গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র

চিরচেনা ছবির হারানো নায়কেরা

শত্রুবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ে মারছেন এক কিশোর। তাঁর ডান পাশে রাইফেল তাক করে স্থির বসে আছেন আরও দুজন। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাঙালি মানসে এই দৃশটি একটি চিরচেনা আলোকচিত্র। কিন্তু চিরচেনা এই ছবির নায়কদের কথা তেমন কেউ জানে না। ছবিটি তোলা হয়েছিল আজ থেকে ঠিক ৫৪ বছর আগের ৭ ডিসেম্বর।

শত্রুবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ে মারছেন এক কিশোর। তাঁর ডান পাশে রাইফেল তাক করে স্থির বসে আছেন আরও দুজন। তাঁদের বুকে তুষের মতো বদলা নেওয়ার আগুন। আর চোখে পরাধীন দেশকে মুক্ত করার প্রত্যয়। অসম সাহসী এই কিশোরদের পেছনে বিস্তীর্ণ ব্রহ্মপুত্র নদ আর তার পেছনে বিশাল আকাশ। ডিসেম্বর মাস বলে ব্রহ্মপুত্রের পানি কিছুটা শুকিয়ে এসেছে। নদের ওপারে যে গ্রামটা, তা একটা রেখার মতো মিশে গেছে অসীমায়। এত এলিমেন্টের মধ্যেও কিন্তু ছবির মূল ফোকাস এই তিন কিশোর। তাঁরা যে ঝোপের আড়াল থেকে গ্রেনেড ছুড়ে মারছেন, তার ডান পাশে একটা বরুণগাছ। শত্রুপক্ষের পাল্টা আক্রমণ এলে এই গাছটাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে লড়াইটা চালিয়ে যাবেন তাঁরা। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাঙালি মানসে এই দৃশটি একটি চিরচেনা আলোকচিত্র। বহু মাধ্যমে বহুল ব্যবহারের ফলে এই ছবির নির্মাতা যে নাইব উদ্দিন আহমেদ, তা অনেকেরই জানা। কিন্তু চিরচেনা এই ছবির নায়কদের কথা তেমন কেউ জানে না।

আমি বহুদিন ধরে চেষ্টা করছি এই ছবির নায়কদের খুঁজে বের করতে। অনেক বছর আগে কে যেন আমাকে বলেছিলেন, এই কিশোরদের বাড়ি টাঙ্গাইল অঞ্চলে এখন আর তাঁর নামটা মনে করতে পারি না। ৮ নভেম্বর রাত ১১টা ২৪ মিনিটে আমার হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারটা টুং করে বেজে উঠল। নির্মাতা শরীফ রেজা মাহমুদ লিখেছেন, ‘এই তিন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম আবদুল খালেক, আবদুল মজিদ ও মজিবর রহমান। তঁদের বাড়ির টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মুশুরিয়া গ্রামে।’ খালেক ও মজিদের ফোন নম্বর দিয়ে শরীফ জানালেন মজিবর মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। শরীফ এই তথ্যগুলো পেয়েছেন শেরপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেহ মো. নূরুল ইসলাম হিরোর কাছে। শরীফের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমি পেয়ে যাই এই ঐতিহাসিক ছবির হারানো নায়কদের।

ছবিটি তোলা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর, ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে। ৩ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনী পাকিস্তানি হানাদারদের বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করল। ওই দিনই মিত্রবাহিনীর সঙ্গেই বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করেন এই তিন বীর।
মুক্তিযুদ্ধের সেই চিরচেনা ছবি [ময়মনসিংহ, ৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১]। আলোকচিত্র: নাইব উদ্দিন আহমেদ

আবদুল খালেক ও আবদুল মজিদ তাঁদের স্মৃতি হাতড়ে জানান, ছবিটি তোলা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর, ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে। ৩ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনী পাকিস্তানি হানাদারদের বিপক্ষে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করল। ওই দিনই মিত্রবাহিনীর সঙ্গেই বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করেন এই তিন বীর। হালুয়াঘাট, ফুলপুর, কড়–ইতলা, শর্শাপুর ও পিলিখালিতে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। সব যুদ্ধেই পাকিস্তানিরা পিছু হটে। এভাবেই যুদ্ধ করতে করতে তাঁরা ময়মনসিংহ শহরের দিকে অগ্রসর হন। যখন ময়মনসিংহে আসেন তখন সন্ধ্যা। রাতে একটা বাড়িতে আশ্রয় নেন তাঁরা। এই বাড়িতে বসেই তাঁরা জানতে পারেন শহরের কাছে শম্ভুগঞ্জে রেলওয়ে লোহার ব্রিজের পশ্চিম দিকে হানাদারদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি আছে। যাঁরাই ওখানে অপারেশন করতে যান, তাঁদের কেউ আর ফিরে আসেন না। শেষ রাতে কোম্পানি কমান্ডারের টুআইসি খোরশেদ আলম বললেন, ‘খালেক, তুই তো অনেক সাহসী ছেলে। তুই কি পারবি?’ খালেক বললেন, ‘ইনশা আল্লাহ।’ মজিদ বললেন, ‘আমিও যাব।’ মজিবর ওই দিন ঠান্ডা জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আসছি তো মরতে। আমিও যাব।’

উত্তেজনায় এরপর তাঁদের আর ঘুম হলো না। মাইকে শুনতে পেলেন ফজরের আজান। সবকিছু গুছিয়ে তিনজন রওনা হলেন অপারেশনের উদ্দেশ্যে। তখন ভোর হয়ে গেছে। কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় লোকজন নেমে এসেছে। পথে কয়েকজন বয়োবৃদ্ধের সঙ্গে দেখা। তাঁরা এই কিশোরদের ওখানে যেতে বারণ করলেন। বললেন, ‘এর আগে যাঁরাই গিয়েছেন, তাঁদের কেউ ফিরতে পারেন নাই।’

ব্রহ্মপুত্র নদের ধারেই হানাদারদের বাংকার। রাইফেল রেঞ্জের দূরত্ব বজায় রেখে বাংকারের কাছে গিয়ে অ্যাম্বুশ করলেন তাঁরা। একটি ঝোপের আড়ালে মজিদ আর মজিবর রাইফেল তাক করে অবস্থান নিলেন। খালেক এগোলেন সামনে। বলা হলো গ্রেনেড নিক্ষেপের পর যদি পাল্টা আক্রমণ আসে, তাহলে পেছন থেকে গুলি ছুড়তে। খালেক বাংকার লক্ষ্য করে পরপর তিনটা গ্রেনেড নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ পর দূরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হুইসেল শোনা গেল। বোঝা গেল, এই এলাকা শত্রুমুক্ত।

অপারেশন শেষে ফেরার পথে একজনের সঙ্গে দেখা। লোকটা মধ্য বয়সী। তাঁর হাতে ক্যামেরা ও কাঁধে ব্যাগ। লোকটা বললেন, ‘আপনারা কীভাবে বাংকারটা ধ্বংস করলেন, আমাকে একটু দেখান। আমি এর কয়েকটি ছবি তুলব।’

অপারেশন শেষে ফেরার পথে একজনের সঙ্গে দেখা। লোকটা মধ্য বয়সী। তাঁর হাতে ক্যামেরা ও কাঁধে ব্যাগ। লোকটা বললেন, ‘আপনারা কীভাবে বাংকারটা ধ্বংস করলেন, আমাকে একটু দেখান। আমি এর কয়েকটি ছবি তুলব।’ যুদ্ধের মাঠে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই। খালেক বললেন, ‘এটা সম্ভব না।’ লোকটা আবারও অনুরোধ করলেন। তখন মজিদ বললেন, ‘বাঁচি না মরি জানি না। লোকটা যেহেতু এত করে বলছে, চল ওখানে গিয়ে দেখাই।’ চারজন আবার গেলেন ওই বাংকারের কাছে। ১০-১২ মিনিট ধরে ছবি তোলা হলো। ছবি তোলার পর লোকটা ব্যাগ থেকে একটা খাতা ও কলম বের করলেন। খাতায় তিনজনের নাম–ঠিকানা টুকে রাখলেন। এরপর এই দিন কিশোর মিত্রবাহিনীর ট্রাকে করে টাঙ্গাইলের দিকে রওনা হন।

এরপর বহু বছর কেটে গেল। একদিন এই তিন মুক্তিযোদ্ধা এলেন সেগুনবাগিচার পুরোনো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। জাদুঘরের গ্যালারিতে হঠাৎ দেখলেন, তাঁদের কৈশোরের সোনালিবেলার সেই ছবি! ছবি দেখে তাঁদের রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। জাদুঘরের একজনকে বললেন, ‘আপনারা এই ছবি কোথায় পেলেন?’ জাদুঘরের পক্ষ থেকে বলা হলো, ‘এই ছবি তুলেছেন ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আলোকচিত্রী নাইব উদ্দিন আহমেদ। তিনিই ছবিটি জাদুঘরকে দান করেছেন।’ জাদুঘরের খাতায় নাইব উদ্দিনের ফোন নম্বর পাওয়া গেল। আরেকজনের ফোন থেকে নাইব উদ্দিনকে ফোন করলেন আবদুল খালেক। বললেন, ‘বহু বছর আগে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে আপনি যে তিন কিশোরের ছবি তুলেছিলেন, সে কথা কি আপনার মনে আছে?’ নাইব উদ্দিনের চোখে তিন কিশোরের সাহসী মুখটা ভেসে উঠল। নাইব উদ্দিন অশ্রুসিক্ত হয়ে বললেন, ‘তোমরা এত দিন কোথায় ছিলে? তোমাদের খুঁজতে বেশ কয়েকবার আমি টাঙ্গাইল গিয়েছি। পাই নাই। এরপর বহু মানুষকে ছবি দেখিয়ে তোমাদের খোঁজ নিয়েছি। কেউ তোমাদের কথা বলতে পারেনি।’

২০০৯ সালে তাঁদের ছবিসংবলিত পোস্টারে সারা দেশ ছেয়ে যায়। পোস্টারে নিজেদের ছবি দেখে তাঁরা নাইব উদ্দিনকে ফোন করলেন। নাইব উদ্দিন বললেন, ‘আগামীকাল ধানমন্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে একটা অনুষ্ঠান আছে। সেখানে স্লাইডে তোমাদের ছবিটা দেখানো হবে। সময়-সুযোগ হলো আসো।’ পরের দিন বিকেলে খালেক আর মজিদ এলেন বেঙ্গল গ্যালারিতে। ৩৮ বছর পর দুই বীরকে দেখতে পেয়ে নাইব উদ্দিনের চোখ নোনা হয়ে যায়। এরপর নাইব উদ্দিনের সঙ্গে তাঁদের আর কখনো দেখা হয়নি।