
কিছু বই আছে, যেগুলো পড়া শেষ হলে আমরা আর আগের ‘আমি’ থাকি না। আমাদের ভেতর নতুন দিগন্ত খুলে যায়। বদলে যায় মন, জীবন-জগৎকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, অনুভব করার ক্ষমতা। এসব বই বয়স, সময় আর ভূগোল পেরিয়ে বহু মানুষের মনে আলোড়ন তোলে। এমনই এক বই নিয়ে এ রচনা।
জীবন ও জগৎকে পরিচিত ঘেরাটোপের বাইরে দেখার সুযোগ করে দেয় যেসব বই, অনুমান করি তাদের সংখ্যা অল্প। সঙ্গে সঙ্গে এ–ও মনে করি, পাঠকভেদে এই সব বই ভিন্ন হতে বাধ্য, কেননা সবার মন-মানসিকতা এক হয় না, অন্তত সব সময়ে না। এ সত্ত্বেও একই বই অনেকের কাছে মন ভালো করে দেওয়ার মতো প্রিয় হয়ে গেলে তার মধ্যে শুধু সাহিত্যগুণ কারণ হিসেবে কাজ করে না, সেখানে থাকে সহজে বোধগম্য আর অনুসরণীয় জীবনবোধ, ভারিক্কি ভাষায় ‘জীবনদর্শন’। এই জীবনবোধ বা জীবনদর্শন কোনো কোনো পাঠকের জীবন বদলে দিতে পারে এই অর্থে যে পড়ার পর জীবন ও জগতের প্রতি দৃষ্টি তার বদলে যায়, সামান্য হলেও।
জীবন বদলে দেয়নি, কিন্তু দেখা আর চিন্তার ধরন বদলে দিয়েছে, এমন খুব বেশি বই পড়া হয়নি আমার। তরুণ বয়সে যে বই পড়ে জীবন ও জগৎকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে পেরেছি, সেটি দ্য লিটল প্রিন্স। লেখকের নাম আতোয়াঁ দা সাঁ-জুপেরি। ফরাসিভাষী সাঁ-জুপেরি জন্মেছিলেন ১৯০০ সালে ফ্রান্সের লিও শহরে। ছোটবেলায় তাঁর ইচ্ছা ছিল শিল্পী হবেন। কিন্তু মা–বাবা নিরুৎসাহিত করায় হলেন বিমানচালক। সেই পেশা তাঁকে কথাশিল্পী হওয়ার পথ খুলে দিল অসীম নীলিমায় একাকী উড়ে বেড়াবার সুযোগ করে দিয়ে।
একই বই অনেকের কাছে মন ভালো করে দেওয়ার মতো প্রিয় হয়ে গেলে তার মধ্যে শুধু সাহিত্যগুণ কারণ হিসেবে কাজ করে না, সেখানে থাকে সহজে বোধগম্য আর অনুসরণীয় জীবনবোধ, ভারিক্কি ভাষায় ‘জীবনদর্শন’।
সাঁ-জুপেরির নাম আমি প্রথম জানতে পারি পঞ্চাশের দশকে কলেজে পড়ার সময় রঞ্জনের লেখা বই-এর বদলে বইতে সাঁ-জুপেরির নাইট ফ্লাইট-এর রিভিউ পড়ে। সিঙ্গেল ইঞ্জিনের ছোট বিমান চালিয়ে ডাক (মেইল) নিয়ে যুদ্ধে মত্ত ইউরোপ থেকে পাড়ি দিচ্ছেন আফ্রিকায়, কয়েকবার ভূপতিত হয়েছেন বিমান অচল হয়ে; এমন এক রোমান্টিক অ্যাডভেঞ্চারারের লেখার প্রতি অনেকের মতো আকর্ষণ জন্মাতে সময় লাগেনি আমারও। আমেরিকায় গিয়ে ষাটের দশকে ছাত্রজীবনে পড়েছি তাঁর লেখা বই উইন্ড, স্যান্ড অ্যান্ড দ্য স্টার, নাইট ফ্লাইট ও দ্য ফ্লাইট টু আরাস। আঁদ্রে জিঁদ তাঁর বই পড়ে দেখতে পেয়েছিলেন একধরনের দার্শনিকতা, যার সঙ্গে মিল রয়েছে ভুয়ো বা লোকজ দর্শনের। তখনই রোমান্টিক-রোমাঞ্চ ঘরানার লেখার জন্য সাঁ-জুপেরি খ্যাত হন ‘নীলিমার যোশেফ কনরাড’ অভিধায়। যোশেফ কনরাড সমুদ্রে নাবিকজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিলেন।
সাঁ-জুপেরির শেষ লেখা দ্য লিটল প্রিন্স পড়ার জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হলো বেশ কয়েক বছর। নিজের অজ্ঞতার জন্যই এই বিলম্ব। তাঁর বিমানচালক–জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বইগুলোয় এমনভাবে বুঁদ হয়ে ছিলাম যে এর বাইরে তিনি কী লিখেছেন, তা জানার আগ্রহ ছিল না। হঠাৎ করে, অনেক বছর পর, নব্বই দশকের গোড়ায় নিউমার্কেটের অধুনা লুপ্ত বইয়ের দোকান ‘জীনাত বুক হাউসে’ গিয়ে তাঁর লেখা দ্য লিটল প্রিন্স চোখে পড়ল। প্রথমে ভাবলাম, ছোটদের জন্য লেখা রূপকথা-কল্পকথা হবে। পুরোনো কৌতূহলে বইটা কিনে বাসায় এসে হেলাফেলা করে কিছু দূর পড়ার পর সোজা হয়ে বসতে হলো। তারপর একটানা পড়ে শেষ করলাম চটি বইটা। পড়ার পর বিষণ্নতা আর তার বিপরীতে অপার্থিব এক অনুভবের আনন্দ-শিহরণে স্তব্ধ হয়ে থাকতে হলো কিছুক্ষণ। এমন অভিজ্ঞতা সব বই পড়ে হয় না, অন্তত আমার ক্ষেত্রে না। এককথায়, সাঁ-জুপেরির দ্য লিটল প্রিন্স মৃদু হলেও মনে আলোড়ন তুলবে, যার রেশ জেগে থাকবে অনেকক্ষণ। আর এত বছর পর, নব্বই বছর স্পর্শ করতে যাচ্ছি, এই মুহূর্তে ‘কোন বই জীবন বদলে দিয়েছে?’ এ কথা ভাবতে গিয়ে দ্য লিটল প্রিন্স-এর কথাই প্রথমে মনে এল। অথচ এটি এমন এক বই যা শুধু আপাতদৃষ্টে নয়, পড়ার পর মনে হবে কিশোর উপন্যাস, তা–ও বাস্তবের কিছু নয়, নিছক কল্পকাহিনি। কিন্তু এই বই অল্পবয়সীদের কাছে যেমন জনপ্রিয়, একইভাবে প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকদের কাছে টেনে তাঁদের মনেও করেছে গভীর রেখাপাত।
১৯৪৩ সালে নিউইয়র্কে প্রথমে প্রকাশনার পর ১৯৪৫ সালে ফ্রান্সে ছাপা হয় দ্য লিটল প্রিন্স। নিজ দেশে দেরিতে বইটি ছাপা হওয়ার কারণ হলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জার্মানি ফ্রান্সকে দখল করে নেওয়ার পর সাঁ-জুপেরি দেশ ছেড়ে নিউইয়র্কে আশ্রয় নেন। সেখানে তাঁর দেখা হয় ইউরোপের অন্য স্বেচ্ছানির্বাসিত শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে, যাঁদের মধ্যে ছিলেন সুররিয়েলিজমের পথিকৃৎ আদ্রেঁ ব্রেতো, শিল্পী হুয়ান মিরো, সালভাদোর দালি, ম্যাক্স আর্নস্ট, ইভঁ তাগেঁ, মার্সেল দুশাম্প প্রমুখ। ফ্রান্সের দার্শনিক-রোমাঞ্চ লেখকের খ্যাতি নিয়ে সাঁ-জুপেরি এবার স্পেনের গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা লিখবেন, এ–ই ছিল যখন সবার প্রত্যাশা, তখন তিনি ভাবছিলেন যুদ্ধ ও বিপ্লবের অসারতা এবং তার পেছনে মানুষের নির্বুদ্ধিতার কথা। তিনি এমন একটি বই লেখার পরিকল্পনা করছিলেন, যা একই সঙ্গে হবে কিশোর-পাঠ্য এবং বয়ঃপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশে নিবেদিত। যখন তিনি দ্য লিটল প্রিন্স লিখে শেষ করলেন, তা পড়ার পর নিউইয়র্কে স্বেচ্ছানির্বাসিত শিল্পী-সাহিত্যিকেরা বললেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই ছাপতে হবে এই বই, কেননা দ্য লিটল প্রিন্স যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়া বয়ঃপ্রাপ্তদের বোকামির কথা বলেছে।
জীবন বদলে দেয়নি, কিন্তু দেখা আর চিন্তার ধরন বদলে দিয়েছে, এমন খুব বেশি বই পড়া হয়নি আমার। তরুণ বয়সে যে বই পড়ে জীবন ও জগৎকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে পেরেছি, সেটি দ্য লিটল প্রিন্স। লেখকের নাম আতোয়াঁ দা সাঁ-জুপেরি।
১৯৪৩ সালে প্রথম প্রকাশের পর বইটি ৩০০ ভাষায় অনূদিত হয়ে ছাপা হয়েছে এবং বিক্রি হয়েছে অগণিত সংখ্যায়। অনেক বছর পর (আশির দশকে) পাওলো কোয়েলহো লিখেছেন প্রায় এই শ্রেণির একটি বই, দ্য আলকেমিস্ট, যা বেস্টসেলার হয়েছে। কিন্তু সাঁ-জুপেরির দ্য লিটল প্রিন্স–এর সঙ্গে সর্বাংশে তুলনীয় আর কোনো বই এখনো লেখা হয়নি। কী আছে এই বইতে, যার জন্য এখনো আগ্রহ নিয়ে এই বই পড়ে সব বয়সের মানুষ, পৃথিবীব্যাপী?
কাহিনি বলার আগে বইটি লেখার পটভূমি জানানো দরকার, যা সাঁ-জুপেরি নিজেই বলেছেন ১৯৩৯ সালে লেখা উইন্ড, স্যান্ডস অ্যান্ড স্টার বইতে এক বিমানচালকের মুখে, ‘আমি নিজের পরিস্থিতি চিন্তা করলাম। পায়ের নিচে মরুভূমিতে বালু আর মাথার ওপরে আকাশের তারার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিপদে পতিত আমি জীবনের সব চেনা ঠিকানা থেকে নির্বাসিত। নৈশব্দ্য ছাড়া আমাকে সঙ্গ দেওয়ার কেউ নেই। এখনো শ্বাস নিতে পারছি, এ ছাড়া কোনো ভরসা নেই আমার। এই আশাহীন অবস্থায়ও অবাক হলাম এই ভেবে যে এখনো স্বপ্ন দেখছি আমি। স্বপ্নের ছবিগুলো আসছে প্রস্রবণের ধারার মতো শব্দ না করে। যেন স্মৃতির জাদুতে মোহাবিষ্ট হয়ে আছি আমি।’
বইতে বিমান দুর্ঘটনায় মরুভূমিতে একাকী বিপন্ন চালকের চিন্তায় যে আশার স্বপ্ন, সেটি সাঁ-জুপেরির নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা। তিনি এক বিমান দুর্ঘটনায় ওপরে বর্ণিত বইটির চালক-বর্ণনাকারীর মতো সাহারা মরুভূমিতে ক্ষুৎপিপাসায় মুমূর্ষু হয়ে পড়েছিলেন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পড়েও চরম দুর্বিপাকে আশা জেগে ছিল তাঁর মনে। সেই মনোবল তাঁকে মৃত্যু থেকে রক্ষা করেছিল। আর তখনই তাঁর মনে রোপিত হয়েছিল ‘লিটল প্রিন্সে’র বীজ।
লিটল প্রিন্সের কণ্ঠস্বর প্রকৃতপক্ষে তাঁর নিজের, সে তাঁর অলটার ইগো। শৈশব থেকে লিটল প্রিন্সের কণ্ঠস্বর বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এ কথা বলেছেন তিনি। ছোটবেলায় ছবি আঁকতেন দেখে অভিভাবকেরা কাণ্ডজ্ঞানহীন তাঁকে ভূগোল, ব্যাকরণ আর জ্যামিতি পড়তে বলেছেন। ছয় বছর বয়সে তাঁকে ত্যাগ করতে হয় ছবি আঁকা আর ভবিষ্যতে শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন। দ্যলিটল প্রিন্স বইটির শুরুতে বর্ণনাকারীর মুখ দিয়ে বৈষয়িক জ্ঞানসর্বস্ব অভিভাবকদের এই অবিমৃশ্যকারিতার কথা বলেছেন তিনি। একইভাবে জানিয়েছেন, বয়স বৃদ্ধির পর বয়ঃপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দৈনন্দিনের জাগতিক চিন্তার অসারতা সম্বন্ধে তাঁর ছোটবেলার যে ধারণা, তার পরিবর্তন হয়নি। তিনি দুঃখ করে বলেছেন, তাঁকে বড়দের স্বার্থসম্পন্ন জগতে তাঁদের একজন হয়ে ভান করে থাকতে হয়েছে বিমান দুর্ঘটনায় সাহারা মরুভূমিতে পড়ার আগে। ক্ষুৎপিপাসায় কাতর তিনি মরুভূমিতে দ্বিতীয় দিনের ভোরে শুনতে পেলেন, কেউ যেন তাঁকে ডাকছে। তাকিয়ে দেখলেন, ঝলমলে রাজকীয় পোশাকে এক খুদে রাজকুমার তাঁকে বলছে, ‘আমাকে একটা ভেড়ার ছবি এঁকে দাও।’
বর্ণনাকারী ছোটবেলায় যে হাতির ছবি এঁকেছিলেন, তা আঁকার পর রাজকুমার দেখে বলল, ‘এত বড় না। আমি যে গ্রহ থেকে এসেছি, সেখানে সবকিছু ছোট। তুমি ভেড়া এঁকে দাও।’
বর্ণনাকারী তখন একটা বাক্স এঁকে বললেন, ‘এর ভেতরে তোমার ভেড়া আছে।’
দেখে খুশি হয়ে খুদে রাজকুমার বলল, ‘ভেড়াটা কি খুব বেশি ঘাস খাবে? আমি যেখানে থাকি, সেই গ্রহে ঘাসের অভাব। ভেড়া ঘাস খেয়ে ফেললে মরুভূমি হয়ে যাবে।’
বর্ণনাকারী বিমানচালক বললেন, ‘এটা ছোট ভেড়া। ঘাস কম খাবে। এই নাও দড়ি। ভেড়া বেঁধে রাখো। তা হলে যখন-তখন ঘাস খাবে না।’
শুনে শিউরে উঠল রাজকুমার। ব্যথিত হয়ে বলল, ‘না। বাঁধলে ও মন খারাপ করবে। তা ছাড়া সে কত দূরই–বা যাবে? আমি যেখান থেকে এসেছি, সেটা ছোট জায়গা।’
নব্বই দশকের গোড়ায় নিউমার্কেটের অধুনা লুপ্ত বইয়ের দোকান ‘জীনাত বুক হাউসে’ গিয়ে তাঁর লেখা দ্য লিটল প্রিন্স চোখে পড়ল। প্রথমে ভাবলাম, ছোটদের জন্য লেখা রূপকথা-কল্পকথা হবে। কিছু দূর পড়ার পর সোজা হয়ে বসতে হলো।
এরপর দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বর্ণনাকারী বয়স্কদের হিসাব করে সবকিছু দেখা আর বিচার করার অভ্যাস নিয়ে তাঁর হতাশার কথা জানিয়ে শুরু করেন খুদে রাজকুমারের সঙ্গে মরুভূমিতে আনন্দে দিন কাটানোর কাহিনি। জীবনে এই প্রথম তিনি একজনকে পান, যার মধ্যে তাঁর মতো শিল্পীর কল্পনাশক্তি রয়েছে এবং যে জীবনকে বড়দের চেয়ে ভিন্নভাবে দেখে। অবশ্য তিনি সঙ্গে সঙ্গে খুদে রাজকুমারের গল্প বলেন না। রাজকুমারের সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা হওয়ার ছয় বছর পর তিনি লেখেন দ্য লিটল প্রিন্স। বয়সে যাঁরা বড়, তাঁদের ‘বিজ্ঞতার অজ্ঞতা’ সম্পর্কে সচেতন হয়ে তিনি লিখেছেন খুদে রাজকুমারের সঙ্গে মরুভূমিতে তাঁর দিনগুলোর কথা।
খুদে রাজকুমার জানতে চাইল, তার ভেড়া বাওবাবগাছ খেতে পারবে কি না।
আমি বললাম, বাওবাব অনেক বড়। ভেড়া কী করে খাবে অত বড় গাছ?
রাজকুমার বলল, বাওবাব ছোট হয়ে মাটি থেকে ওঠে। ভেড়া তখন খেতে পারে। তা হলে ঘাস কম খাবে সে।
আমি বললাম, এটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
রাজকুমার বলল, বাওবাব অন্য গাছ খেয়ে ফেলে। ঘাস জন্মাতে দেয় না। ওটা খারাপ গাছ। তাই ছোট থাকতেই তুলে ফেলা উচিত। ভেড়া ছোট বাওবাব খেলে খুব ভালো হবে। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলে, ভেড়া ফুল খেয়ে ফেলবে না তো?
খেতে পারে। আমি খুব স্বাভাবিক স্বরে বলি।
‘খেতে পারে! তুমি দেখি বড়দের মতো আবেগহীন হয়ে কথা বলছ। আমি ভেবেছি তুমি অন্য স্বভাবের।’ খুদে রাজকুমারের স্বরে ক্ষোভ।
শুনে আমি বলি, দেখি ফুল বাঁচাবার জন্য কী করা যায়।
খুদে রাজকুমার তার গ্রহে ফুল রক্ষা করার জন্য কী করেছে, সে কথা বলে। বুঝতে পারি, সে শুধু ঘাস নয়, ফুলও ভালোবাসে। মনে হয়, সুন্দর সবকিছু তার প্রিয়।
এরপর খুদে রাজকুমারের সঙ্গে লেখক-বর্ণনাকারীর (আমি) যেসব বিষয়ে আলাপ হয়, তার সারসংক্ষেপ এই—
খুদে রাজকুমার বিভিন্ন গ্রহে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে এক ব্যবসায়ীর কথা বলে যে আকাশের সব তারাকে তার সম্পত্তি বলে ভাবে। কিন্তু সে তারাগুলো গুনতে এত ব্যস্ত থাকে যে কোনো তারার সৌন্দর্য জানার সময় পায় না। বলার পর সে ব্যবসায়ীর নীরস জীবন নিয়ে ঠাট্টা করে।
এক ভূগোলবিশারদের কথা বলতে গিয়ে রাজকুমার জানায়, তিনি ম্যাপ তৈরিতে এত ব্যস্ত যে মাঠে ফুটে থাকা ফুল দেখে সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন না। বরং বিরক্ত হন এই জন্য যে ফুল তাঁর কাজে বাধা দেয়। বেচারা! বলে হাসে খুদে রাজকুমার।
এক ট্রেনচালকের কথা বলে খুদে রাজকুমার, যে নানা পথে দ্রুত ট্রেন চালিয়ে নিয়ে যায়। ট্রেনের কেন যে এত ঘোরাঘুরি, তা বয়স্ক যাত্রীরা বোঝে না। কিন্তু অল্প বয়সের যাত্রীরা খুব আনন্দ পায় এতে। তারা চলন্ত ট্রেনের কামরার জানালায় মুখ রেখে বাইরের দৃশ্য দেখে উল্লাস করে।
খুদে রাজকুমার এক বিক্রেতার কথা বলে যে পিপাসা নিবারণের জন্য একটা ওষুধ বিক্রি করে ক্রেতাকে আশ্বাস দেয় যে খাওয়ার পর তারা প্রতি সপ্তাহে তেপ্পান্ন মিনিট সাশ্রয় করতে পারবে। খুদে রাজকুমার শুনে ব্যবসায়ীকে বলেছিল, ‘আমার যদি তেপ্পান্ন মিনিট খরচ করার থাকত, তাহলে আমি হেলেদুলে একটা পরিষ্কার পানির ফোয়ারার কাছে যেতাম।’ তারপর রাজকুমার বর্ণনাকারী-বিমানচালকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মরুভূমির সৌন্দর্য কী, জানো? তার মধ্যে কোথাও না কোথাও একটা কুয়া লুকিয়ে আছে। খুঁজলেই পাওয়া যায়।’
বিমানচালক বলল, ‘আমার খুব তেষ্টা পেয়েছে।’
খুদে রাজকুমার বলল, ‘চলো, আমরা কুয়া খুঁজি। মরুভূমি এক মজার জায়গা। কোথাও না কোথাও কুয়া লুকিয়ে রেখেছে।’
এক ভূগোলবিশারদের কথা বলতে গিয়ে রাজকুমার জানায়, তিনি ম্যাপ তৈরিতে এত ব্যস্ত যে মাঠে ফুটে থাকা ফুল দেখে সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন না। বরং বিরক্ত হন এই জন্য যে ফুল তাঁর কাজে বাধা দেয়। বেচারা! বলে হাসে খুদে রাজকুমার।
তারপর হেঁটে যেতে যেতে রাজকুমার এক বাতি জ্বালানো লোকের কথা বলে। সে বাতি জ্বালানো আর নেভানোর সময় চিৎকার করে বলে, ‘হুকুম হলো পালনের জন্য। এই আমি যেমন ওপরওয়ালার হুকুমে বাতি জ্বালি আর নেভাই।’
রাজকুমার বলে, ‘একমাত্র এই লোকটাকেই আমার বিজ্ঞ বলে মনে হয়। সে সবার জন্য অন্ধকারে আলো জ্বালায়। ভোর হলে নিভিয়ে দেয়।’
এক মদ্যপের কথা বলে হাসে রাজকুমার। ‘সে মদ খায় কেন, জানো? মাতাল হলে লজ্জা পায়, সেই জন্য। বয়স্করা ফাঁকি দিতে কত যে মিথ্যা কথা বলে! কিছু মিথ্যা খুব মজার।’
কুয়ার খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে রাজকুমার তার অভিজ্ঞতার কথা বলে। একসময় সে আর বিমানচালক পানির কুয়া পেয়ে যায়। আর তখনই অদৃশ্য হয় রাজকুমার। যাওয়ার আগে সে বলে, ‘বয়সে বড় যারা, তাদের অধিকাংশই উদ্ভট স্বভাবের। তারা শুধু জানে হিসাব করতে। আকাশের তারা আর গ্রহের ঘাস, ফুলের সৌন্দর্য তারা দেখতে পায় না। শুধু তোমাকে দেখলাম অন্য রকম।’
আমি বললাম, আমি যে বুকের মধ্যে ছোটবেলার মন নিয়ে ঘুরছি এখনো।
অদৃশ্য হওয়ার আগে খুদে রাজকুমার বলল, শুধু হৃদয় দিয়েই দেখা যায়। সত্য আর সুন্দর সবার চোখে পড়ে না।
দ্য লিটল প্রিন্স লেখার পর সাঁ-জুপেরি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগের মতো আবার ডাক নিয়ে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে উত্তর আফ্রিকায় প্লেন চালিয়ে যান, ফিরে আসেন। একবার এভাবে উড়ে যাওয়ার সময় তাঁর প্লেন নিখোঁজ হয়। তাঁর প্লেনের ধ্বংসাবশেষ বা তাঁর মৃতদেহ, কিছুই পাওয়া যায়নি।
দ্য লিটল প্রিন্স সাঁ-জুপেরিকে অমরত্ব দিয়েছে। আলোড়িত করেছে, করে যাচ্ছে অগণিত পাঠকের মন। যেমন করেছে আমাকে, যে জন্য এই বইয়ের কথাই মনে এল ‘মন বদলে দেওয়া বই’-এর কথা ভাবতে গিয়ে।