গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

মহাফেজখানা থেকে

অপরাহ্নের গল্প

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের এ গল্প প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৯ সালের ১২ মার্চ। তখনও প্রথম আলো অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি, তাই গল্পটি এত দিন শুধু কাগজের পাতাজুড়েই ছিল। ‘অন্য আলো’ অনলাইন পাঠকের জন্য আজ গল্পটি তুলে ধরা হলো।

বাসটা ভালোই চলছিল, কিন্তু জগতে অবিমিশ্র ভালো বলে কিছু নেই। দুপুর যখন বাসের চাকার সঙ্গে গড়িয়ে যাচ্ছে বিকেলের দিকে, বাসটা ঝাঁকি দিয়ে দুএকবার কাশল—জটিল কাশির রোগীর মতো-থেমে থেমে কিছুটা এগুলো, তারপর নিথর হয়ে গেল।

রাস্তাটা মাঝারি সাইজের, কিন্তু বাস ট্রাক চলে বুনো মোষের মতো তেজে। প্রতিমুহূর্তে একটা ‘গেল, গেল’ ভাব। আমাদের চালক একটু বেশি সতর্ক, নাকি বাসের স্বাস্থ্যটা উপদ্রুত, জানি না, কিন্তু যাত্রাটা তেমন ভীতিকর মনে হয়নি। তবুও, থামায় একটু স্বস্তি পেলাম, কিছুক্ষণের আয়ু ফিরে পাওয়ার স্বস্তি। কিন্তু সেটি বেশিক্ষণ থাকল না। কারণ বাসটা ঠেলতে হবে।

ঠেলতে হবে? হ্যাঁ ঠেলতে হবে। সবাই হাত লাগান ভাই, আমাদের কিছু করার নাই। তেলিয়াপাড়া ওই দেখা যায়। ওখানে পৌঁছানো গেলে বাসটা সারানোর একটা ব্যবস্থা হবে।

তেলিয়াপাড়া কোনো বিখ্যাত জায়গা নয়। এর নামের সঙ্গে কোনো ইতিহাস কিংবা কিংবদন্তির গন্ধ নেই। আশেপাশে প্রচুর জঙ্গল, জগতে যা ক্রমশ বিরল হচ্ছে বলে আমরা জানি। আর আছে চা বাগান। আরো নিশ্চয় অনেক কিছু আছে। কিন্তু সেসবের খবর তেলিয়াপাড়াবাসীরাই বলতে পারবেন। আমি তেলিয়াপাড়াবাসী নই। বাইরে থেকে যতটা চোখে পড়ে, তাই বর্ণনা করতে পারি। কিন্তু বর্ণনাটা বরং একটু পরেই করি, কারণ আপাতত আমার চোখে একটা মুগ্ধতা ধরা পড়েছে। না, তেলিয়াপাড়ার প্রকৃতির সৌন্দর্য-মুগ্ধতা নয়—তেলিয়াপাড়া বাজারে, যেখানে আমরা বাসটাকে ঠেলতে নিয়ে এসেছি, তেলিয়াপাড়ার এই ডাউনটাউনে, বস্তুত কোনো প্রকৃতি নেই। এখানে এসে পৌঁছানোর আগেই প্রকৃতি সাবাড় হয়ে গেছে। প্রকৃতি যেটুকু আছে, তা মানুষকে ঝোঁপঝাড়ের দিকে টানার জন্য। আমার মুগ্ধতার বিষয় এক তরুণী, আটাশ ত্রিশের মতো বয়স। সুশ্রী। সুশ্রী তরুণীদের চোখ নাক মুখ এবং শরীরের গড়ন এবং চুল সবই সুন্দর হয়। এই তরুণীরও। তদুপরি তার সবুজ রঙের তাঁতের শাড়িটিও সুন্দর—নাকি তার গায়ে লেগে শাড়িটা সুন্দর হয়েছে, কে জানে। তরুণীর সঙ্গে একটি ৫/৬ বছরের মেয়ে, নিশ্চয় তার। কিন্তু আশেপাশের স্বামী-সদৃশ কাউকে দেখা গেল না। হয় সে মানুষ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়েছে, অথবা মেয়ের জন্য বিস্কুট অথবা কেক কিনছে, অথবা সে সঙ্গে আসেনি। অথবা সে মৃত।

তরুণীটির ফর্সা মুখ কিছুটা লাল হয়ে আছে, যদিও তাকে (অবশ্যই) গাড়ি ঠেলতে হয়নি। তার কপালে ঘামের চিহ্ন। দিনটাকে অবশ্য উষ্ণই বলা যায়. যদিও শীত আসার খবর রটে যাওয়ার কথা বাতাসে। সূর্য হেলে পড়তে শুরু করেছে। বাসটা যেখানে থামিয়ে মেকানিকের খোঁজে গেছে ড্রাইভার, তার পাশে কিছু কাঁচামালের দোকান। আড়ত। গদিতে মোটাসোটা দোকানি বসে হিসাব করছে, নয়তো আলাপ করছে কারো সাথে। একটা দোকানের সামনে বাঁশের বেঞ্চ পাতা। সেই বেঞ্চে মেয়েকে নিয়ে বসেছে তরুণীটি। ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে, যদিও বাতাসে ক্লান্তির কোনো স্পর্শ নেই। সতেজ, স্বাস্থ্যময় বাতাস। প্রাণটা জুড়িয়ে দেয়। অন্তত আমার দিয়েছে।

আমি বেঞ্চটার বিপরীতে একটা পাথরের উপর বসি। তিনটে বড়সড় পাথর ফেলা মেটে রাস্তার একপাশে, অন্য পাশে পরপর তিনটে দোকান। কী সুন্দর হিসাব! আমার ও তরুণীর মাঝখানে ছ’সাত ফুটের ব্যবধান।

বাসের প্যাসেঞ্জাররা হল্লা করছে এদিক-সেদিক। কেউ চা খাচ্ছে, উচ্চস্বরে কথা বলছে। কেউ উদ্দেশ্যহীন হাঁটছে। অনেকেই দেখছে তরুণীটিকে। আরো মহিলা যাত্রী আছে, তাদের দুএকজনকেও মানুষ দেখছে, যারা একটু দেখার মতো তাদেরকে। তবে বেশি দেখছে এই তরুণীটিকে।

বাসে উঠে ভালো সিট দখলের প্রতিযোগিতায় কোনোদিকে তাকানোর সময় হয়নি। তরুণীটিকে দেখিনি। তার কন্যাটিকেও। এখন তার দিকে চোখ পড়তে একটা আবিষ্কারের আনন্দ পাচ্ছি। তরুণীটি চুপচাপ বসে। আমিও। আমাদের মাঝখানের মেটে রাস্তাটাতে কোনো উত্তেজনা নেই। শুধু খড়খড় বাতাসে দুএকটা পাতা আর ধুলিকণা ওড়াওড়ি করে।

তরুণীটি ক্লান্ত চোখে আমার দিকে তাকায়। সাধারণ, অবিশেষ দৃষ্টিপাত। তবে আমি জানি, আমি তার চোখে পড়ব অচিরেই। দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় দৃষ্টিপাতে। শুধু সময়ের ব্যাপার।

কেন তার চোখে পড়ব আমি? কারণ, আমাকে সেখানে দেখলে আপনারও চোখে পড়ত। তেলিয়াপাড়ার ডাউনটাউনে এই নিঃসঙ্কোচ অপরাহ্নে চোখে পড়ার মতো আর কেউ ছিল না ধারে কাছে। আমার গায়ে একটা লাল চেক শার্ট চোখে সোনার রিমের চশমা। আমার পরনে জিনসের প্যান্ট: যেখানে অন্যান্য প্যাসেঞ্জারের অনেকেই পরেছে লুঙ্গি না হয় সস্তা কাপড়ের প্যান্ট। আমার চেহারাতেও একটা কুলীন কুলীন ভাব। বস্তুত অনেকেই আমার দিকে দুএকবার সম্ভ্রমের চোখে দেখেছে, অকারণে সালামও দিয়েছে দু’এক যুবক। সালামযোগ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারীই বলা যায় আমাকে, সে কারণে বাস ঠেলা থেকেও হয়তো অব্যাহতি পেয়েছি।

দ্বিতীয়বার আমার দিকে চোখ পড়তেই একটু থমকে তাকাল তরুণীটি। মনে হলো, আমাকে যেন খুঁটিয়ে দেখল, দু’দণ্ড। তারপর চোখ ফিরিয়ে নিল। আমি নিশ্চিত হই, রাস্তায় ঘুরঘুর করতে থাকা উদভ্রান্ত কুকুরটি বাসটির ছায়া মাড়িয়ে চলে যাওয়ার আগেই তৃতীয় নেত্রপাত ঘটবে।

এবং তাই ঘটল।

আমি এবার সরাসরি তরুণীটির দিকে তাকালাম। একটুখানি বিচলিত মনে হলো তাকে।

কিন্তু মুহূর্তমাত্র। তারপর মৃদু হাসল। হাসিটি বিপন্ন, যদিও মাধুর্যের কোনো কমতি নেই তাতে। ‘আপনার মেয়ে বুঝি?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘জ্বি, আমার মেয়ে, মিথিলা’। সে বলল, ‘মিথিলা, সালাম করো।’ সালামযোগ্য ব্যক্তিত্বই বটে।

‘সুন্দর নাম, সচরাচর শোনা যায় না।’

‘ধন্যবাদ,’ বলল তরুণীটি, দেখা যাচ্ছে, সুশ্রী তরুণীটির শিক্ষা এবং রুচি আছে। কিন্তু স্বামীটি কোথায়? মনের মধ্যে প্রশ্নটা জাগে, কিন্তু জিজ্ঞেস করার সাহস হয় না, অথবা এরকম প্রশ্ন করার যথার্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি না।

‘দূরে কোথাও যাচ্ছেন?’ আমি সভ্য মানুষের মতো প্রশ্ন করি। ‘যত দূর গাড়িটা যাবে’, তরুণীটি হেসে বলে, ‘অর্থাত্ শ্রীমঙ্গল। আপনি?’

‘আমিও।’

‘ও।’

তরুণীটি দূরের গাছপালার সারির দিকে চোখ ফেরায়। তার শাড়ির আঁচল বাতাসে ওড়ে। আঁচলটা ধরে সে কপালের ঘাম মোছে। মেয়ের মাথায় হাত ঠুকে আদর করে। আমি বুঝতে পারি, তার চোখ এবং মনোযোগ আবার আমার দিকে ফিরবে—যদিও এক অর্থে তাদের সরিয়ে নেয়নি সে। কথোপকথনে সাময়িক ছেদ পড়েছে—শুধু অভ্যাসের জন্য। মনে মনে হয়তো ভাবছে, আর কিছু বলা সঙ্গত কিনা, অথবা কতক্ষণ আর কথা বলা শোভন হবে। কথা বলতে আগ্রহ না থাকলে তরুণীটি ‘একটু হেঁটে আসি, বসে বসে ভাল্লাগছে না বলে উঠে যেত। কিন্তু সে বসে আছে। আমি তাকে দেখছি; কারণ দেখতে ভালো লাগছে। গাড়িটা বিকল হয়ে যাওয়ায় বিরক্ত হয়েছিলাম। এখন মনে হচ্ছে থাকুক সেটি বিকল হয়ে। আর আমি মেয়েটির সামনে এই পাথরে বসে থাকি একটা দিন।

তরুণীটি আবার দৃষ্টি ফেরায়। মৃদু হাসে। ‘শ্রীমঙ্গলেই থাকেন?’ সে জিজ্ঞেস করে।

‘না, ঢাকাতে।’

‘কাজে যাচ্ছেন?’

‘কাজেও বলতে পারেন, অকাজেও বলতে পারেন।’

তরুণীটি কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে।

‘লেখালেখির জন্য একটা বাগানে যাচ্ছি।’

‘কী লেখেন?’

‘এই টুকিটাকি, গল্প উপন্যাস—এইসব।’ আমি বিষয়টা হালকা করার জন্য বলি।

‘একা যাচ্ছেন যে?’

‘একা মানুষ। একাই তো যেতে হয়।’

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, ‘লেখালেখিতে চলে?

প্রশ্নটা শুনে মন খারাপ হয়ে যায়। লেখালেখি যারা করে, তাদের একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে মানুষ দেখবে, এরকম ভাবতে আমার ভালো লাগে। এর সঙ্গে আবার জীবিকার প্রশ্নটা কেন জড়িয়ে ফেলা? প্রসঙ্গটা এড়াতে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘শ্রীমঙ্গলেই থাকেন?’

মেয়েটি মাথা নাড়ে।

‘নিজের বাসা?’

আবারো সে মাথা নাড়ে।

মেটে রাস্তাটা যেখানে চওড়া হয়ে একটা তেলের কলের সামনে গিয়ে ডানে বাঁক নিয়েছে, সেখানে কিছু ছোট ছেলেমেয়ে খেলছে। হৈ চৈ করছে। এদের কেউ বাজারে মুটের কাজ করে, কেউ এমনিতেই ঘুরে বেড়ায়। এদের সঙ্গে যাত্রীদের দু’এক সন্তান যোগ দিয়েছে। মায়ের পাশে বসে এতোক্ষণে অধৈর্য হয়ে পড়েছে মিথিলা। এবার সে উঠে দাঁড়ায়, মায়ের হাত ধরে টানে। সেও খেলবে।

গল্পটি ‘প্রথম আলো’র সাহিত্য সাময়িকী ‘শুক্রবারের সাময়িকী’তে এভাবেই প্রকাশিত হয়েছিল
‘তাতে কী। আমাকে মানুষ খুঁজে পাবে না। কেউ খুঁজতে বেরুলে আমার জানা হয়ে যায়।’ ‘কিন্তু আমার কাছে ধরা দিলে যে?’ ‘না, ধরা দিইনি। আমাকে আপনার প্রয়োজন হয়েছে, কিছুক্ষণ সঙ্গ দিতে এসেছি। ব্যস্।’ ‘তোমাকে আমার কেন প্রয়োজন হবে’, আমি জিজ্ঞেস করি। আবদুল কাদিরের আত্মবিশ্বাস ভঙ্গিটা আমাকে পীড়া দেয়।

তার বেশিক্ষণ তরুণীটি বসে থাকবে না।

‘আপনি একাই যাচ্ছেন শ্রীমঙ্গলে?’ আমি মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করি।

‘না, আমার স্বামী সঙ্গে আছেন।’

‘ও’, আমি বলি। আমার গলা প্রায় বসে যায়। কিন্তু আমি যে আশাহত হয়েছি সেটি তরুণীটিকে বুঝতে দেয়া যায় না। ‘তাকে দেখছি না যে?’

‘মেকানিক আনতে গেছে’, মেয়েটি নিষ্পৃহভাবে বলে।

‘ও, গাড়ির মালিক বুঝি?’

‘না ড্রাইভার।’

আমার মনে হলো, বিকল গাড়িটা যেন কানের পাশে বিকট শব্দে ভেঁপু দিয়ে উঠল।

২.

আমি পাথরের উপর বসে থাকি। তরুণীটি হাঁটছে। দূর থেকে তাকে আরো সুন্দর লাগছে, তার সেই সবুজ শাড়িতে। চুল কাঁধ ছাপিয়ে পড়েছে অজস্র, বাতাসে উড়ছে। আমার হতচকিত ভাবটা কাটে না। এই বিকল গাড়ির ড্রাইভার তার স্বামী? ভুল বলেনি তো? অথবা ভুল শুনিনি তো আমি?

একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করে। এখনো কয়েক শলা আছে। কালকের কেনা প্যাকেটে।

সিগারেটে কয়েকটা টান দিলে বিচলিত ভাবটা চলে যায়। পুরো ব্যাপারটা একটা যুক্তিযুক্ত আলোয় দেখার চেষ্টা করি। ড্রাইভারের পেশাটি সচারাচর খুব উন্নত কোনো পেশা নয়, সেটা জানি। উচ্চশিক্ষিত লোক বাসের ড্রাইভার হয় না। কিন্তু একেবারেই কি হয় না? ড্রাইভারের চেহারাটা মনে আনতে চেষ্টা করি। মনে পড়ে না। কন্ডাক্টরের সঙ্গেই যেটুকু কথাবার্তা হয়েছে, ড্রাইভার আড়ালে রয়ে গেছে। হয়তো সুদর্শন মানুষ সে, হয়তো জেদ করে পেশাটি বেছে নিয়েছে। এজন্য মেয়েটির পরিবার বিয়ে দিতে আপত্তি করেনি। হয়তো তরুণীটি একা বাসে যাচ্ছিল কোথাও সুশ্রী ড্রাইভারকে দেখে ভালো লেগে যায় ... নাহ্।

একটা ফাঁক থেকে যায়। হিসাবটা মেলে না। তাহলে?

আমি ভাবতে থাকি। সত্যিই কি মেলে না? একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথোপকথনে মেয়েটি কি কোনো ইঙ্গিত দেয়নি? সেটি কি আমি ধরতে পারিনি?

তরুণীটিকে দেখা যায়, দু এক মহিলার সঙ্গে কথা বলছে। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিটি, তার সবুজ শাড়ির অশান্ত আঁচল, তার অপরাহ্নের আলোয় ধোয়া চুল আমাকে এক স্বপ্নের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট করে যায়, যে স্বপ্নটি এইমাত্র আমার ভেতরে তৈরি হয়েছে।

৩.

সিগারেটের প্যাকেটটা নাড়াচাড়া করি অন্যমনস্কভাবে। সোনালি রঙের প্যাকেট, রোদ পড়ে চকচক করে। সেই চকচকে আলো ফুড়ে হঠাৎ কিছু লেখা বেরোয়। কালো কালিতে লেখা একটা ঠিকানা। মনে পড়ে যায়, গত সন্ধ্যায় আমার এক বন্ধু ঠিকানাটা লিখে দিয়েছিল প্যাকেটের ওপর। একটা বিয়েতে গিয়েছিলাম, সেখানে দেখা তার সঙ্গে। পুলিশের সেজো-মেজো কর্তা।আমি শ্রীমঙ্গল যাচ্ছি শুনে আমাকে উত্সাহ দিয়েছিল, বাজ খাওয়া মানুষের ব্যাপারটার খোঁজ নিতে, সম্ভব হলে মানুষটিরও। ‘গল্প-টল্প লিখিস, মজা পাবি’, সে বলেছিল।

বাজ খাওয়া মানুষের ঘটনাটা আমার অগোচরেই ছিল। সেটি আমার গোচরে আনল আমার বন্ধু। ঘটনাটা এই: শ্রীমঙ্গলের অনতিদূর দড়িপোঁতায় গত বৈশাখে খুব ঝড় হয়েছিল। সঙ্গে বজ্রপাত। বজ্রপাতে দুজন মানুষ মারা গেল, কিন্তু একজন মরলো না। যে বেঁচে গেল, তার নাম আবদুল কাদির। শীতের সময় লেপতোষক বানায়, অন্য সময় হাটবাজারে রেলস্টেশনে এটা-সেটা ফেরি করে একতারা বাজিয়ে। যে দুজন মরলো, তারা মাঠে কাজ করছিল আর আবদুল কাদির মাঠটা পার হচ্ছিল। মাথায় বাজ পড়লে কিছুক্ষণ অচেতন হয়ে পড়েছিল সে। জ্ঞান ফিরে পেলে উঠে দাঁড়ায়, তারপর দৌড়ে গ্রামে গিয়ে দুজনের বজ্রপাতের খবর পৌঁছে দেয়।

তারপর থেকে আবদুল কাদিরের কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দেখা দিল। যেকোনো মানুষকে দেখে সে তার অতীতটা বলে দিতে পারে। ভবিষ্যত্ নয়, অতীত।

যেহেতু দেশের মানুষ ভবিষ্যত্ জানতেই আগ্রহী বেশি, অতীতকে নয়, আবদুল কাদিরের তেমন নামডাক হলো না। পয়সাপাতিও হলো না। তবে তার কদর বাড়ল সেসব লোকের কাছে, অন্যের অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে যাদের লাভ হয়, যেমন রাজনীতিবিদ, দুষ্টলোক, অথবা পুলিশ। শুধু আশপাশ থেকে নয়, ঢাকা থেকেও তার ডাক আসলো।

বিশেষ করে নির্বাচনের সময়। এবং এভাবেই পুলিশের খাতায় তার নাম উঠল, পুলিশের ভালো ও মন্দ উভয় খাতায়।

আমার বন্ধু আমাকে উত্সাহ দিল, অন্তত একবার আবদুল কাদিরের সঙ্গে দেখা করার। আবদুল কাদির কিছুদিন পালিয়ে ছিল; যাদের অতীত সংবাদ দিয়ে সে জটিলতা সৃষ্টি করেছে, তারা তাকে খুঁজছিল। পুলিশ জানে, সে শ্রীমঙ্গল অথবা আশেপাশে আছে, কিন্তু তাকে ধরা যাচ্ছে না। ‘অন্তত তার নিজের নিরাপত্তার জন্যও তাকে পুলিশের আশ্রয়ে আনতে হবে,’ আমার বন্ধু বলেছে। কিন্তু আমি জানি পুলিশের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী। কোন কোন মানুষ সম্পর্কে কী কী জানা বাকি রয়ে গেছে তাদের, আন্দাজ করতে পারি।

কাগজের অভাবে সিগারেটের প্যাকেটে যে ঠিকানাটা আমার বন্ধু লিখে দিয়েছে, সেটি শ্রীমঙ্গলের বিখ্যাত লেপতোষক ব্যবসায়ী অঘোর সামন্তের। তার কাছে যদি কোনো খোঁজ পাওয়া যায় আবদুল কাদিরের। লেখক মানুষ, হয়তো কোনো খবর জানলে তা জানাতে আপত্তি করবে না। তবে আবদুল কাদিরকে পেলে তাকে প্রথম জানাতে অনুরোধ করেছে বন্ধুটি। থানায় গিয়ে বিনে পয়সায় ঢাকায় ফোন করতে পারবো।

রোদ পড়ে চিকচিক করছে অঘোর সামন্তের নাম। সেই দ্যুতির ভিতর থেকে একটা আলোর কাঁটা উঠে এসে হঠাত্ যেন বিঁধল আমাকে। আমি চমকে উঠলাম। আবদুল কাদির। অতীতদ্রষ্টা। কেমন হয়, আবদুল কাদিরকে যদি আমি পাই, এবং তাকে জিজ্ঞেস করি ওই তরুণীটির কথা, এবং তার অতীতটা চোখের সামনে দেখতে পাই?

এই অবাস্তব চিন্তায় নিজেই হাসি। তবে চিন্তাটা উপভোগ্য নিঃসন্দেহে। একটা সিগারেট খেলে মাথাটা পরিষ্কার হবে, আমি ভাবি।

বাতাসটা আবার খড়খড়ে হয়ে উঠেছে। উদ্ভ্রান্ত কুকুরটা একটা আশ্রয় পেয়েছে, পাশের পাথরটির ছায়ায়। শুয়ে শুয়ে আমার দিকে উদাসীনভাবে তাকায় কুকুরটা।

আমার হাসি পায়। কিছুক্ষণ আগে চোখাচোখি হলো এক অপূর্ব সুন্দরীর সঙ্গে, এখন চোখাচোখি হলো এই কুকুরটার সঙ্গে।

এই কুত্তাটার সঙ্গে!

৪.

সিগারেট শেষ হয়ে যায়। গোড়াটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে উঠতে যাব—একটা খবর নিতে হয় বিকল বাসটার কদ্দুর কী হল—কুকুরটা হঠাত্ চিত্কার করে ওঠে। সেদিকে তাকাতেই চোখে পড়ে, পাথরটার উপর, একটা লোক বসে। কখন এসে বসেছে, কে জানে—খেয়ালই করিনি, এতটাই মগ্ন ছিলাম নিজের চিন্তার ভিতরে। তার পা কুকুরটার লেজ মাড়িয়ে দিয়েছে।

লোকটার ওপর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বেচারা কুকুর। পরিশ্রান্ত হয়ে একটুখানি বিশ্রাম নিচ্ছিল।

কিন্তু লোকটাই বা কে? মাথায় লম্বা চুল, মুখে দাড়ি। পরনে রংচটা শার্ট, চেক লুঙ্গি। হাতে একটা একতারা। আমার ভ্রু কুঁচকে আসে। স্মৃতিতে একটা গন্ধ ছড়ায়। কোথাও কি দেখেছি লোকটাকে?

‘আমার নাম আবদুল কাদির।’ আমার চোখের দিকে স্পষ্ট তাকিয়ে বলে লোকটি। ‘আমার খোঁজ নিতে বলা হয়েছে আপনাকে, যদিও তাতে আপনার তেমন আগ্রহ নেই।’

 আমি চমকে উঠি, আবদুল কাদির মাথায় বাজ পড়লে যেমন চমকে উঠেছিল।

‘কী করে জানলেন, আবদুল কাদির, আপনাকে খুঁজে দেখতে বলা হয়েছে আমাকে?’ প্রশ্নটা করেই অবশ্য বুঝতে পারি, বাতুল প্রশ্ন। আবদুল কাদির হাসে, আর বলে, ‘আমাকে তুমি বলবেন। খুশি হবো।’

‘ঠিক আছে। কিন্তু তোমাকে পুলিশ-টুশি খোঁজাখুঁজি করছে, নিশ্চয় জানো। তেলিয়াপাড়ার বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেন?’

‘তাতে কী। আমাকে মানুষ খুঁজে পাবে না। কেউ খুঁজতে বেরুলে আমার জানা হয়ে যায়।’

‘কিন্তু আমার কাছে ধরা দিলে যে?’

‘না, ধরা দিইনি। আমাকে আপনার প্রয়োজন হয়েছে, কিছুক্ষণ সঙ্গ দিতে এসেছি। ব্যস্।’

‘তোমাকে আমার কেন প্রয়োজন হবে’, আমি জিজ্ঞেস করি। আবদুল কাদিরের আত্মবিশ্বাস ভঙ্গিটা আমাকে পীড়া দেয়।

জসিম ড্রাইভারকে আবারো নিরীক্ষণ করি আমি। তাকে দেখে একটা স্কুল মাস্টারের মতো নিরাপদ মনে হয়। লোকটাকে নিষ্ক্রিয় করা কোনো ব্যাপারই না, আমার জন্য। ধরা যাক তরুণীটি চলে আসতে রাজি হলো জসিমকে ছেড়ে। কী করবে জসিম? থানা পুলিশ? কোর্ট কাচারি? হামলা মাস্তানি? সবখানে নির্ঘাত সে মার খাবে। একটা পুলিশ কেসে ফাঁসিয়ে তাকে জেলে পাঠিয়ে দেয়া যায়। সামাজিকতার মুখোশটা সেরকম প্রয়োজনে সামান্য খসালেই জসিমের মতো মানুষ উড়ে যায় খড়কুটো হয়ে।

‘সেতো আপনিই আমাকে বলবেন, প্রয়োজনটা যেহেতু আপনার।’ সে বলে। আমার রাগ হয়। সালামযোগ্য ব্যক্তিত্ব আমি, সমাজে একটা প্রতিষ্ঠা আছে। অথচ আবদুল কাদির এমনভাবে কথা বলছে যেন তার কথা শোনার জন্য পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে এসেছি।

‘তোমাকে আমার কোনো প্রয়োজন হবে না। তুমি আসতে পার।’ আমি বলি। এবং খোঁচা-খাওয়া অহংকারটাকে শান্ত করার জন্য একটু ভয় দেখাই তাকে, ‘তোমার খবর পুলিশে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে আমাকে, জানো তো।’

আবদুল কাদির হাসে। কিছুটা করুণা, কিছুটা বিষণ্নতা থাকে সেই হাসিতে। আবার একটা নিস্পৃহ ভাবও। একটু আগে কুকুরটার দিকে তাকিয়ে আমি যে রকম হেসেছিলাম।

একটা হাত সে বাড়ায় আমার দিকে। ‘দিন, একটা সিগারেট দিন। গল্পটা যেহেতু একটা সিগারেটের সমান লম্বা।’

‘কোন গল্পটা?’ আমি দ্বিধান্বিতভাবে জিজ্ঞেস করি, কিন্তু তাকে সিগারেট দিই, অভ্যাসবশত:।

‘ওই গল্পটি,’ বলে অনির্দিষ্টভাবে সামনের দিকে আঙুল তুলে দেখায় আবদুল কাদির।

পরিশ্রান্ত, ইতঃস্তত ছড়ানো যাত্রীদের ভিড়ে একটুখানি সবুজ শাড়ির আভাস দেখা দেয়। একটা গাছের সঙ্গে ঠেস দিয়ে সে দাঁড়ানো। আঁচলে মুখ মুছছে। মুখ, নাকি চোখ, এই দূরত্ব থেকে বোঝা যায় না। তার কন্যাটি খেলছে পথের ধুলোয়। ওই তরুণীর মতো মায়েরা সন্তানদের এই ধূলিধূসর খেলা পছন্দ করে না: তার বিরক্ত হওয়ার কথা। হাত ধরে টেনে তোলার কথা। কিন্তু সে কিছুই করছে না। শুধু গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিকেলের বাতাসের মতো উদাস এবং অভাবী তার ভঙ্গিটি।

আবদুল কাদিরের চোখে প্রশ্ন তুলে তাকাই। যদি গল্পটি ওই তরুণীর হয়, তাহলে আপত্তি নেই। বস্তুত একটু আগেও সেই গল্প জানার আমার একটা আগ্রহ ছিল। হয়তো আরো কিছুক্ষণ মেয়েটি ওই বেঞ্চে বসে থাকলে আমার তা জানা হয়ে যেত।

আবদুল কাদিরের কোনো দখল নেই ভাষার ওপর। একটু জটিল বর্ণনাতে ভাষাটি ভেঙে যায়, হাবুডুবু খায়, সাঁতার কাটে। কিন্তু তার ভাঙা ভাষা একটা ভাঙা জীবনের ছবি তুলে ধরে। মলিন একটি ছবি, খুবই সাধারণ—খবরের কাগজে এরকম ছবি দেখতে আমরা অভ্যস্ত।

তরুণীটি, আবদুল কাদিরের বর্ণনা মতো, ছিল মোটামুটি সচ্ছল এক মধ্যবিত্ত পরিবারের। কলেজে পড়ার সময় বাবা মারা যান, আর তখন থেকেই বিপত্তি নামে তার জীবনে। তার বিয়ে হয় এক উকিলের সঙ্গে। বরের বয়সটা বেশিই ছিল, তবে আরো বেশি ছিল তার শারীরিক সমস্যা। বছর তিনেকের মাথায়, নিঃসন্তান স্ত্রীকে রেখে লোকটা মারা যায়। তরুণীটি মায়ের কাছে ফিরে যায়, চাকরি নেয় একটা স্কুলে। কিন্তু অচিরেই সে জসিম ড্রাইভারের কুদৃষ্টিতে পড়ে।

‘জসিম ড্রাইভার, যদি জানতে চান’, আবদুল কাদির আমাকে জানায়, ‘স্কুলটাও পাস করেনি। নতুন ড্রাইভার হয়েছে মোটে।’

‘নেশাটেশা করত নাকি?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

‘তা আবার। গাঁজা খেত। বদ লোকের সঙ্গে ওঠাবসা করত।’

‘জসিম ড্রাইভারের কুদৃষ্টি পড়ল মেয়েটার উপর। তারপর কী হলো?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

‘প্রথম প্রথম মেয়েটিকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে জসিম। মেয়েটিও ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। মা, দুই ভাই, এক বোন ছিল মেয়েটির—তারাও সমান ঘৃণা প্রকাশ করেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু করেনি।’

‘মানে?’

‘মেয়েটার নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, যদিও ভাই দুটো অন্তত জানত, জসিম কী করতে পারে। তার কুখ্যাতি ততোদিনে কানভরে শোনার কথা তাদের। সিলেটে মেয়েটার এক মামা ছিলেন, নামজাদা উকিল। তিনিই প্রথম বিয়েটা ঠিক করেছিলেন যাহোক। তার ওখানে পাঠিয়ে দিলেই হতো। মামার নিশ্চয় অনুতাপ ছিল ভাগ্নির ভুল বিয়ে দিয়ে। কিন্তু সেরকম কিছু তারা করল না।’

‘তারপর?’

‘তারপর একদিন জসিম তার দলবল নিয়ে তুলে নিয়ে গেল মেয়েটাকে। জোর করে বিয়ে করল। নিয়ে গেল গ্রামের ব াড়ি। তারপর মেয়েটা খুব কান্নাকাটি করায় একমাস পর বাপের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল।’

ব্যাপারটা আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হলো। কিন্তু আবদুল কাদির জানালো, বিয়ের পর জসিমের মধ্যে একটা মস্ত পরিবর্তন এসে গেল। ‘জসিম ড্রাইভারকে আমি পুরোপুরি খারাপ মানুষ বলতে পারবো না। কারণ মেয়েটিকে সে কোনো কষ্ট দেয়নি। মাথায় করে রেখেছে বরং।’ হতে পারে। পশুর ভিতরেও নন্দনতত্ত্বের সূত্রেরা থাকে। কিন্তু মেয়েটিকে নিজে রেখে এল সে বাপের বাড়ি? কেন? আবদুল কাদির জানার, জসিম একটা সুযোগ দিয়েছিল মেয়েটিকে, জগত্টাকে দেখার। তা সে দেখল, ভালোভাবেই দেখল। যে দুই ভাই বোনকে উদ্ধার করবে বলে হম্বিতম্বি করছিল এতোদিন, জসিমকে মেরে তক্তা করে দরোজা বানিয়ে রাখবে বলে হুমকি দিচ্ছিল সর্বসাধারণ্যে, তারা এবং স্ত্রীরা, হঠাত্ সুর পাল্টে ফেলল। মেয়েটির চরিত্রদোষেই ঘটনাটা ঘটেছে। মেয়েটি পরিবারের জন্য অশেষ কলঙ্ক। পরিবারের নড়বড়ে কাঁধে মেয়েটি একটি বোঝা। এসব কথা বরং সর্বসাধারণ শুনতে লাগল।

স্কুলের চাকরিটি ফেরত নিতে গেলে মেয়েটি শুনল, সে নষ্টা। সে কলঙ্ক। ইত্যাদি। স্কুলটা যেহেতু সর্বসাধারণের।

কাজেই দু’মাস পর জসিম ড্রাইভারের ভাঙা বাড়িতেই ফিরে গেল মেয়েটি। তারপর মিথিলা হলো। তারপর জসিম ড্রাইভার পুরো বাবা বনে গেল।

আবদুল কাদিরের সিগারেট শেষ হয়ে যায়।

‘আরেকটা সিগারেট খাবে?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

‘না, আমাকে যেতে হবে’ বলে সে পাথর থেকে পা নামায়। খালি পা, হাঁটু পর্যন্ত ধুলা। আবদুল কাদিরের জন্য হঠাত্ মায়া হয় আমার। অলৌকিক ক্ষমতাটা তাকে শাপগ্রস্ত করেছে আসলে। চোখ দেখলে বোঝা যায়। খুবই বিপন্ন সে, জগতের কাছে, নিজের কাছে।

কিছু না বলেই চলে যাচ্ছিল আবদুল কাদির। হঠাত্ কী মনে পড়ায় ফিরে আসল। ‘একটা কথা বলি, যদি কিছু মনে না করেন’, নরম গলায় সে বলে, ‘ওই মেয়েটি কিন্তু আপনার ওপর খুব ভরসা করেছিল। ওই বেঞ্চিটাতে বসে বসে সে একটা সম্ভাবনার ছবিও দেখে ফেলেছিল। আশ্চর্য।’

আবদুল কাদির আমার দিকে চোখ ছোট করে তাকায়। ‘আশ্চর্য’, সে আবারো বলে, তারপর চলে যায়। সামনের দিকে কিছুটা গিয়ে একটা হাওয়ার ঘূর্ণির মতো হারিয়ে যায় সে। যাক। তাকে আপাতত আর প্রয়োজন নেই। আমার যা জানার ছিল, জানা হয়ে গেছে। ধন্যবাদ, আবদুল কাদির।

কিন্তু উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আমার অস্বস্তিটা শুরু হয়। অতীতকাল ব্যবহার করেছে আবদুল কাদির। তার অতীত কাল ব্যবহারটা আমার পছন্দ হয় না। মেয়েটি একটা সম্ভাবনার ছবি দেখেছিল কেন হবে, এখনও দেখছে নিশ্চয়। অবশ্যই। একটা অকারণ পুলকে মনটা ভরে যায়। ওই সবুজ তাঁতের শাড়ি পরা মেয়েটিকেই আমি খুঁজছি। অনেকদিন থেকেই খুঁজছি।

৫.

জসিম ড্রাইভার মেকানিক নিয়ে এসেছে। ইঞ্জিন খুলে তারা কাজ করছে। আমি পাশি দাঁড়িয়ে দেখি জসিম ড্রাইভারকে। বদ লোক ছিল, এখন ভালো হয়ে গেছে—আবদুল কাদির তাই বলেছে। কিন্তু মরিচাপড়া চোখ দুটো ছাড়া তার চেহারায় অতীত আতিশয্যের কোনো প্রমাণ পেলাম না। মোটাসোটা শরীর, প্রশস্ত কপাল, বিরল চুলে পাক ধরেছে, অথচ পঁয়ত্রিশের মতো বয়স। তার হাত মসিলিপ্ত; মুখে ও জামায় লাগছে কালিঝুলি। মেয়েটি বাবার পাশে দাঁড়িয়ে। অনেক যাত্রী একটা বৃত্ত রচনা করে নিঃশব্দে দেখছে মেরামতির কাজ।

ঘণ্টাখানেক আরো লাগবে। ঘণ্টাখানেক মাত্র সময় আমার হাতে।

জসিম ড্রাইভারকে আবারো নিরীক্ষণ করি আমি। তাকে দেখে একটা স্কুল মাস্টারের মতো নিরাপদ মনে হয়। লোকটাকে নিষ্ক্রিয় করা কোনো ব্যাপারই না, আমার জন্য। ধরা যাক তরুণীটি চলে আসতে রাজি হলো জসিমকে ছেড়ে। কী করবে জসিম? থানা পুলিশ? কোর্ট কাচারি? হামলা মাস্তানি? সবখানে নির্ঘাত সে মার খাবে। একটা পুলিশ কেসে ফাঁসিয়ে তাকে জেলে পাঠিয়ে দেয়া যায়। সামাজিকতার মুখোশটা সেরকম প্রয়োজনে সামান্য খসালেই জসিমের মতো মানুষ উড়ে যায় খড়কুটো হয়ে।

আমি ঘড়ি দেখি। ঘড়িতে শেষ বেলা।

আমি হাহাকার করে উঠি, ‘মিথ্যা, মিথ্যা কথা!’ ‘না মিথ্যা নয়’, সে বলে, ‘আপনি নিজেও জানেন, মিথ্যা নয়।’ কে বলেছেন আপনাকে, এসব কথা? কে বলেছে?’ আমি শেষবারের মতো তাকে জিজ্ঞেস করি। ‘আবদুল কাদির।’ তরুণীটি আবছা অন্ধকারে হারিয়ে যায়। কে এই আবদুল কাদির?

৬.

তরুণীটি দাঁড়িয়ে ছিল একটু দূরে, সেই গাছটার সঙ্গে হেলান দিয়ে। গাঢ় বিকেলের বাতাসে অনেক ছায়া জমেছে। সেগুলি আস্তে আস্তে বাড়বে। তারপর দূরের ঘরবাড়ি, খেতখামার, গাছপালা, তেলিয়াপাড়া বাজারের দোকানপাট—সব গ্রাস করে নেবে। তরুণীটি সেইসব ছায়ার দিকে চোখ মেলে দিয়েছে।

আশেপাশে ইতস্তত ঘোরে দু’একজন মানুষ। যাত্রী অথবা স্থানীয় লোক। আমি সুযোগ খুঁজি কথা বলার। লোকগুলি তাকাতে তাকাতে চলে যায়। আমি এগিয়ে যাই। আবদুল কাদিরের কথাগুলো আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে।

‘আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল, শুনবেন কি?’ আমি বলি।

‘বলুন।’ নিস্পৃহভাবে বলে তরুণীটি। আমি অবাক হই। এরকম নিষ্পৃহ হবার কথা নয় মেয়েটির।

‘অনুমানে একটা কথা বলি, অপরাধ নেবেন না ... আপনার ড্রাইভার স্বামী আপনাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করেছিলেন?’

‘ঠিকই ধরেছেন’, মেয়েটি বলে, একই রকম গলায়।

‘আপনি মুক্তির একটা পথ খুঁজছেন, বহুদিন থেকে।’

মেয়েটি মাথা নাড়ে।

‘সেই পথটি এখন পা বাড়াবার দূরত্বে’, আমি আত্মবিশ্বাস ছড়াতে ছড়াতে বলি। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে মেয়েটি। তার চোখে বিষণ্নতা জমে। আমি অবাক হই। মেয়েটি তার একটা ফর্সা আঙুল সবুজ শাড়িতে জড়ায়। তারপর, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে, এরকম করে বলে, ‘আপনাকে দেখে একটা বিশ্বাস জন্মেছিল, ভুল বলব না। একটা সম্ভাবনাও উঁকি দিয়েছিল মনে ...’

একটুখানি থামে মেয়েটি, হয়তো নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার জন্য। আমার টেনশন হয়, আমি একটা ‘কিন্তু’র গন্ধ পাই তার কথায়। ‘কিন্তু’টি শীঘ্রই আসে।

‘কিন্তু সেই সম্ভাবনাটি মিলিয়ে গেছে।’

‘কেন? কেন?’ আমি আর্তনাদ করে উঠি।

‘সেটি আপনিই ভালো জানেন।’ মেয়েটি বলে।

‘আপনি কেন হেঁয়ালি করছেন?’

মেয়েটি হাসে। যেরকম হেসেছিল আবদুল কাদির

‘আপনি শ্রীমঙ্গল যাচ্ছেন লেখালেখির জন্য নয়, পাত্রী দেখার জন্য।’

আমি চমকে উঠি।

‘আপনার স্ত্রী মারা গেছেন বছর দুয়েক হলো।’

আমি মাথা নাড়ি। ‘হ্যাঁ, জটিল রোগ হয়েছিল, অনিরাময়যোগ্য।’

মেয়েটি হাসে।’ এখন আপনি খুব নিঃসঙ্গ।’

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি।

‘কিন্তু যে মেয়েটিকে দেখতে যাচ্ছেন, তাকেও তো খুব একটা পছন্দ হয়নি আপনার, অন্তত ছবি দেখে?’

আমি অধৈর্য হই। কিছুটা ক্রোধও হয়।’ এসব কথা কোত্থেকে জানলেন আপনি? কে বলল আপনাকে?’

মেয়েটি আবার হাসে। ‘আমাকে আপনার খুব ভালো লেগেছিল। ওই মেয়েটির কথা একদম ভুলে গিয়েলেন। আমাকে নিয়ে অনেক কিছু ভেবেওছিলেন।’

‘এখনো ভাবছি। সব দায়িত্ব এখন আমার’, আমার কণ্ঠে উত্তেজনা বাড়ে।

‘না, তা হয় না’, মেয়েটি বলে। তার কণ্ঠটি কঠিন। ‘না, তা হয় না।’

‘কেন হয় না?’ আমি জানতে চাই।

‘আপনার সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হোক, তা-ও আমি চাই না।’ পাশ দিয়ে মানুষ যাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ তাকাচ্ছে।ব আমাদের শোনার দূরত্বে তারা। মেয়েটি চুপ করে থাকে।

আমার ইচ্ছে হয় মানুষগুলিকে ধাক্কা দিয়ে গর্তে ফেলে দিতে। তারপর মেয়েটির হাত ধরে মাঠটা পার হয়ে দূরের কোনো গন্তব্যে চলে যেতে।

‘আজকের বিকেলটা খুব সুন্দর ছিল, তাই না?’ মেয়েটি বলে, স্বগতোক্তির মতো, ‘বিকেলটা এখন মরে গেছে।’

মরা বিকেলের দিকে আমিও তাকাই।

গাছের নিচ থেকে সরে এলো মেয়েটি। তারপর ধীর পা ফেলে এগিয়ে যেতে থাকল গোলাকার সেই ভিড়ের দিকে, যেখানে তার স্বামী কালিকুলি মেখে গাড়িটা মেরামত করছে। তার পা ফেলার ভঙ্গিটি আমাকে বলে দেয়, এটি কোনো দ্বিধান্বিত মানুষের পা ফেলা নয়।

আমি মরিয়া হয়ে তার পিছু নিই। ‘কেন দেখা হবে না? কেন?’

তরুণীটি ঘুরে দাঁড়ায়। তার ক্লান্ত, অবসন্ন চোখে আমার দিকে তাকায়। ‘কারণ, আপনার স্ত্রী কোনো জটিল, অনিরাময়যোগ্য রোগে মারা যায়নি। আপনি নিজেই মেরেছেন তাকে’, সে বলে, ‘সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে, ঠাণ্ডা মাথায়। ওষুধের সঙ্গে, খাবারের সঙ্গে বিন্দু বিন্দু বিষ মিশিয়ে। অন্য একজনকে ভালোবাসতেন তিনি, তার শাস্তি হিসেবে।’

আমার মনে হলো, রাস্তাটা মুহূর্তে ভরে গেছে কোমর পর্যন্ত থকথকে কাদায় এবং আমি ওই কাদায় আটকে গেছি। আমি একটা জায়গায় সেঁধিয়ে গেছি, আর তরুণীটি চিরদিনের জন্য আমার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

আমি হাহাকার করে উঠি, ‘মিথ্যা, মিথ্যা কথা!’

‘না মিথ্যা নয়’, সে বলে, ‘আপনি নিজেও জানেন, মিথ্যা নয়।’

কে বলেছেন আপনাকে, এসব কথা? কে বলেছে?’ আমি শেষবারের মতো তাকে জিজ্ঞেস করি।

‘আবদুল কাদির।’

তরুণীটি আবছা অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

কে এই আবদুল কাদির?