শিশির ভট্টাচার্যের আঁকা আবুল ফজলের (১ জুলাই ১৯০৩—৪ মে ১৯৮৩) প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
শিশির ভট্টাচার্যের আঁকা আবুল ফজলের (১ জুলাই ১৯০৩—৪ মে ১৯৮৩) প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

মুক্তগদ্য

বুদ্ধির মুক্তির অবিচল পথিক

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের আদর্শকে শুধু লেখায় নয়, জীবনাচরণেও ধারণ করেছিলেন অধ্যাপক আবুল ফজল। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের শতবর্ষের প্রেক্ষাপটে এবং আবুল ফজলের জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর পুত্রের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে একজন নির্ভীক বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদের অন্তরঙ্গ প্রতিকৃতি।

মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও তার ভাবাদর্শ অবলম্বন করে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও শিখা পত্রিকা প্রকাশের শত বছর পূর্ণ হলো ২০২৬ সালে। কুসংস্কার ও কূপমণ্ডূকতায় নিমজ্জিত মুসলিম সমাজের মধ্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ আর বিশেষভাবে স্বাধীন ও যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশে এ প্রয়াসগুলোর গুরুত্ব ও বিশেষত্ব এখানে বিস্তারিত উল্লেখের প্রয়োজন নেই। এ নিয়ে বেশ কিছু পুস্তক ও গবেষণা এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।

যাঁরা বুদ্ধির মুক্তি ও শিখা পত্রিকার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, পরবর্তীকালে তাঁদের অধিকাংশই লেখালেখিতে তেমন সক্রিয় থাকেননি। এই জাগরণের প্রাণপুরুষ আবুল হুসেন রক্ষণশীল সমাজ-কর্তাদের চাপে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়ে পরবর্তীকালে ওকালতিতে মনোনিবেশ করেন। কাজী মোতাহার হোসেন লেখালেখিতে আর তেমনভাবে থাকেননি। মোতাহার হোসেন চৌধুরী অল্প বয়সেই প্রয়াত হন। কাজী আনোয়ারুল কাদীর ও অন্যরাও তেমন সক্রিয় থাকেননি। একমাত্র কাজী আবদুল ওদুদ কলকাতায় থেকে নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ লেখালেখি চালিয়ে গেছেন। বুদ্ধির মুক্তির দুই তরুণ সদস্য ছিলেন আবুল ফজল ও আবদুল কাদির, দুজনেই তখন ছাত্র।

আবুল ফজল
নিবারণহীন জ্ঞানপিপাসা, জানার দুর্নিবার আগ্রহ দ্বারা তিনি জয় করেছিলেন সব প্রতিকূলতা। শুধু জ্ঞানপিপাসার চরিতার্থেই তিনি সন্তুষ্ট থাকেননি, সাহিত্যশিল্পের সৃজনজগতেও হাত বাড়িয়েছেন। এটি স্বাভাবিক যে বুদ্ধির মুক্তির মতাদর্শ তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল, এর চেতনার আলোকবর্তিকাকে তিনি সঞ্চারিত করেছিলেন আশি বছরের জীবনব্যাপী লেখালেখির জগতে যেমন, তেমনই ব্যক্তিগত জীবনাচরণেও।

আবুল ফজল ও আবদুল কাদির পাকিস্তান-পর্বেও লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে আবদুল কাদির ক্রমশ সম্পাদনা ও গবেষণামূলক কাজে অধিক মনোনিবেশ করেন। বুদ্ধির মুক্তির যে অভিপ্রায়, সেই প্রত্যয়ে আজীবন স্থির থেকে পশ্চিমবঙ্গে কাজী আবদুল ওদুদ আর এ বঙ্গে আবুল ফজল লেখনী চালু রেখেছিলেন। পাকিস্তান নামের একটি ধর্মীয় বিভাজনবাদী রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে আবুল ফজল যে ঝুঁকি ও বিপদাশঙ্কার মুখেও একটি উদার প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের পক্ষে লেখনী চালিয়ে গেছেন, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিশ্চয় অপরিসীম। ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করার কথা সে সময় তিনি বারবার বলেছেন, আইয়ুবীয় সামরিক শাসনের মধ্যে মূলত রক্ষণশীল একটি সমাজে বাস করে এমন কথা বলার সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল। ষাট ও সত্তরের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে অধ্যাপক আবুল ফজল ছিলেন অন্যতম প্রতিবাদী কণ্ঠ। আইয়ুব খানের আমলে তাঁর লেখা প্রকাশের কারণে একাধিক পত্রপত্রিকার সংখ্যা বাজেয়াপ্ত হয়েছে। তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন, এমন শঙ্কাও দেখা দিয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্যের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ করেছিলেন, এমন বিরোধিতা সে সময় অকল্পনীয় ছিল।

বাবা হিসেবে তাঁকে যেটুকু দেখেছি সে নিয়ে দু–চার কথা বলবার জন্য কলম ধরা। আবুল ফজল ছিলেন, যাকে ইংরেজি ভাষায় বলে সেলফ-মেড পারসন। নিতান্ত বালক বয়সে গণ্ডগ্রাম থেকে পিতার সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরে এসে বিভিন্ন স্থানে অতি কষ্টকরভাবে জায়গির থেকে মাদ্রাসায় লেখাপড়ার মাধ্যমে তাঁর একাকী সংগ্রামী জীবনের সূচনা। নিবারণহীন জ্ঞানপিপাসা, জানার দুর্নিবার আগ্রহ দ্বারা তিনি জয় করেছিলেন সব প্রতিকূলতা। শুধু জ্ঞানপিপাসার চরিতার্থেই তিনি সন্তুষ্ট থাকেননি, সাহিত্যশিল্পের সৃজনজগতেও হাত বাড়িয়েছেন। এটি স্বাভাবিক যে বুদ্ধির মুক্তির মতাদর্শ তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল, এর চেতনার আলোকবর্তিকাকে তিনি সঞ্চারিত করেছিলেন আশি বছরের জীবনব্যাপী লেখালেখির জগতে যেমন, তেমনই ব্যক্তিগত জীবনাচরণেও।

ধর্মের অন্তঃসারকে তিনি নিয়েছিলেন মানবকল্যাণের একটি পথ হিসেবে। ফলে গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে যেমন পুস্তক রচনা করেছেন, তেমনি বাহাই ধর্ম বিষয়ে নিবন্ধও লিখেছেন। বাবা ছিলেন ধর্মের গূঢ়ার্থের প্রতি আস্থাবান, আচার-সর্বস্বতায় নয়।

বাবার জীবন ছিল ‘প্লেইন লিভিং অ্যান্ড হাই থিঙ্কিং’ মটোতে শক্তভাবে বাঁধা। সারা জীবন তাঁকে দেখেছি সাদা লং ক্লথের পাঞ্জাবি ও পাজামা পরতে। চলাচল অতি অবশ্য না হলেও মূলত পদব্রজে। তাঁর প্রতি অর্পিত দায়িত্ব তিনি শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে পালনে অবিচল ছিলেন, সেই দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনেই হোক, অথবা সত্তরোর্ধ্ব বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের গুরুদায়িত্ব পালন কিংবা সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাবার কাজই হোক। সামান্যতম উপকরণে জীবনধারণের মন্ত্র তিনি পরিবারের সবার মধ্যে সঞ্চারিত করেছিলেন। প্রত্যুষে অন্ধকার থাকতে প্রাতর্ভ্রমণে বের হতেন, সাড়ে ছয়টায় দোতলার সিঁড়িতে তাঁর ফেরার পাদুকাধ্বনি শুনে আমরা ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে উঠতাম। এত বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকা তাঁর নিতান্ত অপছন্দ ছিল। দিনের বাকি সময় তিনি কোনো রকম বিশ্রাম গ্রহণ করতেন না। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সভাসমিতি ছাড়া সর্বক্ষণ বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় অথবা চেয়ারে বসে লিখতেন বা পড়তেন। সব সন্তানকে সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রদানকে তিনি তাঁর প্রধানতম কর্তব্য মনে করেছেন। ওই যুগে, যখন কন্যাসন্তানকে উচ্চশিক্ষা দেওয়ার প্রচলন বিশেষ হয়নি, তখন একমাত্র কন্যাকে আত্মীয়পরিজনহীন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠাতে বাবা সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।

ধর্মের অন্তঃসারকে তিনি নিয়েছিলেন মানবকল্যাণের একটি পথ হিসেবে। ফলে গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে যেমন পুস্তক রচনা করেছেন, তেমনি বাহাই ধর্ম বিষয়ে নিবন্ধও লিখেছেন। বাবা ছিলেন ধর্মের গূঢ়ার্থের প্রতি আস্থাবান, আচার-সর্বস্বতায় নয়।

উপাচার্য নিযুক্ত হয়ে তিনি উপাচার্যের প্রাসাদোপম বাড়িতে থাকেননি, নিজের বাসায় থেকেছেন, একই সরল সাধারণ জীবনই যাপন করেছেন। যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নির্যাসকে তিনি নিজের জীবনে ধারণ করেছিলেন, তা থেকে বিচ্যুত না হওয়ার সাধনা জীবনভর করে গেছেন।

জীবনে শতভাগ সততা রক্ষা করা তাঁর কাছে ছিল সর্বোচ্চ শপথ। দুয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়। স্কুলে ভর্তিকালে তাঁর ছয় সন্তানের প্রত্যেকের আসল বয়স দেওয়া হয়েছে। আমাদের কনিষ্ঠ ভাইকে ভর্তি করে এসে বাবাকে বললাম, ওর বয়স দুই বছর কমিয়ে দিয়েছি, চাকরিক্ষেত্রে সুবিধা হবে। বাবা কিছু বললেন না, পরের দিন স্কুলে গিয়ে ওর সঠিক বয়স দিয়ে এলেন। জানালেন, জ্ঞানার্জনের সূচনা হবে মিথ্যা দিয়ে, এটি তাঁর পক্ষে বরদাশত করা সম্ভব নয়। আমার আগের তিন ভাইবোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, প্রত্যেকের জন্য বাবা মাসে এক শ টাকা পাঠাতেন। আমি গিয়ে ভর্তি হলাম আর্ট কলেজে। দেখলাম, ছবি আঁকার সরঞ্জাম কেনাসহ মাসে অন্তত দেড় শ টাকা লাগে। বাবা আমার আবেদন সরাসরি নাকচ করে দিয়ে লিখলেন, ‘আমি এক শ টাকাই পাঠাতে পারব, বাকি পঞ্চাশ টাকা তুমি টিউশনি বা পার্ট-টাইম কাজ করে জোগাড় করে নিয়ো।’ প্রথম দুই বছর ওভাবেই আমি পড়েছি।

বঙ্গবন্ধুর আমলে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকের শাসন নিয়ে অনেকটাই হতাশ হলেও সপরিবার বঙ্গবন্ধু হত্যার নৃশংসতায় তিনি গভীরভাবে শোকার্ত হয়েছিলেন। সরকারের উপদেষ্টা থাকা অবস্থাতেই ‘মৃতের আত্মহত্যা’ নামে গল্প লিখে প্রতিবাদ করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদের অন্যতম এ গল্প। এটি তাঁর সত্যদর্শী জীবনবীক্ষারই অংশ। উপাচার্য নিযুক্ত হয়ে তিনি উপাচার্যের প্রাসাদোপম বাড়িতে থাকেননি, নিজের বাসায় থেকেছেন, একই সরল সাধারণ জীবনই যাপন করেছেন। যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নির্যাসকে তিনি নিজের জীবনে ধারণ করেছিলেন, তা থেকে বিচ্যুত না হওয়ার সাধনা জীবনভর করে গেছেন।

  • আবুল মনসুর: শিল্পী ও লেখক