অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

ধ্রুব এষের ষাটে পদার্পণ

ধ্রুবচারিতা

‘এ ধরনের মানুষকে নিয়ে কিছু লেখা সম্ভব নয়।’ আমার প্রস্তাব শুনে তিনি অনেকটা খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘শার্লক হোমসের মতো রহস্যময়, হিমুর মতো বেখেয়াল...এরা মানুষের পর্যায়ে পড়ে না। জাতীয় পুরস্কার আনতে যায় স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে।’

তিনি বিখ্যাত লেখক ও প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী, আমার কণ্ঠ তাই অনুনয়ের শেষ সীমানায়, ‘স্যার, একটু যদি চেষ্টা করে দেখতেন। আপনার ১৭টি বইয়ের প্রচ্ছদ করেছে সে, এ নিয়েও তো অল্পস্বল্প কাহিনি থাকার কথা।...জাস্ট একটা স্মৃতিচারণা।...১৭ তারিখ ওর জন্মদিন, তাই বলছিলাম কি...।’

তিনি কথার মাঝখানে আমায় থামিয়ে দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করলেন, ‘দুনিয়ায় আর লেখক নাই? আমাকেই সব লিখতে হবে কেন?’

ঘরের ভেতরে তখন শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের নাতিশীতোষ্ণ হাওয়া। নীরবতা মানুষের মনে বোধ হয় মায়া জন্মায়। দম নিয়ে তিনি ফের প্রশ্ন করলেন, ‘এ পর্যন্ত কয়জনের লেখা পেয়েছেন?’

অনেকের লেখা স্যার। খ্যাত ও অখ্যাত মিলিয়ে ৫০ জনের কম হবে না। অথচ আমরা ছাপতে পারব সাকল্যে ১২ জনের লেখা।

‘এতজনের কাছে লেখা চাওয়ার মানে হয় না।...আর কী বলব, এখন হরেদরে ঘরে ঘরে সবাই লেখক। ফেসবুকে লেখে।’

মাথা নেড়ে বললাম, চাইনি স্যার। এসে গেছে। সম্ভবত তরুণদের মধ্যে বেশির ভাগেরই জানা যে তার জন্মদিন ১৭ জানুয়ারি।

তিনি জানতে চাইলেন, ‘আনিস লেখা দিয়েছে? ইমদাদুল? সেলিনা...?’

সম্পাদককে নাকি সময়-সময় জলধর, সিকান্‌দার, হাবীব কিংবা সাগরময় হতে হয়, নইলে লেখা পাওয়া যায় না। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো এসব রাখাল সম্পূর্ণ নিজের মর্জিতে চলে, এরা লেখক। বিনয়ের অবতার বনে গিয়ে তাই বললাম, তাঁরা লেখা দিয়েছেন স্যার। উল্টো ধন্যবাদ জানিয়েছেন এই উদ্যোগের জন্য। ভালো মানুষ তো আমার অনুরোধ তাই ফেলতে পারেননি।...কিন্তু সবার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হবে আপনার লেখাটা।

তাঁর কপালে এবার ভাঁজ পড়ল, ‘ওর কোন দিক নিয়ে লিখব বুঝতে পারছি না। প্রচ্ছদশিল্পী, নাকি লেখক, নাকি কবি, নাকি শিশুসাহিত্যিক, নাকি গীতিকার...। ছেলে তো বহুমুখী।’ বললাম, আর ছেলে বলবেন না স্যার। ১৯৬৭ সালে জন্ম, ৬০ হতে চলেছে...।

‘ভালো মানুষ’ ও ‘গুরুত্বপূর্ণ’ শব্দগুলো বোধ হয় বিখ্যাত লেখকের কানে ঝাপটা মারল। তাঁর কণ্ঠস্বর আচমকা নরম হয়ে গেল, ‘আপনাকে লেখা দেওয়ার শেষ তারিখটা বলেন তো ভাই?’

জানুয়ারির ১০ তারিখ। এটা শুধু আপনার জন্য।

তাঁর কপালে এবার ভাঁজ পড়ল, ‘ওর কোন দিক নিয়ে লিখব বুঝতে পারছি না। প্রচ্ছদশিল্পী, নাকি লেখক, নাকি কবি, নাকি শিশুসাহিত্যিক, নাকি গীতিকার...। ছেলে তো বহুমুখী।’

বললাম, আর ছেলে বলবেন না স্যার। ১৯৬৭ সালে জন্ম, ৬০ হতে চলেছে...।

তাঁর ভুরু কপালে উঠল, ‘বলেন কী? এত বছর হয়ে গেল!’

মাছ টোপ খেলে অ্যাংলার যেমন নিঃশব্দ হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে সুতা টানে, আমি তা–ও করলাম না, স্রেফ একটা প্রস্তাব দিলাম—স্যার, ওর জীবনের যেকোনো দিক নিয়ে আপনি লিখতে পারেন। যেমন আপনার মর্জি। আমার শুধু মনে পড়ছে, ওকে নিয়ে একদিন একটা ভয়ংকর গল্প শুনিয়েছিলেন, সেই কাহিনি যদি লিখতেন।

‘কোন গল্পটা?’ তিনি মগজের অলিগলি যেন হাতড়ে বেড়ালেন। ব্যর্থ হয়ে হালছাড়া গলায় বললেন, ‘মনে করতে পারছি না।’

তাঁকে খেই ধরিয়ে দিতেই প্রথম দৃশ্যটির পুনরাবৃত্তি ঘটল দীর্ঘদিন পর। শিল্পকলা একাডেমির সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল এক দীর্ঘকায়। তার গায়ে কালো চাদর। সেই চাদরে সাদা অক্ষরে শামসুর রাহমানের কবিতার একটি পঙ্‌ক্তি লেখা: ‘ঝরাপাতা যেন সময়ের বিষণ্ন উষ্ণতা।’

স্রেফ একটা প্রস্তাব দিলাম—স্যার, ওর জীবনের যেকোনো দিক নিয়ে আপনি লিখতে পারেন। যেমন আপনার মর্জি। আমার শুধু মনে পড়ছে, ওকে নিয়ে একদিন একটা ভয়ংকর গল্প শুনিয়েছিলেন, সেই কাহিনি যদি লিখতেন। ‘কোন গল্পটা?’ তিনি মগজের অলিগলি যেন হাতড়ে বেড়ালেন।

বিখ্যাত লেখক নিশ্চিত হলেন যে দীর্ঘকায় এ মানুষটি তাঁর গ্রন্থেরই সেই প্রচ্ছদশিল্পী, সুনামগঞ্জের উকিলপাড়ায় যার জন্ম। দুর্দান্ত যেমন আঁকায়, তেমনি লেখায়। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মনের-ঘরে আনন্দের রং আঁকতে সে পারঙ্গম।...চাদর পরা লোকটাকে একেবারে কাছে গিয়ে তিনি ডাকলেন, কোনো সাড়া মিলল না; বরং সে দ্রুত মুখ ঢেকে সরে পড়ল সেখান থেকে। কাহিনির সবে শুরু। শেষটা পাঠক পাবেন আরও পরে।

দুই.

আমার কাহিনির সূচনাপর্ব অবশ্য ১৯৯৬ সালে, তখন ওর বয়স মাত্র ২৯। একটি উপন্যাস বেরোবে। প্রকাশক মুজিবর রহমান খোকা, তিনি প্রচ্ছদশিল্পীর নাম বলে জানতে চাইলেন, ‘ওকে চেনেন? আপনাদের দেশেই বাড়ি।’

নাম শুনেছি। পরিচয় নেই!

‘কাল সন্ধ্যায় সেবা প্রকাশনীর অফিসে চলে যাবেন, তাঁর দেখা মিলবে। রহস্যপত্রিকায় কাজ করেন উনি। আপনাকেও বোধ হয় উনি নামে চেনেন।’

মনে মনে প্রশ্ন করি, কীভাবে? ১৪ বছর আগে, ১৯৭৮ সালে শিশু একাডেমি ও মুক্তধারা আমার দুটি বই প্রকাশ করেছিল। তারপর এক যুগের বেশি শূন্য জমিন...ফসলবিহীন। মানুষ কেন মানুষকে মনে রাখবে কর্ম ছাড়া?

সেবা কার্যালয়ে তখন আমাদের তিন বন্ধু কাজ করেন। শেখ আবদুল হাকিম, রকিব হাসান ও নিয়াজ মোরশেদ। দহরমমহরম বেশি শেখের সঙ্গে। তো সেই সন্ধ্যায় যথারীতি শেখ হাকিমের টেবিলের সামনে গিয়ে বসি এবং চা পানের পর এক পর্যায়ে সেই শিল্পীর খোঁজ নিই। ‘তিনি কি এখন আছেন অফিসে?’

শেখ হাকিম বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। ডাকব এখানে?’

না, ওনার ডেস্কটা কোথায়, দেখিয়ে দেন।

আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম শিল্পীর টেবিলের সামনে। হাকিম পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর নাকিস্বরে কী কী যেন বললেন তিনি, এক বর্ণও বুঝতে পারলাম না। আমি তার উদ্দেশে বললাম, উজান-ভাটির প্রচ্ছদ আঁকছেন শুনে খুব খুশি হয়েছি।

সেবা কার্যালয়ে তখন আমাদের তিন বন্ধু কাজ করেন। শেখ আবদুল হাকিম, রকিব হাসান ও নিয়াজ মোরশেদ। দহরমমহরম বেশি শেখের সঙ্গে। তো সেই সন্ধ্যায় যথারীতি শেখ হাকিমের টেবিলের সামনে গিয়ে বসি এবং চা পানের পর এক পর্যায়ে সেই শিল্পীর খোঁজ নিই। ‘তিনি কি এখন আছেন অফিসে?’

নাকিস্বরে উচ্চারিত হলো, ‘আঁমি বঁইটা পঁড়েছি ভাঁই।’

বলেন কী?

ভেতরে–ভেতরে আমি চমৎকৃত। কোনো শিল্পীকেই এ পর্যন্ত পুরো বই পড়ে প্রচ্ছদ আঁকতে শুনিনি। ব্যস্ত এই পৃথিবীতে এত সময় কোথায়?

*

এ ঘটনার পর চারটি বছর কেটে গেল।

আমি তখন হরিকেলে প্রাচীন এক জনপদের রাজা কান্তিদেব হওয়ার চেষ্টায় আছি, তার কন্যা সুচেতা ও মা বিন্দুবতী দুই জগতের বাসিন্দা। একজন থাকে ঢাকায়, আরেকজন সুনামগঞ্জে। একজন জীবিত, অন্যজন মৃত। ’৯২ সালে তিনি না-ফেরার দেশে চলে গেলেও মাটির দুনিয়াকে করে গেছেন মাতৃভূমি। আমাকে তাই ঢাকায় যেতে হয়, মাতৃভূমি সুনামগঞ্জের মাটির খবর নিতে হয় এবং সব সামলে হরিকেলের চাকরিটাও রাখতে হয় ঠিকঠাক। বাস্তবে সে ভূমি হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম। লেখা আর হয় না।

তিন.

তরুণ ধ্রুব এষ। স্কেচ: মাসুক হেলাল

২০০৪ কি ০৫ সালে ফের দেখা হয়, সম্ভবত কথাশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর বাসায়। প্রথম পলকে মনে হলো দুই সহোদর, পাশাপাশি বসে রোদ পোহাচ্ছেন। জ্যেষ্ঠের দাড়ি-গোঁফ নেই, কনিষ্ঠের আছে। একেবারে যেন ‘ছোট ঠাকুর’, গতকাল ভানু সিংহের পদাবলী লিখে শেষ করেছেন মাত্র।

জ্যেষ্ঠ আমায় দেখে খুশি হয়েছেন, এ কথা বলা যাবে না। উত্তর মেলে তাঁর কপাল কুঁচকানো চেহারায়। মুখে বললেন, ‘কী মিয়া! লেখালেখি বাদ দিয়া হারাদিন দেহি বাংলাবাজারে ঘোরাঘুরি করেন। এইহানে কী কাজ?’

পরের বছরগুলোতে দেখা যাবে, এই জ্যেষ্ঠ বা বুবু সব সময় অন্যের কাছ থেকে শিল্পীকে আড়াল রাখার চেষ্টা করছেন। এমনকি হাকিম ভাইয়ের (শেখ আবদুল হাকিম) চোখেও ধরা পড়ে তাঁর এই প্রবণতা। তিনি একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বুলবুল এ রকম করে কেন? ছেলেটার সঙ্গে একা কাউকে কথাই বলতে দেয় না। মানে কী এসবের?’

ফিচকে হাসি দিয়ে বললাম, ওরা ভেরলেন আর ও র‍্যাঁবো হয়ে গেছে।

শেখ আবদুল হাকিম ঠাস করে একটা মন্তব্য ছুড়ে দিলেন, ‘ওই দুই কবি তো সমকামী ছিলেন। বুলবুল মেয়েপাগলা মানুষ।’

তারপর নিজেই একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করালেন, ‘আসলে তা নয় জুবেরী। আসল ঘটনা হচ্ছে, বুলবুল আমাদের সঙ্গে একে মিশতে দেয় না, খারাপ যদি হয়ে যায় ছেলেটা! আমরা তো একেকজন ইবলিশ! হা হা হা।’

পরের বছরগুলোতে দেখা যাবে, এই জ্যেষ্ঠ বা বুবু (বুলবুল চৌধুুরী) সব সময় অন্যের কাছ থেকে শিল্পীকে আড়াল রাখার চেষ্টা করছেন। এমনকি হাকিম ভাইয়ের (শেখ আবদুল হাকিম) চোখেও ধরা পড়ে তাঁর এই প্রবণতা। তিনি একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বুলবুল এ রকম করে কেন?

আমি গজগজ করতে থাকলাম, ছেলে কোথায় দেখলেন? ৩৭ বছর বয়সের ধাঁড়ি একটা মানুষ, প্রচ্ছদ এঁকে মাথা গরম করে দিচ্ছে সিনিয়রদের। এরই মধ্যে পুরস্কারও পেয়ে গেছে একাধিক। আমার-আপনার ভাগ্যে জুটেছে? বাসার সিঁড়িতে বসে এখনই ওর জন্য অপেক্ষা করে মুরিদরা।

‘মুরিদ?’ শেখ হাকিম হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘শেষ পর্যন্ত কি পীর হয়ে গেল ছেলেটা?’

বুবু বা বুলবুলের ধারণাও সে রকম। তিনি মনে করতেন, ও হচ্ছে আধুনিক ‘সন্ত’, ছদ্মবেশ ধারণ করে পৃথিবীতে এসেছে।

‘হ মিয়া, এই মিছার দুনিয়াতে ওরে কখনো মিছা কথা কইতে দেখলাম না। কোনো ধান্দাবাজি নাই। সরল-সুতার জীবন...।’

শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে অন্য প্রসঙ্গ টেনে আনতাম। তিনি যে ওর চাইতে বয়সে বড়, প্রতিষ্ঠিত একজন কথাশিল্পী, তাঁর মতো স্মরণযোগ্য টুকা কাহিনি সে কখনো লিখতে পারবে না—এসব বলতে বলতে হঠাৎ প্রশ্ন করতাম, আপনি কেন রোজ ওর বাসায় দুপুরের খাবারদাবার নিয়ে যান? ওটা কি আপনাকে মানায়?

বুলবুল উল্টো বিস্ময়াহত চোখে তাকাতেন, ‘আরে মিয়া, নাইলে খাইব কী? বুয়া একদিন আহে তো আরেক দিন আহে না...। কীসব আবোলতাবোল পাক করে, মুখে দেওন যায় না। ছেলেটারে বাঁচাইতে হইব না? আমি তো মিয়া একখান “টুকা” লিখছি, বাঁইচ্যা থাকলে হে দশখান লিখব।’

চার.

বুবু কিংবা বুলবুলের ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক ও অভ্রান্ত প্রমাণ করতেই যেন প্রচ্ছদশিল্পী থেকে তার লেখকে রূপান্তর। ছড়া-কবিতা ও শিশু-কিশোর উপযোগী লেখা টুকটাক আগেই লিখত, একসময় দেখা গেল সিরিয়াস সৃজনেও হাত পড়েছে। নিয়মিত দেদার লিখছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে গান, ভয়ংকর কথামালায়।

বুলবুল ওর লেখা পড়তেন না, যদি খারাপ লেগে যায়! সে জন্য তিনি অপেক্ষা করতেন অন্যের মন্তব্যের ওপর। একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘“রাফখাতা” নামে একটা বই বারাইছে মিয়া। পড়ছেন?’

আপনি কেন রোজ ওর বাসায় দুপুরের খাবারদাবার নিয়ে যান? ওটা কি আপনাকে মানায়? বুলবুল উল্টো বিস্ময়াহত চোখে তাকাতেন, ‘আরে মিয়া, নাইলে খাইব কী? ছেলেটারে বাঁচাইতে হইব না? আমি তো মিয়া একখান “টুকা” লিখছি, বাঁইচ্যা থাকলে হে দশখান লিখব।’

মাথা ঝাঁকালাম, হ্যাঁ।

‘কেমন হইছে? হইছে কিছু?’

অসাধারণ।

বুবুর চোখ দুটো বড় হয়ে যায়, ‘কন কী মিয়া! খাইব তো পাঠকে? বিক্রিবাট্টা হয়?’

গলায় এবার বিরক্তির প্রকাশ ঘটে গেল, কী যে বলেন না বুলবুল ভাই! আপনি তো ওর কোনো বই পড়েন না, পড়লে বুঝতেন।

‘এই বইটা পড়মু। দাম কত রাখছে, দেখছেন?’

এবারও বিরক্ত হয়ে বললাম, প্রতিদিন ওর বাসায় যান, একটা বই সে দিতে পারে না?

‘আরে মিয়া ডেইলি সাধে, আনি না। ছোট ভাইর জামা গায়ে পরলে আগে শিউলি দিয়া দিতে হয়। আপনাগো দেশে আছে না এই নিয়ম?’

পরের সপ্তায় তাঁর পূর্ণচন্দ্র লেনের বাড়িতে গেলে রাফখাতা বইটি দেখতে পাই সিথানের কাছে। ৪০ পার্সেন্ট কমিশন ছাড়ের রসিদটাকে তিনি রেখেছেন পড়ার চিহ্ন হিসেবে। বইখানা হাতে নিয়ে দেখলাম, ২২ পৃষ্ঠায় রাখা সেই রসিদ।

জানতে চাইলাম, কেমন লাগছে বুলবুল ভাই?

স্মিত হেসে বললেন, ‘হ। ভালোই লিখছে। একবার শেষ কইরা আবার পড়তাছি মিয়া! হবায় ২২ পৃষ্ঠায় আইছি।’

অনুরূপ ঘটনা ঘটল ‘হিজল দাশ কবি’র বেলায়। বইটা নিসর্গপ্রেমী দ্বিজেন শর্মাকে উৎসর্গ করা। ভিন্নধর্মী পরাবাস্তব উপন্যাস। ক্ষীণকায় কিন্তু শক্তিধর। বেশ কয়েকজন কৃতী লিখেও ফেলেছেন হিজল দাশ কবিকে নিয়ে।

বুলবুল পড়েটড়ে কিচ্ছু বুঝলেন না। অকপট স্বীকারোক্তি। আমায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘পড়ছেন নি মিয়া?’

হ্যাঁ। বইটা আমাকে দেওয়ার সময় ধ্রুব লিখেছিল, হিজল দাশ কবির বড় ভাই।

হেসে ফেললেন বুলবুল, ‘আরে মিয়া হে এইডা নিজেরে নিয়াই লিখছে। আউলাঝাউলা একটা মানুষ, ভুল কইরা এই দুনিয়ায় নাইম্যা গেছে। হে কয়, সব গাছ গাছ না। শীতে নীল হয়ে যায় নদী। মাইনষেরই রূপক...।’

পাঁচ.

পরিণত ধ্রুব এষ। প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

যাঁদের কাছ থেকে লেখা এনেছিলাম, কিন্তু ছাপতে পারিনি, তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিনের ব্যবধানে সেই স্মৃতি ভুলে গেলেন। ইমদাদুল, আনিসুল, সেলিনা এত বেশি লেখেন যে দু-একটি ‘বাচ্চা’ হারিয়ে গেলে মনে থাকার কথাও নয়! আর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা জানে যে সেই ‘প্রকল্প’ মাঠে মারা গেছে, দৈনিকটি এখন বন্ধ, এমনকি প্রকাশনা সংস্থাটিও নেই। তবু আমি বসুন্ধরা, কারওয়ান বাজার কিংবা বাংলা একাডেমি এলাকায় পারতপক্ষে যাই না, যদি কারও মনে পড়ে যায়, ‘আরে ভাই, আপনি? সেই যে লেখা নিয়ে গেলেন আর দেখা নাই।’

কিন্তু আমি ভুলতে পারিনি সেই বিখ্যাত লেখকের সৃজন। সত্যি বড় দরদ দিয়ে লিখেছিলেন তিনি। ইচ্ছা করে, লেখাটা অন্য কোথাও ছাপতে দিই। দুটো কারণে নিজেকে সংবরণ করি। এক. তিনি শতায়ু। দুই. লেখাটা কম্পিউটারে কম্পোজ করা, যেখানে লেখকের নামই লেখা নেই।

হিজল দাশ কবি?

এ ধরনের লেখা প্রমাণ করা কঠিন যে কার রচনা। এ ছাড়া তিনি এমন উচ্ছ্বাস ও অযৌক্তিক মত প্রকাশ করেছিলেন, যা তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবু গল্পটা বলা উচিত। লেখকের নাম না-ই বললাম।

‘শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে হঠাৎ আচরণ বদলে যাওয়া যুবকটিকে সেই মুহূর্তে অচেনা ও দুর্বোধ্য ঠেকলেও অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পেরেছিলাম, এর নেপথ্য কারণ অন্যত্র। আমার সঙ্গে আলাপ করলে আশপাশের অনেকে চিনে ফেলতে পারে, বিশেষ করে সে, যার কাছ থেকে আড়াল হতেই তার এই ছদ্মাবরণ।’

‘সে’ হচ্ছে সেই মানুষটা, যে তার বাসা থেকে রাগ করে চলে গেছে; কিন্তু ভালো নেই। খেয়ে না–খেয়ে দিন কাটায়। রাতে ঘুমায় পাবলিক লাইব্রেরি চত্বর কিংবা কমলাপুর স্টেশনে। যুবক তাই পরিচিত একজনের মাধ্যমে টাকা দিতে শিল্পকলা একাডেমিতে প্রায়ই সন্ধ্যাবেলায় যায়, ওই সময়টা ‘পলাতক বন্ধু’ আসে এখানে আড্ডা মারতে; কিন্তু সুনামগঞ্জের এই বন্ধুকে কোনো অনুরোধ করবে না বাসায় যেতে।...লেখক-শিল্পীদের একটা ইগো আছে না?

*

১৯৬৭ সালের ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের উকিলপাড়ায় জন্ম নেওয়া এ মানুষটির নাম যে ধ্রুব এষ, সচেতন পাঠককে এ কথা বলার বোধ হয় আর অপেক্ষা রাখে না। দুজন মানুষকে এক জীবনে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, এর একজন শেখ আবদুল হাকিম, অপরজন ধ্রুব এষ। দুজনই জনমভর নির্ভর করেছেন সৃজনশক্তির ওপর। সৃজনে মুক্তি, সৃজনে আনন্দ, সৃজনে আয়, সৃজনই সবকিছু। অন্য কোনো পেশা নেই। এ ধরনের মানুষের দীর্ঘ আয়ুর প্রয়োজন।

অনেক অনেক কাল বেঁচে থাকুন, ভাই ধ্রুব এষ।

টীকা

১. জলধর সেন, সিকান্‌দার আবু জাফর, আহসান হাবীব ও সাগরময় ঘোষ—চার বিখ্যাত সম্পাদক।

২. পল ভেরলেন ও জ্যাঁ আর্তুর র‍্যাঁবো—ফরাসি দুই বিখ্যাত কবি, অসম বয়সের এই দুই প্রতিভাবানকে নিয়ে হরেক জনশ্রুতি রয়েছে।

৩. শিউলি—বৃহত্তর সিলেটের প্রচলিত আপ্যায়নরীতি, মেহমানকে অর্থসহ নানা উপঢৌকন দেওয়ার এই রীতিকে ‘শিউলি’ বলা হয়।