আলোকচিত্রী এডওয়ার্ড ওয়েস্টন ও তাঁর আলোকচিত্র অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
আলোকচিত্রী এডওয়ার্ড ওয়েস্টন ও তাঁর আলোকচিত্র অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

আলোকচিত্রে গল্প

স্টিল লাইফের প্রথম ভাষা

অতীতকে পাঠ করার নানা উপায় আছে। কখনো তারিখ, দলিল, স্মৃতিচারণ বা বিবরণীর মধ্য দিয়ে; আবার কখনো এমন কিছু মুহূর্তের মুখোমুখি আমরা হই, যার সমস্ত ভার, আবেগ ও বাস্তবতা সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরভাবে ধারণ করে একটি মাত্র আলোকচিত্র। সময়ের সীমানা অতিক্রম করে টিকে থাকা এসব ছবির পেছনে লুকিয়ে থাকে বহুস্তর গল্প। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আমরা তুলে ধরব তেমনই কোনো বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।

১৯৩০ সালের ঘটনা। এ বছর আলোকচিত্রী এডওয়ার্ড ওয়েস্টন ধারণ করেন ‘পেপার নং ৩০’ নামের একটি আলোকচিত্র, যা মর্ডানিস্ট আলোকচিত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য। পেপার নং ৩০ এমন একটি প্রতীকচিত্র যা বিংশ শতাব্দীর শিল্পদৃষ্টিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল।

ওয়েস্টন আলোকচিত্রে ধারণ করেছিলেন একটি সাধারণ সবুজ বেল পেপার, যা কিনা আমাদের রান্নাঘরের নিত্যদিনের সঙ্গী। তবে ছবিটি কেবল একটি ছবি ছিল না। তা রূপান্তরিত হয়েছিল এক গভীর ও মূর্তিমান সৌন্দর্যের ফর্মে। ক্যামেরায় এমন এক বস্তু হয়ে ধরা দিয়েছিল, যা একই সঙ্গে হয়ে উঠেছিল বিমূর্ত ও বাস্তব। নীরব একটি ভাস্কর্য যেমন দ্যুতি ছড়ায়, তেমন। এই আলোকচিত্র ধারণের মধ্য দিয়ে এডওয়ার্ড ওয়েস্টন প্রমাণ করেছিলেন যে আলোকচিত্র শুধু ডকুমেন্ট করার মাধ্যম নয়; বরং এটি হতে পারে একটি শুদ্ধ শিল্প। যাকে তিনি আখ্যা দিয়েছিলেন ‘পিওর ফটোগ্রাফি’ হিসেবে। আলোকচিত্রটিতে বাস্তবতাকে বিকৃত না করে, তারই নিখুঁত, স্বচ্ছ ও তীক্ষ্ণ সৌন্দর্যকে তুলে ধরা ছিল তার মূল লক্ষ্য।

১৯২০ দশকের শেষভাগে এবং ১৯৩০ দশকের শুরুতে আলোকচিত্রী এডওয়ার্ড ওয়েস্টনের দৃষ্টি ধীরে ধীরে মানবদেহ থেকে সরতে থাকে এবং স্থির হতে থাকে প্রকৃতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সৌন্দর্যের দিকে। তখন তাঁর ধারণ করা আলোকচিত্রের বিষয় হয়ে ওঠে ঝিনুকের শাঁস, ফল, সবজি ইত্যাদি। এসব সাধারণ বস্তুর অন্তর্লীন জীবনশক্তি তাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। সেসবকে তিনি নিজেই আখ্যায়িত করেছিলেন, ‘দ্য লিভিং এসেন্স অব ম্যাটারস’ বলে।

আলোকচিত্রী এডওয়ার্ড ওয়েস্টন

একটি ব্যক্তিগত নোটে ওয়েস্টন লিখেছিলেন, তাঁর মাথায় হঠাৎ একটি অনুপ্রেরণা আসে। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে তিনি যে সমস্যায় পড়েছিলেন, তা সমাধান করেন এক দারুণ বুদ্ধিতে। তিনি একটি বড় টিনের ফানেলের ভেতর পেপারটিকে রাখেন। ফলে ব্যাকগ্রাউন্ড গাঢ় হয়ে যায়; আর টিন থেকে প্রতিফলিত আলো এসে পেপারের গায়ে পড়লে পুরো ফ্রেমে এক জাদুকরি দীপ্তি এনে দেয়। যা পেপারের গঠনকে জীবন্ত করে তোলে, যেন আলো নিজেই মূর্তি গড়ছে।

ফানেল থেকে প্রতিফলিত কোমল আলো পেপারের গায়ে তৈরি করে ছায়া এবং আলোয় ভরা এক ভাস্কর্যিক গভীরতা। এর ব্যাকগ্রাউন্ডটি দেখতে ধাতব, আবার হুট করে মনে হয় যেন পাথরে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে। আলোকচিত্রের বিষয়বস্তুর প্রতিটি কার্ভ, প্রতিটি ভাঁজ যেন আলোয় জেগে উঠেছে। এই আলো পেপারের শরীরকে কেবল দৃশ্যমান করেনি; বরং তার ভেতরের গঠনকে ভাস্কর্যে রূপান্তরিত করেছে।

ওয়েস্টনের ফ্রেম এতটাই অন্তরঙ্গ যে দর্শক প্রথমে বুঝতে পারেন না ছবির বিষয়বস্তুটি একটি সবজি। একই সঙ্গে এতটাই বাস্তব যে এর পৃষ্ঠের প্রতিটি সূক্ষ্ম বুনট (টেক্সচার) স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। আবার একই সঙ্গে বিমূর্ত, যেন এক অজানা জীবনের প্রতীক। এ বিষয়ে ওয়েস্টন নিজেই লিখেছিলেন, ‘এটি ক্ল্যাসিক এবং সম্পূর্ণ তৃপ্তিদায়ক একটি পেপার; কিন্তু পেপারের চেয়েও বেশি; বিমূর্ত। কারণ, বিষয়বস্তু নিয়ে আমাদের যে ধারণা ইতিমধ্যে আছে, সে সবের সীমার একেবারে বাইরে নিয়ে যায়।’

‘পেপার নং ৩০’

বহু সমালোচক লক্ষ্য করেছেন, পেপারটির বাঁক ও ভাঁজ যেন মানুষের দেহের মতো। বলা যায়, একটি মোচড়ানো শরীর অথবা দেখলে মনে হয় একজন শুয়ে থাকা নারী। যদিও ওয়েস্টন বলেছিলেন, ‘এটি কেবল একটি পেপার ছাড়া আর কিছু নয়।’ তবুও তাঁর সেই সময়ের ধারণ করা নু৵ড আলোকচিত্রগুলোর সঙ্গে এই ছবির রূপগত সাদৃশ্য অস্বীকার করা যায় না। তিনি প্রকৃতির বিভিন্ন ফর্মের মধ্যেই মানবিক স্পর্শ খুঁজে পেয়েছিলেন।

পেপার নং ৩০ আলোকচিত্রীর একটি পৃথক দৃষ্টিভঙ্গির ঘোষণা মানুষের সামনে হাজির করেছে। ১৯৩২ সালে নির্দিষ্ট একটি দর্শন ঠিক করে জন্ম নিয়েছিল ওয়েস্টনসহ কয়েকজন আলোকচিত্রশিল্পীর গ্রুপ ‘এফ/৬৪’। এই গোষ্ঠী ঘোষণা করেছিল, আলোকচিত্রকে আর্টিশিয়াল সফটনেস বা পিকটোরিয়ালিস্ট শৈলীর হাতছানির বাইরে এনে প্রযুক্তিগত নিখুঁততা ও দৃশ্যের শুদ্ধতায় পৌঁছাতে হবে। বিখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী এনসেল এডামসও ছিলেন এই গ্রুপের অন্যতম প্রধান সদস্য।

পেপার নং ৩০ আলোকচিত্রটি ছিল ওয়েস্টনের ‘স্ট্রেইট ফটোগ্রাফির’র প্রতি অঙ্গীকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রকাশ। আলোকচিত্রটি দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একটি সাধারণ বস্তু রান্নাঘরের একটি সাধারণ পেপার হয়ে উঠতে পারে মহাজাগতিক সৌন্দর্যের অভাবনীয় প্রতীক। ওয়েস্টন বাস্তবতাকে ছেঁটে ফেলেননি; বরং সেটিকেই এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে দর্শক মুখোমুখি হন বিষয়বস্তুর অস্তিত্ব ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের। এটি প্রমাণ করে দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রতম বস্তুও শিল্পীর চোখে হয়ে উঠতে পারে রহস্যময় ও আধ্যাত্মিক।

‘বাঁধাকপির পাতা’

‘পেপার নং ৩০’ আলোকচিত্রটির জন্ম কোনো আকস্মিক অনুপ্রেরণার ফল ছিল না; বরং এটি ছিল এক দীর্ঘ ও ধৈর্যশীল সাধনার চূড়ান্ত পরিণতি। বহু বছরের আলোকচিত্র অনুশীলনের মধ্য দিয়ে এডওয়ার্ড ওয়েস্টন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছিলেন, যেখানে তাঁর লক্ষ্য ছিল শুধু ‘দেখা’ নয় বরং বিষয়বস্তুর ‘অর্থপূর্ণ উপস্থাপন’ হাজির করা। অর্থাৎ প্রকৃতির অন্তর্নিহিত রূপ ও সত্তাকে দর্শকের সামনে প্রকাশ করা।

ওয়েস্টন কর্মজীবনের শুরু করেছিলেন পিকটোরিয়ালিস্ট ধারায়। যেখানে আলোকচিত্রকে চিত্রকলা শিল্পের মতো দেখানোর জন্য নরম ফোকাস, ধোঁয়াটে আবহ আনা কিংবা টেকনিকে নানা পরিবর্তন করা হতো; কিন্তু ১৯২৩ থেকে ১৯২৬ সালে মেক্সিকোবাস তাঁর শিল্পদৃষ্টিকে আমূল পাল্টে দেয়। ডিয়েগো রিভেরার মতো চিত্রশিল্পীদের প্রভাব ওয়েস্টনকে টেনে আনে আধুনিকতাবাদে। ওয়েস্টন বুঝতে সমর্থ হন শিল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবতাকে বিকৃত করা নয়; বরং তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যকে চূড়ান্ত নান্দনিকতায় প্রকাশ করা।

মেক্সিকো থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে এসে ওয়েস্টন পুরোপুরি নিবেদিত হন প্রকৃতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জৈব উপাদান যেমন ঝিনুক, ফল, সবজি, লাউ, কুমড়া ইত্যাদির যথোপযুক্ত অধ্যয়নে। তাঁর নিজের ভাষায়, এসব প্রাকৃতিক জিনিসের মধ্যে তিনি খুঁজে পান ‘এন্ডলেস ভ্যারাইটি ইন ফর্ম ম্যানিফেস্টেশন অ্যান্ড এক্সট্রাঅর্ডিনারি সারফেস টেক্সচার’ অর্থাৎ রূপের অফুরন্ত বৈচিত্র্য ও ব্যাকগ্রাউন্ডের আশ্চর্য সূক্ষ্মতা। এ পর্যায় থেকেই শুরু হয় তাঁর ‘বস্তুতে আত্মার সন্ধান’।

‘শামুক’

ওয়েস্টনের পেপার সিরিজের যাত্রা শুরু হয় মূলত ১৯২৭ সালে। স্টুডিওর ভেতরে বিভিন্ন ফরমেটে তিনি পেপারকে স্থাপন করে পরীক্ষা চালাতে থাকেন। এমনই তাঁর এক উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা ছিল একটি পেপারকে দুধের বোতলের মুখে স্থাপন করা। যা তিনি নিজে এবং তাঁর ভাস্কর বন্ধু পিটার ক্রাসনো উভয়েই প্রশংসা করেছিলেন। প্রকাশ করেছিলেন ওয়েস্টনের মূর্তিকলাসুলভ দৃষ্টিকে এবং সাধারণ ক্ষুদ্র একটি বস্তুকে ‘গম্ভীর ও বিশাল’ কিছুতে রূপান্তরিত করার আকাঙ্ক্ষাকে। তবে তাতে তখনো ছিল স্পষ্ট পরীক্ষার ছাপ। বিষয়বস্তুর রূপ ও উপস্থাপনার মধ্যে সম্পূর্ণ সমন্বয় তখনো ধরা দেয়নি।

১৯২৯ সালে তিনি আরও গভীরভাবে এ বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেন। পেপারের আশ্চর্য শারীরিক গঠনরেখা ওয়েস্টনকে এমনভাবে মুগ্ধ করেছিল যে তিনি অন্তত ছাব্বিশটি নেগেটিভ খরচ করে ফেললেন। কখনো কাপড়ের ওপর রেখে, কখনো সাদামাটা ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন আলোর সমন্বয়ে তিনি একের পর এক আলোকচিত্র ধারণ করতে থাকেন। ফলে তিনি বহুবার ব্যর্থ হন। আলো দুর্বল হয়ে যায় কিংবা বাইরে দিয়ে ফায়ার ট্রাক যাওয়ায় ক্যামেরা কেঁপে ওঠে কিংবা ফোরগ্রাউন্ড অতিরিক্ত উজ্জ্বল হয়ে যায় ইত্যাদি। তবুও তিনি থামেননি, নিরাশ হননি, চেষ্টা জারি রাখেন। তিনি খুঁজছিলেন একটি নিখুঁত উপস্থাপন, যেখানে পেপার তার বাস্তব সীমা ছাড়িয়ে শিল্পে উন্নীত হবে।

অবশেষে ১৯৩০ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের চার দিনের মধ্যে ওয়েস্টন আরও ৩০টির মতো পেপার নেগেটিভ তুললেন। আর এই পর্যায়ে পেলেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত ও বিখ্যাত ফলাফল। একটি বিশেষ কাগজ নিয়ে কাজের সময় তিনি উপলব্ধি করলেন, সাদা কাপড় বা কার্ডবোর্ড পটভূমি হিসেবে অতিরিক্ত উজ্জ্বল, ফলে পুরো বিন্যাসের সাম্য ভেঙে পড়ছে। এমন সময় তাঁর নজর পড়ল একটি বড় টিনের ফানেলের ওপর। তিনি ফানেলের প্রশস্ত মুখের মধ্যে পেপারটিকে স্থাপন করলেন; এবং ধারণ করলেন ইতিহাস তৈরি করা পেপার নং ৩০। ফানেলটি দুটি কাজ সহজ করে দিল। প্রথমত কালচে একটি পটভূমি তৈরি করল, যেখানে স্থান বা আকার সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না; এবং দ্বিতীয়ত আলো প্রতিফলিত করে পেপারের শরীরকে একটি ত্রিমাত্রিক ও ভাস্কর্যিক গভীরতা দিল।

এডওয়ার্ড ওয়েস্টন সৃষ্টির উত্তেজনায় তাঁর ডে-বুকে লিখলেন এভাবে—

‘এটি ছিল সত্যিই এক উজ্জ্বল আইডিয়া। কাগজটির জন্য এটি ছিল এক নিখুঁত পটভূমি, যা তার বক্রতার গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রতিফলিত আলো এনে দিয়েছিল। আমি কাগজটিকে ফানেলের ভেতরে স্থাপন করলাম, জাইস লেন্সে ফোকাস করলাম এবং জানতাম ঠিক কোন কোণ থেকে আলোটি পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যাবে। ছয় মিনিটের এক্সপোজার দিলাম; আর ফল পেলাম এক অসাধারণ নেগেটিভ—আমার তোলা ছবিগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম।’