অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

লেখক ও উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা

সত্যেন সেনের নৈতিক ও রাজনৈতিক সাহিত্য

বিশ শতকের মধ্যভাগে বাংলা সাহিত্য যখন একদিকে নন্দনতত্ত্বের আত্মমগ্নতায়, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক ও রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের চাপে বিভক্ত, তখন সত্যেন সেন ইতিহাস, বিজ্ঞান ও রাজনীতিকে সাহিত্যের ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক ভিন্ন পথ বেছে নেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য হবে জ্ঞান ও চেতনার বাহন—ক্ষমতাহীন মানুষের হাতে আত্মপরিচয়ের অস্ত্র।

লেখা ছিল সত্যেন সেনের কাছে রাজনৈতিক দায়িত্ব। তিনি কখনোই নিজেকে ‘নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক’ হিসেবে কল্পনা করেননি। তিনি যা–ই লিখতেন, তাঁর লেখার লক্ষ্য ছিল পাঠককে সচেতন নাগরিকে রূপান্তরিত করা। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পরবর্তী সময়ে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন তিনি, যেখানে সংস্কৃতি সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষা হয়ে ওঠে।

সত্যেন সেনের সাহিত্যে নৈতিকতা কোনো বিমূর্ত আদর্শ বা উপদেশমূলক নীতিবাক্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেরই একটি কার্যকর রূপ। তাঁর কাছে নৈতিকতা মানে ব্যক্তিগত সদ্‌গুণ নয়, বরং ইতিহাস, জ্ঞান ও ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের দায়বদ্ধ সম্পর্ক। মসলার যুদ্ধ, আল বেরুনী কিংবা ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা—এই সব রচনায় তিনি দেখিয়েছেন, ইতিহাস বিকৃতি, সাম্প্রদায়িকতা ও বিজ্ঞানবিরোধী চিন্তা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ভুল নয়, নৈতিক অপরাধও।

লেখা ছিল সত্যেন সেনের কাছে রাজনৈতিক দায়িত্ব। তিনি কখনোই নিজেকে ‘নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক’ হিসেবে কল্পনা করেননি। যা–ই লিখতেন, লক্ষ্য ছিল পাঠককে সচেতন নাগরিকে রূপান্তরিত করা। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পরবর্তী সময়ে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

সত্যেন সেনের রাজনৈতিক দর্শনকে কোনো একক তাত্ত্বিক সূত্রে আবদ্ধ করা কঠিন। এটি গড়ে উঠেছে মার্ক্সবাদী ইতিহাসবোধ, বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদ, অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ ও উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক চেতনার সম্মিলনে। তাঁর মার্ক্সবাদী অবস্থান ছিল বিশ্লেষণী, গোঁড়ামুক্ত। তাঁর কাছে মার্ক্সবাদ কোনো চূড়ান্ত মতাদর্শ নয়; বরং সমাজের শ্রেণিকাঠামো, উৎপাদন সম্পর্ক ও ক্ষমতার বিন্যাস বোঝার একটি কার্যকর পদ্ধতি। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু।

বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিতে রাজনৈতিক ইতিহাস

রাজনৈতিক দর্শনের সাহিত্যিক রূপায়ণে সত্যেন সেন সচেতনভাবে ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্যকে বেছে নিয়েছেন। তাঁর কাছে ঔপনিবেশিকতা ছিল শুধু রাজনৈতিক শাসন নয়, বরং জ্ঞান, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর আরোপিত নিয়ন্ত্রণ। এই নিয়ন্ত্রণের ফলে শোষিত মানুষের ইতিহাস মুছে যায় বা বিকৃত হয়, যাকে তিনি ঔপনিবেশিক সমাজের প্রধান সংকট হিসেবে দেখেছেন। তাই তিনি ইতিহাসকে শাসকের নয়, শোষিত মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন করে পাঠ করতে চেয়েছেন। এই লক্ষ্যেই তাঁর সাহিত্যিক প্রকল্পের কেন্দ্রে ছিল ইতিহাস, যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতা।

জেডি বার্নালের ‘সায়েন্স ইন হিস্ট্রি’ অবলম্বনে লেখা ‘ইতিহাস ও বিজ্ঞান’ গ্রন্থে সত্যেন দেখিয়েছেন, ইতিহাসচর্চা যদি যুক্তি, প্রমাণ ও কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়, তবে তা সহজেই শাসকশ্রেণির মতাদর্শে পরিণত হয়। এখানে বিজ্ঞান বলতে তিনি কেবল প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বোঝাননি; বরং সমাজকে বোঝার একটি সামগ্রিক যুক্তিবাদী পদ্ধতির কথা বলেছেন। এই বিজ্ঞানমনস্ক ইতিহাসবোধই তাঁকে ইতিহাস বিকৃতি, অলৌকিক ব্যাখ্যা ও আবেগনির্ভর জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সাহায্য করেছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গির জনপ্রিয় ও গণমুখী প্রকাশ দেখা যায় তাঁর বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রবন্ধধর্মী রচনাগুলোতেও। ‘আমাদের এই পৃথিবী’ গ্রন্থে তিনি প্রকৃতি ও পৃথিবী সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেছেন, যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল কুসংস্কার ও ভয় ভাঙা। সত্যেন সেন বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞানমনস্কতা ছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তি অসম্ভব। এই গ্রন্থে বিজ্ঞান কেবল তথ্য নয়, এটি হয়ে ওঠে গণমানুষের সাংস্কৃতিক রাজনীতির হাতিয়ার।

ইহুদি জাতির পতনের সময়ের জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে রচিত সত্যেন সেনের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘অভিশপ্ত নগরী’, যা তৎকালীন রাজতন্ত্র, পুরোহিততন্ত্র ও সমাজের গভীর দ্বন্দ্ব এবং ধর্মের অন্তঃসারহীনতার বিরুদ্ধে বিবেক এবং যুক্তির বিদ্রোহ তুলে ধরেছে।

‘মসলার যুদ্ধ’ উপন্যাসে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে অর্থনৈতিক লোভ, সামরিক শক্তি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য একত্রে কাজ করে বিশ্বব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

ইহুদি জাতির পতনের সময়ের জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে রচিত সত্যেন সেনের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘অভিশপ্ত নগরী’, যা তৎকালীন রাজতন্ত্র, পুরোহিততন্ত্র ও সমাজের গভীর দ্বন্দ্ব এবং ধর্মের অন্তঃসারহীনতার বিরুদ্ধে বিবেক এবং যুক্তির বিদ্রোহ তুলে ধরেছে। যেখানে নবী ইয়ারমিয়ার প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে মানবপ্রেম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে।

তাঁর ‘পাপের সন্তান’ অভিশপ্ত নগরী উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ড বলা চলে। প্রথম খণ্ডে যে অভিশপ্ত জেরুজালেম নগরীর কথা বলা হয়েছে, দ্বিতীয় খণ্ডে সেই নগরীটি পুনর্গঠনের কাহিনি ফুটে উঠলেও তাকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে মানবপ্রেম। এখানেও সত্যেনকে আমরা আবিষ্কার করি একজন যুক্তিবাদী হিসেবে, মানুষের ইতিহাসের লেখক হিসেবে, কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় ইতিহাসের লেখক হিসেবে নয়।

যুক্তিবাদী দৃষ্টিতে মুসলমান ইতিহাস পাঠ

সত্যেন সেন যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ধর্ম ও পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতির সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ধর্ম যখন ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সীমা অতিক্রম করে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখনই তা শোষণের উপকরণে পরিণত হয়। তবে এই সমালোচনা কখনোই ধর্মবিদ্বেষী নয়; বরং ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিশ্লেষণনির্ভর। ‘আল বেরুনী’ উপন্যাসে তিনি মধ্যযুগীয় ইসলামি জ্ঞানচর্চার ভেতরে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের শক্তিশালী ধারা তুলে ধরেছেন। আল বেরুনীর চরিত্রের মধ্য দিয়ে সত্যেন সেন দেখান, সভ্যতার অগ্রগতি কখনো একক ধর্ম বা জাতির একচেটিয়া সম্পদ নয়; বরং তা গড়ে ওঠে সংলাপ, কৌতূহল ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে। এ উপস্থাপন আধুনিক সাম্প্রদায়িক ইতিহাস বয়ানের সরলীকরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা সত্যেন সেনের রাজনৈতিক দর্শনের একটি মৌলিক স্তম্ভ। আগেও উল্লেখ করেছি, তাঁর কাছে সাম্প্রদায়িকতা ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের একটি কৌশল, যা শোষিত জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত করে শাসনকে সহজ করে। তাই ‘ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা’ গ্রন্থে তিনি মুসলমান জনগোষ্ঠীকে কৃষক, শ্রমিক, সৈনিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করেন, যাঁরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। এভাবে তিনি ইতিহাসকে সাম্প্রদায়িক বিভাজন থেকে উদ্ধার করে শ্রেণি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে পুনঃ স্থাপন করেন।

‘আল বেরুনী’ উপন্যাসে মধ্যযুগীয় ইসলামি জ্ঞানচর্চার ভেতরে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের শক্তিশালী ধারা তুলে ধরেছেন। আল বেরুনীর চরিত্রের মধ্য দিয়ে দেখান, সভ্যতার অগ্রগতি গড়ে ওঠে সংলাপ, কৌতূহল ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে।

সত্যেন সেনের মতে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরও যদি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসচর্চায় ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি বহাল থাকে, তবে মুক্তি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

সত্যেন সেনের রাজনৈতিক অবস্থানের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর ‘ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা’ গ্রন্থে। এখানে সত্যেন সেন পরিকল্পিতভাবে সেই সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চার বিরোধিতা করেন, যা মুসলমান সমাজকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে বন্দী করে দেখে। তিনি দেখান, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মুসলমান জনগোষ্ঠী ছিল সক্রিয়, সংগ্রামী ও শ্রেণিগতভাবে বহুবিধ। এ গ্রন্থ কেবল ইতিহাসের পুনর্লিখন নয়, এটি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক অবস্থান।

একইভাবে ‘মসলার যুদ্ধ’ বা ‘আল বেরুনী’র মতো ঐতিহাসিক উপন্যাসেও সত্যেন সেন ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন, জ্ঞান-দখল এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কাঠামো উন্মোচন করেন। তাঁর ইতিহাসচর্চা কখনোই নিরপেক্ষতার ভান করেনি; বরং সচেতনভাবেই শোষিত মানুষের পক্ষ নিয়েছে। এ পক্ষাবলম্বনই তাঁকে মার্ক্সবাদী মানবতাবাদের ধারায় স্থাপন করে, যেখানে ইতিহাস মানে ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং মানুষের মুক্তির সংগ্রাম।

উদীচী প্রতিষ্ঠায় সত্যেন সেন

সত্যেন সেনের চিন্তা ও কর্মজীবন কেবল লেখালেখির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক দর্শন ও সাহিত্যিক চেতনা বাস্তব সমাজে কার্যকর না হলে তার মূল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি মনে করতেন, রাজনীতি যদি কেবল দলীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে না। সংস্কৃতিই সেই ক্ষেত্র, যেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয় এবং যেখানে চিন্তা ও অনুভূতির পরিবর্তন সম্ভব হয়। এই উপলব্ধি থেকেই উদীচী গড়ে ওঠে একটি গণসংস্কৃতির আন্দোলন হিসেবে। পরবর্তী সময়ে তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত হন রণেশ দাশগুপ্ত ও শহীদুল্লা কায়সারসহ সে সময়ের একঝাঁক তরুণ। যাঁরা অনুজ হলেও স্বয়ং সত্যেন সেন এবং উদীচীর তৈরিতে তাঁদের ভূমিকা রয়েছে।

উদীচীর শিল্প–সতীর্থদের সঙ্গে সত্যেন সেন

উদীচীর মূল আদর্শ অসাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবিকতা ও গণমানুষের পক্ষে অবস্থান। গণসংগীত, গণনাট্য, কবিতা আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক সমাবেশের মাধ্যমে উদীচী সমাজের ভেতরে রাজনৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে যাচ্ছে এখনো। সত্যেন সেনের নেতৃত্বে উদীচী কখনোই কেবল একটি সাংস্কৃতিক ক্লাব হয়ে ওঠেনি, এটি ছিল একটি সংগঠিত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য ছিল মানুষের চেতনার স্তরে পরিবর্তন আনা।

উদীচীর কর্মকাণ্ডে যে ইতিহাসচেতনা ও যুক্তিবাদ দেখা যায়, তার সঙ্গে সত্যেন সেনের সাহিত্য ও প্রবন্ধের ঘনিষ্ঠ সংযোগ রয়েছে। তাঁর লেখায় যে অসাম্প্রদায়িক ও বিজ্ঞানমনস্ক অবস্থান পাওয়া যায়, তা উদীচীর সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে সংগীত, নাটক ও শিল্পকলার মাধ্যমে রূপ লাভ করে। এইভাবে সাহিত্য ও সংগঠন পরস্পরকে শক্তিশালী করেছে।

সত্যেন সেন সংস্কৃতিকে কখনোই নিরপেক্ষ ক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, সংস্কৃতিও ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত—এটি হয় শাসকের পক্ষে দাঁড়ায়, নয়তো শোষিত মানুষের পক্ষে। উদীচীর মাধ্যমে তিনি সচেতনভাবে শোষিত মানুষের পক্ষের সংস্কৃতি নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।

তিনি মনে করতেন, রাজনীতি যদি কেবল দলীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে না। সংস্কৃতিই সেই ক্ষেত্র, যেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয় এবং যেখানে চিন্তা ও অনুভূতির পরিবর্তন সম্ভব হয়।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে উদীচীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দেশভাগ-পরবর্তী সমাজে যখন ধর্মীয় পরিচয় রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়, তখন উদীচী অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে ভিন্ন এক পথের ইঙ্গিত দেয়।

উদীচীর সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত ছিল বিজ্ঞানমনস্কতার প্রশ্ন। উদীচীর বহু কর্মসূচিতেই কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে সংস্কৃতি জ্ঞানের সম্প্রসারণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে, যা সত্যেন সেনের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানেরই সাংগঠনিক রূপ।

উদীচী ছাড়াও সত্যেন সেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংগঠক হিসেবে তিনি নতুন প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে উৎসাহিত করেছেন এবং বহু তরুণ শিল্পী ও কর্মীর চিন্তাজগৎ গঠনে প্রভাব রেখেছেন। তাঁর কাছে রাজনীতি কেবল সংসদ বা রাজপথে সীমাবদ্ধ ছিল না; বই, গান, নাটক এবং দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যেও রাজনীতির উপস্থিতি তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন।

সত্যেন সেনের আরও দিক: শিশুসাহিত্য, সংগীত, নারী ভাবনা

রাজনৈতিক দর্শনের বাইরেও সত্যেন সেনের আরও কিছু অনালোচিত দিক রয়েছে, যা আমাদের প্রায় অজানা। যেমন তাঁর শিশুভাবনা। বিজ্ঞানী আবদুল্লাহ আল-মুতী সত্যেন সেনের বিজ্ঞান ও শিশুভাবনা সম্পর্কে বলেন, ‘জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বইয়ের ভাষা–সম্পর্কিত সমস্যাটি চিরকালের। তবে বলতেই হবে সত্যেন সেনের জন্য এই বইয়ে ব্যবহৃত সহজ, সরল অথচ রসালো ভাষা সম্ভবত স্বভাবজ। “পাতাবাহার” বইয়ের গল্পগুলোতে তাঁর শিশু–কিশোরদের উপযোগী আশ্চর্য মিষ্টি ভাষার পরিচয় পাওয়া যায়। আর পাওয়া যায় শিশু মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর গভীর উপলব্ধির। রূপকথার ধাঁচে লেখা এই গল্পগুলোতে ফ্যান্টাসি আর বাস্তবতার আশ্চর্য মেশামেশি—ঠিক যেমন ঘটে শিশুদের মনে।’

লেখক ও অধিকারকর্মী মালেকা বেগম ২০১৪ সালে সত্যেন সেন সম্পর্কে একটি স্মৃতিচারণা করেছেন। সেই স্মৃতিকথার কিয়দাংশ উপস্থাপন করলে আমরা তাঁর নারীভাবনা সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা পেতে পারি। মালেকা বেগম বলছেন, ‘বইয়ের নাম “রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ”—হাতে নিয়েই চমকে গিয়েছিলাম। রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে বসে লেখা ১৯৫৯ সালে। এর আগে তৈরি করা পাণ্ডুলিপি ছিল ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’। সিপাহি বিপ্লবের ১০০ বছর (১৮৫৭-১৯৫৭) পূর্তিতে লেখা বইটি বেরিয়েছিল ১৯৫৮ সালে। আমার-আমাদের মনে আছে, সেই বছরটা পূর্ব পাকিস্তানে ছিল সেনাশাসন শুরুর বছর। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সিপাহি বিদ্রোহ হলেও পাঠকের হৃদয়ে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান আপনি পরোক্ষে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

সত্যেন সেনের কিছু বইয়ের প্রচ্ছদ

“রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ” বইটির বিষয়ে বলেছেন, এটি কল্পকাহিনী নয়। নারীর মুক্তির কাহিনী কি? নারীর জীবনের রুদ্ধদ্বার কি? প্রেম-চাঞ্চল্য-প্রতীক্ষার অনবদ্য কাহিনী। আপনি নায়কের জবানিতে প্রেমিকাকে বললেন, “তুমি মুক্ত হও”। নায়িকা বললেন, “তোমাকে বাদ দিয়ে আমার স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব নেই”। এই তো চির পুরাতন, চির নতুন, নারীর প্রেম বেষ্টনীর বাঁধন। শুনে নায়কের জবানিতে আপনি ধিক্কার জানালেন, “মানুষ নয়, এ যেন ষোলো আনা মেয়ে”। সমাজকাঠামোতে, সংসার-পরিবারের বেষ্টনীতে মেয়েরা তো মানুষ নয়। সে নিজেও বুঝতে চায় না ষোল আনা “মেয়ে” হওয়ার দোষ কি? “মানুষ” হলেই–বা কী লাভ? পুরুষ তো মানুষ বলেই সমাজ-পরিবার-রাষ্ট্রে স্বীকৃত। তা সে কি “ষোল আনাই পুরুষ নয়?” পুরুষ অহমিকা, আধিপত্য, কি “মানুষ” হওয়ার লক্ষণ? এসব কথা নিয়ে কত না বিরক্ত করেছি আপনাকে। বুঝেছি আপনার আদর্শগত অবস্থান। নারী জাগরণ ও নারী মুক্তির লক্ষ্যে বৈশ্বিক-দেশীয় প্রেক্ষাপটে আপনি আধুনিক মুক্ত মনের দার্শনিক ছিলেন।’

সত্যেন সেন ভালো গাইতেনও। তাঁর সতীর্থ বিপ্লবী জসীম উদ্দিন মন্ডল এক স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন, ‘সত্যেনদার সাথে জেলখানায় এক বছর ছিলাম। সত্যেনদা নিজে গান করতেন। তাঁর গাওয়া অনেক গানের মধ্যে “যাও যাও রাঙ্গিয়ে দিয়ে যাও” গানটি আমার খুব ভালো লাগত। 

সত্যেন সেন শুধু গদ্যসাহিত্যিকই নন, তাঁর রচিত গানওগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। যেমন নারীদের নিয়ে তার গান—মেয়েরা জাগো জাগো/ মেয়েরা জাগো জাগো/ পুরুষের হাতে গড়া শাস্ত্রের বিধানে/ কারাগৃহে নন্দিনী নারী/ মেয়েরা জাগো জাগো/ তোমাদের পদ ভারে কেঁপে যাক ধরণী/ ভেঙে যাক জীর্ণ এ কারা/ মেয়েরা জাগো জাগো/ মেয়েরা জাগো জাগো।

দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে জাতীয় বিভেদ তৈরি যে আমাদের জন্য ক্ষতিকর, তা সত্যেন সে সময়ও উচ্চারণ করে গেছেন—ও যারা দাঙ্গা করে মানুষ মারে/ বুঝে নারে পথের গতি,/ ও যারা দাঙ্গা করে/ সে কি কভু চিন্তা করে/ এটাই আমার দেশের ক্ষতি।

দেশের ভেতরে থাকা বিদেশি এজেন্টগুলো নিয়ে সত্যেন সেন সেই সময়েও সচেতন এবং সোচ্চার ছিলেন। তাঁর গানে এসেছে—ও আমার দেশের ভাইরে আমার মিনতি শোনো শোনো/ শোনোরে ভাই দেশের মানুষ মুখ তুলিয়া চাও/ ঘরের ইন্দুর বাঁধ কাটে ভাই দেখতে কি না পাও।

সত্যেন সেন শুধু লিখতেন না, ভালো গাইতেনও। তাঁর সতীর্থ বিপ্লবী জসীম উদ্দিন মন্ডল এক স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন, ‘সত্যেনদার সাথে জেলখানায় এক বছর ছিলাম। এই এক বছরে অনেক স্মৃতি। সত্যেনদা নিজে গান করতেন। খুব সুন্দর রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। তাঁর গাওয়া অনেক গানের মধ্যে “যাও যাও রাঙ্গিয়ে দিয়ে যাও” গানটি আমার খুব ভালো লাগত। আমার সেলে কেউ ছাড়া পেলে বা অন্য জেলে চলে যাওয়া সময় সত্যেনদা বিদায়ের আয়োজন করতেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সত্যেনদা গান ধরতেন আমরা গলা মেলাতাম। নিরান্দ জেলবন্দী জীবনে শত আনন্দ ও কাজের মধ্য দিয়ে সবাইকে ভুলিয়ে রাখতেন। যারা ভালো করে পড়তে জানত না, তাদের খবরের কাগজ পড়ে শোনাতেন। পড়ার পর ঘটনার ব্যাখ্যা দিতেন। এই সময়ে জেলখানায় বসে সত্যেনদা “গ্রামবাংলার পথে পথে” বইটি লেখেন। এই বই প্রখ্যাত কৃষক নেতা হাতেম আলীকে উৎসর্গ করা হয়েছে। প্রত্যেকটি গল্প লেখার পর আমাদের পড়ে শোনাতেন। মতামত নিতেন সবার। আমাকেও অনেকবার জিজ্ঞাসা করতেন। আমি আমার বোধ ও বুদ্ধি থেকে মতামত দিতাম। তিনি প্রত্যেকের মতামতের গুরুত্ব দিতেন। এ ক্ষেত্রে রণেশদার কথাও বলতে হয়। রণেশদাও লিখতেন। তিনিও প্রত্যেকের মতামত জানতে চাইতেন। মতামতের ভিত্তিতে লেখা পরিবর্তন করতেন। শহীদুল্লা কায়সারও লিখতেন।’

রাজনৈতিক মানবতাবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা, অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসবোধ, ইতিহাসচ্যুতি ও পুনর্দখল, গণতান্ত্রিক জ্ঞানচর্চা, সাংস্কৃতিক রাজনীতি এবং নারীভাবনার মতো অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সত্যেন সেন বক্তব্য রেখেছেন, অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। যার প্রতিটি আলাদাভাবে গবেষণার দাবি রাখে।

ভাষার প্রশ্নেও সত্যেন সেনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট। তাঁর প্রবন্ধ ও সাহিত্যকর্মে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সরল, ব্যাখ্যানির্ভর ও সংলাপমুখী ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি পাঠককে আবেগে উদ্বুদ্ধ করতে চাননি; বরং যুক্তির মাধ্যমে চিন্তা করতে বাধ্য করতে চেয়েছেন। এই ভাষানীতির মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি মৌলিক দিক নিহিত—প্রকৃত পরিবর্তন আসে বোঝাপড়ার মাধ্যমে, অন্ধ আনুগত্যের মাধ্যমে নয়।

একজীবনে সত্যেন সেন

সত্যেন সেনের জন্ম ১৯০৭ সালে, ব্রিটিশ শাসনের এক সুদৃঢ় পর্যায়ে। এ সময় বাংলার সমাজ ছিল বহুমুখী সংকটে আক্রান্ত। একদিকে ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণ, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সূক্ষ্ম কিন্তু ক্রমবর্ধমান রাজনীতি। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এমন এক পরিবেশে, যেখানে শিক্ষা ও সংস্কৃতি একদিকে মুক্তির পথ, অন্যদিকে শাসকের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। এ দ্বন্দ্বই তাঁর মানসগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সত্যেনের কাকা ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য। তাঁর আরেক কাকা মনোমোহন সেন ছিলেন শিশুসাহিত্যিক। পরিবারেই তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়। শিক্ষাজীবনেই সত্যেন ইতিহাসের ভেতরে খুঁজেছেন ক্ষমতার কাঠামো, আর বিজ্ঞানের মধ্যে দেখেছেন যুক্তিবাদ ও মুক্তচিন্তার সম্ভাবনা। পরবর্তী সময়ে ‘ইতিহাস ও বিজ্ঞান’ গ্রন্থে তিনি যে যুক্তি তুলে ধরেন—ইতিহাসচর্চা যদি বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিনির্ভর না হয়, তবে তা সহজেই ক্ষমতাবানদের হাতিয়ার হয়ে উঠতে বাধ্য।

ব্রিটিশ শাসনামলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। এ কারাবাস তাঁর জীবনে কোনো বিচ্ছিন্ন পর্ব নয়; বরং এটি তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্বতার একটি নির্ণায়ক ধাপ। কারাগারে বসেই তিনি উপলব্ধি করেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কীভাবে মতাদর্শ, শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখায় রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যবাদ ও ক্ষমতার প্রতি যে গভীর সন্দেহ ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। কারাবাস-পরবর্তী সময়েও সত্যেন সেন আপসহীন ছিলেন।

দেশভাগের পর পূর্ব বাংলার সামাজিক বাস্তবতা—নতুন রাষ্ট্রের ভেতরে পুরোনো শোষণের পুনর্গঠন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ—তাঁকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এ সময়ে তিনি বুঝতে পারেন, রাজনৈতিক মুক্তি অর্জন করলেই সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি নিশ্চিত হয় না; বরং রাষ্ট্র বদলালেও ইতিহাসচর্চা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভেতরে ঔপনিবেশিক মানসিকতা রয়ে যেতে পারে। এ উপলব্ধিই তাঁকে সাংস্কৃতিক সংগ্রামের দিকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করে।

সত্যেন সেনকে মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁকে কোনো একক পরিচয়ের ভেতরে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন একযোগে ইতিহাসচিন্তক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, বিজ্ঞানমনস্ক বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। তবে এ বহুমাত্রিকতার অন্তরালে একটি সুস্পষ্ট ঐক্য বিদ্যমান—মানুষের মুক্তির প্রশ্ন। তাঁর সব লেখালেখি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এই মুক্তির ধারণাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। এ কারণেই সত্যেন সেনের অবদান কেবল সাহিত্যিক নয়, এটি রাজনৈতিক ও নৈতিকও।

তবে সত্যেন সেনের সীমাবদ্ধতাও আলোচনা করা প্রয়োজন। তাঁর লেখার ভাষা ও শৈলী অনেক সময় অতিরিক্ত ব্যাখ্যানির্ভর ও তত্ত্বনিষ্ঠ বলে সমালোচিত হয়েছে। কিছু পাঠকের কাছে তাঁর রচনা সাহিত্যিক রোমাঞ্চের চেয়ে পাঠ্যপুস্তকীয় মনে হতে পারে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই আসলে তাঁর সাহিত্য দর্শনের ফল। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই আবেগের চেয়ে যুক্তিকে, অলংকারের চেয়ে ব্যাখ্যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই নির্বাচনকে সাহিত্যিক দুর্বলতার বদলে রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবেই দেখা উচিত।

সার্বিকভাবে সত্যেন সেনের অবদান বাংলা সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে গভীর ও স্থায়ী। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সাহিত্য কীভাবে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, সংস্কৃতি কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠতে পারে এবং জ্ঞান কীভাবে মুক্তির হাতিয়ার হতে পারে। বর্তমান বাংলাদেশের পটভূমিতে—যেখানে সাম্প্রদায়িকতা, ইতিহাস বিকৃতি ও বিজ্ঞানবিরোধী প্রবণতা নতুন রূপে ফিরে আসার চেষ্টা করছে, সেখানে সত্যেন সেনের চিন্তা নতুন করে পাঠ করার প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়।

সত্যেন সেন (২৮ মার্চ ১৯০৭—৫ জানুয়ারি ১৯৮১)
কিছু পাঠকের কাছে তাঁর রচনা সাহিত্যিক রোমাঞ্চের চেয়ে পাঠ্যপুস্তকীয় মনে হতে পারে। কিন্তু তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই আবেগের চেয়ে যুক্তিকে, অলংকারের চেয়ে ব্যাখ্যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই নির্বাচনকে সাহিত্যিক দুর্বলতার বদলে রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবেই দেখা উচিত।

এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত ছিল বিজ্ঞানমনস্কতার প্রশ্ন। উদীচীর বহু কর্মসূচিতেই কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে সংস্কৃতি জ্ঞানের সম্প্রসারণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে, যা সত্যেন সেনের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানেরই সাংগঠনিক রূপ।

উদীচী ছাড়াও সত্যেন সেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংগঠক হিসেবে তিনি নতুন প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে উৎসাহিত করেছেন এবং বহু তরুণ শিল্পী ও কর্মীর চিন্তাজগৎ গঠনে প্রভাব রেখেছেন। তাঁর কাছে রাজনীতি কেবল সংসদ বা রাজপথে সীমাবদ্ধ ছিল না; বই, গান, নাটক এবং দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যেও রাজনীতির উপস্থিতি তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন।

সত্যেন সেনকে মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁকে কোনো একক পরিচয়ের ভেতরে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন একযোগে ইতিহাসচিন্তক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, বিজ্ঞানমনস্ক বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। তবে এ বহুমাত্রিকতার অন্তরালে একটি সুস্পষ্ট ঐক্য বিদ্যমান—মানুষের মুক্তির প্রশ্ন। তাঁর সব লেখালেখি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এই মুক্তির ধারণাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। এ কারণেই সত্যেন সেনের অবদান কেবল সাহিত্যিক নয়, এটি রাজনৈতিক ও নৈতিকও।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সত্যেন সেন এমন এক ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে সাহিত্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো নান্দনিক প্রকল্প নয়। তাঁর রচনায় শিল্পের সঙ্গে দায়িত্বের সংযোগ ঘটেছে। ‘মসলার যুদ্ধ’ বা ‘আল বেরুনী’র মতো ঐতিহাসিক উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন, ইতিহাস কীভাবে বর্তমানকে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে ‘ইতিহাস ও বিজ্ঞান’ বা ‘আমাদের এই পৃথিবী’র মতো প্রবন্ধে তিনি সরাসরি যুক্তি ও জ্ঞানের মাধ্যমে পাঠকের চিন্তাজগৎকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। এই দুই ধারার মিলনেই সত্যেন সেনের সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য গড়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক চিন্তাবিদ হিসেবে সত্যেন সেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও শ্রেণিভিত্তিক ইতিহাসবোধ। ‘ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা’ গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, ইতিহাসের বিকৃতি কীভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে শক্তিশালী করে। এই গ্রন্থ আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ, ইতিহাস বিকৃতি ও পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতি এখনো সমাজের একটি বড় সংকট। সত্যেন সেন ইতিহাসকে পুনর্লিখনের মাধ্যমে এই রাজনীতির বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।

সত্যেন সেনের বিজ্ঞানমনস্ক অবস্থানও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এমন এক সমাজে, যেখানে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদকে প্রায়ই ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে আপস করতে বলা হয়, সত্যেন সেন স্পষ্টভাবে যুক্তির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কাছে বিজ্ঞান ছিল মুক্তির ভাষা। এ কারণেই তিনি জ্ঞানকে সহজ করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ প্রয়াস তাঁকে বাংলা সাহিত্যে একজন বিরল বিজ্ঞানমনস্ক লেখকে পরিণত করেছে।

সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে তাঁর ভূমিকা সত্যেন সেনের মূল্যায়নে একটি আলাদা মাত্রা যোগ করে। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, সংস্কৃতি কীভাবে রাজনৈতিক চেতনার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। গান, নাটক ও শিল্পের মাধ্যমে যে গণসংস্কৃতির আন্দোলন তিনি শুরু করেছিলেন, তা আজও সক্রিয়। এটি প্রমাণ করে, তাঁর চিন্তা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তা জীবন্ত সামাজিক অনুশীলনে রূপ পেয়েছিল।

তবে সত্যেন সেনের সীমাবদ্ধতাও আলোচনা করা প্রয়োজন। তাঁর লেখার ভাষা ও শৈলী অনেক সময় অতিরিক্ত ব্যাখ্যানির্ভর ও তত্ত্বনিষ্ঠ বলে সমালোচিত হয়েছে। কিছু পাঠকের কাছে তাঁর রচনা সাহিত্যিক রোমাঞ্চের চেয়ে পাঠ্যপুস্তকীয় মনে হতে পারে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই আসলে তাঁর সাহিত্য দর্শনের ফল। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই আবেগের চেয়ে যুক্তিকে, অলংকারের চেয়ে ব্যাখ্যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই নির্বাচনকে সাহিত্যিক দুর্বলতার বদলে রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবেই দেখা উচিত।

সার্বিকভাবে সত্যেন সেনের অবদান বাংলা সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে গভীর ও স্থায়ী। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সাহিত্য কীভাবে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, সংস্কৃতি কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠতে পারে এবং জ্ঞান কীভাবে মুক্তির হাতিয়ার হতে পারে। বর্তমান বাংলাদেশের পটভূমিতে—যেখানে সাম্প্রদায়িকতা, ইতিহাস বিকৃতি ও বিজ্ঞানবিরোধী প্রবণতা নতুন রূপে ফিরে আসার চেষ্টা করছে, সেখানে সত্যেন সেনের চিন্তা নতুন করে পাঠ করার প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়।