
অতীত পাঠের অনেক ধরনের উপায় রয়েছে। তারিখ, দলিল, স্মৃতিচারণ বা বিবরণীর মধ্য দিয়ে যেমন, আবার এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যাদের সমস্ত ভার, আবেগ ও বাস্তবতা সবচেয়ে সংক্ষেপে ধারণ করে কেবল একটি আলোকচিত্র। সময়ের সীমানা ভেদ করে টিকে থাকা এসব ছবির পেছনে থাকে একাধিক গল্প। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আমরা তুলে ধরব এমনই কোনো বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।
১৯৪৮ সালে লাইফ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় ডব্লিউ ইউজিন স্মিথের আলোকচিত্র-প্রবন্ধ ‘কান্ট্রি ডক্টর’। আলোকচিত্র-প্রবন্ধ বলার কারণ, ‘কান্ট্রি ডক্টর’ কেবল কয়েকটি আলোকচিত্রের সমষ্টি নয়; বরং একগুচ্ছ ছবি দিয়ে কীভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প বলতে হয়, তার ভিত্তিপাঠ। অন্তরঙ্গ, রুক্ষ এবং গভীর মানবিক সহানুভূতিতে ভর করে ইউজিন স্মিথ তাঁর ধারণ করা আলোকচিত্রের মাধ্যমে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করেন, যার মাধ্যমে একজন সাধারণ গ্রামীণ চিকিৎসকের নিত্যদিনের শ্রম রূপ নেয় মানবিক সহনশীলতার এক সর্বজনীন মহাকাব্যে। যেই কাব্য পাঠে আজও আমরা অনুপ্রাণিত হই, মুগ্ধ হই।
এই আলোকপ্রবন্ধে অবলম্বন করা হয়েছে কলোরাডোর ছোট শহর ক্রেমলিংয়ের চিকিৎসক ড. আর্নেস্ট সেরিয়ানির জীবন ও কর্ম। সেই সময় স্মিথের কাজের পদ্ধতি ছিল বিপ্লবাত্মক। সপ্তাহের পর সপ্তাহ তিনি সেরিয়ানির সঙ্গে বসবাস করেছেন, যতক্ষণ না ক্যামেরার উপস্থিতি চিকিৎসকের কাছে উপস্থিত আর দশটা উপাদানের মতো হয়ে ওঠে। স্মিথ কেবল ছবি তোলেননি, তিনি অনুসরণ করেছিলেন ‘ইমারশন জার্নালিজম’; যা সাংবাদিকতার এমন একটি ধারা, যেখানে একজন সাংবাদিক কোনো খবরের গভীরে পৌঁছানোর জন্য সংশ্লিষ্ট পরিবেশ বা ঘটনার মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করেন। সাধারণ সাংবাদিকতায় সাংবাদিকেরা ঘটনার বাইরে থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন, কিন্তু ইমারশন জার্নালিজমে তিনি নিজেই সেই অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে যান।
একটি ঘোড়া উল্টে পড়ে কয়েকটি পাঁজর ভেঙে যাওয়া এক রোগীর বুকে ড. সেরিয়ানি ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছেন। লাইফ ম্যাগাজিনের সম্পাদকেরা লিখেছিলেন, ‘এক ডজন ক্ষেত্রজুড়ে দায়িত্ব পালন করেও তাঁর আয় একজন শহুরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একটিমাত্র শাখায় কাজ করে যে উপার্জন করেন, তার চেয়ে কম। তবু সেরিয়ানি প্রতিদান পান তাঁর রোগী ও প্রতিবেশীদের স্নেহে, নিজের সম্প্রদায়ে অর্জিত উচ্চমর্যাদায় এবং এই সত্যে যে তিনি কারও অধীনে নন, নিজেই নিজের মালিক। তাঁর কাছে এটুকুই যথেষ্ট।’
‘কান্ট্রি ডক্টর’ একগুচ্ছ ছবি দিয়ে কীভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প বলতে হয়, তার ভিত্তিপাঠ। ইউজিন স্মিথ তাঁর ধারণ করা আলোকচিত্রের মাধ্যমে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করেন, যার মাধ্যমে একজন সাধারণ গ্রামীণ চিকিৎসকের নিত্যদিনের শ্রম রূপ নেয় মানবিক সহনশীলতার এক সর্বজনীন মহাকাব্যে।
স্মিথের ধারণ করা আলোকচিত্রের আগে ম্যাগাজিন ফটোগ্রাফি ছিল মূলত সাজানো দৃশ্য বা বিচ্ছিন্ন ছবির সমাহার। তখন আলোকচিত্রের কাজ ছিল লিখিত প্রতিবেদনের সহকারীর ভূমিকা পালন করা। লেখাটা লিখত অন্য একজন, আলোকচিত্র সেখানে সহায়ক উপাদান হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। স্মিথ লেখক এবং আলোকচিত্রের এই সম্পর্কের কেমিস্ট্রি বদলে দেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সঠিক বিন্যাসে ও ছন্দে সাজালে আলোকচিত্র নিজেই হয়ে উঠতে পারে প্রধান বর্ণনাকারী, যা একটি সিনেম্যাটিক প্রবাহে নিজেই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।
১৯৪০-এর দশকের শেষভাগে আমেরিকার চিকিৎসাক্ষেত্রে এক গভীর রূপান্তর চলছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অধিকাংশ তরুণ চিকিৎসক ঝুঁকছিলেন শহরকেন্দ্রিক বিশেষায়িত চিকিৎসার দিকে। শহরে আয় বেশি, কর্মঘণ্টা নিয়মিত এবং সামাজিক মর্যাদাও নিশ্চিত। ফলে দেশের বিস্তীর্ণ গ্রামীণাঞ্চল পরিণত হচ্ছিল কার্যত চিকিৎসাশূন্য মেডিক্যাল মরুভূমিতে।
এই প্রবণতায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন। তারা লাইফ ম্যাগাজিনের কাছে একটি প্রতিবেদনের প্রস্তাব রাখে, যার উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ চিকিৎসকের (জেনারেল প্র্যাকটিশনার) ভূমিকা রোমান্টিক করে তুলে ধরা এবং মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের গ্রামীণ চিকিৎসাচর্চার দিকে আকৃষ্ট করা। ওই সময় প্রায় দুই কোটি পাঠকের কাছে পৌঁছানো লাইফ ছিল এই ‘প্রচার’কে শিল্পে রূপ দেওয়ার আদর্শ মাধ্যম।
এই প্রতিবেদনের জন্য কলোরাডো মেডিক্যাল সোসাইটি যে নামটি সুপারিশ করেছিল, তিনি ড. আর্নেস্ট সেরিয়ানি। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩২, চেহারায় আকর্ষণ আছে, সঙ্গে কাজে অসাধারণ নিষ্ঠা। স্থান নির্ধারণ করা হলো কলোরাডোর ক্রেমলিং-রকি পর্বতমালায় অবস্থিত এক প্রত্যন্ত পশুপালননির্ভর জনপদ। যার আয়তন প্রায় ৪০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে এবং আনুমানিক ২ হাজার মানুষের জন্য তিনি ছিলেন একমাত্র চিকিৎসক। অন্যদিকে সেরিয়ানি কেবল রোগী দেখতেন না, তিনি একই সঙ্গে সার্জন, রেডিওলজিস্ট (নিজ হাতে এক্স-রে ডেভেলপ করতেন), প্রসূতিবিদ এবং জরুরি চিকিৎসক। শহরের দরিদ্র বাসিন্দাদের কাছ থেকে তিনি প্রায়ই পারিশ্রমিক পেতেন পণ্য বিনিময়ে, অনেক সময় কিছুই পেতেন না।
আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন লাইফ ম্যাগাজিনকে একটি প্রতিবেদন করতে বলে, যা সাধারণ চিকিৎসকের ভূমিকা রোমান্টিক করে তুলে ধরা এবং মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের গ্রামীণ চিকিৎসাচর্চার দিকে আকৃষ্ট করবে। প্রায় দুই কোটি পাঠকের কাছে পৌঁছানো লাইফ ছিল এই ‘প্রচার’কে শিল্পে রূপ দেওয়ার আদর্শ মাধ্যম।
এই প্রতিবেদনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আলোকচিত্রী ডব্লিউ ইউজিন স্মিথ তখন জীবনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য যুদ্ধসংবাদদাতা; কিন্তু ১৯৪৫ সালে ওকিনাওয়ায় গোলার শেল-ছররায় গুরুতর আহত হয়ে তাঁর পেশাগত জীবন প্রায় থেমে গিয়েছিল। ‘কান্ট্রি ডক্টর’ ছিল কাজে ফেরার পর তাঁর প্রথম বড় প্রকল্পগুলোর একটি।
স্মিথের কাজের পদ্ধতি ছিল প্রবল ও প্রায় উন্মত্তরকম নিবিড়। তিনি ক্রেমলিংয়ে কাটান টানা ২৩ দিন। ড. সেরিয়ানির ছায়াসঙ্গী হয়ে কাটিয়েছেন সকাল-সন্ধ্যা-রাত। চিকিৎসক ও রোগীদের স্বস্তি দিতে প্রথমদিকে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ক্যামেরায় ফিল্ম না ভরে ঘুরে বেড়াতেন। অনর্থক ক্লিক করতেন। এই কৌশলকে তিনি বলতেন ‘ওয়ালপেপার টেকনিক’। ফলে একসময় তাঁর উপস্থিতি আর চোখে পড়ত না আর তখনই ক্যামেরার খাঁচায় ধারণ করতেন সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত, গভীরভাবে অন্তরঙ্গ ও আবেগঘন মুহূর্তগুলো।
ডকুমেন্টারি আলোকচিত্রে স্মিথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল তাঁর নিজেকে এই অদৃশ্য করে দেওয়ার কৌশল। ড. সেরিয়ানি স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, প্রথম এক সপ্তাহ স্মিথ ক্যামেরায় ফিল্মই ঢোকাননি। তিনি শুধু চিকিৎসকের পিছু নিয়েছেন, অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে শুরু করে শৌচাগার পর্যন্ত, যতক্ষণ না শাটারের শব্দ ঘড়ির টিকটিকের মতোই স্বাভাবিক ও উপেক্ষণীয় হয়ে ওঠে।
এই পদ্ধতিই স্মিথকে এমন সব মুহূর্ত ধরতে দেয়, যা এর আগে ম্যাগাজিন ফটোগ্রাফিতে দেখা যায়নি। অসুরক্ষিত, নগ্ন বাস্তবতার মুহূর্ত।
‘কান্ট্রি ডক্টর’ আলোকপ্রবন্ধে স্মিথ এমন কয়েকটি কৌশল ব্যবহার করেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর স্বাক্ষরধর্মী রীতিতে পরিণত হয়। যেমন তিনি ফ্ল্যাশের কটকটে আলো এড়িয়ে চলেছেন এবং ক্লিনিক ও বাড়ির ম্লান আলো ব্যবহার করেছেন। ফলে আলোকচিত্রে তৈরি হয়েছে একধরনের ‘কিয়ারোস্কুরো’; যা আলো ও অন্ধকারের নাটকীয় সংঘাতের মাধ্যমে আলোকচিত্রগুলোকে দিয়েছে প্রায় গাম্ভীর্য ও কালোত্তীর্ণতা। স্মিথ অপেক্ষা করতেন আবেগের শীর্ষবিন্দুর জন্য, খুঁজে বেড়াতেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত ডিসাইসিভ মোমেন্টটিকে। দীর্ঘ ক্লান্তির পর ডাক্তারের নুয়ে পড়া কাঁধ, কিংবা অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকের একাগ্র দৃষ্টি—সব।
ঘোড়ার লাথিতে আহত এক শিশুর চিকিৎসা, অঙ্গচ্ছেদ, বার্ধক্যে জর্জরিত মানুষের পাশে সান্ত্বনার হাত। জন্ম ও মৃত্যুর উভয় প্রান্তে চিকিৎসকের উপস্থিতি দেখিয়ে স্মিথ ‘কান্ট্রি ডক্টর’কে রূপ দেন একধরনের ধর্মনিরপেক্ষ পুরোহিতে। যিনি সমাজ ও প্রকৃতির নিষ্ঠুর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মধ্যস্থতা করেন।
অন্যদিকে আলোকপ্রবন্ধটি স্মিথ সাজিয়েছেন ধারাবাহিকভাবে। যেমন শুরু করেন দৈনন্দিনতার মধ্য দিয়ে, খেতের মধ্য দিয়ে হাঁটা এবং ধীরে ধীরে পৌঁছে যান জীবন-মৃত্যুর সংকটে কিংবা জরুরি অস্ত্রোপচারে। রাত গভীর হলে নিজের রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছেন ড. সেরিয়ানি, হাতে এক কাপ কফি। চোখ মাটির দিকে নামানো, দেহভঙ্গিতে ভেঙে পড়ার লক্ষণ, টানা ৩০ ঘণ্টার কর্মভার যেন তাঁর শরীরে জমে আছে। এই ওঠানামা চিকিৎসকের জীবনের নিজস্ব ছন্দকেই প্রতিফলিত করে।
রাত দুইটা পর্যন্ত টানা চলা একটি অস্ত্রোপচার শেষ করে ড. সেরিয়ানি ক্লান্ত শরীরে হাসপাতালের রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হাতে এক কাপ কফি, ঠোঁটে একটি সিগারেট। লাইফ ম্যাগাজিন লিখেছিল, ‘নার্সরা তাঁকে বারবার বিশ্রাম নিতে ও একটু ঢিলে হতে বলেন। কিন্তু তাঁরা ভালো করেই জানেন, তিনি তা পারবেন না। সেই কারণেই দিন-রাত সব সময় তাঁর জন্য টাটকা কফিভর্তি একটি পাত্র চুলায় জ্বালিয়ে রাখেন।’
এই ছবিই পুরো প্রবন্ধের আবেগীয় কেন্দ্র। এটি চিকিৎসককে ‘নায়ক’ হিসেবে গড়ে তোলার চিরাচরিত ধারণা ভেঙে দেয় এবং সামনে আনে পেশাগত নিঃসঙ্গতার নগ্ন বাস্তবতা। ক্রেমলিংয়ের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেরিয়ানি ছিলেন শত শত মাইলজুড়ে মানুষের একমাত্র ভরসা। স্মিথ দক্ষতার সঙ্গে ধারণ করেছেন সেই বৈপরীত্য, যে মানুষটি সর্বদা অন্যের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তে পাশে থাকেন, তিনিই আসলে গভীরভাবে একা।
স্মিথের আলোকপ্রবন্ধটি ড. সেরিয়ানিকে জাতীয় প্রতীকে পরিণত করেছিল। তিনি হাজার হাজার চিঠি পান, টিভি ও রেডিও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ আসতে থাকে। প্রচারের ফলে ক্রেমলিং একটি নতুন ১৪ শয্যার হাসপাতালের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। খ্যাতি সত্ত্বেও সেরিয়ানি সারা জীবন ক্রেমলিংয়েই থেকে যান।
অন্যদিকে আলোকপ্রবন্ধে জীবনের পূর্ণচক্রও উপস্থিত। আমরা দেখি, ঘোড়ার লাথিতে আহত এক শিশুর চিকিৎসা, অঙ্গচ্ছেদ, বার্ধক্যে জর্জরিত মানুষের পাশে সান্ত্বনার হাত। জন্ম ও মৃত্যুর উভয় প্রান্তে চিকিৎসকের উপস্থিতি দেখিয়ে স্মিথ ‘কান্ট্রি ডক্টর’কে রূপ দেন একধরনের ধর্মনিরপেক্ষ পুরোহিতে। যিনি সমাজ ও প্রকৃতির নিষ্ঠুর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মধ্যস্থতা করেন।
স্মিথ কেবল মহৎ দিকগুলো আলোকচিত্রে ধারণ করেছেন না হয়, ভেঙে দেওয়া অনেক কিছুও তুলে এনেছেন তাঁর শিল্পমাধ্যমে। যেমন অপারেশনে মা ও নবজাতক উভয়ের মৃত্যুর পর সেরিয়ানি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে। তিনি একজন ডাক্তারকে বীর চিকিৎসক হিসেবে তুলে ধরেন না, বরং মৃত্যুর মতন অতি সাধারণ ঘটনাকে অতি সাধারণভাবে একটি ঘটনায় স্থাপন করেন। ডাক্তার একজন মানুষ, তিনি নিজ সীমাবদ্ধতায় ভেঙে পড়বেন, সেটাই স্বাভাবিক। আবার ক্ষুদ্র হাসপাতালটিতে কোনো লিফট না থাকায় স্মিথ ক্যামেরাবন্দী করেন সেই দৃশ্য, যেখানে সেরিয়ানি বৃদ্ধ থমাস মিচেলকে কোলে করে সিঁড়ি বেয়ে অস্ত্রোপচার কক্ষে নিয়ে যাচ্ছেন।
আলোকপ্রবন্ধটি বিপুল সাফল্য পেলেও স্মিথ নিজে ছিলেন চরম অসন্তুষ্ট। তাঁর বিশ্বাস ছিল যে ছবির বিন্যাসই গল্পের আত্মা। তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কারণ, লাইফ ম্যাগাজিনের সম্পাদকেরা তাঁর তোলা দুই হাজার ছবির মধ্যে মাত্র ২৮টি প্রকাশ করেছিলেন। স্মিথ মনে করতেন, ছবির ক্রমবিন্যাস হওয়া উচিত একটি সংগীত সিম্ফনির মতো। একটি স্পষ্ট সূচনা, একটি চূড়ান্ত শিখর এবং একটি আদর্শ সমাপ্তি। পরবর্তী প্রকল্পগুলোতে সম্পাদকদের সঙ্গে অবিরাম সংঘাতই শেষ পর্যন্ত তাঁকে লাইফ ছেড়ে ম্যাগনাম ফটোস-এ যোগ দিতে বাধ্য করে, যেখানে তিনি বেশি শিল্পস্বাধীনতা পেয়েছিলেন।
স্মিথের আলোকপ্রবন্ধটি ড. সেরিয়ানিকে জাতীয় প্রতীকে পরিণত করেছিল, কিন্তু তাঁর জীবন প্রত্যাশিত পথে বদলায়নি। তিনি হাজার হাজার চিঠি পান, টিভি ও রেডিও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ আসতে থাকে। প্রচারের ফলে ক্রেমলিং একটি নতুন ১৪ শয্যার হাসপাতালের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। খ্যাতি সত্ত্বেও সেরিয়ানি সারা জীবন ক্রেমলিংয়েই থেকে যান। ১৯৮৬ সালে ৬৯ বছর বয়সে অবসর। ৪০ বছর ধরে একই সম্প্রদায়ের সেবা করা থেকে অবসর নেওয়ার দুই বছর পর মৃত্যু।
‘কান্ট্রি ডক্টর’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই ড. সেরিয়ানি রাতারাতি জাতীয় পরিচিতি লাভ করেন। তবু তিনি সারা জীবন ক্রেমলিং ছাড়েননি। অন্যদিকে স্মিথের জন্য এই কাজ প্রতিষ্ঠা করে দেয় ফটোপ্রবন্ধকে এক উচ্চ শিল্পরূপ হিসেবে, যেখানে ছবির বিন্যাস ও ছন্দ একক কোনো ক্যাপশনের চেয়েও গভীর সত্য উন্মোচন করতে সক্ষম।
ডব্লিউ ইউজিন স্মিথের ‘কান্ট্রি ডক্টর’কে প্রায়ই বলা হয় আধুনিক আলোকচিত্র-প্রবন্ধের জন্মক্ষণ। কারণ, এই কাজটি প্রমাণ করে দিয়েছিল, আলোকচিত্র কেবল লেখার ব্যাখ্যা নয়, আলোকচিত্র নিজেই হতে পারে লেখা। কেন এই প্রবন্ধ আজও এত গভীরভাবে প্রভাবশালী, তা বোঝার জন্য আমাদের তাকাতে হয় স্মিথের নির্মাণপ্রক্রিয়ার সূক্ষ্মতা, প্রায় আবেশগ্রস্ত শ্রম এবং এর বিশ্বব্যাপী প্রভাবের দিকে।