অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গল্প

ক্ষত

চা শেষ করে তাওফিক-উল করিম টং দোকানের সুতায় ঝোলানো লাইটারের সাহায্যে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করছিলেন। সে সময় দোকানের বেঞ্চে পাশাপাশি বসা দুজন বৃদ্ধের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো। যেন দুটি মুখই চেনা, কিন্তু স্পষ্ট হয় না কিছু। একজনের মুখে কোঁচকানো তামাটে চামড়ায় সাদা দাড়ি, পরনে পাজামা আর হাফহাতা সাদা গেঞ্জি। অন্যজনের খুব ছোট করে কাটা কাঁচাপাকা চুল, পরনে ময়লা লুঙ্গি আর গায়ে একটা গামছা প্যাঁচানো। আমেরিকাপ্রবাসী তাওফিক তেরো বছর পর আবার এ দেশে এসেছেন। নিউ জার্সিতে থাকতেই ঠিক করেছিলেন এবার দেশে গেলে শৈশব-কৈশোরের জায়গাগুলো ঘুরে দেখবেন, খুঁজবেন হারিয়ে যাওয়া মুখগুলো। বিস্মৃতির জগতে তলিয়ে যাওয়ার আগে স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে ভ্রমণ করে পুরো জীবনটাকে নতুনভাবে জোড়া দেওয়া দরকার। অতীতবিহীন একটা খণ্ডিত জীবনযাপন সব সময় উপভোগ্য না-ও হতে পারে। মানুষ তো কেবল বর্তমানে নয়, অতীতেও বাঁচে। অতীতের কেবল সুখকর স্মৃতির অমৃত রোমন্থন করতে চান অনেকেই, কিন্তু ফেলে আসা বিষ-স্মৃতিও তো সমগ্র জীবনেরই অংশ। এই অখণ্ড অতীত একেকজন মানুষের বর্তমান জীবনের পাটাতন হয়ে থাকে। তাই শক্ত পায়ে দাঁড়াতে স্মৃতিগুলোকে সজীব রাখা চাই। যে জন্য কখনো কখনো চোখের এবং মনের সংযোগের প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট দৃশ্যপটের সঙ্গে। আর কথা-ই তো আছে—দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে তা মন থেকে দূরে সরে যায়। আজ সকাল নয়টায় কালো রঙের এই রাশ গাড়িটা হায়ার করেছিলেন সারা দিনের জন্য। তরুণ ড্রাইভার বলল, ‘স্যার, কোথায় যাব?’ তাওফিক ইচ্ছা করেই কোনো সফরসঙ্গী রাখেননি, যাতে নিজের মতো করে পুরোনো জায়গাগুলো দেখে তার রূপ-রস-গন্ধ তথা অনুভবগুলো নিবিড়ভাবে আত্মস্থ করা যায়।

‘তুমি হাইওয়ে ধরে সোজা যেতে থাকো, আমি বলব।’ তাওফিক সামনে ড্রাইভারের পাশে বসেছিলেন। বনিএমের গান বাজছে, ‘চিকিটিটা টেল মি হোয়াটস রং, ইউ আর এনচেইনড বাই ইয়োর ওন সরো।’ উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় গানগুলো খুব প্রিয় ছিল তাঁর। রাস্তার দুই ধারের বাড়িঘর, দোকানপাট দেখে মনে হয় গত দুই-তিন দশকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার বেশ খানিকটা উন্নতি হয়েছে। একটা দূরবর্তী পল্লি অঞ্চলে ঢুকে পড়লে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতো। তখন হঠাৎ তাওফিকের একটি বিশেষ গ্রামের স্মৃতি মনে পড়ে। স্টোরিওর ভলিউম কমিয়ে দিয়ে বলেন, ‘বাঁশহাটিয়া গ্রামটা বাঁ দিকে না?’

আমেরিকাপ্রবাসী তাওফিক তেরো বছর পর আবার এ দেশে এসেছেন। নিউ জার্সিতে থাকতেই ঠিক করেছিলেন এবার দেশে গেলে শৈশব-কৈশোরের জায়গাগুলো ঘুরে দেখবেন, খুঁজবেন হারিয়ে যাওয়া মুখগুলো।

‘জি স্যার, সোজা গেলে সাত কিলোমিটার হবে।’

‘টানা পাকা রাস্তা তো?’

‘হ্যাঁ, মাঝে আধা কিলোমিটার একটু ভাঙা আছে, তাতে বিশেষ অসুবিধা হবে না।’

‘নদী ছিল যে, লোকে খেয়া পার হতো?’

‘সেখানে তো বহু আগে ব্রিজ হয়ে গেছে—ট্রাক পর্যন্ত চলে। অবশ্য নদীটা প্রায় শুকনো এখন, কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও বড়জোর গলা অবধি।’

গাড়ি বাঁ দিকে মোড় নিলে প্রথমে কয়েকটি দোকানপাট, বাড়িঘর আর একটা ইটের ভাটা চোখে পড়ে। তারপর টানা দুই–তিন কিলোমিটার বিস্তীর্ণ মাঠে নানা রকম ফসল। একটা ছোট নদীর ওপর ব্রিজ, তিন যুগ আগে এখানেই খেয়া পার হতো লোকে। তাওফিক সারা জীবনে মোট দুবার এই পথে যাওয়া-আসা করেছিলেন। ব্রিজ পেরিয়ে মিনিট পাঁচেক চলার পর ড্রাইভার বলল, ‘স্যার, এখান থেকেই বাঁশহাটিয়া গ্রাম শুরু।’

‘আচ্ছা, আর একটু যাও তো।’

দু শ মিটারের মতো এগোলে ডান দিকে দেখা যায় কয়েকটি শিমুলগাছের তলায় দুটি টং দোকান। একটা মুদি, অন্যটা চায়ের দোকান আর অদূরেই একটা কামারশালা। সেদিকে ইঙ্গিত করে তাওফিক বলেন, এবার ডান দিকটাতে রাখো তো, বড় শিমুলগাছের নিচে পার্ক করো। তিনি গাড়ি থেকে নেমে ধীর পায়ে চায়ের দোকানটার দিকে এগিয়ে যান। ঠিক করেন এক কাপ চা খেয়ে আর একটা সিগারেটে টান দিতে দিতে গ্রামের ভেতরটায় ঢুকবেন। সবুজ গাছগাছালিতে ঘেরা গ্রামটি দূর থেকে দেখে মনে হয় খুব বেশি বদলায়নি, তেমনই শান্ত-নিস্তরঙ্গ। তবে ভেতরে গেলে নিশ্চয়ই কিছু পরিবর্তন চোখে পড়বে। গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে, মানুষ আর আগের মতো হতদরিদ্র নেই। তবে কাণ্ডজ্ঞান, স্বভাব-চরিত্রের কতটা উন্নতি হয়েছে, তা বলা মুশকিল। নিশ্চয়ই যাবেন ভেতরটা দেখতে। ড্রাইভার ছেলেটিকে চোখে পড়ছে না। কামারশালা এখনো বন্ধ, বাঁশের দরজায় তালা ঝুলছে। সব মিলিয়ে দ্বীপের মতো উঁচু জায়গাটায় এই মুহূর্তে মোট চারজন মানুষ। চায়ের দোকানদার, তিনি নিজে আর বেঞ্চে বসা দুজন বয়স্ক মানুষ। বৃদ্ধ দুজন বিশেষভাবে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আচ্ছা, দুটো লোকের চেহারায় বেশ মিল, ওরা কি দুই ভাই? এখন ২০২৫ আর ঘটনাটা ছিল সম্ভবত ১৯৮৭–র। আটত্রিশ বছরে একটা মানুষ কতটা বদলাতে পারে যে তাকে দেখে আদৌ চেনা সম্ভব হবে না? মৃদু বাতাসের ভেতর তাওফিক দুই বৃদ্ধের বিপরীত দিকে ফিরে সিগারেটে টান দিচ্ছিলেন। দূরে কোথাও কোকিল ডাকছে। তাওফিক মাঝে দুবার ঘাড় ঘুরিয়ে সতর্কভাবে কয়েক সেকেন্ড পর্যবেক্ষণ করেছেন; কিন্তু এদের মধ্যে সেদিন দুপুরের ও সন্ধ্যার অর্থাৎ আটত্রিশ বছর আগেকার পুরুষ ছিল কোনজন, তা ঠিক ঠাওরে ওঠা কঠিন হয়। তবে মনে পড়ে, লোকটার কালো পুরু গোঁফ ছিল, মাথায় মাখা ছিল সরিষার তেল। এখন সামনের দুজনেরই গোঁফ ছোট করে ছাঁটা। দুটো লোকই যৌবনকালে বেশ সুঠাম আর তাগড়া ছিল বোঝা যায়। তাওফিক কি লোকটার নাম জানতেন—শুনেছিলেন কোনো দিন? নাহ, মনে করতে পারেন না একেবারেই।

একটা মুদি, অন্যটা চায়ের দোকান আর অদূরেই একটা কামারশালা। সেদিকে ইঙ্গিত করে তাওফিক বলেন, এবার ডান দিকটাতে রাখো তো, বড় শিমুলগাছের নিচে পার্ক করো।

ওই সময় বৈশাখ মাসের গরমে বাঁশহাটিয়া যাওয়ার কথা ছিল না কোনোমতেই। মা নিরুপায় হয়ে পাঠিয়েছিলেন। মায়ের চাচাতো বোন মোমেনার অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল এই বাঁশহাটিয়া গ্রামে। তার স্বামী আকবর আলী বছরে দু-একবার খেতের রসুন, কলাই ডাল, যবের ছাতু, মানকচু প্রভৃতি নিয়ে তাওফিকদের বাড়িতে আসত। ফিরে যাওয়ার সময় তাওফিকের চাকরিজীবী বাবা হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিতেন। সেবার ফাল্গুন মাসের শেষ থেকে মায়ের দুই মাস টানা জ্বর, টাইফয়েড। এর মধ্যে তাওফিকের বাবা আর বোনের পক্স হলো। আকবর খালু বেড়াতে এলে তাওফিকের বাবা বললেন, ‘তুমি ভাই এর মধ্যে আর থেকো না, আমাদের ছোঁয়াচে রোগ। বরং আমার ছেলেটাকে কদিন তোমাদের কাছে নিয়ে রাখোগে।’ তিনি আকবর খালুর হাতে এক শ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিলেন। তাওফিকের বাবা ছিলেন থানা পোস্টমাস্টার। ছোট একটা বাসা ভাড়া নিয়ে তাঁদের মধ্যবিত্ত সংসার চলে যেত একরকম। তাওফিক জন্ম থেকে মা–বাবা ছাড়া দুটো দিনও কোথাও গিয়ে আলাদা থাকেনি। কিন্তু বাড়ির সকলে আজ তাকে বিদায় দিতে প্রস্তুত। মায়ের ঘরে গিয়ে তাওফিক বলেছিল, ‘মা, আমি যাব না তোমাদের ছেড়ে, ওখানে আমি একা কীভাবে থাকব?’ জ্বর আর মাথাব্যথা নিয়ে শীর্ণ শরীরে মা দুপুরের দিকে একবার উঠে কষ্ট করে রান্না করেন। বাকিটা সময় বিছানায়। তাঁর সারাক্ষণ মাথাব্যথা থাকত বলে বাবা বারান্দায় একটা কলসের তলা সামান্য ছিদ্র করে মাথায় পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। পানিভর্তি কলসটা ঝোলানো বাঁশের আড়ায়, তার নিচে মাথা পেতে শুয়ে ছিলেন মা। তিনি তাওফিকের গায়ে হাত বুলিয়ে বলেন, ‘সোনা আব্বা, তোকে ছেড়ে থাকতে কি আমাদের ভালো লাগবে? বাড়ির বাকি তিনটে মানুষেরই কী অবস্থা দেখ। তোরও যদি ধরে বসে, বিপদের আর শেষ থাকবে না।’

কথার ফাঁকে মা তাওফিককে বলেন তাকের ওপর থেকে কাজলদানিটা নিয়ে আসতে। মায়ের কাজল বানানোর একটা ঘরোয়া পদ্ধতি ছিল। দুই পাতাবিশিষ্ট কাজলদানির অবতল একটা দিকে সরিষার তেল মেখে তাতে প্রদীপশিখা জ্বালিয়ে কালি জমিয়ে কাজল বানানো হতো। তাওফিক আজন্ম কাজলদানিটি দেখে আসছেন। ঘর থেকে একটু দূরে কোথাও গেলে মা কপালের বাঁ দিকে বড় করে টিপ দিতেন। সেদিনও মধ্যমা দিয়ে কপালে টিপ দিয়েছিলেন, যাতে কারও নজর না লাগে। আর বলেছিলেন, ‘মোমেনা খালা তো দূরের কোনো মানুষ না। যা বাবা, মন খারাপ করে না। তোর আব্বা একটু ভালো হলে গিয়ে নিয়ে আসবে।’

বাড়ির আঙিনা ছেড়ে আকবর খালুর হাত ধরে রাস্তায় নেমে সাড়ে নয় বছরের তাওফিকের বুকের ভেতর কেমন একটা হাহাকার করে ওঠে, যে অনুভূতি এর আগে কখনো হয়নি। প্রথমে প্রায় আধা ঘণ্টা স্কুটারে পোড়া ডিজেলের ধোঁয়ায় চোখজ্বলা নিয়ে ভাঙাচোরা রাস্তা অতিক্রম। তারপর নৌকা করে নদী পার হয়ে তিন মাইল ভ্যানে এবং অবশেষে প্রায় এক মাইল মেঠোপথ ধরে হেঁটে মোমেনা খালার বাড়ির উঠান পর্যন্ত পৌঁছাল একেবারে গোধূলিলগ্নে। এতটা দূরবর্তী বিদ্যুৎবিহীন গ্রামে আগামী দিনগুলো কতটা বিষণ্ন হতে পারে, শিশু তাওফিক তা প্রথম সন্ধ্যায়ই উপলব্ধি করেছিল। সন্ধ্যার খানিক পরে রাতের খাবার খেয়ে সবাই শুতে চলে গেল। রাতে তাকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল আমেনা খালার বড় মেয়ে রোকেয়ার সঙ্গে। বিবাহিতা মেয়েটি সম্ভবত সন্তানসম্ভবা হয়ে মায়ের কাছে এসেছিল। সে বালিশে মাথা রাখার কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে মৃদু স্বরে নাক ডাকতে শুরু করল। তারপর অন্তত একটা ঘণ্টা তাওফিক এপাশ–ওপাশ করেছে। চোখে জল নিয়ে বিনিদ্র অন্ধকার দেখতে দেখতে একটা সময় ঘুমাতে পেরেছিল।

ওই লোকটা সম্ভবত মোমেনা খালাদের বাড়ি থেকে বেশ কয়েকটা বাড়ি দূরে থাকত। তাওফিক যাওয়ার পরের দিন বেলা এগারোটার দিকে একটা রেডিও হাতে এসেছিল লোকটা। ওকে দেখে লোকটা খালাকে বলল, ‘ও ভাবি, এই ছ্যামড়া আবার কিডা?’

ওই লোকটা সম্ভবত মোমেনা খালাদের বাড়ি থেকে বেশ কয়েকটা বাড়ি দূরে থাকত। তাওফিক যাওয়ার পরের দিন বেলা এগারোটার দিকে একটা রেডিও হাতে এসেছিল লোকটা। ওকে দেখে লোকটা খালাকে বলল, ‘ও ভাবি, এই ছ্যামড়া আবার কিডা?’

খালা উঠানে শুকাতে দেওয়া ধান পায়ের পাতায় নাড়তে নাড়তে উত্তর দেয়, ‘আমার বোনপো, ওই যে ওর আব্বা পোস্টমাস্টার।’

গোঁফওয়ালা লোকটা গামছা দুলিয়ে বাতাস নিতে নিতে টিনের চালের নিচে বারান্দার বসে রেডিওর ভলিউম বাড়িয়ে দেয়। ছায়াছবির গান বাজছে, ‘হাঁটুজলে নেমে কন্যা হাঁটু মাজন করে।’

লোকটা তাওফিকের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘নাম কী তুমার” কোন কিলাশে পড়ো?’

‘তাওফিক, ক্লাস থ্রি।’

লোকটাকে বিশেষ মন্দ লাগে না তাওফিকের। মনে হয়, রাতে যদি ওর রেডিওটা রেখে যেত, অন্তত দুর্বার অনুষ্ঠান আর কিছু গান বা নাটক শুনে রাতের খানিকটা সময় পার করা যেত।

তাওফিক ওই গ্রামে কত দিন ছিলেন তা মনে নেই। আর ওই ঘটনা কততম দিনে ঘটেছিল, তা–ও ঠিক বলতে পারবেন না। তবে বাঁশহাটিয়া অবস্থানের চতুর্থ বা পঞ্চম দিন হতে পারে।

সেই দুপুরে শাক ভাজি আর আলুভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে উঠানের পাশে দুটো গ্রাম্য ছেলের লাটিম ঘোরানো দেখছিল তাওফিক। তখন ওই রেডিওধারী লোকটা এসে মোমেনা খালাকে ডাক দিয়ে বলে, ‘ভাবি হাটে যাচ্ছি। রসুন আর কী যেন আনতি কইলেন?’

মোমেনা খালা আঁচল থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট দিয়ে বলে, ‘দুই টাকার আদা আর তিন টাকার মদ্যি রসুন আনবা যেটুক হয়। এই ছ্যামড়াডা এয়েচে, খালি শাকপাতা দিয়ে ভাত দিচ্ছি, কাইল বাড়ির ওই মোরগডা জবই দেব।’

আজ বারান্দায় বসে রেডিওতে ছায়াছবির দুটো গান শোনে লোকটা। এক ফাঁকে বলে, ‘তালি ভাবি ওরে আমার সাথে দিয়ে দেন, হাটেরতে গরম গরম জিলেপি খাওয়ায়ে আনবানে।’

খালা গলা বাড়িয়ে ডাক দেয়, ‘তাওফিক, যাও বাবা, এই মামার সাথে হাটেরতে ঘুরে আসো।’

তাওফিক আপত্তি করেনি। গ্রামের হাটে ঘুরতে মন্দ লাগবে না হয়তো।

অন্ধকার হয়ে আসা পথে লোকটার পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে তাওফিক কোনো উত্তর দেয়নি, কেবল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। লোকটা তখন বলে, ‘যদি কাউ রে কইস, তালি কলাম জ্যান্ত ফিরে যাতি পারবিনে এই গিরামেরতে।’

লুঙ্গি পরিহিত লোকটা দ্রুত বাড়িতে গিয়ে স্যান্ডো গেঞ্জির ওপর গামছা চড়িয়ে আর হাতে একটা কাঠা নিয়ে তাওফিকসহ রওনা হলো। গ্রামের হাটটা বেশ বড়—কৃষক, কুমার, তাঁতি, জেলে, ময়রা সবারই পসরা আছে এখানে। এক কোণে কামারশালাও দেখা গেল। মাছ-তরকারি কেনা শেষে লোকটা তাওফিককে খেজুর গুড়ের জিলাপির বিশেষ দোকানে নিয়ে যায়। দোকানিকে বলে, ‘আমার এই ভাগনের জন্যি এক প্লেট গরম জিলেপি দেও।’ লোকটাও গোগ্রাসে জিলাপি খাওয়ায় অংশ নেয়। খাওয়া শেষ হলে খেয়াঘাট পার হয়ে তাওফিক লোকটার পেছন পেছন হাঁটতে থাকে। প্রথমে বালুময় চওড়া রাস্তাটা ধরে এগিয়ে যায় দুজন। তারপর বাঁ দিকে চিকন রাস্তা গেছে বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে, লোকটা সেই পথ ধরে এগোয়। তাওফিকের মনে হলো, আসার সময় তো এই রাস্তা দিয়ে আসেনি। তবু সে কিছু বলে না। আরও খানিকটা এগোলে দুপাশের ঝোপের ভেতর দিয়ে একপেয়ে পথ। ঘরে ফেরার আগে পাখিরা শেষবারের মতো কিচিরমিচির করে নিজেদের মধ্যে আলাপ শেষ করে নিচ্ছে। লোকটা বলল, ‘সামনে আমার একটা আখের খেত আছে, চলো তোমারে আখ খাওয়াব।’

তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। কৃষক আর রাখালেরা ঘরে ফিরে গেছে। দূরের গ্রামগুলোতে কিষানিরা রাতের রান্নার জন্য চুলো জ্বালিয়েছে বলে অনুমান করা যায়। কতক বাড়ি থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠে আকাশে মিশে যাচ্ছে। তাওফিকের মন সায় দেয় না। ‘না, এখন থাক, রাত হয়ে যাচ্ছে।’

লোকটা তার হাত ধরে টান দিয়ে বলে, ‘আরে আয় না—এই ভুঁইর গ্যান্ডারি খুব মিষ্টি।’

বিস্তীর্ণ খেতে আখগুলোর বেশির ভাগ দুই মানুষের সমান লম্বা। ওই আখের খেতের ভেতরেই মাথায় সরিষার তেল মাখা পুরু গোঁফের লোকটা বিকট রূপ ধরে এগিয়ে এসেছিল তার ছোট্ট পেলব দেহটার দিকে। প্রথমে কেন যেন গালে-ঠোঁটে চুমু দিতে শুরু করলে মুখ থেকে বিশ্রী একটা গন্ধ এসে গা গোলাচ্ছিল। ভয়ে কাঁপতে থাকা নিরুপায় তাওফিক বলে, ‘এখানে থাকব না, বাড়ি যাব মোমেনা খালার কাছে।’

‘আরি যাবি তো—তোরে হাটেরতে গরম গরম জিলেপি খাওয়ালাম আবার বললাম না আখ খাওয়াব।’

‘না, আমি বাড়ি যাব।’

‘বাড়ি তো যাবিই—ছোট্ট ইট্টু কাম আছে তোর সাথে, ভয় নেই কোনো। আমি যা করার আদর করেই করব—কোনো ব্যথা পাবিনে।’ এই বলে লোকটা তার প্যান্ট খুলে লোহার মতো শক্ত কিছু প্রবেশ করিয়েছিল পশ্চাদ্‌দেশ দিয়ে। তাওফিক ব্যথায়–অপমানে কেঁদে উঠলে লোকটা ওর মুখ চেপে ধরে। তাওফিকের অশ্রু আর লালায় একাকার লোকটার শক্ত পাঞ্জা। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ‘কোনো ব্যথা লাগেনি, কানবিনে মোটে—এরপর যদি কোনো আওয়াজ করিস, এই আখের ভুঁইর মদ্যি গলা টিপে ম্যারা থুয়ে যাব কলাম।’ হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় বিকট গন্ধ ভেসে আসে, খেতের ভেতর বোধ হয় কোথাও ইঁদুর মরে পচছিল।

সেই সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে তাওফিক মোমেনা খালা বা কাউকে কিছু বলতে পারেনি। লোকটা আসার সময় বলেছিল, ‘এই কথা কি কবি কাউ রে?’

অন্ধকার হয়ে আসা পথে লোকটার পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে তাওফিক কোনো উত্তর দেয়নি, কেবল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। লোকটা তখন বলে, ‘যদি কাউ রে কইস, তালি কলাম জ্যান্ত ফিরে যাতি পারবিনে এই গিরামেরতে।’

তাওফিক সিগারেটে টান দিতে দিতে লোক দুটোকে ভালো করে খেয়াল করেন। সেদিন সন্ধ্যার সেই নিপীড়ক লোকটি এই দুজনের মধ্যে কে আসলে—নাকি এরা কেউ নয়, অন্য কোনো জন? তিনি অহেতুক সন্দেহ করছেন! এতকাল পর বিষয়টি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে আর লাভ কী—কোনো কূল কি মিলবে? আর যদি চিহ্নিত করতেই পারেন, তাহলে এতকাল পরে কী করবেন তিনি? লোকটার টুঁটি চেপে ধরে সেই সন্ধ্যার কথা স্মরণ করিয়ে কিলঘুষি দিতে দিতে রক্তাক্ত করে ফেলবেন? তাতে কি আশপাশের বা গ্রামবাসীর সমর্থন মিলবে? তিনি কি কৌতূহলী বা প্রতিবাদী জনতার সামনে স্পষ্ট করতে পারবেন ওই বৃদ্ধ আটত্রিশ বছর আগে কী ভীষণ রকম নিপীড়ন চালিয়েছিল তার ওপর? নাকি লোক দুটোর ছবি তুলে নিয়ে গ্রামের লোকদের কাছে নাম-পরিচয় জেনে এই দুজন সন্দেহভাজনের নামে থানায় গিয়ে কেস করবেন? তিনি শতভাগ নিশ্চিত নন, এই দুজনের মধ্যেই একজন ঘটনার নায়ক। এর বাইরে তৃতীয়জনও হয়ে থাকতে পারে। তাহলে গ্রামে ঢুকে তিনি কি উদ্ধার করতে পারবেন নাম–পরিচয়? আটত্রিশ বছর আগে ওই রেডিওধারীর বয়স কত ছিল—পঁচিশ নাকি পঁয়ত্রিশ, তা তো নিশ্চিত করে বোঝার বয়স তখন হয়নি তাওফিকের। তবু বলা যায়, সেই পুরুষ মানুষটির বয়স আজ তেষট্টি-চৌষট্টির আশপাশে হবে।

তার মানে এরা দুজনই বালকদের নির্যাতন করত যুবক বয়সে। কবে কখন কোন বালকের ওপর চড়াও হয়েছে, ঠিক মনে করতে পারছে না। দুজন একই পথের পথিক বলে বুড়ো বয়সেও একসঙ্গে চলে। শাস্তি তো তাহলে দুটোরই পাওনা।

হঠাৎ তাওফিকের মনে হয়, এই দুজনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেদিনের সেই রেডিওধারী শয়তানটা। দু ঘা বুড়ো শরীরে পড়লে ঠিকই স্বীকার করবে সব। তাওফিক কৌশলে মিষ্টিকথা বলে দুই বুড়োকে ডেকে গাড়িতে এনে তোলেন। গাড়িতে ঘুরে শহর দেখাবেন বললে বৃদ্ধ দুজন খুশি হয়। কালো রঙের রাশ ছুটে চলে হাইওয়ের দিকে। তাওফিক পকেট থেকে ধারালো ছুরিটি বের করে আনফোল্ড করতে করতে বলে, ‘এই ছুরিটি দেখেছ, এমন ধারালো ছুরি বাপের জন্মেও দেখোনি তোমরা, আমেরিকা থেকে আনা। গলার কাছে সামান্য একটা পোঁচ দেয়ামাত্র কেল্লাফতে হয়ে যাবে।’

বৃদ্ধ দুজন ভয়ে কাঁপতে থাকে। ‘কেন বাবা, আমাদের কী অপরাধ?’

‘আটত্রিশ বছর আগে আখখেতের ভেতর ক্লাস থ্রিতে পড়া সেই ছেলেটির কথা মনে আছে?’ বলে তাওফিক গভীরভাবে ওদের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে বোঝার চেষ্টা করে অপরাধী আসলে কোনজন?

কিন্তু দুজনই প্রায় সমস্বরে বলে ওঠে, ‘মাপ করে দাও বাবা।’

তার মানে এরা দুজনই বালকদের নির্যাতন করত যুবক বয়সে। হয়তো খানিকটা স্মৃতিভ্রষ্ট বলে কবে কখন কোন বালকের ওপর চড়াও হয়েছে, ঠিক মনে করতে পারছে না। দুজন একই পথের পথিক বলে বুড়ো বয়সেও একসঙ্গে চলে। শাস্তি তো তাহলে দুটোরই পাওনা।

তখন তাঁর একটি ক্লু মনে পড়ে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তোমার সেই টু ব্যান্ড রেডিওটা আছে?’

শুনে তামাটে চামড়ার দাড়িওয়ালা লোকটা ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে, সে তাওফিকের পা দুটো স্পর্শ করে বলে, ‘নষ্ট হয়ে গেছে মেলা আগেই। তুমি মাপ করে দেও বাপ আমার।’

‘তোরা কতজন শিশুর সাথে এই বর্বরতা করেছিলি বল! আমি এই ভাড়া করা গাড়ি রক্তে ভাসাব না। তোদের কী শাস্তি হওয়া উচিত, সেটা তোরাই ঠিক কর।’

দুই বৃদ্ধের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আরেকটি সিগারেটে আগুন ধরান তাওফিক। এতক্ষণ ওদের ভয় দেখিয়ে শাস্তি দেওয়ার যে ঘটনা, তা কেবল তাঁর মস্তিষ্কেই ঘটেছিল, যখন তিনি দুই বুড়োকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন—বাস্তবে একটুও নয়। বস্তুত তাওফিক চিরকালই এক কোমল প্রকৃতির মানুষ, খানিকটা মেয়েলি ধরনেরও হয়তো। কোনো রকম নিষ্ঠুর কাণ্ড কখনোই তাঁর দ্বারা সম্ভব নয়। জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে গাড়ির কাছে এলে ড্রাইভার দরজা খুলে দেয়, তাওফিক ধূমপান করছেন দেখে গ্লাস খানিক নামিয়ে দেয়। জিজ্ঞেস করে, ‘স্যার, গ্রামের ভেতর যাব?’

‘না, তুমি মেইন রাস্তার দিকে ফিরে যাও।’

গাড়ি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে মহাসড়ক ধরে। এবার তাওফিক পেছনে বসেছেন। হঠাৎ কেন যেন মায়ের সেই কাজলদানিটার কথা মনে পড়ে। আর মনে পড়ে মায়ের স্নেহমাখা সদাসতর্ক মুখখানা। মা সহজে তাঁকে চোখের আড়াল করতেন না। মায়ের কাজলের টিপ প্রহরী হয়ে থাকত বদনজরের। বাঁশহাটিয়ায় কপালে ওই টিপ মুছে গিয়েছিল বলেই তাঁর ওপর নজর পড়েছিল শকুনের। ওদের চিহ্নিত করা যায় না, কারণ শকুনগুলো সব দেখতে এক রকম।

তাওফিক জানেন, ড্রাইভার দু-এক মিনিটের মধ্যেই জিজ্ঞেস করবে, কোন দিকে যেতে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁর আসলে আর কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না। রাস্তার দুপাশে চলমান দৃশ্যে চোখ রেখে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে, দুই চোখের কোনায় জমেছে অশ্রুবিন্দু। খুব মনে পড়ছে মাকে। মায়েরা কেন দূরে থাকে—কেন মরে যায় মা—কেন মুছে যায় কাজলের টিপ! সতচল্লিশ বছর বয়সী তাওফিকের চেহারায় অসহায়ত্ব আর ভয়ের গভীর এক ছায়াপাত ঘটে—একটি অবোধ নিরুপায় শিশুর মতো।