অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বংশলতিকায় লোকসাহিত্যের আলো

কোনো এক বৃষ্টিস্নাত বিকেলে আমাদের ধানমন্ডি ১৪ নম্বর রোডের ৫৫১ নম্বর বাসার সামনের বারান্দায় বসে বাবার সঙ্গে আমাদের পাঁচ ভাই-বোনের তুমুল বাহাস হচ্ছে। সালটা সম্ভবত ১৯৭৭। বাবাটি আর কেউ নন, স্বনামধন্য সাহিত্যিক ও লোক-গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী। বাহাসের বিষয় তাঁর পূর্বপুরুষের পরিচয়। বাবা বলছিলেন, ‘আমরা পীরের বংশ। আমাদের পূর্বপুরুষ শেখ নান্নু শায়িত আছেন ব্রাহ্মণ-শাসনে। তিনি বাগদাদ থেকে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছিলেন।’

রুমি আমাদের বড় ভাই। সে অন্যমনস্কভাবে কবজি ঘুরিয়ে ক্রিকেট বল ছোড়ার ভঙ্গি করছিল। হঠাৎ বাবার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘বাবা, এগুলো সব মিথ।’

বাবা উত্তেজিত স্বরে উত্তর দিলেন, ‘তাই বলছ? তাহলে চলো, দেখিয়ে আনি তাঁর কবর।’

বড় বোন রিমা বলল, ‘সে তো আমরা দেখেছি। বহুবার তুমি আমাদের নিয়ে গেছ।’

রুমি ভাই রিমাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার প্রশ্ন তো সেটা নয়। প্রশ্ন হলো, তিনি কি আদৌ বাগদাদ থেকে এসেছিলেন? ধর্ম প্রচার করতেই কি এসেছিলেন?’

আমিই–বা চুপ থাকব কেন? বলে উঠলাম, ‘হতে পারে তিনি কোনো মোগল সৈন্য। সেদিন পত্রিকায় পড়েছি যে কোনো কারণে কোনো সৈনিক মোগল সম্রাটের বিরাগভাজন হলে অথবা তাঁর বিরুদ্ধে জেল বা ফাঁসির আদেশ হলে তাঁদের কেউ কেউ বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে পালিয়ে যেতেন। তারপর ছদ্মবেশে নতুন জীবন শুরু করতেন। তাঁদের কেউও হতে পারেন।’

বাবা কিছুটা রেগে বললেন, ‘তোমাদের জেনারেশনের সমস্যা এটাই। তোমরা কিছুই বিশ্বাস করতে চাও না। সম্মান করতে জানো না। আমাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস লেখা আছে আবদুল করিম খানের তরফ গৌরাঙ্গীর ইতিহাস (১৯৩২) বইয়ে। বইটা এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই। খালেদের কাছে আছে।’ খালেদ আমাদের চাচাতো ভাই। প্রয়াত আবু সাঈদ চৌধুরীর কনিষ্ঠ পুত্র। ‘যত দ্রুত সম্ভব আমি এনে তোমাদের দেখাব।’ সেদিনের সেই আলাপ ওখানেই অমীমাংসিত রইল।

আশরাফ সিদ্দিকী
বাবার মৃত্যুর পর তাঁর বইয়ের বিপুল ভান্ডার গোছাতে গিয়ে চোখে পড়ল একটা বই। নাম তরফ গৌরাঙ্গীর ইতিহাস। তৎক্ষণাৎ চমক দিয়ে ভেসে উঠল বাবার সঙ্গে আমাদের বংশপরিচয় নিয়ে বাহাসের স্মৃতি।

তারপর বহু জল গড়িয়ে গেছে। পেরিয়ে গেছে প্রায় ৪০টি বছর। আমাদের ধানমন্ডির বাসাটা বিল্ডার্সের কাছে চলে গেছে। আমরা ভাই–বোনেরা সব নানা-নানি, দাদা-দাদি হয়ে গেছি। ভীষণভাবে সুস্থ ও পরিমিত জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে ৯৩ বছর বয়সে খুব সামান্য অসুস্থতার পর বাবা ১৯ মার্চ ২০২০ সালে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।

বাবার মৃত্যুর পর তাঁর বইয়ের বিপুল ভান্ডার গোছাতে গিয়ে চোখে পড়ল একটা বই। নাম তরফ গৌরাঙ্গীর ইতিহাস। তৎক্ষণাৎ চমক দিয়ে ভেসে উঠল বাবার সঙ্গে আমাদের বংশপরিচয় নিয়ে বাহাসের স্মৃতি। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ এটা। পুনর্মুদ্রণ করেছেন আবদুল করিম খানের ছেলে বুলবুল খান।

তৎক্ষণাৎ বইটা নিয়ে বসে পড়লাম। দারুণ উৎসাহে পাতা ওলটাতে ওলটাতে চলে এলাম আমাদের দাদা-পরদাদার ইতিহাসে। জানলাম, আমাদের বংশলতিকা শুরু হয় ঘাটাইল থানার ব্রাহ্মণ-শাসন এলাকা থেকে। শেখ নান্নু ধর্ম প্রচারের জন্য বাগদাদ থেকে ঘাটাইলে এসেছিলেন। সে সময়ে নাকি ঘাটাইলে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য ছিল প্রবল। নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা নানাভাবে শোষিত ও নির্যাতিত হতো তাদের হাতে। শেখ নান্নু কুলীন ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের পথ পরিহার করে শান্তির পথে চলতে আহ্বান করেন। তাঁরা তাঁর পরামর্শের কোনো গুরুত্বই দেননি। লোকশ্রুতি আছে, শেখ নান্নু তাঁর অলৌকিক ক্ষমতায় ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের এমনভাবে শাসন করেন যে সেই এলাকায় তাঁদের প্রতিপত্তি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। পর্যায়ক্রমে শেখ নান্নু এই এলাকায় তাঁর স্থায়ী আবাস গড়ে তোলেন। এলাকাটির নাম ব্রাহ্মণ-শাসন হওয়ার পেছনে এ–ই হচ্ছে কাহিনি।

পরবর্তী সময়ে বাদশাহর কাছ থেকে সেই গ্রাম ও এর আশপাশের আরও দুটি গ্রামের লাখেরাজপ্রাপ্ত হন তিনি। লাখেরাজ এমন একটি ভূমিব্যবস্থা, যেখানে বাদশাহর সম্মতির ভিত্তিতে ভোক্তাকে কোনো কর দিতে হয় না। শেখ নান্নুর ছিল দুই পুত্র—আলী মাহমুদ আর ওলী মাহমুদ। তিনি তাঁর দুই পুত্রকে ইসলাম প্রচারের জন্য টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় পাঠিয়ে দেন। ওলী মাহমুদ প্রথমে কাগমারীর দিয়াবাড়িতে এবং পরে তিনি ও তাঁর সন্তানেরা আটিয়ার কালিহাতী থানার নাগবাড়িতে বসতি গড়ে তোলেন।

ওলী মাহমুদ বড় রিয়াভুক্তা নিবাসী দরবেশ শেখ কালের কন্যাকে বিয়ে করেন। সেই ঘরে তাঁর তিন পুত্র শেখ ওয়াজ মাহমুদ, শেখ গাউস মাহমুদ ও শেখ আফজাল মাহমুদের জন্ম হয়। গাউস মাহমুদের ছিল তিন পুত্র, তাঁদের একজন জান-উল্লাহ। জান-উল্লাহর দ্বিতীয় কন্যার বিয়ে হয় মতিউদ্দিন ওরফে মহদী মিয়াঁর সঙ্গে। তাঁদের প্রথম সন্তান গোলাম মুর্তুজা। গোলাম মুর্তুজা ছিলেন সেই অঞ্চলের নায়েবে নাজিম। তাঁর তিন পুত্র এবাদত উদ্দিন সিদ্দিকী, আব্বাস উদ্দিন সিদ্দিকী ও সলিম উদ্দিন সিদ্দিকী।

একবার গোলাম মুর্তুজা খাজনা আদায় করে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ফিরছিলেন। এই সময়ে তাঁকে পেছন থেকে বঙ্গরার মীর তোফেল আলী মন্ত্রপূত বাণ মারেন। এতে মাসখানেক ভুগে তিনি অকালে মারা যান। তাঁর আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে রানি ভবানী তাঁর পরিবারকে তিনটি গড় উপহার দেন। গড়গুলো হলো ঝনঝনিয়া গড়, সুরিচালা গড় ও আলোকদিয়া গড়।

পরবর্তী জীবনে গোলাম মুর্তুজার বড় সন্তান এবাদত উদ্দিন সিদ্দিকী জমিদারি ক্রয় করে চৌধুরী পদবি লাভ করেন। তৎকালীন (আইয়ুব আমলে) পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার আবদুল হামিদ চৌধুরী ছিলেন তাঁর সন্তান এবং বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তাঁর পৌত্র।

সলিম উদ্দিন সিদ্দিকী ছিলেন সংসারবিরাগী এক দরবেশ। অত্যন্ত অল্প বয়সে মারা যান। তাঁর স্ত্রী আফসান নেসা এক পুত্র ও দুই কন্যাকে নিয়ে বিধবা হয়েও শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেন। এই সলিম উদ্দিন সিদ্দিকীই হলেন আশরাফ সিদ্দিকীর দাদা। আর এবাদত উদ্দিন সিদ্দিকী হলেন তাঁর নানা। অর্থাৎ তাঁর বাবা সাত্তার সিদ্দিকী বিয়ে করেছিলেন তাঁর আপন চাচাতো বোন সমীরণ নেসাকে।

একনিশ্বাসে পূর্বপুরুষের পরিচয়ের অংশটুকু পড়ে শেষ করলাম। সে এক অভূতপূর্ব অনুভূতি। নিজের বংশলতিকার প্রতি বাবার যে গভীর সম্মান ও আস্থা, তা তাঁর মৃত্যুর পর গভীরভাবে অনুভব করতে পারলাম।

তাঁর শেষ জীবনে গল্পচ্ছলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বাবা, এমন কিছু কি আছে, যার সাধ ছিল কিন্তু পাওনি?’ ঠাট্টার স্বরে বলেছিলেন, ‘তরুণ বয়সে যাকে ভালো লেগেছিল, তাকে পাইনি।’ একটু চাপ দেওয়ার পর বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার এবং জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সাধ ছিল।’ তবে এ–ও বলেছিলেন, এ জন্য তাঁর কোনো আফসোস নেই।

শেখ নান্নু আসলেই কি বাগদাদ থেকে এসেছিলেন? তিনি কি সত্যিই ব্রাহ্মণদের শাসন করছিলেন? এগুলো আসল বিষয় নয়। আসল বিষয় হলো আশরাফ সিদ্দিকীর জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা লোককথা ও লোককাহিনি। তাঁর বংশলতিকাও এই লোক-ঐতিহ্যেরই অংশ।

বাবাকে বুঝতে পেরে ভীষণ ভালো লাগায় মন ভরে গেল।

আশরাফ সিদ্দিকী জীবনে নানা পদকে ভূষিত হয়েছেন—১৯৮৮ সালে একুশে পদক, ১৯৬৬ সালে ইউনেসকো সাহিত্য পদক, ১৯৬৪ সালে শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার। এ ছাড়া পেয়েছেন রিডার্স ডাইজেস্ট পুরস্কার, জসীমউদ্​দীন স্বর্ণপদক, আবুল মনসুর আহমদ পুরস্কার, দীনেশচন্দ্র সেন স্বর্ণপদক, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, জ্ঞানতাপস ডক্টর শহীদুল্লাহ্​ স্বর্ণপদকসহ নানা সম্মান।

তাঁর শেষ জীবনে গল্পচ্ছলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বাবা, এমন কিছু কি আছে, যার সাধ ছিল কিন্তু পাওনি?’ ঠাট্টার স্বরে বলেছিলেন, ‘তরুণ বয়সে যাকে ভালো লেগেছিল, তাকে পাইনি।’ একটু চাপ দেওয়ার পর বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার এবং জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সাধ ছিল।’ তবে এ–ও বলেছিলেন, এ জন্য তাঁর কোনো আফসোস নেই।

তিনি গত হয়েছেন ছয় বছর আগে। এ বছর লোকসাহিত্য গবেষণা, সাহিত্যসৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬ (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়েছে। পুরস্কারটি ঘোষণার পর আনন্দে আর উত্তেজনায় সারা রাত জেগে থেকে আনমনে বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। বলেছি, ‘বাবা, তুমি নিজ হাতে এই পুরস্কার গ্রহণ করতে পারলে নিশ্চয়ই
খুশি হতে। আমরাও হতাম। তবে তোমার সন্তান হিসেবে এই পুরস্কার গ্রহণের সুযোগ পেয়ে আমি ধন্য, আমি গর্বিত।’

● লেখক:  সাহিত্যিক ও লোকগবেষক আশরাফ সিদ্দিকীর মেয়ে।