গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

আলোকচিত্রে গল্প

প্রান্তসীমায় দাঁড়ানো একটি নগরীর গল্প

অতীত পাঠের অনেক ধরনের উপায় রয়েছে। তারিখ, দলিল, স্মৃতিচারণ বা বিবরণীর মধ্য দিয়ে যেমন, আবার এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যাদের সমস্ত ভার, আবেগ ও বাস্তবতা সবচেয়ে সংক্ষেপে ধারণ করে কেবল একটি আলোকচিত্র। সময়ের সীমানা ভেদ করে টিকে থাকা এসব ছবির পেছনে থাকে একাধিক গল্প। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আমরা তুলে ধরব এমনই কোনো বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।

আলোকচিত্রী অরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁ যেকোনো আলোকচিত্র পাঠকদের জন্য একটি অনবদ্য অধ্যায়। ১৯৪৮ সালে চীনের সাংহাইয়ে তাঁর ধারণ করা ‘গোল্ড রাশ’ আলোকচিত্রটি ফটোসাংবাদিকতার এক অনন্য পাঠ হিসেবে বিবেচিত। তিনি তাঁর ক্যামেরার চারকোনা ফ্রেমে বিশ্ব-ইতিহাসের মানবিক হতাশা ও আতঙ্কের এক স্পর্শকাতর মুহূর্ত ধারণ করেছেন এবং নাম দিয়েছেন গোল্ড রাশ। আলোকচিত্রটির গল্পে পাহাড়ে সোনা খোঁজার কোনো আয়োজন দেখতে পাওয়া যায় না; বরং স্বর্ণকে উপলক্ষ করে রাস্তায় নেমে আসা মানুষের ঢল কীভাবে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মরিয়া হয়ে উঠতে পারে, তা তুলে ধরে। কার্তিয়ের-ব্রেসোঁর এই একটি আলোকচিত্র কেন এত ভার বহন করে, তা বুঝতে হলে তৎকালীন সাংহাইয়ের অর্থনৈতিক ধসের দিকে তাকাতে হয়।

১৯৪৮ সালের শেষ দিকের ঘটনা। চীনা মুদ্রা ইউয়ান কার্যত মূল্যহীন হয়ে পড়ে। কুওমিনতাং (চীন প্রজাতন্ত্রে তাইওয়ানের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল) সরকারের বিপুল সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে কমিউনিস্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের খরচ সামাল দিতে গিয়ে লাগামহীনভাবে অর্থ ছাপানো হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় পাল্টে যেতে থাকে। দিনে দিনে অবস্থা এমন হয় যে যুদ্ধের শুরুতে যেই চালের বস্তা কয়েক ইউয়ানে পাওয়া যেত, এই সময় তার দাম পৌঁছায় লাখ-লাখ ইউয়ানে। ফলে কোনো কিছুই আর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ‘গোল্ড ইউয়ান’ চালু করে। এতে নাগরিকদের নতুন একটি কাগুজে মুদ্রার বিনিময়ে ব্যক্তিগত সোনা, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা জমা দিতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু তাতেও সমাধান হয় না। একদিন যখন গোল্ড ইউয়ানও ধসে পড়ে, মানুষ বুঝতে পারে তাদের সারা জীবনে তিলে তিলে করা সঞ্চয় কেবল মূল্যহীন কিছু কাগজে পরিণত হয়েছে।

আলোকচিত্রটির গল্পে পাহাড়ে সোনা খোঁজার কোনো আয়োজন দেখতে পাওয়া যায় না; বরং স্বর্ণকে উপলক্ষ করে রাস্তায় নেমে আসা মানুষের ঢল কীভাবে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মরিয়া হয়ে উঠতে পারে, তা তুলে ধরে।

এই একটি ঘটনাকে অনেকগুলো দিক থেকে বিচার-বিবেচনা করে দেখা যায়। সময়টি ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাস। চীনা গৃহযুদ্ধ দিনে দিনে চূড়ান্ত পর্বে উপনীত হয়েছে। একদিকে মাও সে–তুংয়ের কমিউনিস্ট বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে, অন্যদিকে কুওমিনতাং সরকারের জারি করা কাগুজে মুদ্রার মূল্য দ্রুত ভেঙে পড়ছে। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে সরকার সীমিত পরিমাণ স্বর্ণ বিতরণের ঘোষণা দেয়। এমন সময় লাইফ পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে চীনে অবস্থান করছিলেন আলোকচিত্রী কার্তিয়ের ব্রেসোঁ। ঘটনাক্রমে তিনি একটি ব্যাংকের সামনে এই দৃশ্য দেখতে পান। হাজার হাজার মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিল সেই লাইনে দাঁড়িয়ে। একসময় যখন উপস্থিত মানুষের প্রায় সবার উপলব্ধি হলো যে ব্যাংকে সবার জন্য স্বর্ণ পর্যাপ্ত নেই, রাষ্ট্রই তাদের সঞ্চয় ছিনিয়ে নিয়েছে, তখন সেই অপেক্ষা রূপ নিল এক উন্মাদ ও পিষ্ট হয়ে যাওয়া ‘স্বর্ণ-দৌড়ে’।

গোল্ড রাশ, ১৯৪৮। আলোকচিত্র: অরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁ

আলোকচিত্রটি প্রথম দেখায় অনুভূতি জাগায় গাদাগাদি করা মানুষের মাঝে দমবন্ধ করা ঘনত্ব ও উন্মত্ত এক গতির। যেন কানে ভেসে আসে অপরিচিত চিৎকার আর শরীরে লাগে ভিড়ের মাঝে তৈরি হওয়া দমবন্ধ করা মানসিক চাপ। কয়েক সেকেন্ড ছবিটির দিকে তাকানো হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর, অথচ ঘটনাটি পুরোপুরি বুঝতে হলে তাকিয়ে থাকতে হয়। পুরো ফ্রেমজুড়ে ছড়িয়ে আছে একধরনের সংগঠিত বিশৃঙ্খলা। যেখানে ব্যক্তিসত্তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে সম্মিলিতভাবে, মরিয়া হয়ে ওঠা বেঁচে থাকার একটি আন্দোলনে। ইতিহাসের নির্মম চাপে পিষ্ট হয়ে যেতে থাকা মানুষের প্রতি এক গভীর সহমর্মিতা জাগে।

আলোকচিত্রী কার্তিয়ের ব্রেসোঁ একদিকে যেমন ফ্রেমে জ্যামিতির ব্যবহার করতেন, অন্যদিকে তিনি ছিলেন ‘ডিসাইসিভ মোমেন্ট’ ধারণার প্রবর্তক। অর্থাৎ সময়ের সেই কাঙ্ক্ষিত ক্ষণ, যখন চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার ভারসাম্য ও আবেগ তীব্রতার শিখরে পৌঁছে। তিনি যেই ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করতেন এবং শাটার বোতাম চাপতেন। ক্যামেরায় ধারণ করতেন ঘটনার চূড়ান্ত মুহূর্তটি।

আলোকচিত্রটি প্রথম দেখায় অনুভূতি জাগায় গাদাগাদি করা মানুষের মাঝে দমবন্ধ করা ঘনত্ব ও উন্মত্ত এক গতির। যেন কানে ভেসে আসে অপরিচিত চিৎকার আর শরীরে লাগে ভিড়ের মাঝে তৈরি হওয়া দমবন্ধ করা মানসিক চাপ।

গোল্ড রাশ ছবিটির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই পুরো ফ্রেমে প্রায় কোনো খালি জায়গা নেই। মানুষের মাথা ও কাঁধ এক ঘন কিন্তু ছন্দময় বিন্যাস তৈরি করেছে, যা বাঁ পাশের নিচের কোণ থেকে ডান পাশের ওপরের কোণের দিকে আমাদের দৃষ্টিকে চালিত করে। আমরা দেখতে পাই ঘটনাটি বিশৃঙ্খল হলেও এর মধ্যে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো রয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে দালানের ভার্টিক্যাল লাইন ও মানুষের কাঁধের হরাইজন্টাল লাইন মিলিয়ে যেন একটি অদৃশ্য জাল তৈরি হয়েছে, যা ফ্রেমের ভেতরে মানুষগুলোকে আটকে রাখছে, যা মানুষের বাস্তব সময়ে বন্দিত্বের প্রতিফলন ঘটায়। ছবিতে সামনের দিকে বা ফোরগ্রাউন্ডে উপস্থিত থাকা মানুষগুলোর মুখাবয়ব যেমন তীক্ষ্ণ, তেমনি পেছনে সরে যাওয়া মানুষের স্তরও স্পষ্ট। এই ‘ডিপ ফোকাস’ জনসমুদ্রের ব্যাপ্তি ও ঘনত্বকে আরও প্রবল করে আমাদের সামনে হাজির করে।

আলোকচিত্রী অরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁ (১৯০৮-২০০৪)

সাদাকালো আলোকচিত্রে কার্তিয়ের ব্রেসোঁ সুনিপুণভাবে টোনাল কনট্রাস্ট তৈরি করেছে। একদিকে মাথার ওপর পড়া প্রাকৃতিক আলো, অন্যদিকে প্রতিটি মানুষের ঘামে ভেজা মুখ, যা তাদের গাঢ় পোশাকের ভিড় থেকে আলাদা করে তোলে। আবার উপস্থিত মানুষের মাঝের ফাঁকে জমাট অন্ধকার পর্যাপ্ত জায়গার অনুপস্থিতিকে তীব্র করেছে। সম্পূর্ণ ভিড়কে মনে হয় যেন এক অবিভক্ত ও ঢেউ খেলানো পিণ্ড, বস্ত্র ও দেহের এক সম্মিলিত তরঙ্গ। মানুষের কোটের খসখসে উল, রোদে পোড়া ত্বকের রেখা সবকিছুকে এমনভাবে তুলে আনে, যেন তা ছোঁয়া যায়।

এই আলোকচিত্রে মানুষের ব্যক্তিগত বাঁচার সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক বিপর্যয় একসূত্রে গাঁথা। এখানে ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি কেবল স্বর্ণের জন্য নয়, একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও ভেঙে পড়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শেষ লড়াই। দর্শক যেন ভিড়ের বেশ কাছাকাছি অবস্থান করছে, এতটাই নিকটে যে নিজেকে প্রান্তসীমার সাক্ষী বলে মনে হয়। কারণ, আলোকচিত্রী কোনো টেলিলেন্স ব্যবহার করেননি। তিনি উপস্থিত ছিলেন ঘটনাস্থলের একদম কাছে। ফলে তাকে দাঁড়াতে হয়েছে মানুষের চূড়ান্ত আতঙ্কের মুখোমুখি। কার্তিয়ের ব্রেসোঁর উদ্দেশ্য কখনোই কেবল একটি ‘সুন্দর’ ছবি তোলা ছিল না। বরং তিনি ধারণ করেছেন চূড়ান্ত মানসিক চাপে সৃষ্ট হওয়া অতি সাধারণ মানুষের বাস্তব অবস্থা।

ইতিহাসবিদদের কাছে এ ঘটনা হচ্ছে সেই মুহূর্ত, যখন জাতীয়তাবাদীরা প্রকৃত অর্থে ‘স্বর্গের ম্যান্ডেট’ হারায়। এটি শুধু একটি সামরিক পরাজয় ছিল না, ছিল সরকারের প্রতি জন–আস্থার সম্পূর্ণ পতন। কার্তিয়ের ব্রেসোঁর ছবি যখন লাইফ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, বিশ্ব তখন প্রত্যক্ষ করে জাতীয়তাবাদী শাসন কীভাবে ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে। এই আলোকচিত্র একই সঙ্গে এক ব্যবস্থা ও বিফলতার দৃশ্যমান দলিল। এটি সেই নির্দিষ্ট ক্ষণকে ধরে আছে, যখন একটি সমাজ বুঝতে পারে তার মুদ্রা, তার সরকার, তার নিরাপত্তা সব একসঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।