অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান
অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

গল্প

তন্দ্রাভরা জাহাজ

জিগাতলা পোস্ট অফিস থেকে লোকটা আবার ল্যাংচা মেরে মেরে আসছে। কদিন ধরেই আসছে। হেঁটে আসে না, যেন ভেসে আসে। মুখটা আমিনুলের মতো। তবে আমিনুল হলে হয়তো এত কথা বলত না। কেননা আমিনুল যখন ভাবত, ‘দেশের অবস্থা ভালো নয়’, কিন্তু সেটা তার পক্ষে বাইরে গিয়ে বলা সম্ভব ছিল না, কেবল রানুকেই সে কথাটা বলতে পারত। আমিনুল হলে হয়তো এভাবে বসে থাকত না। সে ঘরে গিয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবত আর লিখত। তাকে যে আবিষ্কার করেছে, তার বাড়ি বয়ে এসে মামলা ঠুকতে চাইত না।

সে এসে বসার ঘরে বসে থাকে। বইপত্র ওলটায়। যে বই খুলে ধরে, সেটার পাতা ওলটায় না, এক জায়গায় আঙুল রেখে তাকিয়ে থাকে। আজ সে পড়ছে নিরাপদ তন্দ্রা। সে বোধ হয় হিরন যে কাদার মধ্যে আটকে আছে, সেখানেই নিজের স্যান্ডেলসমেত আটকে আছে। চা দিলে চা ঠান্ডা করে খায়। সর পড়ে যায় ততক্ষণে। তারপর ঢকঢক করে খায়। খোয়া বিস্কুটগুলো পর্যন্ত ত্যানা হয়ে যায়। ছোঁয় না।

বারান্দার টিয়া পাখিটা কৌতূহলী হয়ে তাকায়। পাখা ঝাপটায়।

লোকটা রোজ একবার করে বলে, বটু ভাই, আমার গল্পটা তো শেষ করলেন না।

আমি কিছু বলি না। কী বলব? গল্প কি শেষ হয়? একবার লেখা গল্প কি লেখকের হাতেও আর থাকে? আমার সব গল্পই তো শেষ হয়ে গেছে মনে হয়। বানিয়ে বানিয়ে কিছু লিখতেও পারি না কোনোকালে। মাটির জাহাজ? জীবন আমার বোন? সব জীবন থেকে নেয়া একটি জহির রায়হান চলচ্চিত্র! হা হা হা!

আমার দুনিয়াটা আরেকটু সুন্দর করা যেত না ভাই? আমি তো কবি মানুষ। সুন্দরের সাধক। আপনিই তো বলেন বটু ভাই। বলেন, আপনি নিজেও কি কখনো কবিতা মকশো করেন নাই? আমি উত্তর দিই না। কাগজের মানুষকে কী উত্তর দেব?

লোকটা বলে, বুঝলাম, আমি হয়তো গুন্ডার হাতে মারাও পড়তে পারতাম। কিন্তু স্বর্গে তো চলে যাইনি। তাই বলে নরকেও তো থাকতে চাইনি। আমার দুনিয়াটা আরেকটু সুন্দর করা যেত না ভাই? আমি তো কবি মানুষ। সুন্দরের সাধক। আপনিই তো বলেন বটু ভাই। বলেন, আপনি নিজেও কি কখনো কবিতা মকশো করেন নাই?

আমি উত্তর দিই না। কাগজের মানুষকে কী উত্তর দেব? জানালা দিয়ে তাকাই। রিকশার টুংটাং। ফেরিওয়ালা পচা সাবান হাঁক দেয়। মানুষ হাঁটে। কত বছর ধরে আছি। এখন আর কাউকে চিনি না। নতুন নতুন মানুষ। পুরোনো মানুষগুলোরও খোমা বদলে গেছে।

লোকটা আবার বলে, দিদির সাথে দেখা হওয়া বন্ধ না করলে হয়তো ওকে জয়নাল মাস্তানের হাত থেকে বাঁচাতে পারতাম। নাকি নগদ কিছু কাঁচা পয়সা ট্যাঁকে গুঁজে আপনা ভাই–ই তুলে দিল ওর হাতে? মদ বেচা মানুষ আরা কত ভালো হয়? ঘাড়ের বোঝা ফেলে দিয়েছে সুট করে।

তারপর হঠাৎ কী মনে পড়তে বলে, ভাই, মদ খাওয়ার টাকা নাই। হাতটা উপুড় করেন। গাঁজার জন্য দুটো পয়সা দেন না। আপনাকে ফেলে খাব না। একলা মানুষ কি প্রসাদ খাওয়া চলে?

টাকা দিলাম। দিলাম মানে, নিরাপদ তন্দ্রার ৪১ আর ৪২ পৃষ্ঠার ফাঁকে রাখলাম। কাগজের টাকা। প্রসাদ বলে কথা!

২.

এখন আর তাসমেন জুয়েলার্সে বসি না। ভাইয়েরা মিলে ব্যবসা সামলায়। মাসে একটা মাসোহারা দেয়। এই হলুদ বাড়িটায় থাকি। জিগাতলা বাজারের পাশে। গিন্নি মারা গেলেন। সবাই বলছে পুরান ঢাকায় ফিরে যেতে।

সে চলে গেলে ঘরটা ফাঁকা লাগে না। বরং ভিড়ভাট্টা লাগে। রঞ্জু আসে। আবদুল খালেক আসে। পিচ্চি অনুটাও আসে। ম্যানেজার কেরামত আসে কিন্তু দেখা দেয় না। আড়ালে থাকে। আরও কে কে আসে। খোকা ভাই আর আসবে না। সবার নাম মনে নেই। চেহারা চিনলেও নাম ভুলে গেছি। বইয়ের তাকে উইপোকা ঝুনঝুন করে। ঘুস ঘুস করে।

কত দিন বায়তুল মোকাররমে যাই না। এখন আর তাসমেন জুয়েলার্সে বসি না। ভাইয়েরা মিলে ব্যবসা সামলায়। মাসে একটা মাসোহারা দেয়। এই হলুদ বাড়িটায় থাকি। জিগাতলা বাজারের পাশে। গিন্নি মারা গেলেন। সবাই বলছে পুরান ঢাকায় ফিরে যেতে। লালবাগ নাকি আজিমপুর যেতে হবে, মনে পড়ছে না। ঠিকানাটা হাতে পেলে চলে যেতে পারব। কিন্তু এই বাড়ি ছেড়ে কীভাবে অন্য কোথাও যাওয়া সম্ভব?

বটু ভাই লেখা ছেড়ে দিয়েছে—সবাই বলে। আমি অস্বীকার করি। লেখা কেউ ছাড়ে নাকি? লেখা ছেড়ে দিলে পরে এই লোকগুলো আসত না। আনোয়ার আসত না। রানু আসত না। জামশেদ আসত না। লিখি মাথার ভেতরে। কাগজ–কলম নিয়ে বসি না, এ–ই যা। তবে হ্যাঁ, লেখা ছেড়ে যায় লেখককে। ওরা আসে। বসে। কথা বলে। অভিযোগ করে।

গামবুট আনোয়ারের পরিণতির গল্পটা আমি আমিনুলের ভবিতব্যের প্রতীক বোঝাতে ফেঁদেছিলাম কি না, এই প্রশ্নটা সে করে। আরে বাবা, যা দেখেছি তা–ই তো লিখেছি। বানিয়ে কিছু লিখতে পারলাম কবে?

অগত্যা আমি মাথা নাড়ি। সে মানে না। বলে, আমি বুঝি। আরও কত লেখকের বই–ই তো পড়ি। লেখকেরা কী লিখে কী বোঝাতে চায়, তার একটা ফর্মুলা আছে। জনৈক অভিজ্ঞ পাঠকের চোখ ফাঁকি দেওয়া যায় না। কিন্তু রানুকে কোথায় নিয়ে ফেললেন? আমার চুলে বিলি কেটে দেবে না আর? না হয় পুরোটা চেয়েছিলাম। সে বিশ্বাস রাখতে পারেনি—আমি হয়তো বিয়ে করার সাহস করব না।

তারপর আমিনুল আমার চোখে চোখ রেখে বলে, এ তো বড় অবিচার।

প্রকাশক বন্ধু এসে ঈদসংখ্যার যে কাহিনিটা ঘষামাজা করে বই করতে বলল, তাতেও আমি গা করিনি। করিনি মানে একেবারেই যে করিনি তা নয়, আমি সব কটি চরিত্রকে খুন করেছি। ভ্রূণেই। রানুকেও। আমিনুলকেও।

৩.

লোকে বলে আমি বড় সাহিত্যিক। সমালোচকেরা বলেন—বাংলাদেশে আছে ইলিয়াস আর বটু। বটু আর ইলিয়াস। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর মাহমুদুল হক বটু—শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক। হাসি পায়। আমরা কি গামা নাকি গোবরবাবু? কুস্তিগির নাকি ভার উত্তোলন করি? বক্সার মোহাম্মদ আলী আর জো লুই?

আমার একটা গল্প লিখে বই ছাপতে লাগে দশ বছর। ষোলো বছরও লাগে। আর রাতকাবারি নভেল লিখিয়েদের বই সকালবেলায় বাংলাবাজারের দপ্তরি এসে নিয়ে যায়। শুক্কুর শুক্কুর আষ্টো দিনে ছেপে বই বেরোয়। রংচঙা কভার। ইদ্রিস কম্পোজিটরের কথা বলে কথা!

আমারও দোষ আছে। লিখে ফেলে রাখি। ভুলে যাই। নিজেই পড়লে আর আনন্দ পাই না। তাই হেলা করি। ফেলে রাখার শাস্তি দিয়েছে মফিদুল। ‘পাতালপুরী’র গল্পটা কেটেছেঁটে ছাপিয়ে ঈদসংখ্যা তো মুখ রক্ষা করল। পরে হারিয়েই ফেললাম আসল গল্পটা। মানে মাথা থেকে হারিয়ে গেছে। ওই নিউজপ্রিন্টে ছাপা কাগজগুলো আর কোনো অর্থ বহন করে না।

মফিদুল তাগাদা দেয়। পাতালপুরীর গল্পটা ছাপবে। সম্পাদনা করে, মেদ–মাংস লাগিয়ে বড় করতে হবে। মানে পূর্ণাঙ্গ করে দিতে হবে। আরে, দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে একটানে কী লিখেছিলাম, তা আর মনে আছে?

আমার তো কোনো কাস্টোডিয়ান নেই। গল্পটা আধাখেঁচড়া। কোন চরিত্র কেন বানিয়েছিলাম, কে কেন এই ভাষায় কথা বলছে, কে কোথা থেকেই–বা এসেছে, কিচ্ছু মনে পড়ে না। লিখব যে—আমি এই বইয়ের ভাষাটাও তো আর রপ্ত করতে পারছি না। আমার একেক বইয়ের গল্পের ভাষা একেক রকম। সবাই জানে। বই ছেপে পাঠককে ঠকিয়ে কী লাভ? নিজেকেই–বা কী করে ঠকাই?

কিন্তু আমিনুল তো বিচার নিয়ে এসেছে। রানু তো বসে আছে বাজারের চায়ের দোকানটায়। জামশেদ জানালায় মুখ গলিয়ে রেখেছে। অরুণিমা দিদি ছাদের ঘরে বসে আছে।

সমালোচকেরা বলেন—বাংলাদেশে আছে ইলিয়াস আর বটু। বটু আর ইলিয়াস। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর মাহমুদুল হক বটু—শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক। হাসি পায়। আমরা কি গামা নাকি গোবরবাবু? কুস্তিগির নাকি ভার উত্তোলন করি?

৪.

জিগাতলার হলুদ বাড়িতে বসে পেপার পড়ি। আজ ৩১ মার্চ ১৯৮১। সাবের ভাইয়ের মৃত্যুর দশ বছর। শহীদ সাবের। দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী।

সাবের ভাইয়ের কথা ভাবলেই মাথার ভেতর একটা চক্কর লাগে। হু হু করে কোথায় যেন। উনি লিখতেন। আমার গুরু। ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলে পড়ি। উনি পড়ান। আমি তখন একটু–আধটু লিখিটিখি। তখন তিনি লেখা ছেড়ে দিলেন। মানসিকভাবে এলোমেলোমি। মাঝেমধ্যে জ্ঞানের নাড়ি টনটনে মার্কা লেখা লিখেও ফেলেন এক–দুই স্লিপ। এখানে–ওখানে থাকেন। মাঝেমধ্যে দৈনিক সংবাদ অফিসের টেবিলে ঘুমান। আমিও ছিলাম কিছুদিন, সংবাদেই। সাবের ভাইকে সবাই দেখত। খেতেটেতে দিত। যুদ্ধের প্রথম হপ্তাতেই সংবাদ অফিসে আগুন দিল। সাবের ভাই আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেলেন। ফিনিস। কয়লার টুকরা দেখে আজরাইল ফেরেশতাও কেঁদে ফেলল।

আমিও সেই থেকেই পুড়ছি কি না!

মুন্সিগঞ্জে যেতে হবে। নৌকায় বেড়ালে শরীর–মন ফুরফুরে হয়। নদীর ঘাটেই শ্যানেল শাহ বাবার ডেরা। মুন্সিগঞ্জে নাকি নরসিংদী? হবে একটা। বাবার প্রসাদ নিতে হবে। বাবার প্রসাদ নিলেই সাবের ভাইয়ের কথা বেশুমার মনে পড়ে।

তারপর সব এলোমেলো হয়ে যায়। পাতালপুরীর গল্পটা আরও হিজিবিজি লাগে।

ঘুম পায়।

জাহাজভর্তি ঘুম।

এই জাহাজটা কোথায় যাচ্ছে, জানি না।

৫.

জামশেদ বলে, আমার শেষটা বদলান। আমার বউ কেন গলায় দড়ি দেবে। আমি তো বাড়ি ফিরছিলামই। রাতবাহিনী আমার বাড়ি ঘিরে রাখত। একদিন তো ঠিকই আসতাম। আমি বলি, আমি এখন আর লিখি না। নতুন সংস্করণের সুযোগ নেই।

ঘুমের মধ্যে দেখি—আমি জাহাজের পাটাতনে। এটা কি তৃতীয় শ্রেণি? চারপাশে আমার সব চরিত্র। কেউ আর আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে না। এক ম্যাজিশিয়ান ছুরি দিয়ে হাত কেটে চামড়ার ব্যাগ থেকে মলমের টিউব বের করে মলম লাগাচ্ছে। ওই মলমটাই তিন টাকা করে বিক্রি করছে। ম্যাজিক দেখতে দেখতে ওরাও আমাকে ভুলে গেছে—আমিনুল আর ওর পাতালপুরী গ্রুপ বাদে। প্রথম শ্রেণির কেবিন থেকে দুজন মেয়ে বেরিয়ে এসে আড়ালে দাঁড়িয়ে ম্যাজিক দেখছে। এই মেয়ে দুটো গয়না কিনতে আসত।

আমিনুল (আনোয়ার না তো!) বলে, নামবেন না?

আমি বলি, একটা শুকনা জায়গা দেখান।

রানু বলে, আপনি তো আমাকে নামতেই দিলেন না।

জামশেদ বলে, আমার শেষটা বদলান। আমার বউ কেন গলায় দড়ি দেবে। আমি তো বাড়ি ফিরছিলামই। রাতবাহিনী আমার বাড়ি ঘিরে রাখত। আসতে পারতাম না। একদিন তো ওদেরকে কেউ খেলে দিত। একদিন তো ঠিকই আসতাম।

আমি বলি, আমি এখন আর লিখি না। নতুন সংস্করণের সুযোগ নেই।

ওরা বিশ্বাস করে না। আমাকে ভণ্ড ভাবছে। মিথ্যুক ভাবছে।

‘কলিকালের ভণ্ড বাবার চ্যালা!’—কোথা থেকে যেন কোরাস ভেসে আসে। মিউজিকও আছে। টুনটুন টুনটুন টুনটুন টুন!

জাহাজ দুলছে। তন্দ্রা বাড়ছে।

আমি ঘাম দিয়ে উঠি।

৬.

ভোরে টিয়া পাখিটা ডাক দেয়। আমি উঠে বসি। দানাপানি দিতে হবে।

টেবিলে কাগজ–কলম।

কিছু লিখব কি না, জানি না। নাছোড়বান্দা এক ছোকরা ইন্টারভিউর প্রশ্নমালা রেখে গেছে। পিরিচ চাপা দেওয়া চিরকুট আছে একটা।

বাইরে জিগাতলার রাস্তা। মানুষ হাঁটে। বলেছি তো, কাউকে চিনি না।

কিন্তু আমি জানি, এই তন্দ্রাভরা জাহাজ থেকে নামা যাবে না।

লেখা ছাড়লেও আমিনুল, রঞ্জু কিংবা আবদুল খালেক আমাকে ছাড়ে না।

আমিনুল আবার আসে। ঠান্ডা চা সুড়ুৎ করে খায়। নিরাপদ তন্দ্রার ৪৪ নম্বর পৃষ্ঠার গ্লাস ফ্যাক্টরিতে বসে থাকে।