অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান
অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

আর্হেন্তিনায় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন

রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বোর্হেসের একটি অগ্রন্থিত লেখা

রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৬১ সালে আর্হেন্তিনায় যে ব্যতিক্রমী আয়োজন হয়েছিল, তার বিস্তৃত পরিসর ও সাংস্কৃতিক অভিঘাত দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় অগোচর রয়ে গেছে। ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর নেতৃত্বে রাষ্ট্রপ্রধান, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও লেখকদের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা সেই মহাযজ্ঞের কেন্দ্রে এসে দাঁড়ান হোর্হে লুইস বোর্হেস—রবীন্দ্রনাথের কবিতা বিষয়ে এক বিরল বক্তৃতা নিয়ে। ‘লা নাসিয়ন’ পত্রিকার প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সেই অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিয়েছেন রাজু আলাউদ্দিন

রবীন্দ্রনাথের বিদেশি শুভাকাঙ্ক্ষী ও অনুরাগীদের মধ্যে আর্হেন্তিনার নেতৃস্থানীয় সাহিত্য সংগঠক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর কথা অনেকেই জানেন। ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আতিথ্যে মাসাধিক কাল বুয়েনস এইরেসে কাটিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত পরস্পরের সংযোগ ও হৃদ্যতার কথাও আজ আর অজানা নয়। রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ মাত্রই জানেন, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরও ওকাম্পো এই বাঙালি লেখকের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী তাঁরই উদ্যোগে আর্হেন্তিনায় ঘটা করে উদ্‌যাপিত হয়েছিল, যে আয়োজনে আর্হেন্তিনার প্রথম সারির বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি সংযুক্ত তো ছিলেনই, এমনকি ভারত ও আর্হেন্তিনার সর্বোচ্চ দুই প্রধান ব্যক্তি যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও রাষ্ট্রপতি ড. আর্তুরো ফ্রন্দিসি পর্যন্ত এই উদ্‌যাপনের নেতৃত্বে যুক্ত হয়েছিলেন। এই উদ্‌যাপন কতটা বড় পরিসরে হয়েছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলার আগে, আমাদের এ–ও মনে পড়বে যে ওকাম্পো কেবল আনুষ্ঠানিকতার জৌলুশ দিয়েই রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে তোলেননি, উপরন্তু তাঁর সম্পাদিত ‘সুর’ (Sur) পত্রিকা এই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যাও প্রকাশ করেছিল। সেই বিশেষ সংখ্যা নিয়ে আলাপের বিষয়টি আমরা আপাতত মুলতবি রাখব ভিন্ন এক আলোচনার স্বার্থে। তা ছাড়া ওই বিশেষ সংখ্যাটির কথা আমরা ইতিমধ্যে কিছুটা জানলেও, উদ্‌যাপনের এই বিরাট আয়োজনটি সম্পর্কে আমাদের তেমন কোনো ধারণা ছিল না। ধারণা না থাকার কারণ এ–সংক্রান্ত তথ্য সেই সময়ের পত্রপত্রিকা ছাড়া রবীন্দ্রনাথের জীবনী—তা সে বাংলায় বা ইংরেজি কিংবা রবীন্দ্রবিষয়ক কোনো গবেষণা গ্রন্থেও উল্লেখিত হতে দেখা যায়নি।

আয়োজনে আর্হেন্তিনার প্রথম সারির বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি সংযুক্ত তো ছিলেনই, এমনকি ভারত ও আর্হেন্তিনার সর্বোচ্চ দুই প্রধান ব্যক্তি যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও রাষ্ট্রপতি ড. আর্তুরো ফ্রন্দিসি পর্যন্ত এই উদ্‌যাপনের নেতৃত্বে যুক্ত হয়েছিলেন।
ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর আয়োজনে বুয়েনস এইরেসে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনের প্রচারপত্র

অথচ এটি ঘটনা হিসেবে যে খুবই নজরে পড়ার মতো ছিল, তার আভাস আমরা পাব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং উদ্‌যাপনকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানমালা সংক্রান্ত আর্হেন্তিনার প্রধান এক দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের দিকে তাকালে। আমরা সেই প্রতিবেদনে চোখ বুলিয়ে নেওয়ার আগে দেখে নেব কারা ছিলেন সেই উদ্‌যাপন কমিটিতে। কমিটি মোট তিনটি ভাগে বিন্যস্ত ছিল। শীর্ষে ছিল ‘সম্মাননা কমিটি’, এরপরই রয়েছে ‘নির্বাহী কমিটি’ আর সবশেষে রয়েছে সাধারণ পরিষদ এবং সেই সাধারণ পরিষদটিও ছিল অসাধারণ ব্যক্তিত্বে পূর্ণ। ‘আন্তর্জাতিক সম্মানিত রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে ছিলেন যথাক্রমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, আর্হেন্তিনার প্রেসিডেন্ট ড. আর্তুরো ফ্রন্দিসি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আদোল্ফো মুহিকা, শিক্ষা ও আইনমন্ত্রী ড. লুইস আর ম্যাককেই, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আলফ্রেদো রোকে বিতোলো, বুয়েনস এইরেস শহরের মেয়র এর্নান হিরাল্ত। তাঁদের পরেই আছে নির্বাহী কমিটি: প্রথমেই আছেন এই কমিটির প্রেসিডেন্ট ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো, ভাইস প্রেসিডেন্ট অস্বাল্দো স্ভানাসিনি, সচিব কার্মেন বাল্দেস, আর আছেন আলফ্রেদো গনসালেস গারানঞ, এদুয়ার্দো গনসালেস লানুছা, সামুয়েল অলিবের ও মার্কোস বিক্তোরিয়া। এ ছাড়া আছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ১৮টি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যেমন আর্হেন্তিনীয় ভাষা একাডেমি, জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থাগার, আর্হেন্তিনীয় ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেসকো, প্রাচ্য-প্রতীচ্য কমিটি, সাধারণ সংস্কৃতি অধিদপ্তর, জাতীয় শিল্প কেন্দ্র, ভাষা ও দর্শন বিভাগ, জাতীয় শিল্প জাদুঘর, বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয়, জাতিসংঘের আর্হেন্তিনীয় সমিতি, আনা এম বেরি, উন্মুক্ত উচ্চ শিক্ষালয়, আর্হেন্তিনীয়-জাপানি সংস্কৃতি সংসদ, পিইএন ক্লাব, প্রাচ্য শিল্প বন্ধু সংসদ, আর্হেন্তিনীয় লেখক সংসদ, যা সংক্ষেপে এসএডিই নামেও পরিচিত এবং আর্হেন্তিনীয় চারুশিল্পী সংসদ। তৎকালীন দেশের সেরা এই প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী বাস্তবায়নে দেশসেরা ৮৫ জন লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীও ছিলেন, যাঁদের অনেকেই আজ কেবল স্প্যানিশভাষী জগতেই নয়, ভাষিক ও ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও পরিচিত। তাঁদের নামগুলো এখানে উল্লেখ করছি অনুক্রমিকভাবে—

রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী বাস্তবায়নে দেশসেরা ৮৫ জন লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীও ছিলেন, যাঁদের অনেকেই আজ কেবল স্প্যানিশভাষী জগতেই নয়, ভাষিক ও ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও পরিচিত।

লেখক ও শিক্ষাবিদ আন্তোনিও আইতা (১৮৯১-১৯৬৬), স্পেনের বিখ্যাত কবি রাফায়েল আলবের্তি (১৯০২-১৯৯৯), যিনি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে চমৎকার একটি কবিতাও লিখেছিলেন। আর্হেন্তিনীয় লেখক, কবি ও ভাস্কর গ্লোরিয়া আলকোর্তা (১৯১৫-২০১২), ক্রিস্তিনা সি এম দে আপারিসিও (?), লেখক-ইতিহাসবিদ হুলিও আরামবুরু (১৮৯৮-১৯৭৪), বিখ্যাত কবি এনরিকে বাঞ্চ (১৮৮৮-১৯৬৮), বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এক্তর বাসালদুয়া (১৮৯৫-১৯৭৬), ভাষাতত্ত্ববিদ, সাহিত্য সমালোচক, অনুবাদক ও অধ্যাপক আনহেল বাত্তিস্তেস্সা (১৯০২-১৯৯৩), প্রাবন্ধিক অনুবাদক হোসে বিয়াংকো (১৯০৮-১৯৮৬), কথাসাহিত্যিক আদোল্ফো বিয়ই কাসারেস (১৯১৪-১৯৯৯), উরুগুয়ের লেখক কার্মেলো এম বোনেৎ (১৮৮৬-১৯৭৭), কার্মেলোর ছেলে অভিনেতা ও নাট্য পরিচালক অস্বাল্দো বোনেৎ (১৯১৮-২০১৩), কথাসাহিত্যিক ও কবি হোর্হে লুইস বোর্হেস (১৮৯৯-১৯৮৬), বোর্হেসের বোন চিত্রশিল্পী নোরা বোর্হেস (১৯০১-১৯৮৯), লেখক ও আইনজীবী বের্নার্দো কানাল ফেইহো (১৮৯৭-১৯৮২), স্থপতি ও ভাস্কর কার্লোস দে লা কার্কোবা (১৯০৩-১৯৭৪), কবি, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আর্তুরো কাপদেবিলা (১৮৮৯-১৯৬৭), সুরকার যন্ত্রশিল্পী হোসে মারিয়া কাস্ত্রো (১৮৯২-১৯৬৪), হোসে মারিয়ার ছোট ভাই সুরকার ও কন্ডাক্টর হুয়ান হোসে কাস্ত্রো (১৮৯৫-১৯৬৮), রাষ্ট্রদূত, আইনবিদ ও অধ্যাপক আর্মান্দো কোক্কা (১৯২৪-২০২০), প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক নিকোলাস কোকারো (১৯২৬-১৯৯৪), সাংবাদিক, কবি ও শিল্প সমালোচক কর্দোবা ইতুরবুরু (১৯০২-১৯৭৭), সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রাবন্ধিক আউগুস্তো রাউল কোর্তাসার (১৯১০-১৯৭৪), নাট্যকার কামিলো দার্তেস (১৮৮৯-১৯৭৪), লেখক, দার্শনিক, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক লেয়ন দুহোবনে (১৮৯৮-১৯৮৪), উরুগুয়ের লেখক, আইনজীবী ও অধ্যাপক কার্লোস আলবের্তো এর্রো (১৯০৩-১৯৬৮), দার্শনিক ও ভারতবিশেষজ্ঞ বিসেন্তে ফাতোনে (১৯০৩-১৯৬২), দার্শনিক ও নৃতত্ত্ববিদ রিসিয়েরি ফ্রন্দ্রিসি (১৯১০-১৯৮৩), প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক কার্মেন গান্দারা (১৯০০-১৯৭৭), ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার সারা গাইয়্যার্দো (১৯৩১-১৯৮৮), অভিনেত্রী দেলিয়া গার্সেস (১৯১৯-২০০১), কবি, সাহিত্য সমালোচক ও অধ্যাপক হুয়ান কার্লোস গিয়ানো (১৯২০-১৯৯০), উচ্চাঙ্গসংগীতের সুরকার আলবের্তো হিনাস্তেরা (১৯১৯-১৯৮৩), কবি ও লেখক আলবের্তো গির্রি (১৯১৯-১৯৯১), রাকেল আর গুবেইয়্যিনি (পরিচয় জানা যায়নি), ইতালিতে জন্ম নেওয়া আর্হেন্তিনীয় সাহিত্য সমালোচক রবের্তো ফের্নান্দো গিউস্তি (১৮৮৭-১৯৭৮), এক্তর ব্লাস গনসালেস (সঠিক পরিচয় জানা যায়নি), রাফায়েল গনসালেস (পরিচয় জানা যায়নি), লেখিকা আদেলা গ্রন্দোনা (১৯১২-?), রোমান ক্যাথলিক প্রিস্ট, লেখক ও অনুবাদক ইউহেনিও গুয়াস্তা (১৯২৭-২০১৩), ঔপন্যাসিক রিকার্দো গুইরাল্দেসের স্ত্রী আদেলিনা দেল কাররিল দে গুইরাল্দেস (১৮৮৯-১৯৬৭), সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ, নাট্য সমালোচক ও নাট্য পরিচালক এদমুন্দো গিবোউর্গ (১৮৯৩-১৯৮৬), কবি ও অধ্যাপক ফের্মিন এস্ত্রেইয়্যা গুতিয়েররেস (১৯০০-১৯৯০), নোবেলজয়ী ফিজিওলজিস্ট বের্নার্দো হোঔসাই (১৮৮৭-১৯৭১), কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক মারিও লান্সেলত্তি (১৯০৯-১৯৮২), বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ও রাষ্ট্রদূত এনরিকে লাররেতা (১৮৭৫-১৯৬১), কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং বোর্হেসের সহলেখিকা লুইসা মের্সেদেস লেবিনসন (১৯০৪-১৯৮৮), আন্তোনিয়েতা সিলবেইরা দে লেনার্সন (পরিচয় জানা যায়নি), বিখ্যাত ‘লোসাদা’ প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা গনসালো লোসাদা (১৮৯৪-১৯৮১), ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত আর্হেন্তিনীয় নাট্য পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা সেসিলিও মাদানেস (১৯২১-২০০০), প্রাবন্ধিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদ ও কূটনীতিবিদ এদুয়োর্দো মায়েইয়্যা (১৯০৩-১৯৮২), শিক্ষাবিদ হুয়ান মান্তোবানি (১৮৯৮-১৯৬১), লেখক, গবেষক ও সাহিত্য সমালোচক ফ্রিইদা স্চুলত্স দে মান্তোবানি (১৯১২-১৯৭৮), কবি, সাংবাদিক ও অনুবাদক কার্লোস মাস্ত্রোনার্দি (১৯০১-১৯৭৬), হোর্হে আ. মিত্রে (পরিচয় জানা যায়নি), স্থপতি ও চিত্রকলার ইতিহাসবিদ মার্তিন নোয়েল (১৮৮৮-১৯৬৩), প্রাবন্ধিক, কবি ও অনুবাদক এইচ এ মুরেনা (১৯২৩-১৯৭৫), কবি, প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক ও চিত্রনাট্যকার পেদ্রো মিগেল অব্লিগাদো (১৮৯২-১৯৬৭), চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, লেখক, স্থপতি ও কূটনীতিবিদ মিগেল ওকামো (১৯২২-১৯১৫), কবি, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পী সিলবিনা ওকাম্পো (১৯০৩-১৯৯৩), কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মারিয়া রোসা অলিবের (১৯৯৮-১৯৭৭), কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মিগেল আলফ্রেদো অলিবেরা (১৯২২-২০০৮), সাহিত্য সমালোচক, সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক হোসে আন্তোনিও ওরিয়া (১৮৯৩-১৯৭০), প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক লুইস দে পাওলা (?-২০০৮), কথাসাহিত্যিক এলবিরা অর্ফি (১৯৩০-২০১৮), কবি হোর্হে পাইতা (১৯৩০-১৯৬০), চিত্রশিল্পী ও চিত্রসমালোচক হুলিও এ পাইরো (১৮৯৯-১৯৭১), কবি, সাহিত্য সমালোচক ও অনুবাদক এনরিকে পেস্সোনি (১৯২৬-১৯৮৯), অভিনেতা ও নাট্যপরিচালক হোর্হে পেত্রাগলিয়া (১৯২৭-২০০৪), হোর্হে পিন্তো (পরিচয় জানা যায়নি), চিকিৎসক ও ফন্দো নাসিয়নাল দে লাস আর্তেসের প্রতিষ্ঠাতা হুয়ান কার্লোস পিনাস্কো (১৯১৫-১৯৯৮), সাহিত্য সমালোচক, অনুবাদক ও অধ্যাপক হাইমে রেস্ত (১৯২৭-১৯৭৯), স্পেনে জন্ম নেওয়া আর্হেন্তিনীয় দার্শনিক ফ্রান্সিস্কো রোমেরো (১৮৯১-১৯৬২), চিত্রশিল্প সমালোচক হোর্হে রোমেরো ব্রেস্ত (১৯০৫-১৯৮৯), কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক সেসার রোসালেস (১৯০৮-১৯৭৩), কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক এর্নেস্তো সাবাতো (১৯১১-২০১১), এইয়্যিনর সালমন (পরিচয় জানা যায়নি), বিখ্যাত সাহিত্য সমালোচক লুইস এমিলিও সোতো (১৯০২-১৯৭০), কবি, সাহিত্য সমালোচক ও প্রাবন্ধিক গিইয়্যের্মো দে তোররে (১৯০০-১৯৭১), রোহেলিও ত্রিস্তানি (পরিচয় জানা যায়নি), কবি হোর্হে বোকোস লেস্কানো (১৯২৪-১৯৮৯), কবি ও ঔপন্যাসিক মারিয়া এলেনা ওয়াল্স (১৯৩০-২০১১), হোর্হে বিইয়্যাল্বা ওয়াল্স (পরিচয় জানা যায়নি) এবং সিনেমা পরিচালক ও প্রযোজক আলবের্তো সাবালিয়া (১৯১১-১৯৮৮)। ৮৫ জনের মধ্যে ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কিন্তু বাকি ৭৫ জনই নিজ নিজ ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে বরেণ্য, তাঁদের কেউ কেউ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তাঁরা হয়তো জন্মশতবার্ষিকীতে সক্রিয় ছিলেন না, তবু তাঁদের অন্তর্ভুক্তি যে উদ্‌যাপনে গুরুত্ব তৈরি করেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

‘লা নাসিয়ন’ পত্রিকার প্রতিবেদনের সঙ্গে ছাপা হওয়া ছবি

ওকাম্পোর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের কারণেই যে এত সব ভিন্ন ভিন্ন পেশার বরেণ্য ব্যক্তিত্ব অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে ওকাম্পো এই উদ্‌যাপনের বিশাল কমিটি গঠনেই থেমে থাকেননি; বরং আবেনিদা লিবের্তাদর হেনেরাল সান মার্তিন ১৯০২-এ অবস্থিত আলংকারিক শিল্পবিষয়ক স্মৃতিশালায় ৯ মে থেকে ৬ জুন, অর্থাৎ এক মাসব্যাপী বক্তৃতার আয়োজন করেছিলেন। মোট আটটি বক্তৃতা দেওয়া হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও চিন্তা সম্পর্কে। ৯ মে ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোকে দিয়েই শুরু হয়েছিল বক্তৃতামালা। তাঁর বিষয় ছিল ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বন্ধুত্বের এক ইতিহাস’। ১২ মে সাহিত্য সমালোচক, অনুবাদক ও অধ্যাপক আনহেল বাস্তিস্তেসসার অভিভাষণের বিষয় ছিল ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা’।

এক মাসব্যাপী বক্তৃতার আয়োজন করেছিলেন। মোট আটটি বক্তৃতা দেওয়া হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও চিন্তা সম্পর্কে। ৯ মে ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোকে দিয়েই শুরু হয়েছিল বক্তৃতামালা।

১৬ মে দার্শনিক, প্রাবন্ধিক ও রাষ্ট্রদূত বিক্তর মাসসু আলোচনা করেন ‘রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তা’ সম্পর্কে। ১৯ মে লেখিকা ফ্রিদা মান্তোবানি ‘কবি ও শিশু’ শিরোনামে আলোচনা করেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। ২৩ মে মার্কোস ভিক্তোরিয়া আলোচনা করেন রবীন্দ্রনাথের ‘সাহিত্য ও জীবন’ নিয়ে। কবি, সাহিত্য সমালোচক ও অনুবাদক এনরিকে পেস্সোনির বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘রবীন্দ্রনাথের নাটক’। ২ জুন অস্বাল্দো স্ভানাসিনি ‘রবীন্দ্রনাথের নীতি ও সৃষ্টি’ শিরোনামে আলোচনা করেন। বক্তৃতামালার শেষ আলোচক ছিলেন হোর্হে লুইস বোর্হেস, ৬ জুন তিনি আলোচনার জন্য বেছে নেন ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতা’। ওকাম্পো, ফ্রিদা, অস্বাল্দো ও বোর্হেস—এই চারজন পরে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক ‘সুর’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যাটিতে আলাদাভাবে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়েও লিখেছিলেন। বোর্হেস লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘ন্যাশনালিজম’ বইটি সম্পর্কে। যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা সম্পর্কে বোর্হেস নিন্দামুখর ছিলেন, বক্তৃতায় তিনি বেছে নিলেন সেই কবিতাকেই। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে সেই বক্তৃতার একটি প্রতিবেদন বেরিয়েছিল ‘লা নাসিয়ন’ পত্রিকায় ৯ জুনে, নিচে সেই প্রতিবেদনটির পূর্ণাঙ্গ অনুবাদটি দেওয়া হলো:

রবীন্দ্রনাথের কবিতা সম্পর্কে বোর্হেস

ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সভাপতিত্বে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদনের শেষ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় আলংকারিক শিল্পবিষয়ক আর্জেন্টিনার জাতীয় স্মৃতিশালার সালোন দোরাদা নামক এক কক্ষে।

লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস মঞ্চে উঠে আলোচনা শুরু করেন এই বলে যে রবীন্দ্রনাথের প্রথম অনুবাদক ইংরেজ কবি ইয়েটসের বদৌলতে ইউরোপে তাঁর পরিচিতি ঘটেছিল, তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে দর্শন, কবিতা ও প্রাচ্য শিল্পের প্রতি কৌতূহল এবং আগ্রহ প্রাচীনকাল থেকেই, যা হেরোডোটাস এবং পরবর্তীকালে অন্যান্য বিখ্যাত লেখকদের চীন, ভারত এবং রহস্যময় ও মোহনীয় প্রাচ্যের অন্যান্য দেশ সম্পর্কে উল্লেখের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়।

‘গীতাঞ্জলি’র লেখকের কবিতাগুলো যে প্রাচীন প্রাচ্য সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত হয়েছিল এবং ইউরোপীয় যে আনুকূল্যের ফলে—যেমন প্রতীকবাদ থেকে—প্রভাব গ্রহণ করেছে, সেই বিষয়ে তিনি জোর দেন। এ ছাড়া তিনি তাওবাদের মতো বিশ্বাসগুলোর ভিত্তিতে গড়ে ওঠা তাঁর গভীর ধর্মীয় অনুভূতি এবং এর দার্শনিক ধারণাও তুলে ধরেন। তাঁর বেড়ে ওঠার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে তার মা–বাবা ব্রাহ্মসমাজ নামে পরিচিত একটি জাতীয় আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, যেটির ঝোঁক ছিল ঐতিহ্যবাহী ধর্মের নবায়নের দিকে। তিনি এ–ও উল্লেখ করেন যে এই আন্দোলন মূর্তিপূজাকে আক্রমণ করার জন্য নেতিবাচক উপাদানগুলো বাদ দিয়ে সেখান থেকে জীবনের জন্য ইতিবাচক জিনিসগুলো গ্রহণ করে। তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন, ‘কিছু কিছু ভারতীয় দেবতার অনেক মাথা এবং বাহু আছে, কিন্তু তাদের মাথাগুলি অদৃশ্য এক ঐক্যের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।’ তিনি এ–ও বলেন, ‘বিভিন্ন ধর্ম আসলে একই ধর্মের নানা দিক এবং সবগুলোই মূলত একই সত্য প্রকাশ করে।’

এরপর তিনি বলেন যে রবীন্দ্রনাথের কাছে ধর্ম এবং কবিতা এক ও অভিন্ন। তিনি ভেরলেনের একটি কবিতা এবং রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার মধ্যে মিল ও নৈকট্যের ওপর জোর দেন, তুলে ধরেন তাদের স্বতন্ত্র সূক্ষ্মতা—যাদের একটি পাপ ও বিস্মৃতিকে ঘনীভূত করে অন্যটি কেন্দ্রীভূত করে হিন্দু আত্মার পরমানন্দের স্মৃতি, যদিও উভয় কবিতাই এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিন্ন অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে রচিত।

এরপর তিনি রবীন্দ্রনাথ ও মেটারলিংকের মধ্যে সাদৃশ্যগুলো তুলে ধরেন এবং রবীন্দ্রনাথের ওপর ফরাসি প্রতীকবাদী ও কয়েকজন ইংরেজ কবির প্রভাবের কথাও বলেন। তিনি চসারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে তিনি সত্যের চেহারা অনেক বেশি দেখেছেন, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন অন্য এক রূপ। আবারও ইয়েটসকে উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেছিলেন ‘রবীন্দ্রনাথ হলেন ভারতের প্রথম সন্ত, যিনি কবিতার আনন্দ বা দেহের আনন্দকে অস্বীকার করেননি’, অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এই বলে তিনি শেষ করেন যে ‘তাঁর কবিতা সর্বেশ্বরবাদ ও তাওবাদের এক মিশ্রণ, বিশ্বের উপাদানগুলোর মিশ্রণ এবং রবীন্দ্রনাথ পড়ার সময় আমরা নিজেদেরকেই খুঁজে পাই এবং মনে হয় যেন আমরা স্বপ্নে নিজেদেরকেই শুনতে পেয়েছি।’

‘বোর্হেসের অপ্রকাশিত বা অগ্রন্থিত’ শীর্ষক গ্রন্থগুলোয় যেসব রচনা আছে তার কোনোটিতেই রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক এই বক্তৃতাটি নেই। বোর্হেস তাৎক্ষণিকভাবে যেসব বক্তৃতা দিয়েছেন, তার প্রায় অনেকগুলোই তাঁর অগ্রন্থিত রচনাবলির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

‘বোর্হেসের অপ্রকাশিত বা অগ্রন্থিত’ শীর্ষক গ্রন্থগুলোয় যেসব রচনা আছে তার কোনোটিতেই রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক এই বক্তৃতাটি নেই। বোর্হেস তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা উপলক্ষে যেসব বক্তৃতা দিয়েছেন, তার প্রায় অনেকগুলোই তাঁর অগ্রন্থিত রচনাবলির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এমনকি তিনি ১৯৬৬ সালে বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ২৫টি লেকচার দিয়েছিলেন, যেগুলো ক্যাসেটে রেকর্ডও করা হয়েছিল, সেই রেকর্ড করা টেপ থেকে শ্রুতলিপিও তৈরি করে নিয়েছিল ছাত্রছাত্রীরা, কিন্তু সেই শ্রুতলিপি ভিন্ন ভিন্ন হাতে তৈরি হওয়ায় একজনের সঙ্গে আরেকজনের মিল খুব একটা ছিল না। অন্যদিকে সেই রেকর্ড আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারপরও সম্পাদক মার্তিন আরিয়াস ও মার্তিন আদিস সেই সব শ্রুতলিপি অনুসরণ করে একটা গ্রহণযোগ্য পাঠ তৈরি করে প্রকাশ করেছিলেন ‘প্রফেসর বোর্হেস’ নামে এক দুর্দান্ত বই। অর্থাৎ বোর্হেস যা কিছু বলেছেন, তার অনেকটাই গ্রন্থিত বা সংকলিত আকারে এখন পাওয়া যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বোর্হেসের এই বক্তৃতার শ্রুতলিপির হদিস আজও স্প্যানিশে পাওয়া যায়নি বা রেকর্ড করা থাকলেও তার শ্রুতলিপি তৈরি হয়নি। কিন্তু ‘লা নাসিয়ন’ পত্রিকার সূত্রে আমরা কেবল জানতে পারছি বোর্হেস এ বিষয়ে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। হয়তো বক্তৃতাটি সংরক্ষিত আছে টেপের ফিতায়, কিন্তু অক্ষরে নয়। তবে—প্রতিবেদনের সূত্রে যেটুকু জানা যাচ্ছে—কৌতুকের ব্যাপার হলো এই যে রবীন্দ্রনাথের কবিতার ব্যাপারে এই বক্তৃতায় তিনি নিন্দুকের ভূমিকা থেকে একবারে প্রায় নিরপেক্ষ এক অবস্থানে চলে এসেছেন। খুব স্তুতি হয়তো নেই, তবে প্রশংসার কিছু পরোক্ষ ধ্বনি আমরা শুনতে পাই যখন তিনি ইয়েটসের রবীন্দ্রবিষয়ক উক্তিগুলো উদ্ধৃত করেন। সন্দেহ নেই যে মরিস মেটারলিংক ও পল ভের্লেনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের যে সম্পর্কটি তিনি চিহ্নিত করেছেন, তা নিঃসন্দেহে বোর্হেসের গভীরভাবে রবীন্দ্রপাঠের ফল এবং তুলনাগুলোও নির্ভুল। তবে একটা ভ্রান্তি আছে: প্রতিবেদক শুরুতেই রবীন্দ্রনাথের প্রথম অনুবাদক হিসেবে ইয়েটসকে উল্লেখ করেছেন—বোর্হেসের উক্তি হিসেবে—তা প্রতিবেদকের শ্রুতিবিভ্রাট বলে মনে হয়। যে বোর্হেস রবীন্দ্রনাথকে এতটা বিশদে ও সতর্ক পাঠের মাধ্যমে তুল্যমূল্যে বিচার করছেন, তিনি ইয়েটসকে রবীন্দ্রনাথের অনুবাদক হিসেবে উল্লেখ করবেন, এটা যুক্তিসংগত বলে মনে হয় না।