সেদিন অমিয় অফিসের সহকর্মীদের বেশ ঘটা করেই নৈশভোজে নিমন্ত্রণ করেছিল। কাছের কলিগ বলতে যাদের বোঝায়, প্রায় সবাই ছিল অতিথির তালিকায়। আমন্ত্রণের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ কারণ আছে, কিন্তু যতবারই কেউ জানতে চেয়েছে, অমিয় ততবারই শিং মাছের মতো পিচ্ছিল ভঙ্গিতে কথার ফাঁক গলে বেরিয়ে গেছে।
তবে মানুষজনকে খাওয়াতে অমিয়র ভীষণ ভালো লাগে, এটা অফিসের সবাই জানে। কিন্তু তাই বলে এত আয়োজন! ব্যাপারটা বেশ রহস্যজনকই বটে।
সন্ধ্যা নামতেই একে একে সবাই এসে হাজির অমিয়দের ফ্ল্যাটে। এলাহি আয়োজন। খাবারের টেবিল যেন ছোটখাটো ভোজসভা। অমিয় সাধারণত একাই থাকে এই বড় ফ্ল্যাটে, ভীষণ নিশ্চিন্ত জীবন তার। কিন্তু আজকের সন্ধ্যায় বাড়িটা যেন সত্যিকারের সংসারে ভরে উঠেছে—বোন, ভগ্নিপতি, ভাগনে, কাকা, কাকিমা, এমনকি মা–বাবাও উপস্থিত।
তাদের মুখে আজ এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসের আলো।
হঠাৎ যেন তার মাথায় একটা কিছু খেলে গেল। ‘বাহ! বুঝেছি ব্যাপারটা!’ মনে মনে ভাবল সে। বিধবা মায়ের বিয়ে দিয়েছে অমিয়। আর এই পার্টি নিশ্চয়ই সে উপলক্ষে। ‘এত সব হয়ে গেল আর আমাকে একবারও বললি না?’
এই সবের মধ্যে অমিয়র সবচেয়ে কাছের কলিগ দিনার বেশ অবাক। হঠাৎ যেন তার মাথায় একটা কিছু খেলে গেল। ‘বাহ! বুঝেছি ব্যাপারটা!’ মনে মনে ভাবল সে। ‘বিধবা মায়ের বিয়ে দিয়েছে অমিয়। আর এই পার্টি নিশ্চয়ই সে উপলক্ষে।’
এর পর থেকে দিনার বারবার অমিয়র কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘এত সব হয়ে গেল আর আমাকে একবারও বললি না?’
অমিয় মুচকি হেসে জবাব দেয়, ‘বলার সময় পেলাম কই! আমিও তো নিজেই জানতাম না। তুই জানলি কীভাবে?’
দিনার তখন গর্বে কলার একটু উঁচু করে বলে, ‘আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয় বন্ধু!’ বলেই হো হো করে হেসে ওঠে।
এই কথাবার্তা সন্ধ্যার মধ্যে আরও কয়েকবার হয়েছে। একবার তো এসে বলেই ফেলল, ‘অমিয়, আমি বলি কী, তুই এবার ব্যাপারটা অ্যানাউন্স করেই দে!’
অমিয় মাথা নেড়ে হেসে বলল, ‘আরেকটু সবুর কর। আগে তো সবাই আসুক। অনেকেই আসবে। ওদের ছাড়া কি অ্যানাউন্স করা যায়?’
স্থূলকায় দিনার মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তাকে দেখলে মনে হয়, মাথা থেকে পা পর্যন্ত যেন এক সাইজের মানুষ—মোটাসোটা, গম্ভীর, কিন্তু মনটা একেবারে শিশুর মতো সরল।
ঠিক তখনই সন্ধ্যার শেষ প্রহরে কলবেলের শব্দে দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকল এক সুদর্শনা তন্বী তরুণী। মার্জিত সাজে অপরূপ লাগছে তাকে।
তরুণীকে দেখে অফিসের অনেকেই চমকে উঠল। আরে, এ তো তন্বী! অফিসের এইচআর বিভাগে অল্প দিনেই নিজের দক্ষতা আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে মেয়েটি। এত সুন্দরী, আবার ততটাই কর্মদক্ষ! কীভাবে সম্ভব!
তরুণীকে দেখে অফিসের অনেকেই চমকে উঠল। আরে, এ তো তন্বী! অফিসের এইচআর বিভাগে অল্প দিনেই নিজের দক্ষতা আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে মেয়েটি।
অনেক নারী সহকর্মীই তাকে একটু হিংসার চোখে দেখে। এত সুন্দরী, আবার ততটাই কর্মদক্ষ! কীভাবে সম্ভব! আর অবিবাহিত পুরুষদের কথা তো বাদই দিলাম, এমনকি কয়েকজন বিবাহিত সহকর্মীরও নাকি রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে তন্বীর মায়াবী উপস্থিতি।
অমিয় এগিয়ে গিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাল। মা–বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে দুজনে এসে দাঁড়াল ড্রয়িংরুমের মাঝখানে।
তখনো সবাই গল্পে মশগুল। হঠাৎ অমিয় জোরে তালি দিয়ে সবার দৃষ্টি নিজের দিকে টানল। মুখে লাজুক হাসি।
সবাই কথা থামিয়ে তাকাল অমিয় আর তন্বীর দিকে।
তন্বী ঘরে ঢোকার পর থেকেই দিনার যেন হাঁ করে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছিল, তন্বীর প্রতি তার গোপন ক্রাশটা যেন আজ একটু বেশিই পা পিছলে গেল।
অমিয় গলা পরিষ্কার করে বলল, ‘আজ আমার জন্য বিশেষ একটা দিন। তন্বীকে আপনারা অনেকেই চেনেন। আমরা একসঙ্গে কাজ করি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একজন আরেকজনকে বুঝে, ভালোবেসে, জীবনের বাকি পথটা একসাথে চলব।’
কথাটা বলেই পকেট থেকে একটি ছোট লাল কৌটা বের করল সে। তার ভেতর থেকে হীরের আংটি বের করে তন্বীর অনামিকায় পরিয়ে দিল।
ঘরের মধ্যে মুহূর্তেই আনন্দের ঢেউ উঠল। হাসি, হাততালি সব মিলিয়ে উৎসবের পরিবেশ।
এই ফাঁকে দিনার অমিয়র ঘাড় ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেল ঘরের এক কোণে। ‘এটা তুই কী করলি রে মামা?’ অমিয় অবাক হয়ে বলল, ‘কী করলাম?’ ‘তোর মায়ের বিয়ের অ্যানাউন্সমেন্টে তন্বী এল কোত্থেকে?’
এরপর তন্বী সবার সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেল, যেন বহুদিন ধরেই এই পরিবারের সদস্য।
এই ফাঁকে দিনার অমিয়র ঘাড় ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেল ঘরের এক কোণে।
‘এটা তুই কী করলি রে মামা?’
অমিয় অবাক হয়ে বলল, ‘কী করলাম?’
‘তোর মায়ের বিয়ের অ্যানাউন্সমেন্টে তন্বী এল কোত্থেকে?’
অমিয় হেসে বলল, ‘মায়ের বিয়ে মানে?’
সে ভেবেছিল, দিনার বুঝি মজা করছে।
দিনার গম্ভীর হয়ে বলল, ‘মায়ের না তো কী? মাসিমা যে আবার বিয়ে করল, সেটা তো বললি না!’
অমিয় এবার পুরোপুরি হতভম্ব, ‘মা আবার বিয়ে করেছে মানে?’
দিনার বলল, ‘আচ্ছা, আমাকে বল, মাসিমার পাশে যে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি কে?’
অমিয় তাকিয়ে বলল, ‘কে আবার, আমার বাবা!’
দিনার বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলল, ‘সেটাই তো বলছি! তোর বাপ তো মারা গেছে, তাইলে এখন আবার মাসিমার পাশে কেমনে দাঁড়ায়?’
বলেই পকেট থেকে মোবাইল বের করে অমিয়র সামনে ধরল।
কয়েক দিন আগে অমিয়র দুলাভাই বিয়ের জন্য পাত্রীর বাড়িতে পাঠানোর উদ্দেশ্যে দিনারের কাছে অমিয়র বায়োডাটা পাঠিয়েছিল। সেখানে পিতার নামের জায়গায় লেখা ‘মৃত শ্যাম শর্মা’।
দিনার গম্ভীর মুখে বলল, ‘তোর বাপ যদি মইরা যায়, আর এখন যদি তোর মায়ের পাশে আবার দাঁড়ায়, তাইলে কী বলবি, তোর মা বিয়ে করে নাই?’
কথাটা শুনে অমিয় হঠাৎ এমন হাসতে শুরু করল যে দাঁড়িয়ে থাকা দায়। হাসতে হাসতে প্রায় মাটিতে বসে পড়ল। পেটে খিল ধরা হাসি কিছুতেই থামছে না।
এটা দেখে দিনারের মেজাজ আরও চড়ে গেল। সে ঝট করে অমিয়র দুই বাহু ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে বলল, ‘কী এমন হাসির কথা হলো?’
অমিয় কষ্ট করে হাসি থামিয়ে বলল, ‘আরে ব্যাটা! আমার বাপের নাম অমৃত শ্যাম শর্মা।’
ওই ‘অ’টা টাইপিং মিসটেক!
ঘরের এককোণে তখনো দিনার দাঁড়িয়ে, মুখটা এমন করে আছে, যেন জীবনে প্রথমবার বাংলা টাইপিংয়ের ভয়াবহতা উপলব্ধি করেছে।