অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

আষাঢ়ে গল্প

ব্যাকবেঞ্চার সোহেল এবং রবীন্দ্রনাথ

জমেছে মেঘ, জমে উঠেছে জম্পেশ আড্ডা। আষাঢ়ে বৃষ্টিতে ঘনীভূত হচ্ছে অবিশ্বাস্য আর আজগুবি সব গল্প। এমনই জমজমাট আষাঢ়ে গল্প নিয়ে এ আয়োজন

সোহেল এক বিশিষ্ট ব্যাকবেঞ্চার। জীবনে একবারই সে সামনের বেঞ্চিতে বসেছিল, যেদিন তার আব্বা তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে হেডমাস্টারকে বলেছিলেন তার দিকে একটু বিশেষ দৃষ্টি রাখতে। সেদিন হেডস্যার নিজে তাকে ক্লাসে পৌঁছে দিয়ে ফার্স্ট বেঞ্চিতে বসিয়ে দিয়ে গেছিলেন। তার পর থেকে সে আর কখনো ভুলেও ফার্স্ট বেঞ্চিতে বসেনি। বসবেই–বা কেন? পড়ালেখার প্রতি ন্যূনতম আগ্রহ তার কোনোকালে ছিল না; ক্লাসে স্যাররা যা বলেন, তা মনোযোগ দিয়ে শোনার কোনো কারণ সে খুঁজে পায়নি কখনো। পরীক্ষায় সে কোনোমতে টেনেটুনে পাস করে, কখনো কখনো দু–এক সাবজেক্টে ফেলও করে। পড়ালেখায় লাড্ডুমার্কা বলে এমন নয় যে তার মাথায় গোবর পোরা। সিলেবাসের বইগুলো বাদে সব ব্যাপারে তার বিপুল আগ্রহ। স্কুলের কোন দিকের দেয়াল টপকে সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে বের হওয়া যায় কিংবা পাড়ার কোন বাড়ির গাছ থেকে আম চুরি করা সবচেয়ে সোজা—এসব ব্যাপারে তার অগাধ জ্ঞান। বাজি ধরে সাঁতরে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে সে একবার ৫০০ টাকা জিতেওছিল। আফসোসের ব্যাপার হলো, ঘটনাটা বাড়িতে জানাজানি হওয়ার পর তার আব্বা তাকে এমন পিটুনি দিয়েছিলেন যে গায়ে জ্বর এসে গিয়েছিল। অবশ্য এটা সোহেলের আম্মার বক্তব্য, তার আব্বার ধারণা, জ্বর এসেছে নদীতে সাঁতার দিয়ে। তবু ভাগ্য ভালো, বাজির টাকাটা হাতছাড়া তার হয়নি।

ক্লাস নাইন থেকে টেনে ওঠার সময় সোহেল মাত্র এক সাবজেক্টে ক্রস খেল। রেজাল্টের আগে সে বেশ ভয়ে ভয়ে ছিল। প্রমোশন না পেলে মুশকিল হয়ে যেত। মানে মানে স্কুলের সবচেয়ে ওপরের ক্লাসে উঠে স্বাভাবিকভাবেই তার আত্মবিশ্বাস গেল বেড়ে। স্কুলে সে এখন প্রায় যায়ই না। গেলেও দু–এক পিরিয়ডের পরেই বের হয়ে আসে বিভিন্ন কায়দা করে। কিছুদিন পরপর নতুন ধরনের উত্তেজনাকর ঘটনা ছাড়া সোহেলের ভালো লাগে না, জীবন পানসে লাগে। এবারে সে ভেবে বের করল নতুন একটা অ্যাডভেঞ্চার। বন্ধুদের ওপেন চ্যালেঞ্জ দিল—কে অমাবস্যার রাতে মড়াখলায় কাটিয়ে আসতে পারবে? সবার মধ্যেই সামান্য ইতস্তত ভাব দেখা গেল এ প্রশ্নের পর।

‘রাইতের বেলা বাইর হউন যাইতো না, দিনে হইলে,’ মারুফের এই মন্তব্যে ঠা ঠা করে হেসে ওঠে সোহেল।

‘দিনওদুফুরো মড়াখলা যাইবার হগলেই পারে; দুধের বাইচ্চারাও পারব।’

কিছুটা কাঁচুমাচু হয়ে যায় মারুফ, তখন রুবেল তার পক্ষে দাঁড়ায়, ‘আরে বুঝস না ক্যান, কতাডা অইল, হারা রাইত বাইরে থাহনের অনুমতি পাওন যাইব না তো বাইত থ্যা।’

‘অনুমতি? অনুমতি লইতে কইতাছে কেডা?’ সোহেল রীতিমতো তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দেয় রুবেলের যুক্তি।

সত্যিই তো, এসব দুষ্টুমি কে কবে বাড়ি থেকে অনুমতি নিয়ে করেছে? সারা রাত বাড়ির বাইরে থাকতে হলে চুরি করেই বের হতে হবে। শবে বরাত আর শবে কদরের রাত ছাড়া কবেই–বা কোন বাড়ি থেকে রাতে বাইরে থাকার অনুমতি পাওয়া যায়? সোহেলের কাছে এসব উসিলা খুবই ফালতু লাগে। সবাই ঘুমিয়ে গেলে পা টিপে টিপে বের হয়ে আসতে হবে। চেষ্টা করলে বাড়ির লোকজনকে বোকা বানানো কোনো ব্যাপারই না।

কিন্তু দেখা গেল, একেকজনের কাছে একেকটি অজুহাত তৈরি আছে। মারুফের বাসার বাড়িওয়ালা নাকি রাত দশটার পর এক্সট্রা তালা লাগিয়ে দেয় কলাপসিবল গেটে, সেটার চাবি ভাড়াটেদের দেয় না। রুবেলের দাদা নাকি সারা রাত ঘুমান না, বারান্দায় পায়চারি করেন। পুলকের বাড়িতে তার মা ছাড়া কেউ নেই; মা–বেটা একই ঘরে ঘুমায়, মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছুতেই বের হওয়া সম্ভব নয়।

সোহেল বুঝতে পারে এদের কারোরই এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মতন মুরোদ নেই।

সোহেলের প্ল্যান মোটামুটি নির্ভুল। বিছানায় কোলবালিশ কাঁথা দিয়ে মুড়ে, ডিমলাইট জ্বালিয়ে, ফ্যান আস্তে করে চালিয়ে রেখে পা টিপে বের হয়ে যায় সে। দোতলার টেরাস থেকে লাফিয়ে নামা তার জন্য ওয়ান–টুর ব্যাপার। সে না চাইলেও বন্ধুরা তাকে একটা টর্চলাইট নিয়ে নিতে বলেছে পকেটে করে। মারুফ তাকে বলেছিল স্যান্ডেলের বদলে কেডস পরে যেতে; ঝেড়ে দৌড় দিতে হলে যেন অসুবিধা না হয়। রুবেলের কথা রাখার জন্য সে বুড়াপীরের মাজার থেকে আনা পড়া পানি কিছুটা খেয়েও নিয়েছে।

২.

পূর্ণিমা–অমাবস্যার হিসাব সাধারণত কেউ রাখে না আজকাল। পুলকের মা নিষ্ঠাবতী বিধবা, নিয়মিত একাদশী ইত্যাদি পালন করেন বলে এসব তারিখ মুখস্থ থাকে তাঁর। মাকে জিজ্ঞেস করেই পরবর্তী অমাবস্যার তারিখ জেনে দিয়েছে পুলক। আমাদের গল্পের নায়ক সোহেল যে বাজি ধরে শ্মশানকালী মন্দিরের বারান্দায় রাত কাটাতে যাচ্ছে, সে কথা মাকে বলার সাহস অবশ্য পায়নি সে। বন্ধুর জন্য তার ভয়াবহ দুশ্চিন্তা হচ্ছে। ভরসার কথা একটাই—কেওয়াটখালী শ্মশানে তার ঠাকুরদাদা আর বাবার সমাধিও আছে। প্রতি ভূতচতুর্দশীতে সে তার মায়ের সঙ্গে গিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে আসে। সোহেলের নিরাপত্তার জন্য আরেক দফা প্রার্থনা করে সে। বাজি ধরে শ্মশানে রাত কাটানোর জন্য বিদেহী আত্মারা যেন কোনো বেয়াদবি না নেন, সোহেলের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সে জন্য মানত করে সে বড় কালীবাড়ি মন্দিরের দানবাক্সে ১০ টাকা ফেলেও এসেছে।

মারুফ নিয়মিত নামাজ পড়ে না; কিন্তু ঘটনার দিন সে ফজর বাদে চার ওয়াক্তের নামাজই মসজিদে আদায় করেছে। সোহেল যেন জান নিয়ে ফেরত আসে, সে জন্য দোয়া করেছে। ভূতপ্রেতে অত বিশ্বাস সে করে না। কিন্তু চোর–ডাকাত–সাপ–বিচ্ছু আরও কত কিছুই তো থাকতে পারে।

রুবেল আরেক কাঠি এগিয়ে। সে বুড়াপীরের মাজার থেকে এক বোতল পানিপড়া এনেছে, কিছুটা পানি খেয়ে বাকিটা যাওয়ার আগে মাথায় ছিটিয়ে নিতে বলেছে।

সোহেল এসব দেখে হেসেই বাঁচে না। বন্ধুদের ভালোবাসায় মুগ্ধ আর আপ্লুত হলেও তাদের এসব ভয় আর শঙ্কাকে অমূলক বলে উড়িয়ে দেয় সে, ‘হুন, আমার ছোড কাকা একটা কতা হিগাইছে—ভূত আমার পুত, পেতনি আমার ঝি। বুকে আছে আল্লা–রসুল, তুই করবি কী? ভূত বইলা কিছু নাই। কেউ আমার ঘাড় মটকাইতো না।’

এটুকু বলেই সে ক্ষান্ত হয় না; ছোট চাচার থেকে শোনা গল্পও বন্ধুদের বলে। একবার এক ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে শ্মশানে গিয়েছিল। সত্যিই যে সে গেছে, তা প্রমাণ করার জন্য মাঝারি আকারের একটা কঞ্চি পুঁতে রেখে আসার কথা। নির্দিষ্ট জায়গায় কঞ্চি পুঁতে উঠতে গিয়ে সে টের পেল, কে যেন তার চাদর টেনে ধরে আছে। ভয়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। পরদিন তার বন্ধুরা গিয়ে দেখে, সে অন্ধকারে চাদরের খুঁটসহ কঞ্চি পুঁতে রেখেছিল। ‘মনের ভূতই আসল ভূত। বুঝছস ব্যাডা?’

আগেই বলেছি, সোহেল ব্যাকবেঞ্চার হলেও বেকুব নয়।

৩.

সোহেলের প্ল্যান মোটামুটি নির্ভুল। বিছানায় কোলবালিশ কাঁথা দিয়ে মুড়ে, ডিমলাইট জ্বালিয়ে, ফ্যান আস্তে করে চালিয়ে রেখে পা টিপে বের হয়ে যায় সে। দোতলার টেরাস থেকে লাফিয়ে নামা তার জন্য ওয়ান–টুর ব্যাপার। সে না চাইলেও বন্ধুরা তাকে একটা টর্চলাইট নিয়ে নিতে বলেছে পকেটে করে। মারুফ তাকে বলেছিল স্যান্ডেলের বদলে কেডস পরে যেতে; ঝেড়ে দৌড় দিতে হলে যেন অসুবিধা না হয়। রুবেলের কথা রাখার জন্য সে বুড়াপীরের মাজার থেকে আনা পড়া পানি কিছুটা খেয়েও নিয়েছে। পুলক তাকে বলেছে কিছু টাকাপয়সা পকেটে নিয়ে নিতে, চোর বা ছিনতাইকারীরা নাকি ইদানীং কিছু না পেলেও ছুরি বসিয়ে দেয়। আমাদের নায়ক সোহেল বীরত্ব দেখানোর লোভে নিজের দেওয়া চ্যালেঞ্জ রাখতে ব্যাপারটাকে যত কঠিন করার চেষ্টা করছিল, তার বন্ধুরা পুরো ঘটনাকে ততই সহজ করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ব্যাকবেঞ্চার সোহেল জীবনে ক্লাসের পড়াই বোঝার চেষ্টা করেনি। আর কোথাকার কোন রবি ঠাকুরের মতন দেখতে এআই সিস্টেমের গবেষণার বিষয় বুঝতে চাইবে কেন? কিন্তু ভয় পাওয়া সোহেলের ধাতে নেই। এই কম্পিউটার প্রোগ্রামের তার মাথায় ঢুকে যাওয়ার ব্যাপারটাকে সে অভিনব অ্যাডভেঞ্চার বলে ভাবে।

বড় রাস্তায় রিকশা ছেড়ে দেয় সোহেল। ঠিক রেলব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরায়। সিগারেট খাওয়াটা এখনো রপ্ত হয়নি তার। প্রথম টানটা দিতেই হালকা কাশি আসে। তবু সে বিশেষ অকেশনে এক–আধটু খাওয়ার চেষ্টা করে। ব্যাকবেঞ্চার হওয়ার জন্য যা যা নিষিদ্ধ কাজ করতে হয়, বিড়ি ফোঁকা তার মধ্যে একটা।

অর্ধেকটা টেনে সিগারেটটা হাতে ধরে রেখেই মাঠ পার হতে শুরু করে সে। একেবারে নদীর ধার ঘেঁষে শ্মশানকালীর মন্দির। মন্দিরের চাতালে বলি দেওয়ার জন্য হাড়িকাঠ, শবদাহ করার জায়গা, খড়ি রাখার জায়গা—কোথায় কী আছে সব তার মুখস্থ। মন্দিরের আঙিনা পেরিয়ে যাওয়ার সময় সে দেখতে পায় বারান্দার ঠিক সামনে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে একটা কুকুর। সাবধানে পা টিপে টিপে যায় সে। নতুন মানুষ দেখলে কুকুরটা চোর সন্দেহ করে ঘেউ ঘেউ করে উঠতে পারে। কেউ তাকে কোনো প্রমাণ রেখে আসতে বলেনি। তার বন্ধুরা আসলে চাইছিলই না সে এ কাজ করুক। কিন্তু প্রমাণ হিসেবে একটা কিছু রেখে না এলে তো এত কষ্ট মাঠে মারা যাবে। তাই সে তিন বন্ধুর কাছ থেকে তিনটা জিনিস চেয়ে এনেছে নির্দিষ্ট সমাধিস্তম্ভে রেখে আসার জন্য। মারুফ দিয়েছে একটা বলপয়েন্ট কলম; পুলক দিয়েছে একটা ইরেজার, সেখানে পুলকের নাম লেখা; আর রুবেল দিয়েছে একটা দুই টাকার কয়েন। সে সব জিনিস একটা রুমালে বেঁধে রেখে আসবে আগে থেকে ঠিক করে আসা জায়গায়। এই সমাধি অন্যান্য সমাধিস্তম্ভের মতো সাদামাটা নয়, একটা ঘরের মতন স্ট্রাকচার, দরজা পর্যন্ত আছে।

সহি–সালামতে বড় সমাধিটার সামনে পৌঁছে যায় সোহেল। সাবধানে দরজাটা টানতেই সেটা খুলে যায়। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ার কথা, কিন্তু অবাক হয়ে সোহেল দেখে সেখানে আবছা আলো। রবীন্দ্রনাথের মতন দাড়িওয়ালা এক লোক ল্যাপটপ কোলে নিয়ে বসে নিবিষ্ট মনে কাজ করছে। সে যে দরজা খুলেছে, সেটা লক্ষ পর্যন্ত করেনি বুড়ো।

এইটুকু ঘুপচি জায়গায় দরজা আটকে আছে কীভাবে লোকটা? দম আটকে আসছে না? নাকি এটা কোনো অশরীরী আত্মা? কিন্তু বিদেহীরা কি ল্যাপটপ ব্যবহার করে? সামান্য সাহস সঞ্চয় করে সোহেল গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, ‘আসসালামু আলাইকুম, আপনে কেডা?’

বুড়ো মাথা তুলে বলে, ‘আমি একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম। তুমি কে?’

‘আমার নাম সোহেল। আপনে এইনো কী করেন? আপনের চেহারা রবি ঠাকুরের মতন ক্যান?’

বুড়ো একটু হাসে, ‘যারা আমাকে বানিয়েছে, তারা আমার এ রকম চেহারা দিয়েছে। আমি এখানে একটা গবেষণা করছি। তুমি এখানে কী করো?’

‘আমি আইছি একটা কামে। আপনে কী লইয়া গবেষণা করতাছুইন?’

একটু ইতস্তত করে বুড়ো বলে, ‘পুরো ব্যাপার বোঝানো একটু সময়সাপেক্ষ। তবে তুমি চাইলে সরাসরি তোমার মাথায় ঢুকে বুঝিয়ে দিতে পারব। আসলেই বুঝতে চাও?’

ব্যাকবেঞ্চার সোহেল জীবনে ক্লাসের পড়াই বোঝার চেষ্টা করেনি। আর কোথাকার কোন রবি ঠাকুরের মতন দেখতে এআই সিস্টেমের গবেষণার বিষয় বুঝতে চাইবে কেন? কিন্তু ভয় পাওয়া সোহেলের ধাতে নেই। এই কম্পিউটার প্রোগ্রামের তার মাথায় ঢুকে যাওয়ার ব্যাপারটাকে সে অভিনব অ্যাডভেঞ্চার বলে ভাবে।

সোহেলের বন্ধুরা সেদিনের পর থেকে নতুন এক সোহেলকে আবিষ্কার করে। প্রতিদিন ফার্স্ট বেঞ্চে বসে ক্লাস করে সে এখন। স্কুল পালানো বাদে সব ধরনের দুষ্টুমিই জারি রেখেছে, কিন্তু পরীক্ষার সপ্তাহখানেক আগে থেকে তাকে আর পড়ার টেবিল থেকে উঠতে দেখা যায় না। তার মা খুশিতে আত্মহারা হয়ে তিন শ রাকাত শোকরানা নামাজ পড়ে ছেলের মতি ফেরানোর জন্য আল্লাহপাকের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

‘জি, বুঝতে চাই।’

রবি ঠাকুরের মতন দেখতে অশরীরী কিন্তু দৃষ্টিগ্রাহ্য মূর্তিটি এক হাত সোহেলের মাথায় রাখে। সোহেল মাথার ভেতরে সামান্য আলোড়ন অনুভব করে। রবীন্দ্রনাথের হাসি হাসি চেহারা তাকে বিভিন্ন কথাবার্তা জিজ্ঞেস করতে থাকে। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতন সব কথার জবাব দেয়। সে কী খেতে ভালোবাসে, তার সবচেয়ে পছন্দের কাজ কী, প্রিয় খেলোয়াড় কে—এসব তথ্য বুড়ো কেন জানতে চাইছে, সে বুঝতে পারে না। সে বুড়োকে জিজ্ঞেস করে, ‘এত কথা জিগাইতাছুইন ক্যা?’

‘তোমার ব্রেইন কীভাবে কাজ করে, আমাকে বুঝতে হবে না?’

মাথায় সামান্য চাপ অনুভব করলেও আর কিছু বলে না সোহেল।

‘তুমি যে বললে আমি রবীন্দ্রনাথের মতন দেখতে, রবীন্দ্রনাথের কোনো কবিতা বলতে পারবে?’

একমাত্র জাতীয় সংগীত বাদে রবীন্দ্রনাথের আর কোনো লাইন সোহেলের মনে পড়ে না। আসলে কবিতা মুখস্থ করার মতন বেহুদা কাজ সে করেইনি কখনো। ক্লাস এইট পর্যন্ত এই মহাবিরক্তিকর ব্যাপারটা বাধ্যতামূলক ছিল। সোহেল সেটাও প্রতি পরীক্ষায়ই ছেড়ে দিয়ে আসত। কিছুক্ষণ চেষ্টাচরিত্র করে হঠাৎ তার মনে পড়ে কোক স্টুডিওর লেটেস্ট রিলিজের কথা:

‘রাশি রাশি ভারা ভারা

ধানকাটা হলো সারা,

ভরা নদী ক্ষুরধারা

খরপরশা—

কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।।’

‘ভেরি গুড, ভেরি গুড।’ নকল রবীন্দ্রনাথ খুব খুশি হয়ে যায়।

মাথার ভেতর লাইনগুলো ঘুরতে থাকে ঘুরতেই থাকে; কিছুক্ষণ পর সোহেল জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায়।

সকালবেলায় চোখ খুলে সে দেখতে পায় পুলক আর মারুফ হাতপাখা নিয়ে বাতাস করছে, রুবেল আর মন্দিরের একজন সেবায়েত তার মাথায় পানি ঢালছে।

৪.

সোহেলের বন্ধুরা সেদিনের পর থেকে নতুন এক সোহেলকে আবিষ্কার করে। প্রতিদিন ফার্স্ট বেঞ্চে বসে ক্লাস করে সে এখন। স্কুল পালানো বাদে সব ধরনের দুষ্টুমিই জারি রেখেছে, কিন্তু পরীক্ষার সপ্তাহখানেক আগে থেকে তাকে আর পড়ার টেবিল থেকে উঠতে দেখা যায় না। তার মা খুশিতে আত্মহারা হয়ে তিন শ রাকাত শোকরানা নামাজ পড়ে ছেলের মতি ফেরানোর জন্য আল্লাহপাকের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

সোহেল কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি–এইচএসসি পাস করে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। মা তাকে হোস্টেলে থাকতে দেবেন না, তাই সে রোজ শহর থেকে গিয়ে গিয়ে ক্লাস করে। আসা–যাওয়ার পথে রেলব্রিজের এলাকাটা পার হওয়ার সময় প্রতিবার শ্মশানকালী মন্দিরের দিকে তাকায়। সেই রাতে কী ঘটেছিল, তা মারুফ, রুবেল আর পুলককে সে বলেনি। বললে ওরা কেউই হয়তো তার কথা বিশ্বাস করত না। ক্লাসে তার রেজাল্ট দুর্দান্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে—এ কথা নিশ্চিত। তার বন্ধুরাও তাকে নিয়ে ভীষণ গর্বিত।

তবে সে নিজের ব্যাকবেঞ্চার হয়ে থাকা দিনগুলো মাঝেমধ্যে খুব মিস করে। ফেক রবীন্দ্রনাথ তার কী সর্বনাশটাই না করেছে!