কীর্তিরাজ ম্হাত্রের আাঁকা চিত্রকর্ম অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
কীর্তিরাজ ম্হাত্রের আাঁকা চিত্রকর্ম অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

দাসী জনাবাই কীভাবে হয়ে উঠলেন সন্ত-কবি

জনাবাই এমন এক নারী, যিনি ভক্তি আন্দোলনের গভীরতম স্রোতে দাঁড়িয়ে থাকা এক শক্তিশালী সত্তা। দাসত্বের জীবনে থেকেও কবিতা, ঈশ্বরপ্রেম আর মানবসমতা—এই তিনটিকে তিনি অনুপমভাবে মিলিয়েছেন। জনাবাইয়ের জীবন ও কবিতা নারী, নিম্নবর্ণ ও শোষিত মানুষের আধ্যাত্মিক মুক্তি এবং সামাজিক প্রতিবাদের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে শত শত বছর ধরে জীবন্ত রয়েছে।

জনাবাই (আনুমানিক ১২৯৮–১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ) ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী সন্ত-কবি। বারকারি সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান কবি নামদেবের দাসী হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর অভঙ্গ তথা ভক্তিমূলক গীতিকবিতাগুলো স্বতন্ত্র শক্তি, গভীর ভক্তি ও নারী-অভিজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে আজও মহারাষ্ট্রের ঘরে ঘরে গীত হয়।

জনাবাইয়ের জীবন সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য খুবই কম। যা জানা যায়, তা প্রধানত পরবর্তীকালের ভক্তি-সাহিত্য, নামদেবের জীবনীগ্রন্থ ও তাঁর নিজের অভঙ্গ থেকে। ধরে নেওয়া হয়, ১৩ শতকের শেষ দিকে, সম্ভবত ১২৯৮ সালের কাছাকাছি সময়ে তাঁর আবির্ভাব।

তাঁর জন্মস্থানের নাম গঙ্গাখেদ। সেটি বর্তমান মহারাষ্ট্রের পরভণী জেলায়।

তিনি জাতিতে ছিলেন শূদ্র। বাল্যকালেই তাঁর মা-বাবা মারা যান। বাবা ছিলেন ভিট্টল বা বিঠ্ঠল বা বিঠোবা বা ভিটোবার ভক্ত। এই দেবতা ওই অঞ্চলে বিষ্ণুর অবতার রূপে পূজিত। পাণ্ডরপুরে তাঁর প্রধান মন্দির। মৃত্যুর আগে জনাবাইয়ের পিতা কন্যাকে পাণ্ডরপুরের ভিট্টলের হাতে সমর্পণ করেন।

শৈশবেই, ৭-৮ বছর বয়সে, তিনি পাণ্ডরপুরে সন্ত নামদেবের বাবা দামাশেটির পরিবারে দাসী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি এই পরিবারের একজন সদস্যের মতোই ছিলেন আজীবন। নামদেবের স্ত্রী গোণাই, পুত্র নারায়ণ, কন্যা লিম্বাই—সবার সঙ্গেই তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন ভিট্টলের দাসী।

এই বাড়ির ভেতরেই তিনি প্রথম দেখেন, প্রার্থনা মানে শুধু মন্দির নয়—আঙিনা, মাঠ, রান্নাঘর সবই। তারপর যা ঘটে সেটা সাধারণত সামাজিক ইতিহাসে দেখা যায় না: একজন নারী, তা–ও নিম্নবর্ণের বলে চিহ্নিত, ঘরের কাজকর্ম করতে করতে ভিট্টলকে নিজের কাছের বন্ধুর মতো, স্বামীর মতো, সন্তানের মতো, আবার গুরু বা একান্ত অন্তরের সঙ্গীর মতো ডাকতে থাকেন।

এই দাসী-জীবনের মধ্যেই জন্ম নেয় তাঁর কবিতা।

নামদেবের গৃহে সারা দিন গৃহকর্মীর কাজ করতেন এবং রাতে অভঙ্গ বা গীতিকবিতা রচনা করতেন। জনাবাইয়ের প্রায় ৩৫০টি অভঙ্গ পাওয়া যায়। তাঁর কবিতা সহজ-সরল লোকভাষায় রচিত। তিনি শব্দের আড়ম্বর চান না। তাঁর কবিতায় মিশে থাকে তাঁর শ্রমজীবন আর ভিট্টলের প্রতি একান্ত নিশ্চল প্রেম।

সন্ত নামদেব (১২৭০–১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং সন্ত জনাবাইয়ের সম্পর্ক ছিল ভক্তি-ইতিহাসের এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে সামাজিক স্তরভেদ ভেঙে আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে নামদেব তাঁর গুরু ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত নয়, তবে জনাবাই নিজেই তাঁকে তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু ও প্রভু হিসেবে গণ্য করতেন। তাঁর অভঙ্গগুলিতে তিনি নিজেকে বারবার নামদেবের দাসী বা জনী বলে উল্লেখ করেছেন। নামদেবের সঙ্গে থেকেই তিনি বারকারি ভক্তির পরিবেশ পান এবং ভিট্টলের প্রতি তাঁর ভক্তি আরও গভীর হয়।

নামদেব জনাবাইকে তাঁর সহকর্মী ও একজন প্রকৃত ভক্ত হিসেবে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। নামদেবের কিছু পদেও জনাবাইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। নামদেবের জীবনীকারদের রচনাতেও জনাবাইয়ের ভক্তির বিশেষ স্থান রয়েছে।

জনাবাই নামদেবের জীবদ্দশায় তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। গবেষকেরা মনে করেন, নামদেবের জীবনের প্রথম দিকের কিছু ঘটনা জনাবাইয়ের রচনায় পাওয়া যায়, যা তাঁকে নামদেবের প্রথম দিকের জীবনীকারের মর্যাদা দেয়। জনাবাইয়ের দাসী পরিচয়টি কেবল সামাজিক ছিল না, এটি ছিল ‘দাস্য ভক্তির’ চরম প্রকাশ। তিনি নামদেবের সেবার মাধ্যমে ঈশ্বর ভিট্টলের সেবা করেছেন এবং নামদেবের সংস্পর্শে এসেই সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক উচ্চতা অর্জন করেছেন।

‘ভিথাল নাম’, কীর্তিরাজ ম্হাত্রে, ২০১৯
আধুনিক যুগে জনাবাইকে নারী অধিকার, দলিত চেতনা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আধ্যাত্মিকতার একজন অগ্রদূত হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। মহারাষ্ট্র থেকে শুরু করে গোটা ভারতের তথা সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মুক্তির সংগ্রামে জনাবাই একটি উজ্জ্বল মশালবাহী হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে রইবেন।

জনাবাইয়ের প্রায়োগিক দর্শন সরল কিন্তু গভীর তৎপর্যবহ। দাসীবৃত্তিই তাঁর সাধনা, আর শ্রমই তাঁর ধ্যান। তিনি ঈশ্বরকে বাইরে খুঁজে বেড়ান না। ঘর পরিষ্কার করা, শস্য কুটে রাখা, দুধ দোয়া, বা জল আনা—এসবের মধ্যেই তিনি ভিট্টলকে দেখেন। ভিট্টল তাঁর কাছে দেবতা নন—আপনজন। এমনই আপন, যে তাঁকে নিয়ে তিনি রাগ করেন, হাসেন, খুনসুটি করেন, অভিমান করেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, রান্না করতে করতে, মাটি বাছতে বাছতেই ভগবানকে পাওয়া যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম সাহসী ভাবনা। কর্মযোগ ও ভক্তিযোগের অপূর্ব মিলন ছিল তাঁর এই দার্শনিকতায়।

মহারাষ্ট্রের ভক্তি আন্দোলন, বিশেষত বারকারি (Warkari) সম্প্রদায়, ঐতিহাসিকভাবে নারী সাধক-কবিদের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছে। বারকারি সম্প্রদায়ে অনেক প্রখ্যাত নারী সাধক ছিলেন, যারা সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে এসেছিলেন: মুক্তাবাই (সন্ত জ্ঞানেশ্বরের বোন, ব্রাহ্মণ), সয়রাবাই (চোখামেলার স্ত্রী, অস্পৃশ্য মহার জাতি), নির্মলা (চোখামেলার বোন, অস্পৃশ্য মহার জাতি), কানহোপাত্রা (দেবদাসী), বাহিনাবাই (ব্রাহ্মণ, ১৬০০-এর দশকে)। জনাবাই ছিলেন এই ধারার অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি, যিনি নিজের নিম্ন জাতি এবং দাসী পরিচয়কে ভক্তির পথে বাধা হতে দেননি।

বারকারি নারী সন্তরা তাঁদের অভঙ্গের মাধ্যমে সমাজে প্রচলিত লিঙ্গবৈষম্য, বর্ণবৈষম্য ও পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নম্র অথচ দৃঢ় প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পুরুষ সন্তদের অনেকেই গৃহত্যাগ করে বৈরাগ্য নিয়েছিলেন। কিন্তু জনাবাই, সয়রাবাই বা বাহিনাবাইয়ের মতো নারীরা গৃহকর্ম (রান্না, বাসন মাজা, সন্তান পালন) ত্যাগ করেননি বরং এই দৈনন্দিন শ্রমের মধ্যেই ঈশ্বরের উপাসনা খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা প্রমাণ করেছেন—মুক্তির জন্য ঘর ছাড়ার প্রয়োজন নেই, বরং ঘরের কাজই ঈশ্বরসেবা হতে পারে।

জনাবাই-ই প্রথম নারী, কবিদের মধ্যে একজন যিনি তাঁর শারীরিক শ্রমকে (যেমন ঝাঁটা দেওয়া, রান্না করা, কাপড় কাচা) আধ্যাত্মিক উপলব্ধির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

ভক্তি তাঁদের ব্যক্তিগত আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও কষ্ট প্রকাশ করার একটি নিরাপদ স্থান জুগিয়েছিল। তাঁরা ভিট্টলকে নিজেদের ‘সখা’, ‘স্বামী’ বা ‘মা’র মতো আপন করে ডেকেছেন, যা সেই সময়ের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের জন্য এক নতুন স্বাধীনতার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।

বারকারি আন্দোলন শুরু থেকেই সাম্য ও মানবিকতার পক্ষে ছিল। এটি উচ্চবর্ণের মুক্তাবাই থেকে শুরু করে অস্পৃশ্য সয়রাবাই বা দাসী জনাবাই—সবার জন্য সমান আধ্যাত্মিক পথ খুলে দিয়েছিল। ভক্তির মাধ্যমে তাঁরা বর্ণাশ্রম প্রথাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বারকারি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী তীর্থযাত্রায় (ওয়ারি) নারীরা প্রথম থেকেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন, যা তাঁদের সামাজিক মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে তুলে ধরে। জনাবাইও এতে অংশ নিতেন। এই ঐতিহ্য আজও মহারাষ্ট্রে বিদ্যমান।

বারকারি ঐতিহ্য নারীদের, বিশেষত নিম্ন বর্ণের ও নিপীড়িত নারীদের জন্য, আধ্যাত্মিক মুক্তি ও সামাজিক প্রতিবাদের এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম প্রদান করেছিল। জনাবাই সেই ঐতিহ্যের মূর্ত প্রতীক, যিনি নিজের জীবন দিয়েই প্রমাণ করেছেন যে ভক্তি কোনো সামাজিক বা শিক্ষাগত পটভূমির ওপর নির্ভরশীল নয়।

জনাবাই কখনো বিয়ে করেননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নামদেবের গৃহে দাসীর কাজ করেছেন এবং অভঙ্গ রচনা করেছেন। তাঁর মৃত্যুর তারিখও সঠিক জানা যায় না। মহারাষ্ট্রে প্রচলিত আছে, তিনি ১৩৫০ সালের দিকে ৫২ বছর বয়সে ভিট্টলের কাছে সমাধি নেন।

জনাবাই ভক্তি আন্দোলনের এক দুর্দান্ত সুর। কবিতা, শ্রম, নারীত্ব, ঈশ্বরপ্রেম—সব মিলিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, আধ্যাত্মিকতা শুধুই পাহাড়ে, অরণ্যে বা গুহায় হয় না, ঘরের কোণেও হয়। বিশেষ করে নিপীড়িত নারীর স্বরকে তিনি প্রথমবার নিজস্ব ভঙ্গিতে আধ্যাত্মিক সাহিত্যে জায়গা করে দেন।

মহারাষ্ট্রে জনাবাই আজও গৃহিণী নারীদের আরাধ্য। তাঁর অভঙ্গ নারী-কীর্তন দলে গীত হয়। সমাজের নিম্নতম স্তরের একজন দাসী কীভাবে সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে, তিনি তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। তিনি প্রমাণ করেছেন, ঝাঁটা হাতেও মুক্তি পাওয়া যায়, আর ভিট্টলের স্মরণ নিয়ে করা গৃহকর্মই হতে পারে সর্বোচ্চ ধ্যান।

আধুনিক যুগে জনাবাইকে নারী অধিকার, দলিত চেতনা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আধ্যাত্মিকতার একজন অগ্রদূত হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। মহারাষ্ট্র থেকে শুরু করে গোটা ভারতের তথা সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মুক্তির সংগ্রামে জনাবাই একটি উজ্জ্বল মশালবাহী হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে রইবেন।

ঘরের কোণে বসে,একগুচ্ছ চাল হাতে নিয়ে ভাবলামএই একেকটা দানা,আমার প্রতিটি ভুলের মতোই ছোট এবং ক্ষমাযোগ্য।

জ না বা ই য়ে র ক বি তা


আমি ভাটির মেয়ে, কাজই আমার ধর্ম।
চাল বাছতে বাছতেই দেখি,
ভিটোবার আলো দানার ভিতর থেকে ঝলকে ওঠে।


ভিটে ঝাড়তে ঝাড়তে ভাবি,
আজ তার পথটা একটু বেশি উজ্জ্বল হোক।
যদি কখনো আসে, যেন কাঁটা না লাগে পায়ে।


আমি দাসী, কিন্তু আমার মন মুক্ত।
যেখানে যাই, ভিটোবা সঙ্গেই থাকে।
আমার নিশ্বাসে তার নাম।


যখন কাপড় ধুই, সে জল হয়ে আমাকে ছুঁয়ে যায়।
কলস ফেটে গেলেও, আমার বিশ্বাস ফাটে না।


রান্নাঘরের ধোঁয়ার ভিতরেও
তার মুখটা দেখি,
যেন ধোঁয়া সরলেই হাসি দেখা যায়।


সবাই আমাকে বলে তুচ্ছ।
কিন্তু ভিটোবা জানে,
আমার ঠোঁটে যে ডাক ওঠে, তার দাম আছে।


আজ চালভান্ডার খালি,
তবু মনে হচ্ছে ভরপুর,
কারণ সে আছে।


আমি ঘুমোতে যাই, সে বসে থাকে মাথার কাছে।
স্বপ্নে দুজনে গৃহস্থালির কথা বলি।


আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, সুখ কী?
আমি বলি,
ভগবান হাত বাড়ালে তার ওপর মাথা রাখা।

১০
জল তুলতে তুলতে হাত ক্লান্ত হয়,
কিন্তু নাম জপ করতে করতে মন ক্লান্ত হয় না।

১১
অনেকে বলে আমি তুচ্ছ দাসী,
কিন্তু তিনি কখনো তা বলেন না।
তিনি শুধু শোনেন।

১২
আজ আঙিনায় বসে ছিলাম।
হাওয়া এসে বলল,
ভিটোবা তোমার কথা ভাবছে।

১৩
আমি নদীর জলে যেমন নিজের মুখ দেখি,
তেমনি তার চোখে দেখি আমার প্রকৃত রূপ।

১৪
আমি জানি না শাস্ত্র, মন্ত্র বা বেদ,
আমার জানা শুধু এই:
তার নাম ডাকলে মন শান্ত হয়।

১৫
সবাই যখন গালাগাল করে,
আমি নীরব থাকি।
নীরবতার ভিতরেও সে থাকে।

১৬
একদিন ঝাঁটা ফেললাম ক্লান্তিতে
ভিটোবা এসে বলল,
জনাবাই, আজ বিশ্রাম নাও।

১৭
রাঁধছি যখন, হাঁড়ির ভিতরে ডাল ফুটছে,
ওই ফুটন্ত শব্দে শুনি মৃদু সংগীত।

১৮
বাড়ির মালকিন রাগ করলে
আমি শুধু মনে মনে বলি,
‘হে ভিটোবা, তুমিই তো আমার আশ্রয়।’

১৯
কোনো দিন যদি দুঃখ লাগে,
আমি গোপনে গিয়ে বলি,
দেখো, আজ মন ভারী।
নিশ্চয়ই সে শোনে।

২০
নিজেকে কখনো সুন্দর মনে হয়নি।
কিন্তু তার কাছে আমি যথেষ্ট,
এটা জানলে সব ক্ষত সেরে যায়।

২১
কেউ কেউ আমাকে দেখে হাসে।
আমি ভাবি,
তারা কি জানে, ভগবান আমার পাশে হাঁটে!

২২
ঝোলানো কাপড়ের ছায়ায় দাঁড়িয়ে
আমি তার নাম বললাম।
কাপড়গুলো বাতাসে দুলে উঠল
মনে হলো সে সাড়া দিল।

২৩
যেদিন সূর্য ওঠে না মনেতে,
আমি হাঁটতে হাঁটতে তাকে ডাকি।
সূর্যের চেয়ে দ্রুত আলো ফিরে আসে।

২৪
একদিন থালা ধুতেই
হঠাৎ মনে হলো
যেন তিনি থালা হাতে নিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে।

২৫
কেউ যদি জিজ্ঞেস করে—
তুমি কী চাও?
আমি বলি,
তার কাছে জায়গা। আর কিছু না।

২৬
কখনো মনে হয়,
আমি তাকে খুঁজি না,
সে-ই আমাকে খুঁজে নেয়।

২৭
ঘরের কোণে বসে,
একগুচ্ছ চাল হাতে নিয়ে ভাবলাম
এই একেকটা দানা,
আমার প্রতিটি ভুলের মতোই ছোট এবং ক্ষমাযোগ্য।

২৮
আমি রাগ করি কম,
কারণ রাগ করলে মনে হয়
সে দূরে সরে যায়।

২৯
আজ খুব ব্যথা পেয়েছি,
তবু হাসলাম।
কারণ জানি
ভগবান দুঃখের ভেতর দিয়েই
আমাকে ছুঁয়ে যায়।

৩০
আমি দুঃখ ঢাকতে পারি না।
তাই দুঃখও ভিটোবার কাছে সোজা পৌঁছে যায়।

কেউ কেউ আমাকে বলেছে,‘দেবতার সঙ্গে এত প্রেম?’আমি বলেছি,‘তিনি-ই তো আমাকে বেছে নিয়েছেন।’

৩১
আঁধার রাতে,
বাড়ির সবাই ঘুমোলে
আমি নিঃশব্দে বলি,
‘তুমি কি জেগে আছ?’
মনে হয় সে জবাব দেয়—
‘সব সময়।’

৩২
আমি নিজের ভাগ্যকে দোষ দিই না।
কারণ যদি অন্য কোথাও জন্মাতাম,
তবে কি তাকে এত কাছে পেতাম?

৩৩
নামদেবের বাড়িতে কাজ করতে করতে
আমি বুঝেছি
সাধনা দূরের পাহাড়ে নয়,
এই ঘরেই।

৩৪
আজ ঝাঁটা দিতে দিতে
এমন মায়া লাগল
মনে হলো সে আমার হাত ধরে আছে।

৩৫
শরীরের ক্লান্তি আমি মানি।
মন ক্লান্ত হলে শুধু বলি,
‘ভিটোবা, একটু শক্তি দাও।’
শক্তি আসে,
ঠিক যেমন ভোর আসে।

৩৬
আমি একদিন বলেছিলাম,
‘তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?
মনে হলো সে হাসল।
হাসিতে আশ্বাস ছিল।

৩৭
জীবনের বোঝা আমি একা বই না।
মনে হয় সে কাঁধে কাঁধ রেখে চলে।

৩৮
আকাশের দিকে তাকালে
কেন জানি মনে হয়
তার চোখ দুটো ঠিক ওইখানেই লুকানো।

৩৯
আজ খুব ঠান্ডা হাওয়া।
আমি ওড়না গায়ে দিলাম।
মনে হলো তিনি নিজেই আমাকে ঢেকে দিলেন।

৪০
আমি দাসী কি না তা অন্যেরা নির্ধারণ করুক।
আমার কাছে আমি শুধু একটিই,
ভিটোবার মানুষ।

৪১
থালা সাজাতে সাজাতে
আমি নাম জপ করছিলাম।
হঠাৎ মনে হলো
থালার চকচকে রূপে
তার মুখই ফুটে আছে।

৪২
কেউ কেউ বলে,
ভগবানের দরজা সহজে খোলে না।
আমি শুধু হাসি
আমি তো দরজা খুঁজিই না।
সে নিজেই এসে পাশে বসে।

৪৩
রাতে হাঁসফাঁস লাগে।
আমি চোখ বুজে ভাবি
তার দুই হাত আমার মাথায়।
ঘুম নেমে আসে শিশুর মতো।

৪৪
আমি তুলো কাটি, সুই গেঁথে কাজ করি।
এই সুইয়ের ফোঁটায়
যেভাবে সুতো যায়,
সেভাবেই আমার হৃদয়
তার প্রেমে গেঁথে যায়।

৪৫
কেউ কেউ রোজ পুজো করে।
আমি রোজ কাজ করি।
সে দেখে কাকে বেশি পছন্দ করে
তা আমি জিজ্ঞেস করি না।
শুধু ডাকি।

৪৬
আমি কখনো জানতাম না
মন এতটা গভীর।
ভিটোবার নামে ডুব দিলে
দিনের ক্লান্তি ভেসে যায়।

৪৭
সবাই বলে
দেবতা দূরে থাকে।
আমি জানি, আমার দেবতা
ভাঙা চৌকির ওপরও বসেন।

৪৮
আমার ভুল হলে
আমি মাথা নিচু করি।
মনে হয় সে মাথায় হাত রাখে,
‘চল, আবার শুরু করি।’

৪৯
আমি জানি না স্বর্গ কোথায়।
কিন্তু যখন তার নাম নিই,
মনে হয় স্বর্গ একটু নেমে আসে।

৫০
ভর সন্ধ্যায়
জোনাকি জ্বলে উঠলে মনে হয়
যেন তার আলোর ক্ষুদ্র বার্তা।

৫১
বাড়ির বাগানে ফুল ফুটেছে।
ফুলের গন্ধে বুঝি,
সে–ও এসেছে একটু কাছে।

৫২
আমি যদি কখনো অহংকার করি,
জানি সে অসহ্য হয়।
তাই অহংকার নামিয়ে রাখি
তার দরজায়।

৫৩
একদিন কান্না আটকে রাখিনি।
কান্না ঝরতেই মনে হলো
বুকটা খালি হয়ে গেল
আর সেই খালি জায়গায়
সে এসে বসল।

৫৪
কেউ কেউ আমাকে বলেছে,
‘দেবতার সঙ্গে এত প্রেম?’
আমি বলেছি,
‘তিনি-ই তো আমাকে বেছে নিয়েছেন।’

৫৫
আমি নিজের দুঃখের কথা
তার কাছে বলি নিঃশব্দে।
সে শোনে নাকি শোনে না, জানি না
তবে মন হালকা হয়।

৫৬
আজ হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম—
এই পৃথিবীই যদি তার মন্দির হয়,
তবে আমি প্রতিদিন মন্দিরেই কাজ করি।

৫৭
রাতে আমি ঘুমোতেই চাই,
কিন্তু ভিটোবা এসে বলে—
‘এই সব কাজ আমাকে দে,
তুই শুধু আমার নাম বল।’

৫৮
ঘর ঝাড়ি, উঠোন ধুই,
তারপর দেখি—ভিটোবা মাটির কণা হয়ে
আমার আঙুলে আটকে আছে।
তাকে ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার কী আছে?

৫৯
দাসী বলে ডাকো, তাতে কী?
ভিটোবা আমার স্বজন,
যার কাছে আমার ক্লান্তি বলি,
যার কাছে আমার গান গাই।

৬০
আমার গান, আমার কাজ,
আমার ঘাম, আমার ভুল
সবই তার কাছে রাখা।
এটাই আমার ভক্তি।