
‘আমরা অনেক অনেক দিন পর একসঙ্গে হয়ে একটা প্রাপ্তবয়স্কদের ফিল্মে অভিনয় করছি।’ এই মন্তব্য তৌকীরের। অভিনেতা তৌকীর আহমেদকে দেখলে মনে হবে গম্ভীর প্রকৃতির—ঠাট্টা করা, ঠাট্টা না–বোঝা মানুষ। আসলে মানুষটা রসে ভরপুর। ঠাট্টা, কৌতুকপূর্ণ কথা বলতে পারে বেশ।
তৌকীররা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের। প্রায় ১০ বছর আগে আমরা একসঙ্গে অভিনয় করেছিলাম। সেটা বিপাশা হায়াতের লেখা একটা টেলিফিল্ম। নির্মাণ করেছিল আরিফ খান। কার সঙ্গে কে কখন, কত দিন পর অভিনয় করা হচ্ছে, এটা মাঝে মাঝে হিসাব করার বিষয় হয়ে ওঠে। কেন হয়ে ওঠে?
এখনো মাঝে মাঝে মনে হয়, ভাবি, শ্রদ্ধেয় আলী যাকের, আবদুল্লাহ আল–মামুন, গোলাম মুস্তাফা—এ রকম আরও অনেকের সঙ্গে আবার যদি অভিনয় করতে পারতাম। সে সুযোগ আর হবে না। হুমায়ুন ফরীদির সঙ্গে শেষ অভিনয় করেছিলাম কবে! কত বছর আগে, হিসাব করি।
মানুষটা নেই। আমার খুব প্রিয় মানুষ, প্রিয় অভিনেতা ছিল সে। তার সঙ্গে অভিনয় করা ছিল আনন্দের। ফরীদির সঙ্গে যাদের অভিনয়ের স্মৃতি রয়েছে, প্রত্যেকেই গালভরা হাসি নিয়ে বলবে, হুমায়ুন ফরীদির সঙ্গে অভিনয় করা শুধু আনন্দের নয়, অনেক অনেক উপভোগ্যও ছিল।
ফুটবল খেলায় চমৎকার পাস দেখলে মনে হয়, মঞ্চে বা ক্যামেরার সামনে দুজন অভিনয়শিল্পী সংলাপ দেওয়া–নেওয়ার যে কাজটা করে, তা অভিনয়, তবে তার সঙ্গে শিল্পিত ফুটবল খেলার অনেক মিল।
মাঠে কোন খেলোয়াড় কখন কার কাছে বলটা পাঠাতে চায়, সেটা আর একজন খেলোয়াড়কে অগ্রিম বুঝে নিতে হয়। বুঝে জায়গায় থাকা এবং সুবিধা তৈরি করে পাঠানো বলটা ফেরত পাঠাতে পারলেই খেলা জমে ওঠে। অভিনয় জমাতেও এই দেওয়া–নেওয়া, পরস্পরের বোঝাপড়াটা দরকার হয়।
একজন শিল্পীর সঙ্গে অভিনয়ের কালে আর একজন শিল্পীকে খেলার মাঠের খেলোয়াড়ের মতোই যথেষ্ট সচেতন, সতর্ক থাকতে হয়। এই সচেতনতা, সতর্কতা বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার সম্পর্ক সু–অভিনয়ের জন্য দরকারি।
অভিনয়শিল্পী মনেপ্রাণে একটা চরিত্রকে ধারণ করে চলে, বলে, ভাবে। তা নিজে ধারণ করার পাশাপাশি সহশিল্পীর মধ্যেও তেমন ধারণ করার চেষ্টা রয়েছে, এমন বুঝলে ফুলের পাপড়ি খোলার মতো অভিনয়ও খোলে। সহশিল্পীর গুণ নিজ মনে সাহস, স্বস্তি জোগায়, আত্মবিশ্বাস দৃঢ় করে। সে কারণেই শিল্পীর মনে হয়, অমুক অমুকের সঙ্গে অভিনয় করা আনন্দের, বিশেষভাবে ভালো লাগে।
সম্প্রতি মঞ্চে ফেরদৌসী মজুমদারের লাভ লেটার নাটকে অভিনয় পাঠ দেখে মনে হয়েছিল শিল্পীর শরীর বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তা প্রকৃতির নিয়ম, কিন্তু সে নিয়মের তোয়াক্কা না করার শক্তি কোনো কোনো শিল্পী, সৃজনশীল মানুষের থাকে। শিল্পীর মনে আরও থাকে অসম্ভবের কেশর ধরে ঝাঁকি দেওয়ার শক্তি ও সাহস।
অভিনয়ের প্রেমে কেটে গেছে ৫০ বছর। বহু শিল্পী রয়েছেন যাঁদের সঙ্গে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা অসাধারণ। অনেক অসাধারণ শিল্পীর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছি, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে অভিনয় করা হয়ে ওঠেনি। আর হবেও না, ভাবলে মনে হয়, জীবনটা আরও আরও প্রেরণাদায়ক, সৌভাগ্যের হতে পারত।
মহিমাময় ফেরদৌসী মজুমদারের সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগ বিশেষ প্রাপ্তির মতোই। একসময় মঞ্চ ও টেলিভিশন তাঁর দুর্দান্ত অভিনয়–ক্ষমতায় কেঁপেছে, ঝলসে উঠেছে। সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। এখন নিভৃতে জীবন কাটানোর কথা, কিন্তু তিনি হার না–মানা গোত্রীয় মানুষ। এখন বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না। চলতে–ফিরতে পারেন, কিন্তু তা বেশ চেষ্টা ও কষ্ট করে। এমন দশায় সাধারণ মানুষ মনে দুঃখ জমিয়ে ঘরে, নির্জনে বসে থেকে অতীত স্মৃতি নাড়াচাড়া করেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। প্রবল সচল কোনো মানুষ যখন বুঝতে পারেন নিজের শরীর কথা শুনছে না বলে সীমিত নড়াচড়া করে জীবন কাটাতে হচ্ছে, তখন হতাশা জাগে, অভিমান বাড়ে। পৃথিবী ও নিকটের অনেক মানুষ পর হয়ে গেছে মনে হয়।
প্রকৃত শিল্পী কোমল এবং একই সঙ্গে প্রবল কঠিনও। সারা জীবন অসংখ্য বাস্তবতা অস্বীকার করে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও শিল্পী নিজ কর্মের গৌরব ধারণ করে দীপ্যমান থাকতে পারেন।
সম্প্রতি মঞ্চে ফেরদৌসী মজুমদারের লাভ লেটার নাটকে অভিনয় পাঠ দেখে মনে হয়েছিল শিল্পীর শরীর বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তা প্রকৃতির নিয়ম, কিন্তু সে নিয়মের তোয়াক্কা না করার শক্তি কোনো কোনো শিল্পী, সৃজনশীল মানুষের থাকে। শিল্পীর মনে আরও থাকে অসম্ভবের কেশর ধরে ঝাঁকি দেওয়ার শক্তি ও সাহস।
সপ্তাহখানেক একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কর্মে, ভাবনায়, আলোচনায়, আনন্দে কাটিয়ে দেওয়ার পর মনে হয়েছে, শ্রদ্ধেয় ফেরদৌসী মজুমদার, মামুনুর রশীদ—এঁদের যে মাত্রার প্রাণশক্তি, তার ছিটেফোঁটা ওই বয়সে পৌঁছে আমাদের প্রাণে কি থাকবে!
জোহরা বেগমের ইচ্ছাপত্র আমাদের অনেককে কয়েকটা দিন খুবই অনুপ্রাণিত করেছে। মনে হয়েছে, এ যেন পুরোনো জীবন নতুন করে ফিরে পাওয়া গেছে।
মহড়া হবে। তারিখ–সময় ঠিক করা হচ্ছে। শ্রদ্ধেয় মামুনুর রশীদের সেদিন অনেক ব্যস্ততা। তিনিও ভেবেছেন যতই ব্যস্ততা থাকুক কয়েক প্রজন্মের শিল্পী একত্রে অভিনয় করছে, এমন সুযোগ প্রায়ই আসে না। দেখেছেন, মহড়া দেওয়ার জন্য সবারই অনেক আগ্রহ। তিনি বললেন, ‘যে করেই হোক আমি ঘণ্টা দুয়েকের জন্য আসব, থাকব সবার সঙ্গে।’
জোহরা বেগমের ইচ্ছাপত্র তৌকীর আহমেদের লেখা একটা টেলিফিল্মের নাম। পরিচালক আরিফ খান ঈদে ফিল্মটা নির্মাণ করতে চান। মাসখানেক আগে পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলে পড়ে খুব ভালো লাগে। তৌকীরের সঙ্গে দেখা হলে বলি, এটা টেলিভিশনের জন্য না হয়ে বড় পর্দার ছবি হতে পারত।
আজকাল টেলিভিশন নাটকের জন্য মহড়া হয় না। জোহরা বেগমের ইচ্ছাপত্র–তে কারা কারা অভিনয় করবেন, জানার পর সবারই ইচ্ছা জাগে, একসঙ্গে বসব, মহড়া হবে। মহড়া হয়। সেই মহড়ায় দীর্ঘ সময় কাটিয়ে মনে হয়, একদা যেমন জীবন ছিল আমাদের, অভিনয়কালে যেমন উত্তেজনা, আনন্দবোধ হতো, তা যেন হুবহু ফিরে পাওয়া গেছে। এই অনুভূতি একা আমার নয়, প্রকাশ করতে দেখি প্রায় সবাইকে।
এই নাটকের অধিকাংশ শিল্পী মঞ্চের সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন দলের। বোধ হয় সে কারণেই সবার মধ্যে একসঙ্গে অভিনয় করার এক বাড়তি আগ্রহ, উত্তেজনা ছিল।
মহড়া হবে। তারিখ–সময় ঠিক করা হচ্ছে। শ্রদ্ধেয় মামুনুর রশীদের সেদিন অনেক ব্যস্ততা। তিনিও ভেবেছেন যতই ব্যস্ততা থাকুক কয়েক প্রজন্মের শিল্পী একত্রে অভিনয় করছে, এমন সুযোগ প্রায়ই আসে না। দেখেছেন, মহড়া দেওয়ার জন্য সবারই অনেক আগ্রহ। তিনি বললেন, ‘যে করেই হোক আমি ঘণ্টা দুয়েকের জন্য আসব, থাকব সবার সঙ্গে।’
সবার মধ্যেই সাজ সাজ রব ছিল, বহুকাল পরে ফেরদৌসী মজুমদার অভিনয় করবেন, তা যেন মহা আনন্দের এক উৎসবের মতো হয়ে ওঠে। নির্মাতা আরিফ খান বললেন, ‘সবাই একসঙ্গে হচ্ছেন, এমন বিশেষ দিনে বিশেষ খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হয়।’
তা করা হয়েছিল। সবার মন অভিনয়ের আনন্দে ভরপুর ছিল, পেটও ভরল সুস্বাদু অষ্টব্যঞ্জনে। লেখার জন্য তৌকীরের প্রশংসার পাশাপাশি রান্নার হাত ও মহড়া বিশেষ করে তোলার জন্য আরিফ খানও প্রশংসা পেল।
রওনক হাসান, জাকিয়া বারী মম, দীপা খন্দকার আমাদের পরের প্রজন্মের অভিনয়শিল্পী। তৌকীর আহমেদ আমার পরের প্রজন্মের। আমার আগের প্রজন্মের হলেন ফেরদৌসী মজুমদার, মামুনুর রশীদ। এই কয়েকটি প্রজন্ম একসঙ্গে হয়ে একটা নাটকে অভিনয় করতে চাওয়া রোজকার ঘটনা নয়। অতি বিশেষ ঘটনা বলে মনে হওয়াও একপ্রকার সুখদায়ক অনুভূতি।
মনে হয়, এই তো সেদিন আমরা কজন রেলভ্রমণে বেরিয়ে ভুল করে একটা স্টেশনে নেমে পড়েছিলাম। পরের ট্রেন আসার আগপর্যন্ত সময় কেটেছে চমৎকার। সময় তো গড়িয়ে চলে যেতেই আসে। একসময় প্রত্যেকের গন্তব্যের ট্রেন এসে গিয়েছিল। একে একে সবাই উঠে পড়েছি যার যার গন্তব্যের ট্রেনে।
অনেক রকম উল্লেখ করার মতো স্মৃতি তৈরি হয়েছে। আরিফ খান গুলশানে এক চমৎকার বাড়িতে শুটিংয়ের আয়োজন করেছিল। সে আয়োজনের কথা শুনে ভালো লাগেনি। কারণ, মানুষ বাস করে এমন বাসায় শুটিং করা শিল্পীদের কাছে অস্বস্তিকর লাগে। শুটিংয়ের প্রয়োজনে লাগবে একটা বড়সড় বাড়ি, অতএব বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অস্বস্তি সত্ত্বেও যেতে হলো।
সে বাড়ির গৃহকর্ত্রী, কর্তা বললেন, ‘দু–চার দিনের মধ্যে এ বাড়িটা ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হওয়ার কথা। তাই আমাদের মনে হলো, এতজন সম্মানিত শিল্পীকে একত্রে আমাদের এ বাড়িতে পাব, সেটা এ বাড়ির শেষ দিকে বিশেষ আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকবে। আমাদের মন ভালো নেই, কিন্তু ভালো লাগছে, আপনারা এসেছেন বলে এ বাড়ির শেষ মধুর স্মৃতি হয়ে থাকবেন।’
সব আনন্দময় অভিজ্ঞতা বয়ান করা সহজ নয়। কদিন ধরে সবাই শুধু অভিনয় করিনি, অভিনয়ের বাইরে আগ্রহ নিয়ে পরস্পরকে অনুভব, উপলব্ধির চেষ্টা করে গেছি। বহুবর্ণের উষ্ণতা, অনেক রকম আনন্দ, স্মৃতির আদান–প্রদান চলেছে। সময় অনর্গল মূল্যবান স্মৃতি রচনা করতে করতে গড়িয়ে গেছে।
এক সন্ধ্যায়, দৃশ্যধারণের ক্ষণকালীন বিরতিতে তৌকীর আহমেদ হাসতে হাসতে বলে, ‘কদিন বড়দের সাথে ওঠাবসা, অভিনয়ের অভিজ্ঞতায় মনে হচ্ছে, প্রাপ্তবয়স্কদের নাটকে অভিনয় করছি।’
সে কথায় হা হা হো হো করে হাসলাম সবাই। মাত্র সেদিনের কথা। এখন শুধু স্মৃতি হিসেবে বলতে ভালো লাগছে। মনে হয়, এই তো সেদিন আমরা কজন রেলভ্রমণে বেরিয়ে ভুল করে একটা স্টেশনে নেমে পড়েছিলাম। পরের ট্রেন আসার আগপর্যন্ত সময় কেটেছে চমৎকার। সময় তো গড়িয়ে চলে যেতেই আসে। একসময় প্রত্যেকের গন্তব্যের ট্রেন এসে গিয়েছিল। একে একে সবাই উঠে পড়েছি যার যার গন্তব্যের ট্রেনে। আবার হয়তো কখনো আর এক স্টেশনে নেমে পড়ে মধুর স্মৃতি রচনা করার সুযোগ আসবে। নিশ্চয়ই আসবে। আশা আছে, থাকে বলেই এ জীবন অনেক মধুর। এই বেঁচে থাকা অতি সৌন্দর্যে পূর্ণ, তাই আকর্ষণীয় ও প্রিয়।