হঠাৎ মহসিনের মনে পড়ল, তার মাথা হারিয়ে গেছে। মাথা ছাড়া সময়, স্মৃতি ও পরিচয়—এই তিনটি কীভাবে সম্ভব, সে প্রশ্নের কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর সে মনে করতে পারল না। সে বাংলামোটরে বাসের অপেক্ষায় আছে, তা তার মনে পড়ল। বাস আসছে, যাচ্ছে। কোনোটাতেই সে উঠছে না। কারণ, কোথায় যাবে, সে কথা তার মনে পড়ছে না। গন্তব্য মানেই ভবিষ্যৎ, আর ভবিষ্যৎ মানেই পরিকল্পনা। মাথা ছাড়া পরিকল্পনা কাজ করে না। তার হাতে একটা ফাইল। ফাইলের ভেতরে কাগজ। কাগজের ভেতরে ভাষা। ভাষার ভেতরে অর্থ। অর্থের ভেতরে বিভ্রান্তি। সে বুঝতে পারছে, ব্যাকরণের ছোট ছোট বিষয়গুলো সে ভুলে যাচ্ছে। কাল, কালান্তর, কালোত্তীর্ণ―সব কালের মধ্যে একটা গোলমাল। বর্তমান চলমান নাকি চলমান বর্তমান―এই প্রশ্নটা হঠাৎ খুব জরুরি হয়ে উঠছে। কারণ, সে বর্তমানে অতীত, আর অতীতের ভবিষ্যৎ খুঁজে পাচ্ছে না। সে অতীত ভাবলে, ভবিষ্যৎ চলে আসে। সে বুঝল অতীত মূলত ভবিষ্যৎ, কিন্তু বর্তমান ও বাংলামোটরে তার বর্তমান কোথায় তা হারিয়ে গেছে।
একজন লোক এসে জিজ্ঞেস করল, ভাই, কোন বাস যাবে উত্তরার দিকে?
মহসিন বলল, যাবে।
লোকটা একটু থমকে গেল।
কোনটা?
যেটা যাবে।
ফাইলের ভেতরে কাগজ। কাগজের ভেতরে ভাষা। ভাষার ভেতরে অর্থ। অর্থের ভেতরে বিভ্রান্তি। সে বুঝতে পারছে, ব্যাকরণের ছোট ছোট বিষয়গুলো সে ভুলে যাচ্ছে। কাল, কালান্তর, কালোত্তীর্ণ―সব কালের মধ্যে একটা গোলমাল।
লোকটা চলে গেল। ভাষা ব্যর্থ হলো। মহসিন ভাবল, তার কি উত্তরাতে যাওয়ার কথা? তার কি উচিত লোকটিকে সাহায্য করা নাকি লোকটার উচিত তাকে সাহায্য করা?
মহসিন খুব ভালো ছাত্র ছিল, সে ব্যাকরণ পছন্দ করত, ফিজিকসের নৈয়মিক তার ভালো লাগত। কর্তা, কর্ম ও ক্রিয়া―এদের মধ্যে একটা শৃঙ্খলা আছে, সে শৃঙ্খলা পছন্দ করত। কর্তা কাজ করে, কর্ম কাজ সহ্য করে, ক্রিয়া মাঝখানে দাঁড়িয়ে নাটক করে। এই বিন্যাসে সে নিরাপত্তা পেত। তার চুলের ভাঁজ ঠিক করত। কিন্তু এখন কর্তা নেই। নাকি কর্মই কর্তা হয়ে গেছে? নাকি ক্রিয়াই সব দখল করে নিয়েছে? সে একটা শব্দ লিখতে গিয়ে আটকে গেল ‘হয়েছে’ না ‘হয়েছিল’? সময় পিছলে যাচ্ছে। তার মনে পড়ল, বিবর্তন তার মাথায় ঢুকছে না। ঢোকার জন্য দরজা লাগে। দরজা নেই, তাই ঢোকে না। খুব সোজা। কিন্তু তার তো মাথাও নেই। ডারউইনের তত্ত্বে ধারাবাহিকতা আছে―একটা প্রজাতি আরেকটায় রূপ নিচ্ছে। কিন্তু মহসিনের জীবনে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। স্কুল, কলেজ, বেকারত্ব―সবই হঠাৎ হঠাৎ ঘটছে। কোনো রূপান্তর সে টের পায়নি। সে সকালে ঘুম থেকে উঠে একদিন বুঝেছে, সে বড় হয়ে গেছে। এই হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়াটাই কি বিবর্তন?
মহসিন সিদ্ধান্ত নিল, সে মাথা খুঁজতে যাবে। সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কারণ সিদ্ধান্ত মানেই ইচ্ছা, আর ইচ্ছা মানেই কেন্দ্র। মাথাহীন মানুষের কেন্দ্র কোথায়?―এই প্রশ্নটা দর্শনের পাঠ্যবইয়ে পরিষ্কার নয়, ফিজিকসে নয়, জ্যোতির্বিদ্যাতেও নয়।
হাসপাতালে মাথা নিয়ে অনেক কাজ হয়, প্রথমে সে গেল হাসপাতাল। হাসপাতালে মাথা কাটা হয়, সেলাই হয়, স্ক্যান হয়। সে ভাবল, এখানে নিশ্চয়ই কোনো হারানো মাথা পাওয়া যেতে পারে।
রিসেপশনের মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, সমস্যা কী?
মহসিন বলল, আমি আমার মাথা হারিয়ে ফেলেছি।
কবে?
ঠিক মনে নেই।
লক্ষণ কী?
আমি ব্যাকরণ ভুলে যাচ্ছি।
মেয়েটি ফাইল বন্ধ করল।
এটা নিউরোলজি, সাহিত্য বিভাগ নয়। হাসপাতালে সাহিত্য বিভাগ নেই। নিশ্চয় আপনি কোনো সাহিত্য পত্রিকায় কাজ খুঁজছেন।
এরপর সে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক জায়গা, যেখানে প্রশ্নকে যত্ন করে লালন করা হয়, আর উত্তরগুলোকে ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা হয়। একজন অধ্যাপক তাকে বললেন, মাথা হারানো কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা না। এটা কাঠামোগত।
মানে?
মানে, জ্ঞান এত বেড়েছে যে মাথা আর বহন করতে পারছে না। তাই ঝরে পড়ছে। উত্তর–আধুনিক যুগে মাথা একটা পুরোনো ধারণা। এখন নেটওয়ার্ক আছে, ডিসকোর্স আছে, ফ্র্যাগমেন্ট আছে, এআই আছে।
মহসিন জিজ্ঞেস করল, স্ট্রিং থিওরি কী?
অধ্যাপক হাসলেন, এটা এমন একটা তত্ত্ব, যেটা বোঝা না গেলেও বলা যায়!
স্ট্রিং থিওরি কী, তা সে বুঝে উঠতে পারছে না। কিন্তু ‘সবকিছু সুতা দিয়ে বাঁধা’—এই কথাটা তার ভালো লাগল। কারণ, মাথা হারানোর পর সে অনুভব করছিল, কোথাও একটা টান আছে। স্মৃতি তাকে টানছে, অভ্যাস তাকে টানছে, সমাজ তাকে টানছে।
এই কথাটা মহসিনের খুব পছন্দ হলো। সে ভাবল, তার জীবনও বোধ হয় এমনই—বোঝা যায় না, কিন্তু বলা যায়। মহসিন দেখল বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলোতে ঝুলছে ডারউইনের ছবি, ছবিতে কালি লাগানো, ক্যাম্পাসে মিছিল হচ্ছে ‘ডারউইন ভুয়া, ভুয়া, ভুয়া...’। ডারউইনের ছবিটা সে মনে করতে পারে―দাড়ি, চোখ ও একটা চিন্তিত মুখ। কিন্তু বানর থেকে মানুষ এই যাত্রাপথে মহসিন নিজেকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। সে কি মাঝামাঝি কোথাও আটকে আছে? নাকি উল্টো পথে হাঁটছে? দেশের সবচেয়ে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একটা চায়ের দোকানে সে দাঁড়াল। দোকানদার জিজ্ঞেস করল, চা?
মহসিন মাথা নাড়ল, তারপর মনে পড়ল, মাথা নেই।
তাই সে বলল, হ্যাঁ।
চা খেতে খেতে সে ভাবল, বিবর্তনকে হয়তো ভুলভাবে বোঝা হয়েছে। হয়তো মানুষ উন্নত হয়নি, শুধু জটিল হয়েছে। তার পাশে দুজন কলেজছাত্র স্ট্রিং থিওরি নিয়ে কথা বলছে।
সবকিছু নাকি সুতা দিয়ে তৈরি।
মানে?
মানে, ইলেকট্রন, কোয়ার্ক, এমনকি আমরাও।
মহসিন চুপচাপ শুনল। স্ট্রিং থিওরি কী, তা সে বুঝে উঠতে পারছে না। কিন্তু ‘সবকিছু সুতা দিয়ে বাঁধা’—এই কথাটা তার ভালো লাগল। কারণ, মাথা হারানোর পর সে অনুভব করছিল, কোথাও একটা টান আছে। স্মৃতি তাকে টানছে, অভ্যাস তাকে টানছে, সমাজ তাকে টানছে, শুধু সে ঝুলে আছে। তার অধ্যাপকের কথা মনে পড়ল, তার চেহারাও ডারউইনের মতো এই উপলব্ধিটা অস্বস্তিকর।
একটা লাইব্রেরিতে ঢুকল সে। পুরোনো বইয়ের গন্ধ। দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য সব আলাদা আলাদা তাকে আছে, কিন্তু একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে না। মহসিন একটা বই খুলল, ভাষাতত্ত্ব। সেখানে লেখা, ‘অর্থ কখনো স্থির নয়’। সে হাসল। মাথা থাকলে হয়তো মাথা নাড়ত। লাইব্রেরির এক কোণে বসে থাকা একজন বৃদ্ধ লোক তাকে বলল, তুমি কি কিছু খুঁজছ?
মাথা, মহসিন বলল।
পাবে না।
কেন?
কারণ, সবাই এখন শরীর দিয়ে ভাবে। মাথা অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। এই কথাটা খুব যুক্তিসংগত মনে হলো তার। আজকাল সিদ্ধান্ত আসে পেট থেকে, হাঁটু থেকে, বাজার থেকে, মাথা কেবল বোঝা। মহসিন লাইব্রেরি ছেড়ে বেরিয়ে এল।
সে একটা পার্কে গিয়ে বসল। শিশুরা খেলছে, দৌড়াচ্ছে, পড়ে যাচ্ছে, উঠে দাঁড়াচ্ছে। বিবর্তনের সবচেয়ে সত্যিকারের দৃশ্য বোধ হয় এটা। হঠাৎ তার মনে হলো মাথা হারানোটা হয়তো তার ব্যক্তিগত নয়। এটা সময়ের সমস্যা। একটা সময় যখন অতিরিক্ত ব্যাখ্যা, অতিরিক্ত তথ্য, অতিরিক্ত তত্ত্ব―সব মিলিয়ে মাথা আর টিকতে পারেনি। ব্যাকরণ ভেঙে পড়েছে। বিবর্তন মানুষ ভুলে গেছে। স্ট্রিং থিওরি শুধু একটা সুন্দর রূপক হয়ে আছে। সময় বাড়ছে। কিন্তু তার তো মাথার খোঁজ করতে হবে, মাথা ছাড়া সে কোথায় যাবে? সে দেখল তার মাথাটা একটা সুতায় ঝুলছে। সুতাটা কেউ টানছে না, তবু টান আছে। মাথার ভেতরে শব্দ ঘুরছে―কারক, বিবর্তন, কোয়ার্ক, অর্থ, ঈশ্বর, বাজার, প্রেম।
সে প্রশ্ন করল, আমি কে?
উত্তর এল না।
সময় যাচ্ছে, মহসিন হাঁটছে। সে কনফার্ম হতে চাইল, সত্যি কি তার মাথা নেই? সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নায় সে নিজেকে দেখল, কিন্তু পুরো না, যেন টিভির সিগন্যাল নেই―ঝিরঝির করছে কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন।
সে আয়নাকে বলল, তুমি কি আমাকে চেনো?
আয়না কিছু বলল না। আয়না কখনো দায় নেয় না। সে দেখল আয়নার সামনে দাঁড়ানো লোকটি আসলে মহসিন নয়। সে ভাবে, হয়তো মাথা কোনো শর্ত না। হয়তো চলাই আসল। সে আর মাথা খোঁজে না। সে আর ব্যাকরণ ঠিক করতে চায় না। সে বিবর্তন বোঝার চেষ্টা ছেড়ে দেয়। স্ট্রিং থিওরি তাকে আর বিব্রত করে না। আর মাথাটা হয়তো কোথাও নেই, হয়তো সবখানেই। সে চারদিকে তাকাল, সে দেখল আসলে কারোরই মাথা নেই। সে মৃদু মাথা নাড়াল, তার মনে পড়ল তার যাওয়ার কথা প্রেমিকার কাছে, তাকে ভালোবাসি বলতে, কিন্তু হঠাৎ তার হাসি পেল!