সাম্প্রতিক

লেখকদের কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা উচিত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। একে এড়িয়ে জীবন যাপন করা এখন প্রায় অসম্ভব। পৃথিবীতে এখন ২০০ কোটি ৯৩ লাখ মানুষ ‍শুধু ফেসবুক ব্যবহার করেন। আর বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহার করেন ৪ কোটি ৪৭ লাখ মানুষ। টুইটার, ইনস্টাগ্রাম—এসবেও আছেন লাখো মানুষ।

এ রকম বাস্তবতায় আজকাল লেখকদের হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকতেই হয়। কিন্তু কতটা সময় তাঁরা সামাজিক মাধ্যমে থাকবেন, তা নিয়ে ইদানীং অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন।

মার্কিন লেখক ও ইউটিউবার ক্রিস্টোফার ককোসি বলেছেন, সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো লেখকদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এসব থেকে লেখকেরা যত দূরে থাকবেন, ততই তাঁদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। অহেতুক সময় নষ্ট করে এসব প্ল্যাটফর্ম। লেখকদের এসব পরিত্যাগ করা উচিত।

আবার আরেক লেখক হিটেন ভিয়াস বলেছেন ভিন্ন কথা। তাঁর মতে, লেখকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে সামাজিক মাধ্যমগুলো। কারণ, এর মাধ্যমে লেখকেরা সহজেই নিজেকে পাঠকের সামনে পরিচিত করতে পারছেন। লেখকদের আরও বেশি সামাজিক মাধ্যমনির্ভর হওয়া উচিত। ফলে লেখকদের কি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা উচিত, নাকি উচিত নয়—এ নিয়ে সত্যিই এক ‘উভয়সংকট’ তৈরি হয়েছে।

কেন লেখকেরা ব্যবহার করবেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হচ্ছে, এর মাধ্যমে পাঠকের সামনে নিজেকে পরিচিত করানো যায়।

একটা সময় ছিল, যখন নিজের লেখক পরিচয় তৈরি করার জন্য পত্রিকা বা সাময়িকীগুলোর দ্বারস্থ হতে হতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সেই বাস্তবতার রাশ টেনে ধরেছে। এখন লেখকেরা নিজেই নিজের লেখা ফেসবুকে পোস্ট করতে পারেন। মুহূর্তে হাজারো মানুষের কাছে তা পৌঁছে যায়। আর এভাবেই একসময় লেখক পরিচয় তৈরি হয়ে যায়।

আগে বই প্রকাশের জন্য প্রকাশক খুঁজতে হতো। এজেন্ট খুঁজতে হতো। এখন ফেসবুকেই তাদের পাওয়া যায়। এটা তো এক অর্থে লেখকদের জন্য আশীর্বাদই।

আবার পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানার জন্যও একসময় অপেক্ষা করতে হতো লেখকদের। এখন লেখা প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে এবং সরাসরি পাঠকের প্রতিক্রিয়া জানা যায়। লেখকের পোস্টের নিচে মন্তব্যের ঘরে পাঠক সরাসরি বলে দেন তাঁর ভালো বা মন্দ লাগার কথা।

আপনি যদি নন-ফিকশন লেখক হয়ে থাকেন এবং তথ্যভিত্তিক লেখা লিখে থাকেন, তাহলে ফেসবুক আপনার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। কারণ, ফেসবুক ব্যবহারকারীরা তথ্যভিত্তিক লেখা বেশি পছন্দ করে থাকেন। রটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক মর নাম্যান ও জেফরি বোয়াস গবেষণায় দেখিয়েছেন, ফেসবুকের সাধারণ পোস্টের চেয়ে তথ্যভিত্তিক পোস্টের ফলোয়ার তিন গুণ বেশি।

বাজার গবেষণাকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান চ্যাডউইক মার্টিন বেইলি (সিএমবি) বলেছে, বিনোদনমূলক পোস্ট পড়েন ৭২ শতাংশ মানুষ, পরামর্শ ও সমাধানমূলক পোস্ট পড়েন ৫৮ শতাংশ মানুষ এবং রম্য পোস্ট পড়েন ৫৮ শতাংশ মানুষ।

সুতরাং আপনি বিনোদনধর্মী লেখক কিংবা রম্য লেখক—যে ধরনের লেখকই হোন না কেন, আপনার জন্য বিরাটসংখ্যক পাঠক অপেক্ষা করছেন ফেসবুকে।

বইয়ের প্রচার, প্রচারণা ও বিপণনের জন্যও সামাজিক মাধ্যম এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। লেখক নিজেই এসব প্ল্যাটফর্মে নিজের বইয়ের প্রচার চালাতে পারেন।

লেখকদের জন্য লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়া খুব জরুরি। আগে এই মিথস্ক্রিয়া একটু কঠিনই ছিল। বিভিন্ন জায়গায় সভা, সেমিনার, পাঠচক্রের আয়োজন করে পাঠকদের সঙ্গে কথা বলতে হতো। এখন লেখক নিজে যখন–তখন ফেসবুক থেকে লাইভে আসতে পারেন, সরাসরি কথা বলেন পাঠকের সঙ্গে।

কেন লেখকেরা ব্যবহার করবেন না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

সামাজিক মাধ্যমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, এটি সময় নষ্ট করে। রাইটার্স ডাইজেস্ট-এর জ্যেষ্ঠ সম্পাদক বরার্ট লি ব্রিয়ার বলেছেন, ‘সামাজিক মাধ্যমগুলোয় অসীম স্ক্রলিং রাখা হয়েছে শুধু সময় নষ্ট করার জন্য।’

একটি লেখা লিখতে হলে লেখককে গভীরভাবে ভাবতে হয়। ধ্যানমগ্ন হতে হয়। দিনের পর দিন গল্পের চরিত্রদের সঙ্গে কথা বলতে হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লেখকদের ধ্যানস্থ হতে দেয় না। কোনো কিছু নিয়ে তলিয়ে ভাবতে দেয় না। একটার পর একটা ইস্যু আসে আর যায়। কোনো একটি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে তলিয়ে ভাবার ‍সুযোগ নেই এখানে।

কিন্তু ভাসা–ভাসা জ্ঞান দিয়ে তো আর লেখক হওয়া যায় না। অগভীর ভাবনার কোনো লেখা আজ পর্যন্ত কালোত্তীর্ণ হয়নি। সুতরাং ভালো ও মানসম্পন্ন লেখা লিখতে হলে, প্রতিষ্ঠিত লেখক হতে হলে আপনাকে অবশ্যই ভাবনাজাগানিয়া লেখা লিখতে হবে, যা আপনি ফেসবুকে থাকলে পারবেন না।

যাঁরা মনে করেন, বই বিক্রির জন্য সামাজিক মাধ্যম খুবই উপাদেয়, তাঁদের ভাবনা পাল্টে ফেলতে বলেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান টিসিকে পাবলিশিং। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী টম করসন বলেছেন, ‘আমরা অনেক লেখকের সঙ্গে কাজ করেছি এবং দীর্ঘদিন গবেষণার পর একটি দুঃখজনক সত্য খুঁজে পেয়েছি। সত্যটি হচ্ছে, আপনার উদ্দেশ্য যদি বই বিক্রি হয়, তবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা উচিত হবে না।’

২০১৭ সালে ফেসবুক তার ব্যবহারকারীদের পোস্টের অর্গানিক রিচ ২০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিল। সেখান থেকে ক্রমাগত কমতে কমতে এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে অর্গানিক রিচ এখন ১ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আপনার বন্ধুতালিকায় থাকা ১০০ জনের মধ্যে মাত্র ১ জন আপনার পোস্ট দেখতে পান। ২০১২ সালে ফেসবুকের অর্গানিক পোস্টের রিচ ছিল ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ১৬ জন আপনার পোস্ট দেখতে পেতেন। এখন দেখতে পান মাত্র একজন। সুতরাং ফেসবুকে অযথা সময় নষ্ট করে লাভ নেই। যে লাখ লাখ পাঠকের কাছে পৌঁছানোর আশায় আপনি ফেসবুকে পড়ে আছেন, সে আশার গুড়ে বালি। তবে হ্যাঁ, আপনি যদি পয়সা খরচ করে আপনার পোস্ট ‍বুস্ট করতে পারেন, তাহলে ফেসবুক আপনার পোস্ট অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিসটা বলেছে, প্রতিদিন গড়ে ২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট সময় ফেসবুকে ব্যয় করেন মানুষ। টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ আরও অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম তো আছেই। সব মিলিয়ে দিনে কত সময় ব্যয় হয়, ভাবুন। এত সময় যদি সামাজিক মাধ্যমেই ব্যয় করেন, তাহলে নিজের লেখাটা লিখবেন কখন?

টিসিকে পাবলিশিং এক প্রতিবেদনে বলেছে, আপনি যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার না করেন, তাহলে বছরে তিনটি প্রমাণ আকারের বই লিখতে পারবেন।

লেখার জন্য সবার আগে দরকার মানসিক স্থিরতা। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমগুলো এমন এক জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আপনার অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে। অহেতুক প্রদর্শনবাদের প্রতিযোগিতায় নামায় আপনাকে। কোথায় যাচ্ছেন, কী খাচ্ছেন, কী করছেন—ক্ষণে ক্ষণে সবকিছুর আপডেট দিতে প্ররোচিত করে। আর এ প্ররোচনার ফাঁদে একবার যদি পা দেন, আপনি আর লেখার সময় পাবেন না।

সুতরাং কী করবেন? সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করবেন নাকি করবেন না? উভয়সংকট! টম করসন নলেজ বলেছেন, সামাজিক মাধ্যম পুরোপুরি পরিত্যাগ করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আপনি অবশ্যই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করবেন, তবে তা যেন আপনার সময়ের মাত্র ২০ শতাংশ হয়। বাকি ৮০ শতাংশ সময় আপনি আপনার সৃজনশীল লেখালেখিতে ব্যয় করুন। আর ২০ শতাংশ ব্যয় করুন সামাজিক মাধ্যমে শুধুই আপনার বইয়ের খবর, লেখালেখির খবরাখবর জানাতে আর পাঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

সূত্র: রাইটার্স ডাইজেস্ট, টিসিকে পাবলিশিং, স্ট্যাটিসটা ও উইলি কমিউনিকেশন