অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

একুশের বিশেষ আয়োজন

মাধবীলতার যে দিন

সকালে উঠে অপু যে গালিটা প্রতিদিন দেয়, তা আজও দিল: ‘ধুর বাল, ভাল্লাগে না!’ পাজামার ফিতা এমন গিট্টু বেঁধে বসে, ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেপে মেপে কায়দা করে তার ভাঁজ খুলতে হয়। প্রতিদিন গালিটা সে দেয় মনে মনে, কেউ শুনতে পায় না। আজ মুখে বলল, শোনা গেল তা। ভাগ্যিস আশপাশে কেউ নেই। থাকলে ভারি অবাক হতো সবাই। অপু জানত যে আজ অন্য রকম হবে সকালটা। ওর শোবার ঘরের জানালার ধারে মাধবীলতাগাছে আজ ফুল ফুটেছে। সাদা পাপড়িতে একটু-আধটু হলদেটে ছাপওয়ালা কয়টা ফুল ফুটেছেমাত্র। তেইশ বছর হলো, এ গাছে ফুল ফোটেনি। অপুর বয়স বাইশ। মা বলেছিল, ‘যেদিন সকালে এ গাছে ফুল ফুটল, সেদিনই আমি প্রথম বুঝছি যে তুই পেটে আসছিস।’ মা কখনো ভুল বলত না। মা বলেছিল, ‘আবার যেদিন ফুল ফুটবে, সেদিন দেখবি ভালো কিছু হবে, খুব ভালো।’

মা থাকলে দেখতে পেত, আজ আবার ফুল ফুটেছে, আর অপু গলা খুলে গালি দিচ্ছে। এমন গালি শুনলে মা কষ্ট পেত নিশ্চয়ই।

আব্বা বেরিয়েছে কোন সকালে। আব্বার সাথে মন খুলে কথা বলা যায় আজ, কত কথা বলা বাকি! কিছুই তো বলা হয়নি। মন্টু দারোয়ান বলল, আব্বা কোর্টে গেছে। পৈতৃক দুই বিঘা জমি নিয়ে আব্বা আর তার ভাইদের বাঁটোয়ারা মামলা চলছে এক জীবন ধরে। আব্বার ফোন বন্ধ থাকবে নিশ্চিত। আর ফোনে কথা বলতে গেলে সে বিচলিত হবে, অস্থির হবে। সেই অস্থিরতার ভারে শান্তিমতো কথা বলা যাবে না। সাফিয়াকে ফোন করল অপু, সে কেটে দিল। এসএমএস পাঠাল সাফিয়াকে: ‘ফোনটা ধরো, একটা দারুণ সারপ্রাইজ আছে। আমি তোমার সাথে অনেক কথা বলব। একদম জাদু, দেখো!’

উত্তর এল, ‘খচ্চরের বাচ্চা, তুই কথা বলবি! তুই কথা বলতে জানস? কয়েকটা গালি লিখতে পারস। আরেকবার ফোন দিলে দেখিস, কী করি।’

অপু আরেকবার ফোন দিল। যদি ধরে। সাফিয়া ব্লক করে দিল, সব জায়গা থেকে অপুকে বাদ। ঝগড়া হলে সে এমন করে। দুই দিন আগে খুব বাজে ঝগড়া হয়েছে, মেসেজে আজেবাজে কথা লিখেছে অপু। দোষ এক্কেবারে তার। কিন্তু আজ ফোন করলে কত আনন্দ হতো! শাশুড়িকে ফোন করলে অপুর কণ্ঠ শুনলে ভিরমি খাবে, বিশ্বাসও করবে না, তাই মেসেজ করল: ‘আম্মা, সাফিয়াকে একটু ফোন ধরতে বলেন। খুব জরুরি।’

অপু সাফিয়াকে বিয়ে করে গত বছর। অপুর তখন একুশ আর সাফিয়ার উনিশ। আব্বা কোনো আপত্তি করেনি, বলেনি যে এটা ঘুরেফিরে খেলাধুলার বয়স, এখন কিসের বিয়ে? আব্বা জানত, এখন যদি বিয়ে না হয়, তাহলে আর কখনো হবে না। সাফিয়া জানে অপুর ভাষা, না বলা আবলতাবল।

শাশুড়ি লিখলেন, ‘অপু আব্বা, তুমি তো সাফিয়ার রাগ জানো। খুব রেগে আছে। এখন আমি কিছু বললে ফোনটোন ভেঙে ফেলবে। আমরা ওর মামার বাসায় যাচ্ছি। সন্ধ্যায় বুঝায়-শুনায় ওকে তোমাদের বাসায় পাঠায় দিব।’

অপু সাফিয়াকে বিয়ে করে গত বছর। অপুর তখন একুশ আর সাফিয়ার উনিশ। আব্বা কোনো আপত্তি করেনি, বলেনি যে এটা ঘুরেফিরে খেলাধুলার বয়স, এখন কিসের বিয়ে? আব্বা জানত, এখন যদি বিয়ে না হয়, তাহলে আর কখনো হবে না। সাফিয়া জানে অপুর ভাষা, না বলা আবলতাবল। গভীর রাতে নৈঃশব্দ্য ভেঙে চুরচুর হয়ে যায় তাদের গল্পে। কেউ তা শুনতে পায় না। তারা দুজন শুধু:

‘অপু, তুমি যে একদিন অনেক কিছু বলবা, কী বলবা?’

‘ধুমায় গালি দিব আর ভালোবাসব।’

‘আমাকে?’

‘তোমাকে, আব্বাকে আর আম্মাকে।’

দুজন মিলে আঙুলের ছাঁয়ায় দেয়ালে একটা হরিণ তৈরি করে, ছুটছে ছুটছে, অন্ধকারের দেয়াল ফুঁড়ে হরিণ ছিনিয়ে নিচ্ছে স্বপ্নের ভেতর-বাহির। খিলখিল হাসির শব্দের টুকরো দেয়াল ভেদ করে অপুর আব্বার কানে যায়, ঘুমপাড়ানি গানের মতন, আরাম। সেই টুকরো হাসি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে আব্বা।

অপু আম্মার কাছে যাবে, আম্মার কবরটার পাশে সে বাগানবিলাসের গাছ লাগিয়েছে। সাদা আর রানি রঙের ফুলের পাতা টুপটাপ করে মাটিতে পড়ে, আম্মা হয়তো লুকিয়ে কুড়িয়ে তা জমা করে! মাধবীলতার একটা গাছ লাগাবে ভাবে, কিন্তু যদি ফুল না হয়! আম্মার মন খারাপ হবে। দিনের পর দিন মাধবীলতার গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকত আম্মা, জানালার ধরে একটা বেতের চেয়ার পেতেছিল, দুপুরে বসে দুলে দুলে তসবিহ্‌ জপত। অপুর ধারণা ছিল, আম্মার এই ড্যাবড্যাবে আগুনচোখের ভয়েই ফুল আর ফোটেনি।

তৌহিদের কাছে এবার যাওয়া যায়। শাহবাগে তৌহিদের অ্যাড ফার্ম আর প্রিন্টিং এজেন্সির অফিস। তৌহিদ তার জানের টুকরা দোস্ত। তাকে দেখে জড়িয়ে ধরে আর ছাড়ে না। ‘শালা, পুরা এক মাস তোর দেখা নাই। কেমন আছস? বিয়া কইরা ভুলে গেলি দোস্তরে।’

অপু আজ তার বাইক নিল না, আজ রিকশার দিন। পথে ইচ্ছেমতন গালি দিল অটোরিকশার চালকদের। তার রিকশাচালক হেসে বলে, ‘হাসিমুখে গালি দিলে হারামজাদারা মানত না। মুখ শক্ত কইরা গালি দেন।’ গ্রিনরোড থেকে সূত্রাপুরে দাদিজানের কাছে যখন সে পৌঁছাল , তখন বেলা এগারোটা। দাদি একা বারান্দায় বসে টিনের মগভর্তি দুধ-চায়ে মুড়ি ভাসিয়ে সুরুৎ সুরুৎ করে টানছে। ছোট চাচাও আব্বার সাথে জমির কাজে কোর্টে গেছে , চাচি কাজে বেরিয়েছে। দাদিজান স্মৃতিভোলা। কখনো মনে রাখে, কখনো ভুলে যায়। কিন্তু অপুকে চিনতে পারে। অপু ঠিক কে, সেটা না মনে না থাকলেও, দাদিজান জানে, অপু তার কাছের মানুষ।

‘দাদি, দেখছো কাণ্ড! আমি কীভাবে গড়গড় করে কথা বলতেছি?’

‘তুই কেঠা? অপু না?’

‘হুঁ।’

‘তুই তো সবসোম এমতেই কথা কইছথ।’

‘কী যে বলো না, দাদিজান। আমি এভাবে...?’

‘তুই জানি কেঠা? আমার ভাই না? আমার বড় ভাই না তুই?’

‘আমি তোমার নাতি। গফুরের ছেলে।’

‘ওহ্, আমার সাদি অইছে? কবে অইলো আমার সাদি?’

‘দাদি, কথা কম বলো, মাথায় একটু হাত বুলায় দাও।’

দাদির কাছ থেকে বের হয়ে, অপু ঠিক করল তৌহিদের কাছে যাবে। কিন্তু তার আগে গেল হানিফ বিরিয়ানিতে। চিৎকার করে শিস বাজিয়ে তুরু লালালা করতে করতে, ‘এই সালাদ দে, এই লেবু কই? আচার নাই, আচার?’ ডাক ছাড়তে ছাড়তে দুই প্লেট বিরিয়ানি খেল। মুরগির তন্দুরি দিতে দেরি হচ্ছে বলে ‘ওই ভাদাইম্মা’ বলে ওয়েটারকে ডাকলে ম্যানেজার কাছে এসে ভুরু নাচিয়ে বলে, ‘আপনে এই দোকানে নয়া নিকি? উজ্জুইসা সবুর করেন, তন্দুরি ওইবার গেলে টেম লাগে, চাইলেই পাওন যায় নিকি? ওই জসিম্মা, পাঁচ নম্বরে জলদি খাওন দে।’

এর আগে অপু এ দোকানে আসেনি, কথাটা ঠিক নয়। এসেছে। এ দোকান তার স্বপ্নের দোকান। একবার পাড়ার বন্ধুদের সাথে এসে খেয়েছে। এত ভালো লেগেছিল, পরেরবার একা এল, তার কথা কেউ শুনল না, বুঝল না, পেছন থেকে কে এসে ধাক্কা দিল, উল্টে পড়ে ঠোঁট কেটে গেল। অপমানে আর এ দোকানমুখো হয়নি। কিন্তু হানিফ বিরিয়ানিতে এমন চিৎকার করে গলা ছেড়ে হল্লা করে দুই প্লেট বিরিয়ানি খাবে, অনেক বছর ধরে জমা থাকা স্বপ্নের স্তূপে এ স্বপ্নও তো টিকে আছে।

দাদা টাকাটা নিল না, তার কিছু মনে নেই। সে আর তাকালও না, উপেক্ষাও করল না, একমনে রুপার বালির আংটা বাঁধতে থাকল। অপু বহু বছর ধরে পকেটে রেখে দেওয়া বারো শ টাকা সঙ্গে নিয়েই ফিরে এল। এই পাড়াতে এল যখন, সুলতানের সাথে দেখা করাটাও জরুরি।

তৌহিদের কাছে এবার যাওয়া যায়। শাহবাগে তৌহিদের অ্যাড ফার্ম আর প্রিন্টিং এজেন্সির অফিস। তৌহিদ তার জানের টুকরা দোস্ত। তাকে দেখে জড়িয়ে ধরে আর ছাড়ে না। ‘শালা, পুরা এক মাস তোর দেখা নাই। কেমন আছস? বিয়া কইরা ভুলে গেলি দোস্তরে।’

অপু হাসে। এখনো কথা বলার সময় আসেনি। একটু অপেক্ষা।

‘কী খাবি, লাঞ্চ কর।’

মাথা নাড়ে অপু, খাবে না।

‘চা খাবি? না কফি?’

অপু ইশারায় বোঝায়, প্রথমটা।

তৌহিদের অফিসরুমে এখন তারা দুইজন। সামনে চা রাখা। এখন বলা যায়।

‘তৌহিদ!’

তৌহিদ চেয়ার থেকে পড়ে যেতে লেগে উঠে বসে।

‘তু–তুই কথা বলতেছিস! ওহ মাই গড! ক্যামনে অপু, ক্যামনে? আই অ্যাম সো হ্যাপি ম্যান! সো হ্যাপি!’

‘তুই ক্যান এত হ্যাপি রে, কুত্তার বাচ্চা?’

‘কী বলিস শালা, হ্যাপি হব না? ইউ আর মাই বেস্ট ফ্রেন্ড। ক্যামনে হলো দোস্ত? কোন ট্রিটমেন্টে? মিরাকেল!’

‘ওই আজকে ফুল ফুটছে তো, তাই।’

‘কই ফুল ফুটছে?’

‘ওই যে চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে, কদমতলায় কে, হাতি নাচছে, ঘোড়া নাচছে সোনামনির বে।’

‘কী কস?’

‘কিছু না। শালা তুই আমারে শুধু ক, আমার বিয়ের দিন, তুই কাজী অফিসের বাইরে দাঁড়ায় লোকজনরে ক্যান বলছিস, দুই গাণ্ডু বোবায় বিয়ে বসছে? কেন অন্যদের সাথে হাসতেছিলি, বল! তুই না আমার বেস্ট ফ্রেন্ড?’

‘দোস্ত, হায় হায় আমার তো মনেও নাই, কী বলছি! এমনি মনে হয় সবাই মিলে একটু মশকরা করছি দোস্ত, নাথিং সিরিয়াস।’

‘ছোটবেলায় তুই পাড়ার সবাইরে বলতি না, এই বোবা হালারে বন্ধু বানায় খুবই ফায়দা। চা-পানির খরচ এই বোবায় দেয়। কথাবার্তা নাই, টাকা ঢালে খালি। বলিস নাই? আমি সব জানি তৌহিদ, সব জানি।’

‘সরি অপু! দোস্ত সরি!’

‘তৌহিদ, তোর চেহারা যেন আর কোনো দিন না দেখি। বন্ধুত্ব ডিসমিস।’

‘এত দিন কিছু বলিস নাই ক্যান? এই যে তোর এত রাগ, ইশারায় তো কত কিছু কইছিস, টেক্সট করিস কিছু হইলে, এইটাও বলতি?’

‘এই যে আমার মতন বোবার সাথে কেউ বন্ধুত্ব করছে, এই কৃতজ্ঞতায় তোর চাকর হয়ে ছিলাম শালা এত দিন। আর এমন করে চিৎকার করে মুখ খুলে এই যে হা–হা করে বলার যে আনন্দ! উফফ, এই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম।’

তৌহিদের অফিস থেকে বেরিয়ে চোখটা ভিজে গেল অপুর। এত দিনের বন্ধুকে বাতিল করে দিল, তাতে সব পুরোনো আনন্দ-ক্ষত কি হারিয়ে গেল! অপু আদি রুপার গয়নাঘরের দিকে হাঁটতে থাকল। চিত্তরঞ্জনদা এখনো কাজ করে, একজীবন ধরেই যেন। মনিপুরী পাড়ার শেষ মাথায় সেই কবে থেকে রয়েছে আদি রুপার গয়নাঘর। চিত্তরঞ্জনদা দোকানের মতোই শান্ত, একমনে চিমটা দিয়ে রুপার পুঁতি জুড়ে জুড়ে তৈরি করে মালা, কানের বালি, হাতের চুড়ি।

‘দাদা, কেমন আছেন?’

দাদা হাসল।

‘দাদা, আমাকে মাফ কইরে দেন, দাদা। মুখে মাফ চাইতে পারিনি বলে লজ্জায় আসিনি।’

‘কে তুমি, ভাইটি?

চিত্তরঞ্জনদা অপুকে চিনতে পারেনি। না পারারই কথা। অপুর বয়স তখন পনেরো, তখন ওরা এ পাড়ায় থাকত। মাথা নিচু করে গোঁ–গোঁ করে কথা বলবার চেষ্টা করত। কেউ ওর দিকে তাকাত না। চিত্তরঞ্জনদাও মন দিয়ে তাকাত না, কিন্তু অপুকে ফেলেও তো দিত না। অপু তার পাশে বসে বসে রুপার মালা গাঁথা শিখত। অপু আব্বাকে বুঝিয়েছিল, জীবনে আর কোনো উপায় না পেলে চিত্তরঞ্জনদার সঙ্গে রুপার দোকানে কাজ করবে। পাড়ার সুইটি যদি একটাবার প্রেমময় চোখে তাকায়, সেই আশায় বারো শ টাকা দামের একটা রুপার আংটি চুরি করে সুইটিকে দিয়েছিল অপু। সুইটি তাকায়নি, আর চিত্তরঞ্জনদাকে সে কী অপমানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে! সেদিন দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল অপু। মালিক চিত্তদাকে চোর, নিমকহারাম, ছোটলোক বলে গালি দিয়েছিল। চাকরি ছাড়ায়নি, এমন বিশ্বস্ত লোক পাবে কোথায়? চিত্তদাও কখনো দোকান ছেড়ে যায়নি।

‘দাদা, আপনি আমার কাছে বারো শ টাকা পান। এই যে এখানে টাকা, আপনি রাখেন। একবার একটা আংটি না বলে, মানে চুরি করে নিয়ে গেছিলাম, মনে আছে? অনেক আগে।’

দাদা টাকাটা নিল না, তার কিছু মনে নেই। সে আর তাকালও না, উপেক্ষাও করল না, একমনে রুপার বালির আংটা বাঁধতে থাকল। অপু বহু বছর ধরে পকেটে রেখে দেওয়া বারো শ টাকা সঙ্গে নিয়েই ফিরে এল। এই পাড়াতে এল যখন, সুলতানের সাথে দেখা করাটাও জরুরি। সুলতানকে দেখেই সে একটা ঘুষি দিল কাঁধে: ‘শালা, আমি যে সবুজ সংঘে তোদের পক্ষে ছিলাম না, তোরে ভোট দেইনি, তুই তো জানস। জানস না? তারপরও তুই সবাইরে ক্যান বললি যে আমি তোর হইয়া কাজ করি? শালা, আমি তোর এগেইনস্টে ছিলাম!’

‘ওরে অপু! বেবি, তুই এত পুরান কথা টেনে আনিস ক্যান? ছোট ছিলাম, ভুল হইছে। সরি সরি। আর তোর গলা দিয়ে এমন অমিতাভ বচ্চনের মতন আওয়াজ বের হইতেছে ক্যামনে? বাপরে, কী কঠিন বেজ! ক্যামনে ঠিক হইল সব, দোস্ত?’

সাফিয়া ফিরে এসেছে, ওর শরীরের বেলিফুলের সুঘ্রাণ ঘরজুড়ে। এই যে সাফিয়াও এসে অপুর গা ঘেঁষে দাঁড়াল। মাধবীলতাগাছকে আড়াল করে তারা তিনজন এক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অপু হাত উঁচু করে আব্বাকে দেখায়, সাফিয়াকে দেখায়: মাধবীলতা গাছ, ফুলশূন্য একাকী দুলছে।

সুলতান অপুকে জাপটে ধরে রাখল, শিঙাড়া আর চা খাওয়াল। অপু কেন যেন ভ্যা–ভ্যা করে কাঁদতে লাগল, সুলতান তাকে চেপে ধরে রাখল, পুরোনো সমস্ত ভুলের মতন গাঢ় করে জড়িয়ে ধরে রাখল বন্ধুকে।

অপু ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। দিনটা বড্ড দীর্ঘ আজ। আম্মার কাছে গিয়ে একবার বসা দরকার। আজিমপুরের দিকে রওনা দিল। আম্মার কবরের চারপাশটায় আগাছা, কবরখানার ম্যানেজারকে ডেকে আচ্ছাসে বকা দিল।

‘এই জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার করবেন। টাকা কি কম পান, তাইলে এত ময়লা ক্যান?’

লোকটা ভারি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল।

আম্মার কবরের পাশে বসে অপু আজকে অনেক গল্প করল: ‘আম্মা, কোনো দিন তো তোমাকে বলা হয়নি, সাফিয়ার সাথে আমার কেমন করে পরিচয়। আমি যে প্রত্যাশা নামের মূক ও বধির সেন্টারে যেতাম, সেখানে এ মেয়েকে দুয়েকবার দেখলাম। আমার পরের ক্লাসের স্টুডেন্ট। একদিন দেখি, সে বাগানে বসে হরিণের ছবি আঁকছে। কী যে সুন্দর, আম্মা! আমি ইশারায় বললাম আরকি, তুমি হরিণ দেখেছ? মেয়েটা মাথা নাড়ে, দেখেনি। আমি বললাম, তোমাকে এ রকম একটা হরিণ খুঁজে দেব। সে হেসে দিল। আমি বললাম, তোমার চোখগুলো হরিণের মতন, আমাকে দেবে? সে আবার হেসে দিল। আম্মা, তুমি যেমন করে আমার কথা বুঝতা, ও সে রকম বোঝে। ও ইশারায় গোঁ–গোঁ করে যা বলে, আমি তা বুঝি। আমাদের এই গোঁ–গোঁ ভাষায় আমরা দুই বোবা মিলে একটা উপন্যাস লিখে ফেলতে পারব। বইয়ের নাম হবে, ভাষাহীন ভালোবাসা। আচ্ছা আম্মা, আমি আজ এমন মানুষের মতন কথা বলছি কেমন করে? তুমি অবাক হচ্ছ, না? আম্মা, আজকে তোমার মাধবীলতাগাছে আবার ফুল ফুটেছে। আজকে তো আমার কথা বলবার দিন। আমি তোমার এখানে একটা মাধবীলতার গাছ লাগাব, এরপর যেদিন আসব, সেদিন নিয়ে আসব।’

সন্ধ্যার আগে বাসায় ফেরা দরকার। আব্বাকে সামনে বসিয়ে আজ বলবে, ও আব্বা, তোমার গায়ের ঘাম–ঘাম ঘ্রাণটুকুর জন্য থেকে বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে অনেক অনেক দিন। রিকশায় যেতে যেতে অপু বুঝল, সব আবার আগের মতন হয়ে যাচ্ছে। ভাড়া মেটানোর সময় সে যখন রিকশাচালককে পাঁচটা টাকা বেশি রাখতে বলতে যাবে, তখন বুঝল সব আবার আগের মতন। শুধু গোঁ–গোঁ শব্দটুকুই বোধ হয় শোনা যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে অপুর মনে হলো, কী বোকা আমি! নিজের দু–একটা কথা মোবাইলে রেকর্ড করে রাখব না! আব্বা শুনতে পেত, সাফিয়া শুনতে পেত, আমার গলা নাকি অমিতাভ বচ্চনের মতন! সুলতান তো বলল!

জানালার কাছে গিয়ে অপু দেখতে পেল, মাধবীলতা ফুলটা কে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। আব্বা পাশে এসে দাঁড়াল, ‘সারা দিন কই ছিলি, অপু?’

সাফিয়া ফিরে এসেছে, ওর শরীরের বেলিফুলের সুঘ্রাণ ঘরজুড়ে। এই যে সাফিয়াও এসে অপুর গা ঘেঁষে দাঁড়াল। মাধবীলতাগাছকে আড়াল করে তারা তিনজন এক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অপু হাত উঁচু করে আব্বাকে দেখায়, সাফিয়াকে দেখায়: মাধবীলতা গাছ, ফুলশূন্য একাকী দুলছে।

আব্বা বলে, ‘এই গাছে একদিন ফুল ধরবে, দেখিস। সেদিন সব ভালো হবে, খুব ভালো।’

সাফিয়া আঙুলের খেলায় ইশারায় বলে, ‘ফুল ফুটেছিল, অপু?’

অপু মাথা নাড়ে। কেমন করে বোঝে সাফিয়া!

সাফিয়া বলে, ‘তুমি কিছু বলতে চেয়েছিলে?’

অপু দুচোখ ভরে হাসে। ‘আজ থাক। আবার যেদিন মাধবীলতা ফুটবে, আমি তোমাদের আমার ভালোবাসার কথা শোনাব।’