ওই যে দেখা যাচ্ছে মৃতদেহ ঘিরে আপনজনদের বিলাপ—এর দুটো দিক আছে বলে মনে করে সুলতান। যে মরে গেছে, সে বেঁচে গেছে। যারা বেঁচে আছে, তারা যেন মরে গেল; কারণ, মরে যাওয়া মানুষটি ছিল একমাত্র উপার্জনক্ষম।
বেঁচে থাকা সুন্দর, কিন্তু পদে পদে অনিশ্চিত। যেমন জটিল অসুখ, রাস্তা পেরুনোর সময় গাড়ির নিচে পড়া, ছিনতাইকারীর ছুরি, চাকরি চলে যাওয়া, গুম, ধর্ষণ, গণপিটুনি—কত কী । আর মরে গেলে ওসব নেই। জীবন আসলে মৌলিকভাবে ভালো বা খারাপ নয়, এটা যেন নির্ভর করে জীবনে কী ঘটছে, তার ওপর।
যেমন সুলতান কীভাবে সামনের দিনগুলো কাটাবে, আজ আর বলতে পারে না। তার যেন মৃত্যু ঘটেছে মাস দুই হলো। অথচ আজ আট দিন হলো, জেবা হাসপাতালে। সুলতানের একমাত্র সম্বল একটা সঞ্চয়পত্র ছিল ব্যাংকে। সেটা ভেঙে চিকিৎসা চলছে। তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে প্রায় দুই মাস হলো।
জেবা বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে থাকে। ঘুম ভাঙার পর সুলতানকে পাশে দেখলে ভরসা পায়। না হলে ভয় পায়। জেবা এখন ঘুমিয়ে। হাসপাতালে ছোট ক্যানটিন রয়েছে। সেখানে গেল সুলতান নাশতাটা সেরে নিতে। সেখানে দেখা ইদ্রিস আলীর সাথে। ইদ্রিস আলীর সাথে পরিচয় আচমকা। বিয়ের পরপরই শ্রীমঙ্গলে গিয়েছিল সুলতান ও জেবা। শ্রীমঙ্গলের একেবারে শেষ প্রান্তে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাশহর সীমান্তের কোল ঘেঁষে নাগাপানি চা–বাগান; জেমস ফিনলের চাতলাপুর চা-বাগানের একটি শাখা বাগান। সাধারণ পর্যটকেরা যেখানে গিয়ে ছবি তোলে, এটা তার থেকেও অনেক গভীরে। সেখানে চারপাশটা এত ঘন আর থমথমে যে ভরদুপুরেও সূর্যের আলো মাটির ছোঁয়া পায় না। এই বাগানের ১২ নম্বর সেকশনের একেবারে শেষ মাথায় একটা পরিত্যক্ত পুরোনো বাংলো আছে, যাকে স্থানীয় চা-শ্রমিকেরা ডাকে ‘রানিমহল’। এক ব্রিটিশ চা ম্যানেজারের স্ত্রী বহু বহু বছর আগে স্বামীর চাকরিসূত্রে ইংল্যান্ড থেকে এসে থাকতেন। সে সময় থেকে এ বাংলোর নাম ‘রানিমহল’। মহলের সামনেই ইদ্রিস আলীর সঙ্গে পরিচয়। তারপর ইদ্রিস আলী যেসব কথা বলেছিল, সেসব প্রায় থ্রিলার বা হরর মুভির মতো ঘটনা। সেবার আর রানিমহল দেখা হয়নি সুলতান ও জেবার। পরে অবশ্য তারা গিয়েছিল।
ইদ্রিস আলী ক্যানটিনে খাবারের কুপন নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে গিয়ে দাঁড়াল সুলতান; পেছন থেকে জানতে চাইল, ‘শ্রীমঙ্গলের ইদ্রিস আলী না?’
সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘জি।’
‘আমাকে চিনতে পেরেছেন?’
ইদ্রিস আলী মুখ না ঘুরিয়েই বলল, ‘জি, আপনে ঢোকার সময়ই আমি দেখেছি। আপনে সুলতান। স্ত্রীর নাম জেবা বেগম।’
তারে জীবিত অবস্থায় কবর দেওয়া হইছিল নাকি মারা যাওয়ার পরও মানুষ জীবিত হইতে পারে, এ–ই নিয়া আলাপ সাত এলাকায় ছড়াইয়া পড়ছিল। এরপর জনি ব্রাউন চাকরি ছাইড়া বিলাতে চইলা যায়। ঘটনার জন্ম এরপর। এই রানিমহলে আর কোনো নতুন সাহেব আইসা ওঠে না। কেউ ওদিকে যায় না। সন্ধ্যার পর দেশি মদে বা হাড়িয়ায় ঢুলু ঢুলু কোনো শ্রমিক বা এইগুলা কেউ খায় নাই, তেমন মানুষও বাংলোর পাশ দিয়া গেলে মাঝে মাঝে নূপুরের শব্দ শুনত।
ইদ্রিস আলীর স্মরণশক্তি ভালো। লোকটা সাহিত্য পড়েনি, সিনেমা দেখেনি। এ রকম একটা মানুষ এত সুন্দরভাবে কোনো কিছু বর্ণনা করে যে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে হয়। যেমন রানিমহলের অলিভিয়া ব্রাউনকে নিয়ে বলা কথাগুলো শুনে মনে হয়েছিল, ইদ্রিস আলী যেন স্বচক্ষে দেখেছে সব। অথচ ইদ্রিস আলী অলিভিয়া ব্রাউন বা রানিমহলের ঘটনাগুলো জেনেছে তার শৈশবে দাদাজানের কাছে। দাদাজানের নাম মোতালিব; সেই চা-বাগানের কেরানি ছিলেন। চা-বাগানের চাকরি সে সময় বংশপরম্পরায় হতো। মোতালিবের পর তার বড় ছেলে মানে ইদ্রিস আলীর বাবা রহমতের হয়েছিল। পরে ইদ্রিস আলীর।
সুলতান ইদ্রিস আলীর সঙ্গে একই টেবিলে মুখোমুখি বসে নাশতা করছে। অল্পস্বল্প গল্প করছে। কিন্তু সুলতান যেন দেখছে অলিভিয়া ব্রাউনকে, যাকে সে আদৌ বাস্তবে দেখেনি। ছবিতেও না। নাকি জেবাকে দেখছে! কনফিউজড। ইদ্রিস আলীর অলিভিয়া ব্রাউন নিয়ে ঘটনা বর্ণনার দক্ষতা এমনই।
ইদ্রিস আলীর ভাষ্যমতে, (অল্প এদিক–সেদিক হতে পারে) ‘অলিভিয়া ব্রাউনের মৃত্যু নিয়া আইজও একটা রহস্য। মৃত্যু অইছিল শীতের এক জ্যোৎস্না রাইতে। মারা যাওয়ার আগে বাংলোর বারান্দায় ওই শীতের মধ্যে একটা হাঁটুসমান ছোট গাউন পইরা বইসা ছিল। তখন তার হাজবেন্ড জনি ব্রাউন বালিশিরা ভ্যালি ক্লাবে গেছিল ভক্স ওয়াগনে চইড়া। ওই সব দেখছে বাংলোর মালি গোপালদা। অনেক রাইতে বাংলোর ড্রাইভার, শেফম্যান আর পাদ্রির চিল্লাচিল্লিতে গোপালদার ঘুম ভাঙলে দেখে, বারান্দায় ভিড়। ততক্ষণে অলিভিয়া ব্রাউন মারা গেছে। একটা টেবিলে গ্রামাফোনের উপরে তার মুখের থুতনি লাইগা ছিল। নিচে গানের রেকর্ড ডিস্ক পইড়া ছিল। আর জনি ব্রাউন ফিরা আইসা অলিভিয়ার পায়ের কাছে বইসা ভ্যা ভ্যা কইরা কানতেছিল আর বলতেছিল, ইউ ক্যাননট ডাই, নেভার, আই ডোন্ট বিলিভ ইট। সেই সময় দাদাজান মাথা নিচু কইরা জনি সাহেবের পিছনে দাঁড়াইয়া ছিল। কেমনে মারা গেছে অলিভিয়া, এইটা কেউ না জানলেও তারে কবর দেওয়ার এক দিন পরই বাংলোর পাদরি যখন বলল, “মেমসাহেব তো মরে নাই, বাঁইচা আছে তেঁতুলগাছের নিচে কবরে,” তখন আবার কবর খোঁড়া হইল। মানুষের ভিড়। অলিভিয়ারে কবর থিকা উঠানোর পর সবাই দেখল, তার শরীর গরম। বাম হাতের একটা আঙুল নড়তেছে। অবশ্য এর কয়েক ঘণ্টা পর অলিভিয়া মারা যায়। কিন্তু তারে জীবিত অবস্থায় কবর দেওয়া হইছিল নাকি মারা যাওয়ার পরও মানুষ জীবিত হইতে পারে, এ–ই নিয়া আলাপ সাত এলাকায় ছড়াইয়া পড়ছিল। এরপর জনি ব্রাউন চাকরি ছাইড়া বিলাতে চইলা যায়। ঘটনার জন্ম এরপর। এই রানিমহলে আর কোনো নতুন সাহেব আইসা ওঠে না। কেউ ওদিকে যায় না। সন্ধ্যার পর দেশি মদে বা হাড়িয়ায় ঢুলু ঢুলু কোনো শ্রমিক বা এইগুলা কেউ খায় নাই, তেমন মানুষও বাংলোর পাশ দিয়া গেলে মাঝে মাঝে নূপুরের শব্দ শুনত।
ভেজা বিষণ্ন বালু, যেন সূর্যের আলোর অভাবে কত দিন হেসে ওঠে না। কিন্তু বিকালবেলা ওই বিষণ্ন বালুময় পাশের ছড়া আর দূরে পাহাড়ের হাতছানি জীবনকে কেমন জানি তাচ্ছিল্য করতে শেখায়। ওখানেই নাকি স্থায়ীভাবে চারটি সিমেন্টের বেঞ্চি করেছে আখতার। কখনো কোনো বিকেলে ওখানে বসে চা খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখে।
সুর ভাইসা আসত। এর পর থিকা এইটা পরিত্যক্ত হইয়া যায়। তবে ডাক্তার ওই ঘটনা সম্পর্কে বলছিল, মেডিক্যাল সাইন্সে নাকি এইটারে বলে ল্যাজারাস সিনড্রোম। কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন দেওয়ার পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেহের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া ফিরে আসাকে ল্যাজারাস সিনড্রোম বলে। আর পাদরি বলছিল, বাইবেলে নাকি আছে, ল্যাজারাস নামের একজনকে তার মৃত্যুর চার দিন পর জীবিত করেছিলেন যিশু।’
সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সেদিন ইদ্রিস আলীর কথায় জেবাকে নিয়ে আর সুলতান ওই বাংলোয় যায়নি। সে রাতে শ্রীমঙ্গলে ফিরেছিল তারা। তবে রানিমহল নিয়ে কৌতূহল ছিল।
নাশতা খাওয়া শেষে ইদ্রিস আলী জেবাকে দেখতে কেবিনে আসে। জেবা শুয়ে আছে। এলোমেলো খড়ের মতো কয়েকটা চুল এসে পড়েছে তার কপালে, চিবুকে, কানের পাশে। চোখের পাতার ওপরে ও নিচে যেন অন্ধকার। ইদ্রিস আলী বলে, ‘উনি তো খুব শুকাইয়া গেছেন। কী হইছে?’
জবাব দিতে সুলতান ইতস্তত করে। কিন্তু কী অবলীলায় ইদ্রিস ক্যানটিনে নাশতা করার ফাঁকে জানাল, তার ছেলেটা মারা গেছে। ডেঙ্গু হয়েছিল। বিকালের মধ্যে লাশ নিয়ে রওনা দেবে। বলার সময়ও ইদ্রিস আলী ভাবলেশহীন। নিজের সন্তান মারা গেছে, কোনো যন্ত্রণার ছাপ তার চোখেমুখে নেই। শুধু বলেছিল, ‘বুঝলেন, মায়ার সংসারেই তো মানুষ বাঁইচা থাকে।’
ইদ্রিস আলী সুলতানের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে জানতে চায়, ‘আপনারা কিছুদিন আগে নাকি রানিমহলে গেছিলেন? আমি অবশ্য তখন ছিলাম না।’
জেবা এ সময় চোখ মেলে। তার হাতে স্যালাইনের সুইটা ঠিক আছে কি না, দেখে নেয় সুলতান। শিয়রে স্যালাইনের ব্যাগ ঝুলছে। সুলতান কী বলবে, কিছু বুঝে উঠতে পারে না। জেবা অল্প হাত ধরে সুলতানের। আবার চোখ বোজে।
সুলতানের মনে পড়ে, মাত্র দশ–বারো দিন আগেই তারা গিয়েছিল। সুলতান আগে থেকে জানত, নাগাপানিতে ব্যবস্থাপক হয়ে গিয়েছে ব্যাচমেট আখতার। ময়মনসিংহ অ্যাগ্রি ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। তত দিনে নাগাপানি চা–বাগান আর জেমস ফিনলে কোম্পানির অধীনে নেই। বেসরকারি মালিকানায় বিক্রি হয়ে গিয়েছে। আখতারই তাদের যেতে বলেছিল। জানিয়েছিল, রানিমহল নিয়ে অনেক মিথ আছে। একটা চার্চ আছে। অলিভিয়া ব্রাউনের গল্প করেছিল। আর বাংলোর পেছনে চার্চের পাশ ঘেঁষে চলে যাওয়া সরু আলপথে অল্প এগোলেই পাহাড়ি ছড়া। ভেজা বিষণ্ন বালু, যেন সূর্যের আলোর অভাবে কত দিন হেসে ওঠে না। কিন্তু বিকালবেলা ওই বিষণ্ন বালুময় পাশের ছড়া আর দূরে পাহাড়ের হাতছানি জীবনকে কেমন জানি তাচ্ছিল্য করতে শেখায়। ওখানেই নাকি স্থায়ীভাবে চারটি সিমেন্টের বেঞ্চি করেছে আখতার। কখনো কোনো বিকেলে ওখানে বসে চা খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখে।
সন্ধ্যার অল্প আগে তারা বাসার দিকে রওনা দেয়। একটা বড় ব্যাগ রিকশায় পায়ের কাছে রাখা। জেবাই বলেছে, রিকশায় ভেঙে ভেঙে বাসায় ফিরবে। রিকশা ছুটছে। সুলতান গুটিসুটি মেরে জেবাকে জড়িয়ে বসে আছে, যাতে সে পড়ে না যায়। জেবাও হাত ধরে আছে তার। মানুষজন কাজ শেষে বাসায় ফিরছে। দালানের ছাদে, রেইনট্রিতে, রাস্তার পিচে, চারিদিক থেকে সন্ধ্যা নামছে। তারা দুজন মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে, নিয়নের আলোয় দেখা যায় না আর।
আখতার রেলস্টেশনে ছিল। ওরা গিয়ে পৌঁছায় রাত সাড়ে তিনটায়। তারপর আখতারের জিপে নাগাপানি চা-বাগানের রানিমহল।
রানিমহল দেখার মতন। বড় বড় কামরা। শার্সি। সামনে–পেছনে বড় বারান্দা। তবে সেই চার্চ নেই। পাদরি নেই। ফুলের বিশাল বাগানটা রয়ে গেছে। তবে মালি নেই। ঝোপঝাড়ে ভরা। কয়েকটা ঘাসফুলকে দৃষ্টিবিভ্রমের মতো কাল্পনিক মনে হয়। যেন তারা বেঁচে আছে, আবার নেই।
চারপাশে অনেক গাছগাছালি। সন্ধ্যায় বাদুড়ের ঝাঁক সেসব গাছে এসে বসে। হাসে। দুলতে থাকে।
সুলতান ও জেবার থাকার কথা ছিল তিন–চার দিন। কিন্তু দ্বিতীয় দিনেই সেই বালুময় পাহাড়ি ছড়ার পাড়ে বেঞ্চিতে বসে কফি খাওয়ার সময় আড্ডার ফাঁকে জেবা হঠাৎ সুলতানকে বলে, ‘আমার মাথাটা ঘুরছে।’
সুস্থ, স্বাভাবিক। রাতে ভালো ঘুমও হয়েছে। হঠাৎ আবার কী হলো? সুলতান তাকে ভেতরে নিয়ে এসে বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার সময় জেবা তার হাতটা ধরে।
জেবা হাত চেপে ধরে বলে, ‘আমার ভয় করছে।’
সুলতান কারণ জানতে চাইলে জেবা বলে, ‘জানি না। মরে যাই যদি।’
নাহ, আগের রাতেও ঠিক ছিল জেবা। হাসিখুশি। ভোরে বাংলোয় পৌঁছানোর পর বেলা এগারোটা পর্যন্ত ঘুমিয়েছে তারা। বাগানের ধুলো ওড়া উঁচু–নিচু পথে হেঁটেছে। দুপাশে সবুজ চা-বাগান। ছবি তুলেছে। আখতার তাড়াতাড়িই ফিরেছিল। সন্ধ্যায় শুধু আড্ডার ফাঁকে জেবা বলেছিল হাসতে হাসতে, ‘কই, অলিভিয়া ব্রাউনের নূপুর তো এখনো শুনলাম না।’
অবশ্য সাঁওতালি ঝুমুর নাচের গান ও মাদলের শব্দ ভেসে আসছিল।
সারা রাত ঘুমায়নি জেবা। সুলতানকেও দেয়নি ঘুমাতে। জড়িয়ে ধরে বলে, ‘যদি মরে যাই?’
আখতারকেও বলেছিল ঘটনাটা সুলতান। পরদিনই তারা ঢাকায় ফেরে। তিন দিন পর জেবা রাতে সুলতানকে জানায়, তার ভয় করে। কী ভয়? অজানা। জানায়, একদিন ফার্মগেটের ফুট ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে পারাপারের সময় তার মনে হচ্ছিল, হঠাৎ তাকে নিচের রাস্তা টানছে। নিচের ছুটে চলা মানুষ, গাড়ি, ভিড়, ফুটপাতে পড়ে থাকা পাগল ডাকছে। আয়, আয়। তার তখন মনে হচ্ছিল, সে ওপর থেকে পড়ে যাচ্ছে। সে প্রায় দৌড়ে অন্য প্রান্তের সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে পড়ে। আশপাশের মানুষ তার আচমকা এমন আচরণে অবাকই হয়েছিল।
পরের সপ্তাহেই সুলতান জেবাকে নিয়ে একজন সাইকিয়াট্রিকের কাছে যায়। কয়েকটা সেশন ও টেস্টের পর সাইকিয়াট্রিক বলেন, জেবা আসলে থানাটোফোবিয়ায় আক্রান্ত। এটি হলো মৃত্যু নিয়ে অস্বাভাবিক এবং তীব্র ভয়।
ইদ্রিস আলী অনেক আগে চলে গেছে লাশ নিয়ে। যাওয়ার আগে বলে গেছে, ছেলের কবরে দুটো সোনালুগাছ লাগাবে। একদিন গাছ দুটো বড় হবে। একদিন ডুবে যাওয়ার ঠিক আগের সূর্যের রং ছড়িয়ে সোনালুরা দোল খাবে। একদিন সেইখানে ইদ্রিস আলীও শুয়ে ঘুমাবে চিরতরে। ছেলের পাশে।
দুপুরের পর ডাক্তার এল। নার্স জেবাকে ডেকে তুলল। একটা ইনজেকশন দেওয়া হবে। এসসিটালোপ্রামের। আর আরেকটা ওষুধ খাওয়ানো হবে, বেনজোডায়াজেপিন। ডাক্তার সুলতানের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ তো বাসায় যাচ্ছেন। তবে সপ্তাহে কাউন্সেলিং আর ওষুধ কন্টিনিউ।’
ডাক্তার, নার্স চলে যাওয়ার পর সুলতান অল্প ভাত খাইয়ে দিল। কই মাছ আর পুঁইশাক দিয়ে।
জেবা শুতে শুতে শুধু বলল, ‘তোমার চাকরিটাও গেল।’
সুলতান কিছু না বলে তার চুলে বিলি কেটে দেওয়ার সময় শোনে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। স্ট্রেচারে এক রোগীকে ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার সময় অনেকগুলো কান্না কুণ্ডলি পাকিয়ে তার বুকের ভেতর ঢুকে যায়।
সন্ধ্যার অল্প আগে তারা বাসার দিকে রওনা দেয়। একটা বড় ব্যাগ রিকশায় পায়ের কাছে রাখা। জেবাই বলেছে, রিকশায় ভেঙে ভেঙে বাসায় ফিরবে।
রিকশা ছুটছে। সুলতান গুটিসুটি মেরে জেবাকে জড়িয়ে বসে আছে, যাতে সে পড়ে না যায়। জেবাও হাত ধরে আছে তার। মানুষজন কাজ শেষে বাসায় ফিরছে। দালানের ছাদে, রেইনট্রিতে, রাস্তার পিচে, চারিদিক থেকে সন্ধ্যা নামছে।
তারা দুজন মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে, নিয়নের আলোয় দেখা যায় না আর।