমরা ১৩৪৮ সালে মড়কের কথা মাথায় রাখতে বলেছিলাম, যখন গণনা করা হয়েছিল যে গোটা মানব প্রজাতির এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়েছিল। যেহেতু তখনো পর্যন্ত পশ্চিম ইউরোপ সংক্রমিত হয়নি, তবে এমনটা কি আজীবন থাকবে?’ না, এমনটা তো সব সময় রইবে না। অনিবার্যভাবেই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডেও মড়ক আসে। তবে ততক্ষণে স্বাস্থ্যবানদের আর কোথাও পালানোর জায়গা নেই। কারণ, মহামারির শেষ বিভীষিকার দিনগুলোতে ‘পৃথিবীর কোথাও আর কোনো আশ্রয় নেই।’ গোটা পৃথিবীরই যে নিদারুণ মারি হয়েছে!
যদি ‘ফ্রাঙ্কেনস্টেইন’ উপন্যাসে মেরি শেলি মানবদেহের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সেলাইয়ের মাধ্যমে একটি গোটা মানবদেহের সৃষ্টির কথা কল্পনা করে থাকেন, তবে ‘দ্য লাস্ট ম্যান’-এ তিনি সভ্যতার বিপন্নতার কথা কল্পনা করেছেন। মৃত্যুর পর মৃত্যু, দেশের পর দেশ ধরে মানব প্রজাতি মইয়ের একটি একটি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমেছে আর তারপর আবার উঠেছে। শেলীর এই উপন্যাসের বয়ানকারী, সেই মেষপালক, মানবসভ্যতার যাবতীয় ‘অলঙ্করণ’, যা কিনা মানবতাকে আবরণে-আভরণে সুসজ্জিত করে, তার নিজের নগ্ন সত্তাকেই আবৃত করে—সেই যাবতীয় অলংকারের ধ্বংস ও বিসর্জনের সাক্ষী হয়ে উঠেছেন। এই অলংকারগুলো হলো আইন, ধর্ম, শিল্পকলা, বিজ্ঞান, উদারনৈতিক সরকার (জাতিগুলো আর নেই), স্বাধীনতা, বাণিজ্য, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, শিল্প, পরিবহন ব্যবস্থা, যোগাযোগ, কৃষি।
‘আমাদের মনগুলো, অগণন স্তর এবং চিন্তার অনিঃশেষ যত সমন্বয়ের ভেতর দিয়ে বিলম্বিতভাবে যারা ছড়িয়ে পড়ে, এখন মাংসের দেয়ালের ভেতরে নিজেদের ঢুকিয়ে ফেলেছে, শুধুই নিজেদের সুরক্ষাই এখন তাদের একমাত্র কাজ।’ ধীরে ধীরে এই ভয়ানক মহামারি যখন সবকিছুই নষ্ট করে দিল, তখন হাতে গোনা যে অল্প কিছু মানুষ বেঁচে গেল, তারাও যেন নিজেদের ভেতর যুদ্ধমান কয়েকটি গোষ্ঠীতে পরিণত হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত না একজন মাত্র মানুষ বা আমাদের কথক তথা সেই মেষপালক টিকে রইল। রোমের নানা ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এই মেষপালক এক লেখকের ঘরে ঢোকে এবং সেই লেখকের টেবিলে দেখতে পায় একটি পাণ্ডুলিপি: ‘এটি ইতালীয় ভাষার ওপর একটি বিদগ্ধ অভিসন্দর্ভ।’ এভাবেই পৃথিবীর টিকে যাওয়া শেষ বইটি হচ্ছে ভাষার অধ্যয়নবিষয়ক, মানবতার প্রথম অলংকরণ। আর আমাদের এই কাহিনির কথক শেষ মুহূর্তে পৃথিবীর একাকী মাত্র মানব হিসেবে কী করেন? ‘আমিও একটি বই লিখব, আমি কেঁদে উঠে বললাম, কার পড়ার জন্য বই লিখব?’ এটাকে কথক বলছে ‘শেষ মানবের ইতিহাস,’ এবং বইটি উদ্দেশ করছে সব মৃত মানুষকে। এই বইয়ের কোনো পাঠক থাকবে না। অবশ্যই মেরি শেলির পাঠকেরা তো পড়বেনই।
(বাকি অংশ আগামীকাল)