
পদার্থবিদদের মধ্যে যাঁরা চিত্রকর্ম ভালোবাসেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে ভেবেছেন। যত সময় যাচ্ছে, ততই তাঁরা পদার্থবিজ্ঞানের আলোকে তাঁর শিল্পকর্মকে দেখার চেষ্টা করেও কোনো মীমাংসায় পৌঁছাতে পারছেন না। কেউ কেউ বলছেন, ভ্যান গঘ চিত্রশিল্পীর চেয়ে সম্ভবত বেশি বিজ্ঞানী, তবে ‘উন্মাদ বিজ্ঞানী’।
এ রকম ভাবার কারণ, তাঁর ‘দ্য স্টারি নাইট’ চিত্রকর্ম। সম্প্রতি এ চিত্রকর্মের সঙ্গে টার্বুলেন্সের গাণিতিক মডেলের সংযোগ বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
রিয়া নায়ারের একটি লেখা ২০২৪ সালের অক্টোবরে জিএমএএসব্লগ ডটকমে প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, পদার্থবিদেরা এখনো ভ্যান গঘের এ চিত্রকর্মের বিষয় নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করছেন। এ লেখায় বলা হয়েছে, ‘পদার্থবিজ্ঞানের পরিভাষায় টার্বুলেন্স হলো, “আকাশে বাতাসের অস্থিরতা”। যখন বাতাস তার স্বাভাবিক ও মসৃণ প্রবাহ হারিয়ে দ্রুত দিক ও গতি পরিবর্তন করে, তখন তাকে টার্বুলেন্স বলে।
‘তাই পদার্থবিজ্ঞানে টার্বুলেন্স গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অমীমাংসিত। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ বিংশ শতাব্দীতে ম্যাট্রিক্স মেকানিকস আবিষ্কার করেন, যা কোয়ান্টাম মেকানিকসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ। মৃত্যুশয্যায় তিনি বলেছিলেন, “ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা হলে দুটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইব। একটি, আপেক্ষিকতা কেন? অন্যটি, টার্বুলেন্স বা আলোড়ন কেন? প্রথমটির উত্তর পাওয়া গেলেও দ্বিতীয়টির উত্তর পাওয়া যাবে কি না, আমি জানি না।”’
বিজ্ঞানীরা জানান, ভ্যান গঘের চিত্রকর্মে ব্যবহৃত ব্রাশ স্ট্রোক ও রংগুলোর সূক্ষ্ম বিবরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চিত্রকর্মের উপাদানগুলো বায়ুমণ্ডলে গ্যাসের ‘লুকানো টার্বুলেন্স’-এর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে মিলে যায়। বিজ্ঞানীরা জানান, আন্দ্রেই কোলমোগোরভ একজন রুশ বিজ্ঞানী। তাঁর মূল থিওরি ছিল, বড় ঘূর্ণি থেকে মাঝারি ঘূর্ণি এবং তার চেয়ে ছোট ঘূর্ণির বণ্টন একটা নির্দিষ্ট অনুপাতে ঘটে। বায়ুমণ্ডলীয় ব্যবস্থায় ভ্যান গঘের ‘দ্য স্টারি নাইট’ এ নিয়ম মেনেই সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ভ্যান গঘের এ চিত্রকর্ম কোলমোগোরভের দেওয়া থিওরির চেয়ে বায়ান্নো বছরের পুরোনো।
তো এই বিষয়টি, মানে টার্বুলেন্সকে নাকি ভ্যান গঘ তাঁর ‘দ্য স্টারি নাইট’ চিত্রকর্মে সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন।
আমরা পদার্থবিদদের আলোচনায় পরে যাব; তার আগে দেখি, কী আছে ‘দ্য স্টারি নাইট’–এ। চিত্রকর্মটিতে দেখা যায়, নীল ঘূর্ণায়মান তারাভরা রাতের আকাশ। অসীমে আবর্তিত চারপাশ। হলুদ একফালি চাঁদ। একটি বা দুই–তিনটি সাইপ্রেস গাছ। তাদের ডালপালাগুলো আংশিকভাবে দুলে চলেছে আকাশের গতি-হাওয়ার সঙ্গে। এসবের নিচে, অনেক নিচে একটি গ্রাম। অতি ছোট ছোট ঘর এবং একটি গির্জা। সেই গির্জার সরু মিনারটি যেন ঢেউ খেলানো একটা নীল পাহাড়ের মধ্যে উজ্জ্বল। উজ্জ্বল হলুদ আলো গ্রাম থেকে যেন স্বাগত জানাচ্ছে। আর সব মিলিয়ে যেন কোথাও একটা আলোড়ন বয়ে যাচ্ছে, কোথাও যেন একটু অনিশ্চয়তা বয়ে যাচ্ছে। আবার শান্ত কোণও মনে হয়। মূলত এ-ই হচ্ছে অল্প কথায় ‘দ্য স্টারি নাইট’। ক্যানভাসের ওপর তেলরঙে আঁকা।
ভ্যান গঘ যখন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে একটি স্যানাটোরিয়ামে ছিলেন, তখন এ চিত্রকর্ম এঁকেছিলেন।
গঘ কেন অসুস্থ হয়ে সেখানে গিয়েছিলেন এবং পরে নিজেকে গুলি করে গমখেতে মেরে ফেলেছিলেন, সেসব আলোচনার আগে দেখা যাক পদার্থবিদেরা ‘দ্য স্টারি নাইট’ নিয়ে কী ভাবছেন।
মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানী হোসে লুইস আরাগন ও তাঁর দল ২০০৮ সালে এক গবেষণা করে বলেন, ভ্যান গঘের চিত্রকর্মে প্রাকৃতিক যে অনিশ্চয়তা; অস্থির অশান্তি দেখা যায়, যেমন টার্বুলেন্স ও ঘূর্ণায়মান আলো ও গতির প্রকৃতি, এগুলো গাণিতিক কাঠামোকে ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করে।
রিয়া নায়ার এ তথ্য তাঁর সেই লেখায় উল্লেখ করে আরও জানান, এটা হতে পারে ভ্যান গঘের ‘সাইকোটিক’ বা মানসিক বিকারগ্রস্ততার কারণে। তারপরও রহস্যময় কারণে তাঁর ব্যবহৃত দৃশ্য পদার্থবিদ্যার গাণিতিক সূত্রকেই অনুসরণ করে।
রিয়া নায়ারের ভাষ্য, ‘একজন ব্যক্তি কীভাবে এই মাত্রার স্বজ্ঞালব্ধ জ্ঞানে উপনীত হন, তা আমরা এখনো জানি না। তবে আমরা নিশ্চিতভাবে এটুকু বুঝতে পারি যে “দ্য স্টারি নাইট”–এর মতো শিল্পকর্ম টার্বুলেন্সের মতো জটিল একটি ঘটনা সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়।’
আইনস্টাইনের সেই স্মরণীয় উক্তি আমাদের মনে পড়ে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘আমি স্বজ্ঞা ও অনুপ্রেরণায় বিশ্বাস করি। মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, আমি সঠিক। কিন্তু আমি জানি না যে আমি সঠিক।’
রিয়া নায়ারের এ প্রবন্ধের শিরোনাম, ‘ফিজিসিস্টস স্টিল ডোন্ট নো, হোয়াট ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ নিউ’। ২০২৪ সালে চীনের একদল পদার্থবিদ জানান, ‘দ্য স্টারি নাইট’ চিত্রকর্মটি এ ধারণা দেয় যে গতির অশান্ত প্রবাহের ক্রমবিকাশে বড় ঘূর্ণিগুলো তাদের কিছু শক্তি ছোট ঘূর্ণিগুলোয় স্থানান্তর করে এবং ছোট ঘূর্ণিগুলোও আবার তাঁদের শক্তি আরও ছোট ঘূর্ণিগুলোয় স্থানান্তর করে। এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে তুলির আঁচড় ও রঙের সান্দ্রতার দৃশ্যমান প্রভাবও পদার্থবিদ্যার নিয়মে ঘটেছে।
বিজ্ঞানীরা জানান, ভ্যান গঘের চিত্রকর্মে ব্যবহৃত ব্রাশ স্ট্রোক ও রংগুলোর সূক্ষ্ম বিবরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চিত্রকর্মের উপাদানগুলো বায়ুমণ্ডলে গ্যাসের ‘লুকানো টার্বুলেন্স’-এর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে মিলে যায়।
বিজ্ঞানীরা জানান, আন্দ্রেই কোলমোগোরভ একজন রুশ বিজ্ঞানী। তাঁর মূল থিওরি ছিল, বড় ঘূর্ণি থেকে মাঝারি ঘূর্ণি এবং তার চেয়ে ছোট ঘূর্ণির বণ্টন একটা নির্দিষ্ট অনুপাতে ঘটে। বায়ুমণ্ডলীয় ব্যবস্থায় ভ্যান গঘের ‘দ্য স্টারি নাইট’ এ নিয়ম মেনেই সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ভ্যান গঘের এ চিত্রকর্ম কোলমোগোরভের দেওয়া থিওরির চেয়ে বায়ান্নো বছরের পুরোনো।
জ্যোতির্পদার্থবিদ অ্যাডাম ফ্র্যাঙ্ক এনবিসি নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ভ্যান গঘ চিত্রকলার ভাষায় যেন পদার্থবিদ্যা লিখেছেন।’ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে মার্কিন শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক অনলাইন সাময়িকী হাইপারঅ্যালার্জিক–এ।
অ্যাডাম ফ্র্যাঙ্ক জানান, পদার্থের জগতে কণা ও তরঙ্গ উভয় প্রকৃতিরই উপস্থিতি বিদ্যমান। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি অনুসারে, যদি আপনি একটি কণার অবস্থান নিখুঁতভাবে মাপতে যান, এর গতি বা ভরবেগে অনেক বেশি ত্রুটি দেখা দেবে। একইভাবে আপনি যদি কণাটির গতি সঠিকভাবে জানতে চান, তাহলে এর অবস্থান কোথায়, তা আর নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। তেমনি ভ্যান গঘের ‘দ্য স্টারি নাইট’ ছাড়াও ‘সানফ্লাওয়ার্স’ চিত্রকর্মেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা যে ভ্যান গঘের চিত্রকর্মে পদার্থবিদ্যা খুঁজে পেলেন, তাহলে কি ভ্যান গঘ পদার্থবিদ্যার ছাত্র ছিলেন? জানা যায় , তিনি পদার্থবিদ্যা কখনো পড়েননি। কিন্তু প্রাকৃতিক নকশা ফুটিয়ে তোলার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। আর তাঁর ‘দ্য স্টারি নাইট’ চিত্রকর্মের সঙ্গে আকাশের ঘূর্ণায়মান স্রোত ও আবর্তগুলো আশ্চর্যজনকভাবে পদার্থবিদ্যার টার্বুলেন্স তত্ত্ব মেনে চলে। বিশেষজ্ঞরা গাণিতিক সমীকরণের হিসাব করা প্রয়োগকে নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি ভ্যান গঘের গভীর ও তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণকেই এর কারণ হিসেবে মনে করেন। স্টেফানি ওয়াডেক স্পেস ডটকমে এমনই ভাষ্য দেন।
গণিতবিদ নাটালিয়া সেন্ট ক্লেয়ার ও অ্যানিমেটর আভি ওফারের তৈরি একটি ভিডিও এবং তা-সংশ্লিষ্ট লেখা চলতি বছরের ২৮ মে ওপেন কালচার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।
ভ্যান গঘের কান কাটার পেছনের কারণ আজও উন্মোচিত নয়। বিভিন্ন গবেষক বিভিন্ন কারণ বলছেন। পল অস্ট্রা নামের ডাচ এক গবেষক দাবি করেছেন, মানসিক অস্থিরতার কারণেই এ কাজ করেছেন তিনি। আরও একটি জনপ্রিয় ধারণা প্রচলিত আছে যে পল গগাঁর সঙ্গে তীব্র ঝগড়ার পর ভ্যান গঘ রাগ ও মানসিক অস্থিরতার বশে রেজার দিয়ে নিজের কানের একটি অংশ কেটে কাগজে মুড়ে ফ্রান্সের আরল শহরের একটি ব্রথেলের এক যৌনকর্মীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই ব্রথেলে দুই বন্ধুই যেতেন বলে জানা যায়। কেউ কেউ মনে করেন, ভ্যান গঘ ওই নারীর প্রতি বিশেষ অনুরাগও অনুভব করতেন। তবে এ দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ মেলে না।
এতে দাবি করা হয়, এ রকম টার্বুলেন্স তত্ত্ব চিত্রকর্মে কাকতালীয়ভাবেই মিলেছে। ভ্যান গঘের জীবনের উত্তাল শেষ বছরগুলোও এ রকম উত্তাল ঘূর্ণির মতো ছিল মানসিক অশান্তির কারণে।
মিডিয়াম ডটকমে চলতি বছরের ২ জুন এ বিষয়ে মনোসমীক্ষকদের ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। শিরোনাম, ‘দ্য সাইকোলজি অ্যান্ড ইমোশন বিহাইন্ড দ্য স্টারি নাইট’। এ লেখায় বলা হয়েছে, ভ্যান গঘের চিত্রকর্মটি আঁকার সময় আবেগ ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাই ছিল অস্থির, চিন্তার জগৎও ছিল ঘূর্ণায়মান। যেহেতু তিনি স্যানাটোরিয়ামে ছিলেন এবং জানালা দিয়ে আকাশ দেখাটাও ছিল জ্বলজ্বলে তারা ও ঘুমন্ত গ্রামের মধ্যে নিজেকে প্রতিস্থাপন। গির্জা ও গাছ ছিল জন্ম ও মৃত্যুর প্রতীক। জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত হয়তো প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর এই চিত্রকর্মে। এটি এমন সব আবেগকে ফুটিয়ে তোলে, যা কথায় প্রকাশ করা কঠিন। বিস্ময়, একাকিত্ব, আশা, অনিশ্চয়তা ও জীবনের অর্থ খোঁজা।এটি কেবল রাতের আকাশের একটি চিত্রকর্ম নয়; এটি মানব মন ও আত্মার এক দৃশ্যগত অন্বেষণ।
এবার আমরা তাঁর অসুস্থতার ব্যাপারে আগ্রহী হলে জানতে পারি যে সেটি নিয়েও রয়েছে অনেক ধরনের তথ্য।
জীবিত অবস্থায় ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। তবু ছিল ছবি আঁকার নেশা। জন্মস্থান নেদারল্যান্ডস হলেও তিনি চলে আসেন ফ্রান্সে। সেখানেই পরিচয় পল গগাঁর (পল গাউগুইন নামেও পরিচিত) সঙ্গে। এই বন্ধুর জীবন ও শিল্পভাবনায় এতই প্রভাবিত হয়েছিলেন ভ্যান গঘ যে তাঁর ছোট ভাই থিও গঘকে একটি চিঠিতে সে কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু একদিন এই দুজন প্রিয় মানুষের কারণেই ভ্যান গঘের বিষণ্নতা আরও বাড়তে থাকে। এমন পরিমাণে বেড়ে যায় যে তিনি ঘোরগ্রস্ত অবস্থায় নিজের কান কেটে ফেলেন। কান কাটার সে ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে ভ্যান গঘ স্বেচ্ছায় ফ্রান্সের সেইন্ট-রেমি-দ্য-প্রোভঁসের একটি স্যানাটোরিয়ামে আশ্রয় নেন। সেখানেই আঁকেন বিখ্যাত ছবি ‘দ্য স্টারি নাইট’। বলা হয়ে থাকে, ছবিটি ছিল ভ্যান গঘের বিছানার পাশের জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া রাতের দৃশ্য। ১৯৪১ সাল থেকে নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে ছবিটি সংরক্ষিত আছে।
ভ্যান গঘের কান কাটার পেছনের কারণ আজও উন্মোচিত নয়। বিভিন্ন গবেষক বিভিন্ন কারণ বলছেন। পল অস্ট্রা নামের ডাচ এক গবেষক দাবি করেছেন, মানসিক অস্থিরতার কারণেই এ কাজ করেছেন তিনি।
আরও একটি জনপ্রিয় ধারণা প্রচলিত আছে যে পল গগাঁর সঙ্গে তীব্র ঝগড়ার পর ভ্যান গঘ রাগ ও মানসিক অস্থিরতার বশে রেজার দিয়ে নিজের কানের একটি অংশ কেটে কাগজে মুড়ে ফ্রান্সের আরল শহরের একটি ব্রথেলের এক যৌনকর্মীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই ব্রথেলে দুই বন্ধুই যেতেন বলে জানা যায়। কেউ কেউ মনে করেন, ভ্যান গঘ ওই নারীর প্রতি বিশেষ অনুরাগও অনুভব করতেন। তবে এ দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ মেলে না।
এক দশকে ২ হাজার ১০০–এর বেশি শিল্পকর্ম নির্মাণ করেছিলেন ভ্যান গঘ। যার মধ্যে ৮৬০টি তৈলচিত্র, ১ হাজার ৩০০–এর বেশি জলরং, ড্রয়িং, স্কেচ ও ছাপচিত্র। চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু আত্মপ্রতিকৃতি, আলো-গতি ও ঘূর্ণি, নৈসর্গিক দৃশ্যমালা, স্থিরচিত্র, বৃক্ষসারি, সূর্যমুখী কিংবা শস্যখেতের দৃশ্য। একসময় প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মপ্রচারক হিসেবেও কাজ করেছিলেন গঘ। উদ্বেগ ও ঘন ঘন মানসিক অসুস্থতায় তাঁকে বেশ অবসাদগ্রস্ত মনে হতো। এক সময় তিনি নিজেকে পৃথিবীর কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে লাগলেন।
আরেকটি কারণ আবিষ্কার করেছেন মার্টিন বেলি। তাঁর নতুন বই স্টুডিও অব দ্য সাউথ: ভ্যান গঘ ইন প্রোভঁস–এ তিনি দাবি করেন যে নিজের ভাই থিওর বিয়ের কথা শুনে বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন ভ্যান গঘ। তারপরই ১৮৮৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর নিজের কান কেটে ফেলেছিলেন শিল্পী। মার্টিন বেলি মনে করেন, থিওর বিয়ের খবরে চিন্তায় পড়ে যান গঘ। কারণ, তাঁর ভাই তাঁকে আর্থিক সহায়তা দিতেন। অসুস্থ হলে চিকিৎসা করাতেন। এমনকি মাসের পর মাস খাওয়াদাওয়া, থাকার টাকাও দিতেন। ভাই বিয়ে করে পাল্টে যায় কি না, এ অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল ভ্যান গঘের মনে।
১৮৮৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর থিওর কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছিলেন ভ্যান গঘ। সঙ্গে ছিল এক শ ফ্রঁ। সে চিঠিতে থিও জানিয়েছিলেন, পুরোনো বান্ধবী জো বঙ্গারের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে এবং তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিয়ে করার। সেদিন গোটা দিনটা বন্ধু গগাঁর সঙ্গে ছবি আঁকা নিয়েই মগ্ন ছিলেন গঘ। ওই দিন রাতে ঝগড়ার পর পল গগাঁ চলে গেলে ভ্যান গঘ নিজের কান কেটে ফেলেন। তবে কাগজে মুড়িয়ে কোনো ব্রথেলের যৌনকর্মীকে সেই কান পাঠাননি। কান পাঠিয়েছিলেন অন্য এক তরুণীকে। বার্নাডেট মার্ফি তাঁর এক লেখায় এমনটাই দাবি করেছেন। লেখাটি প্রকাশিত হয় নিউইয়র্ক টাইমস–এ। গবেষক মার্ফি আবার এর সমর্থনে এক চিকিৎসকের আঁকা একটি ছবির কথা বলেন।
তারপরের ঘটনা অবশ্য সবার জানা। ওই তরুণী কাগজ খুলে কানের টুকরা দেখে মূর্ছা যান। ভ্যান গঘ পালিয়ে যান সেখান থেকে। তবে সেই তরুণী কে বা ভ্যান গঘ কেন তাঁকে কান পাঠিয়েছিলেন, সেটার চূড়ান্ত মীমাংসা হয়নি।
এক দশকে ২ হাজার ১০০–এর বেশি শিল্পকর্ম নির্মাণ করেছিলেন ভ্যান গঘ। যার মধ্যে ৮৬০টি তৈলচিত্র, ১ হাজার ৩০০–এর বেশি জলরং, ড্রয়িং, স্কেচ ও ছাপচিত্র। চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু আত্মপ্রতিকৃতি, আলো-গতি ও ঘূর্ণি, নৈসর্গিক দৃশ্যমালা, স্থিরচিত্র, বৃক্ষসারি, সূর্যমুখী কিংবা শস্যখেতের দৃশ্য। একসময় প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মপ্রচারক হিসেবেও কাজ করেছিলেন গঘ। উদ্বেগ ও ঘন ঘন মানসিক অসুস্থতায় তাঁকে বেশ অবসাদগ্রস্ত মনে হতো। এক সময় তিনি নিজেকে পৃথিবীর কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে লাগলেন। মানসিক অসুস্থতা তাঁর মনে এমনভাবে প্রভাব ফেলে যে ১৮৯০ সালের ২৭ জুলাই হতাশা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে না পেরে গমের খেতে নিজের বুকে নিজে গুলি করেন। এর দুই দিন পর ২৯ জুলাই মাত্র ৩৭ বছর বয়সে এই মহান শিল্পীর মৃত্যু হয়।