অলংকরণ: আরাফাত করিম
অলংকরণ: আরাফাত করিম

গল্প

বৃষ্টি, রেড লরিকেট ও এয়ারপোর্টে কিলারম্যান

১.

তিন মাস পরে মারা যাচ্ছ জানলে কোথায় থাকতে চাও, একসেপ্ট উইথ মি? জিজ্ঞাসা করলে আমি উত্তর দিয়েছিলাম, হিমালয়ের কোনো এক গ্রামে। আমি জানি না এই উত্তর আমি কেন দিয়েছিলাম। আমার এই জীবন ও প্রতিবেশ থেকে আগেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার এক ডিটাচমেন্ট প্রসেসে ঢুকে যাওয়ার জন্য, নাকি সেখানে পাহাড়ের গায়ে প্রতি বেলায় মেঘ আর কুয়াশায় একদম অপ্রত্যাশিতভাবে চোখের সামনের ল্যান্ডস্কেপ বদলে যাওয়া দেখার লোভে। 

নেচারের আনপ্রেডিক্টেবিলিটি ভালো লাগে আমার। আর ভালো লাগে মানুষের জীবনের মিরাকল। প্রচণ্ড অস্থিরতার তোলপাড় আমার ভেতরে থিতু হয়ে এলে, নেটফ্লিক্সে একটা ডকুমেন্টারি আছে, আমি দেখতে বসি মাঝেমধ্যে। ফোরটিন পিকস—নাথিং ইজ ইম্পসিবল। এমন নয় যে ‘কিছুই অসম্ভব নয়’ ধরনের মোটিভেশন আমাকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করে। যেহেতু আমি জানিই, সম্ভব আর অসম্ভব দিয়ে জীবনকে ধরা যায় না, আসলে কিছু দিয়েই ধরা যায় না তাকে। নিজের সঙ্গে এক অনন্ত দাবা খেলায় প্রতিপক্ষের নাম জীবন। এমনও নয় যে হিমালয় বা পর্বতারোহণ নিয়ে এর চেয়ে ভালো ডকুমেন্টারি আর নেই। 

তবু আমার ভালো লাগে, মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাওয়া একজনের মা যখন ফিরে আসে কোমা থেকে আর হাসপাতাল থেকে সে আবার ফিরে যায় মানাসলু বেজক্যাম্পে। অথবা বছর শেষে চীন সরকার বন্ধ করে দেওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে এসে মাত্র ছয় দিনের জন্য খুলে দেয় তিব্বতের শিশাপাংমা পাহাড়। আমার মনে হয়, কী এক হেঁয়ালির অভিনয় করে জীবন শুধু এই সব অবশ্যম্ভাবী অলৌকিকতার আশাটুকু আঁকড়ে ধরে রাখে। আসলে, সবাই জানেই যে এসব ঘটবে, ঘটারই কথা, দ্য ক্লাউডস উইল অ্যাপার্ট, দ্য প্ল্যানেটস উইল গেট ইন আ নিট লিটল লাইন, অ্যান্ড এভরিথিং উইল বিকাম অবভিয়াস। শুধু কখন কীভাবে ঘটবে তা জানে না বলে, অলৌকিকভাবে ঘটে গেলে এ ভানটুকু করতে হয়। 

তবু ভালো লাগে যেকোনো মিরাকল। মনে হয়, সব ভেসে গেলেও কিছু একটা নিশ্চয়ই আছে। তবে ঐশ্বরিক কিছুর ওপর নির্ভর করার ভানটুকু ছাড়া, ওই সাহসের জীবন বেশি ভালো মনে হয়। যে জীবনে অনন্ত দাবা খেলার ওই প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে, প্রাচীন পারস্য উপকথার সেই আফ্রাসিয়াবের মতো বলা যায়, আমি শিকারে বের হব, আমার ঘোড়ার লেজ হেনায় রাঙিয়ে দাও। 

কোনো এক রাতে হোটেলের জানালা দিয়ে এক অন্ধ ভিক্ষুকের গলা ভেসে এলে, এ পৃথিবী ভালো তো বাসে না, এ পৃথিবী ভালো বাসিতে জানে না, ভেবেছিলাম জানিই তো, এ আর নতুন কী! সে যে অন্ধ, ওইটুকু আমার কল্পনা, না হলে এই দুপুররাতে রাস্তায় একা একা কে এভাবে গান গায়! তবে ভিক্ষুক যে সে ব্যাপারে নিশ্চিতই ছিলাম। এভাবে মিনতি করে ইগো বিসর্জন দেওয়ার মহিমা ভিক্ষুক না হলে আসে না। তবে ভেতরে ভেতরে এটাও যেন জানতাম, যেটুকু ভেসে এল, তার বাইরেও আরও কিছু আছে, পৃথিবীর জানার সেখানেই শেষ নয়। পৃথিবী আরও জানে, আরও, প্রকাশ করে না। ওই অব্যক্তটুকু উদ্ধার করে নিতে হয়, দাবা খেলায় জীবন নামের ওই অনন্ত প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রাখার মতো হয়তো, সাহসের ব্যাপার। 

সে রকম কোনো উদ্ধারে যেতে হলে, এর আগে আমি হয়তো কোনো এক হিল স্টেশনের এক বাড়িতে যেতে চাইতাম, যেখানে তিনতলার জানালা থেকে দেখা যায় বৃষ্টি আসার আগে আগে সবকিছু সাদা মেঘে ঢেকে যায় আর সন্ধ্যার আগে আগে পাহাড়ের গায়ে পুরো শহরে একসঙ্গে আলো জ্বলে ওঠে। ব্রেকফাস্টের সময় সেখানে জ্যাজ ফ্লেভারের এক ইনস্ট্রুমেন্টাল বাজতে থাকে রোজ, গেটআপ, স্ট্যান্ডআপ। আর মাঝরাতে সেখানে আট হাজার মাইল দূরের কোনো এক ভূখণ্ডে ভোর হয়…

২.

পুরোনো পাসপোর্টের পাতা উল্টে খুঁজে দেখছিলাম কবে আমি কোথায় গিয়েছিলাম আর ফিরে এসেছিলাম কবে। খুঁজে দেখছিলাম আমার সীমানা পেরোনোর ইতিহাস। সেখানে সময়ের অনিবার্য চিহ্নের মতো জ্বলজ্বল করতে থাকা অ্যারাইভাল আর ডেপারচারের চারকোনা সিলের মাঝখানে বছর, মাস আর তারিখে আমার চোখ আটকে যাচ্ছিল। এবং সেসব তারিখ এত অলৌকিক শক্তি নিয়ে আমাকে আটকে রাখছিল যে আমি হাজার চেষ্টা করেও চোখ সরাতে পারছিলাম না, যেন সেই সব দিন–তারিখেরা আমাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করানোর মতো সাইকোলজিক্যাল এক চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, যেন ওই সব অ্যারাইভাল আর ডিপারচারের দিনগুলোর স্মৃতি আমার মাথার ভেতরে পরিভ্রমণ করে না এলে আমার এই মুহূর্তে এখন আর মুক্তি মিলবে না। 

কোনো এক ডিসেম্বরের ১ তারিখের সিল এক জায়গায়। ডেপারচার। বোর্ডিংয়ের জন্য ওয়েট করতে করতে কপালে কাটা দাগওয়ালা এক লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সেই লোক, আমার পাশেই বসা তখন, আমার কাছ থেকেই ম্যাগাজিন ধার করে নিয়ে পাতা ওল্টাচ্ছে, আমাকে জানাল, সে আনোয়ার কঙ্গোর দলের লোক। আনোয়ার কঙ্গোর দলের হয়ে ইন্দোনেশিয়ায় কমিউনিস্ট গণহত্যায় সরাসরি অংশ নিয়েছে। 

এরপর সে আর কী কী বলে গেল, আমি সব শুনেও শুনতে পারিনি। কারণ, আমার মগজ তখন অর্ধেকের বেশি ইনফরমেশন প্রসেস করতে পারছে না। কারণ, আমি তখন জেনে গিয়েছি যে এই লোক, আমারই পাশে বসা তখন সে, মাথায় ক্যাপ আর গায়ে সাদা শার্ট, সবচেয়ে ঠান্ডা মাথায় মানুষ হত্যা করার এক মিশনে, মানুষ খুন করার এক উৎসবে অংশ নিয়েছিল। আমার মনে আছে, আরও অনেক কিছুর সঙ্গে সে ডিটেইলে, যত বেশি ডিটেইলে বললে মানুষ চোখের সামনে দেখতে পায় সবকিছু, বলেছিল, এক সন্ধ্যায় পনেরো মিনিট, বড়জোর পনেরো মিনিটের মধ্যে পরপর ছয়জনকে কীভাবে মেরে ফেলেছিল সে—‘মাই ম্যাক্সিমাম নাম্বার ইন শর্টেস্ট টাইম।’ 

এর পরই আমি দেখলাম তার চোখে ভয়, প্রতিটি মুহূর্ত এবং প্রতিটি সেকেন্ডে সেই ভয় ছড়িয়ে পড়ছে তার সারা শরীরে। সে জানে, সে নিশ্চিত জানে যে এই ভয় তাকে বাকি জীবন তাড়া করবে, খুব কাছে থেকে তাড়া করবে, নিশ্বাস ফেলবে তার ঘাড়ের ওপর। সেই লোক, আনোয়ার কঙ্গোর দলের সেই লোক, আমাকে সেই রাতে, অনেকটাই ফাঁকা হয়ে আসা সেই এয়ারপোর্টে প্রশ্ন করেছিল, ইজ ইট অল কামিং ব্যাক টু মি? 

সবাই জানে, তা–ই হওয়ার কথা, তাই-ই হয়। কৃতকর্ম ফিরে আসে। 

সেদিন, ডিসেম্বরের ওই ১ তারিখে, ঠিক তখনই তার ফোন এসেছিল আমার কাছে। সেই টাইমজোনে সকাল তখন আর সে এসে কেবল নামছে গাড়ি থেকে। বাসার সামনের ঝাঁকড়া গাছটাতে একটা রেড লরিকেট বসে আছে। আর ও সেই পাখিটাকে, সেই রেড লরিকেটকে ডেকে ডেকে বলছে আমার কথা, লরিকেটকে বলছে—ওকে হাই বলো। 

আরেক জায়গায়, কোনো এক অক্টোবরের ২৯ তারিখ, সেখানেও ডেপারচার সিল। সেদিন বোর্ডিংয়ের আগে আগে সন্ধ্যায় এমন বৃষ্টি, যেন ফেরেশতা মিকাইল বৃষ্টি নামিয়ে দিয়ে ভুলে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আর টাইমজোনের অন্য প্রান্তে, রোদ ওঠা সকাল তখন, ও এসে নামছে ট্রেন থেকে আর দৌড়ে গিয়ে ওটিতে ঢুকতে ঢুকতে বলছে, আজকে হিউম্যান ব্রেনের প্র্যাকটিক্যাল, আট ঘণ্টার অপারেশন মনিটর করতে হবে একটানা। 

আর আমি বোর্ডিংয়ের অপেক্ষায়, বৃষ্টি দেখতে দেখতে বলছি, যাও, অচেতন হয়ে যাওয়ার ঠিক আগে আগে সেই পেশেন্টের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলো, ইয়োর মাইন্ড ইজ আ ওয়াইল্ড গার্ডেন। ইভেন ডেথ ক্যান নট টাচ দ্য ফ্লাওয়ারস ব্লুমিং হিয়ার…

৩.

…তো সেই রবিবার রাতে, কোনো এক গলির মাথায় এসে যখন গাড়ি থামল, সামনে চ্যাপেল স্ট্রিট। রাত তখন কয়টা? বারোটা পাঁচ বা বারোটা দশ। 

তিন দিন ধরে উইকেন্ডের সমস্ত ফুর্তি শেষ করে সবাই যে যার বাসায় ফিরে গেছে। আর রাত বারোটার পরের সেই চ্যাপেল স্ট্রিট কোহকাফ নগরীর কোনো এক রাস্তার মতো নির্জন, শুধু আলোয় জ্বলজ্বল করছে। 

এর মধ্যে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেল একজন। উজ্জ্বল কমলা রঙের জ্যাকেট পরা, হাতে জেবিএলের একটি সাউন্ডবক্স, যে সাউন্ডবক্সে আবার বিভিন্ন কালারের লাইট জ্বলছে আর নিভছে আর জোরে জোরে বাজছে আরবি বা লেবানিজ কোনো মিউজিক! 

লোকটার এই উদাসীনতা, এই আত্মবিশ্বাস দেখে আমার ঈর্ষা হলো। বছরের পর বছর ধরে দেখে আসা, স্যুট-টাই পরা করপোরেট আত্মবিশ্বাস দেখে যেমন বিদ্রূপ করতে ইচ্ছা করে, তেমন নয়। নিখাদ ঈর্ষা—যদি আমিও পারতাম। 

যদি আমিও পারতাম এ রকম জেবিএলের বিভিন্ন কালারের লাইট জ্বলতে থাকা একটা পোর্টেবল সাউন্ডবক্স হাতে ঝুলিয়ে হেঁটে যেতে আর সেটাতে বাজতে থাকত গান—আছেন আমার মুক্তার, আছেন আমার বারিস্টার, শেষ বিচারে হাইকোর্টেতে তিনি আমায় করবেন পার, আমি পাপী, তিনি জামিনদার... 

ততক্ষণে খোলা থাকা একমাত্র দোকানটার ভেতরে ঢুকে গেছি আমরা। অর্ধেক ভিনেগার আর অর্ধেক বিয়ারের মতো স্বাদ, গ্লাসে আমি যখন চুমুক দিচ্ছি, কাউন্টারের ওপর ঘুরতে থাকা কালো আর সাদা রঙের একটা বিড়ালকে আমার সঙ্গী তখন প্রায় সম্মোহিত করে ফেলেছে। সব চাঞ্চল্য থামিয়ে, সেই বিড়াল তখন বসে পড়েছে সেখানে। আর যেকোনো প্রাণীর মতো, এই বিড়ালের উপস্থিতিতেও আমার ষষ্ঠ, সপ্তম আর অষ্টম ইন্দ্রিয় এবং গায়ের লোম সতর্ক হয়ে উঠেছে। 

সেখানে তখন ঢুকে পড়েছে কয়েকজন গে আর কৈশোর পার হওয়া মেয়েদের একটা দল। হঠাৎ বিড়ালটাকে লক্ষ্য করে সেই মেয়েগুলো আমার কাঁধের ওপর দিয়ে তার ছবি তুলে নিয়ে গেল। তখন আমিও ফোন বের করে কাউন্টারের অন্য পাশের লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কি আপনার বিড়াল? সে তখন হেসে দেখিয়ে দিল আমার পেছনে। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সারা বাইসেপ আর ট্রাইসেপ–জুড়ে ট্যাটু আঁকা একজন বসে আছে, সম্ভবত ইউক্রেনিয়ান, শান্ত–স্থিরভাবে তাকিয়ে আছে তার বিড়ালটার দিকে। 

আমি বললাম, ইটস ইয়োর ক্যাট? মাথা নাড়ল সে একবার। আমি বললাম, হি ইজ বিউটিফুল। হাসল সে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ক্যান আই টেক হিজ পিকচার? সেই হাসি ধরে রেখেই সে বলল, নো। 

আমি তখন গ্লাস শেষ করে বের হয়ে আসব আসব বলে প্রস্তুতি নিচ্ছি মনে মনে, পেছন থেকে, সে ডাকল আমাকে। বলল, ‘আই সেইড নো, বাট ইউ ক্যান টেক পিকচার।’ আসলেই যেন আমি বুঝতে পারিনি, তাই আবার জিজ্ঞাসা করলাম, স্যরি? সে আবার বলল, একই কথা, ‘আই সেইড নো, বাট ইউ ক্যান টেক হিজ পিকচার।’ 

যেন, সে সেধে সেধে প্রত্যুত্তর দেওয়ার এক সুযোগ দিয়েছে আমাকে। আমি তাই মিস করলাম না, বললাম, নো, ইটস ওকে, আই অ্যাম গুড, আই অ্যাম পারফেক্ট। 

রাত তখন একটা পার হয়েছে। আমার পাশের সিটের সঙ্গী আর বিশ্বস্ত ড্রাইভার তার সব ক্ষোভ নিয়ে গোষ্ঠী উদ্ধার করছে বিড়ালের মালিক সেই ইউক্রেনিয়ানের আর রেসিজমের ইতিহাসের ওপর নিয়ে গিয়ে ফেলছে এ ঘটনাকে। কেন সে ওই সাদা মেয়েগুলোকে না করেনি তার বিড়ালের ছবি তুলতে, যেখানে শুধু বাদামি চামড়া হওয়ার কারণে আমাকে না করে দিল মুখের ওপর! 

রেসিজমের এসব কথা আমার কান দিয়ে তখন আর ঢুকতে চাইছে না। কারণ, রেসিজম আমার গায়ে লাগে না। সামওয়ান ইজ অ্যালাউড টু হেইট মি ফর মাই কালার, ফর মাই রেইস, ফর মাই রিলিজিয়ন, ফর মাই ন্যাশনালিটি। শারীরিকভাবে আঘাত না করলে, আই অ্যাম ওকে উইথ ইট। তা ছাড়া, রাত তখন একটা পার হয়েছে, এয়ারবিএনবিসহ সব অস্থায়ী ঠিকানার চেক ইন অপশন বন্ধ হয়ে গেছে। আমি তখন শুধু বিশ্রাম আর একটা ঠিকানার দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন। 

তখন আমার হঠাৎ মনে হলো, সে যে আমাকে না করল আর সাদা মেয়েগুলোকে ছবি তুলতে দিল তার বিড়ালের, ইটস নট অ্যাবাউট মি। সাদা মেয়েগুলো তাকে জিজ্ঞাসা করেনি, আমি জিজ্ঞেস করেছি, তাই আমাকে না করেছে। ইটস নট রেসিজম। ইটস লাভ। ইটস পজেসিভনেস। ইটস হিজ রাইট ওভার হিজ ক্যাট। দেয়ার ইজ নো লাভ উইদাউট পজেসিভনেস।

৪.

বের হয়ে আসার কিছুক্ষণ আগে, আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি একদম শেষ মাথায়, অন্য প্রান্তের কাচের দেয়ালে আমার যে ঝাপসা প্রতিকৃতি দেখা যাচ্ছে, সেটার দিকে। সেখানে কী দেখা যাচ্ছে, নেভি-ব্লু টি–শার্ট, আমার কপালের ভাঁজ, হাতে ধরে থাকা পানির বোতল—আমি জানি না। কী গান বেজে চলছে সেখানে, তা আর আমার মাথায় ঢুকছে না, আমি শুনতেও পাচ্ছি না। 

আমার মাথার ভেতরে তখনো চলছে আগের রাতে অনেকবার শোনা—অরুণ আলোয় ব্যথিত প্রেমের/ কমলিনী মুখ ঢাকে/ পৃথিবীর গান আকাশ কি মনে রাখে? 

মাথার ভেতরে আকাশের কাছে পৃথিবীর গাওয়া সেই গান শুনতে শুনতে হঠাৎ দেখলাম পাশের সিট থেকে একটা বিড়াল মনোযোগী হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বিড়ালের মালিক এক কাপল, পাশেই বিড়ালটাকে বসিয়ে রেখে নিজেরা বসে আছে মুখোমুখি। আমি যেই ভাবতে শুরু করেছি যে জিজ্ঞাসা করব কী নাম ওর, তখনই, মেয়েটা ডেকে উঠল বিড়ালটাকে—রেএএএমন্ড। আর সে ঘাড় ঘুরিয়ে নিল আমার দিক থেকে। 

তিন দিন আগে, সেদিনও, বাইরে বৃষ্টি অনেকক্ষণ ধরে। আমি উঠে যাব বুঝতে পেরেই হয়তো, যেহেতু ভেতরে আর কোনো টেবিল ফাঁকা নেই আর, ওয়েটার এক বিদেশি বয়স্ক মহিলাকে নিয়ে এসেছে আমার টেবিলের সামনে। আর ভদ্রতার অভিনয় করে জিজ্ঞাসা করছে, স্যার কি উঠবেন? 

আমি হ্যাঁ বলে আমার জিনিসপত্র নিয়ে উঠতেই, সেই বয়স্ক মহিলা আমাকে জিজ্ঞাসা করে বসল, ডিড ইউ এনজয়? 

আই অ্যাম লিভিং, ইউ ক্যান টেক দ্য সিট বলে বের হয়ে আসতে আসতে আমার মনে হলো, কী এনজয় করার কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করল সে! ওখানে বসে কি এনজয় করার কথা? আমার ভেতরে সাংঘাতিক ভয় কাজ করছে, সেটা এনজয় করার কথা? যে ভয় পাক খেয়ে ঘুরতে ঘুরতে প্রচণ্ড রাগ আর ক্রোধের সাংঘাতিক এক ঝড় হয়ে উঠছে আর হাজার চেষ্টা করেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, সেটা এনজয় করার কথা? 

একটা শব্দ তখনো আমার কানে এসে বারবার আঘাত করছে প্রচণ্ড জোরে। হস্টেজ! 

বাইরে এসে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমি তখন নিষ্ক্রিয় করে দিতে চাইছি শব্দটাকে। 

এই শব্দ আর পৃথিবীর সব ভায়োলেন্স থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য মনে মনে ভাবছি, দ্য প্রিজন ইজ নট আউটসাইড। এই কারাগার আমাদের প্রত্যেকের, প্রত্যেকের ভেতরেই। পারহ্যাপস উই ডোন্ট নো হাউ টু লিভ উইদাউট ইট।