তেলের তেলেসমাতি

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার খবর যেদিন শুনলাম, সেদিনই আমার হার্টের বাঁ পাশটা অবশ হয়ে গেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়া মানে গাড়ি চালানোর খরচ বেড়ে যাওয়া। মানে গরিবের হাতি পোষা।

সিদ্ধান্ত নিলাম, গাড়ি বিক্রি করে দেব। অটোরিকশা কিনব। অটোরিকশায় তেল লাগে না। খানিক বাদে অনুধাবন করলাম, তেলের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে বিদ্যুতের হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কা আছে। বাঘের মুখ থেকে পালিয়ে কুমিরের মুখে পড়ার মতো। তেলের বিল থেকে পালিয়ে বিদ্যুতের বিলের সঙ্গে সংসার পাতার কোনো মানে হয় না।

আমার ব্রেন শর্টসার্কিট হয়ে গেল। তার ওপর অটোরিকশা কিনতে গেলে গাড়ি বিক্রি করতে হবে। মানে, চোরের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে নিজের ঘরের চাবি আরেক চোরের হাতে তুলে দেওয়া। অতএব অটোরিকশা বাদ। নতুন সিদ্ধান্ত নিলাম, সাইকেল কিনব?

সাইকেলে তেল লাগে না, বিদ্যুৎ লাগে না। শুধু দুটো পা দিয়ে প্যাডেল ঠেললেই হলো। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় সাইকেল চালানোর কথা ভাবতেই আমার পায়ের আগে বুক কাঁপতে শুরু করল। অটোরিকশা, বাস, গাড়ি, সিএনজি, বাইক—সবাই শহরের রাস্তায় একসঙ্গে এমনভাবে এলোপাতাড়ি ছুটছে, যেন শৈশবের হারানো সম্পত্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার মধ্যে সাইকেল নিয়ে নামা মানে হাঙরভরা নদী সাঁতার কেটে পার হতে যাওয়া।

সাইকেলে তেল লাগে না, বিদ্যুৎ লাগে না। শুধু দুটো পা দিয়ে প্যাডেল ঠেললেই হলো। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় সাইকেল চালানোর কথা ভাবতেই আমার পায়ের আগে বুক কাঁপতে শুরু করল। অটোরিকশা, বাস, গাড়ি, সিএনজি, বাইক—সবাই শহরের রাস্তায় একসঙ্গে এমনভাবে এলোপাতাড়ি ছুটছে, যেন শৈশবের হারানো সম্পত্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার মধ্যে সাইকেল নিয়ে নামা মানে হাঙরভরা নদী সাঁতার কেটে পার হতে যাওয়া।

ফলাফল, সাইকেলও বাদ। ঠিক করলাম, কিছুই করব না। নন্দলাল হব। ‘নন্দ বাড়ির হ’ত না বাহির, কোথা কি ঘটে কি জানি…’

আমিও নন্দলালের আদর্শে ঘরে বসে থাকব। বাড়ির বাইরে যাব না, গাড়ি চালাব না, অটোয় উঠব না, সাইকেলে জীবন দেব না। ঘরে থাকলে অন্তত তেলের দাম আমাকে ধরতে পারবে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—ওয়ার্ক ফ্রম হোম।

প্রথম দিন মনে হলো, জীবন সত্যিই সুন্দর! অফিসে যেতে হচ্ছে না, গাড়িতে তেল লাগছে না, অটোর ভাড়া লাগছে না। বিছানা থেকে চেয়ার—আমার নতুন যাতায়াত মাত্র ১০ সেকেন্ডের।

দ্বিতীয় দিনই বুঝলাম, বিপদ অন্য জায়গায়।

‘বাড়িতেই তো আছ, বাজারটা করে আনো।’

‘বাড়িতে আছ যখন, মেয়েকে ইশকুল থেকে নিয়ে এসো।’

‘তুমি কি খুব ব্যস্ত? লবণ শেষ হয়ে গেছে। দোকানে যাও।’

অফিস থেকে মেসেজ এল, ‘বাসায় বসেই যখন কাজ করছেন, আজ একটু বেশি সময় অনলাইনে থাকবেন। দরকার আছে।’

বুঝলাম, অফিস থেকে পালিয়ে বাড়িতে আসিনি। অফিসই আমাকে অনুসরণ করে বাড়িতে ঢুকে পড়েছে।

শুরু হলো লাগাতার অনলাইন মিটিং। তার মাঝখানে বাজার, বাজার থেকে ফিরে আবার মিটিং, মিটিং শেষে মেইল, মেইল শেষে আরেক মেইল। অফিসে অন্তত কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল। বাড়িতে কাজ শেষ হওয়ার কোনো সময় নেই। ল্যাপটপ বন্ধ করতে গেলেই মেসেজ আসে, ‘একটা ছোট্ট কাজ করতে হবে।’

এই ‘ছোট্ট কাজ’ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতারণা হয়ে আসে।

চতুর্থ দিন ভোরে আর পারলাম না। পণ করলাম, ‘সূয্যিমামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে’। সূর্য ওঠার আগেই আমাকে ঘুম থেকে উঠে পড়তে হবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। অন্ধকার ভোরে জুতা পায়ে দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। শহর তখনো জেগে ওঠেনি। রাস্তায় গাড়ি কম, হর্ন কম, জ্যাম নেই। হাঁটতে হাঁটতে অফিসে চলে গেলাম।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে আমি নিয়মিত হাঁটছি। তাতে নিজের শরীরের তেল ঝরে যাচ্ছে। আর আমি ধীরে ধীরে স্লিম হয়ে যাচ্ছি। স্লিম হয়ে ইদানীং আমাকে দুর্দান্ত সুন্দর দেখাচ্ছে। আপনা রূপে আপনি মুগ্ধ।

এখন আমার জীবন বেশ সহজ। গাড়ি থেকে অটো, অটো থেকে সাইকেল, সাইকেল থেকে নন্দলাল, নন্দলাল থেকে ওয়ার্ক ফ্রম হোম—সব ঘুরে শেষ পর্যন্ত হাঁটা আমার সঙ্গী হয়ে গেল।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমি নিয়মিত হাঁটছি। তাতে নিজের শরীরের তেল ঝরে যাচ্ছে। আর আমি ধীরে ধীরে স্লিম হয়ে যাচ্ছি। স্লিম হয়ে ইদানীং আমাকে দুর্দান্ত সুন্দর দেখাচ্ছে। আপনা রূপে আপনি মুগ্ধ।

আশা করছি, তেলের দাম আরও বাড়বে এবং আমি শিগগিরই জিরো ফিগার লাভ করব। তখন আর জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে ভয় থাকবে না। তখন তো আমি বাতাসে উড়ে যাব।