অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গল্প

পুনরাগমন

জানালার ফোকর গলে প্রতিদিন যে ঘোলাটে আলোটা ঘরের ভেতরে গড়িয়ে নামে, সেটা আজ সকালে খুব ধারালো হয়ে মশারির বুক চিরে বের হয়ে গেছে। আজকের এই ভিন্ন আলোয় অনেকটা আয়োজন করেই ঘুম ভাঙল খায়রুনের। মশারির জালের দেয়াল ভেদ করে বহু বছর পর ঘরের ভেতরের দিকটায় কৌতূহলী দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। ক্ষুধার্ত মানুষ যেভাবে একগ্রাসেই পুরো খাবারটা খেতে চায়, খায়রুনের দৃষ্টিতে ঠিক সে রকমই আকাঙ্ক্ষা। বহু বছরের ঘোলাটে, কুয়াশাচ্ছন্ন জগৎ থেকে বের হয়ে এই প্রথম তীক্ষ্ণ আর স্পষ্ট জগতে চোখ মেলেছে ষাটোর্ধ্ব খায়রুন।

ঘরটার আসবাব সে রকমই আছে, কেবল দেয়াল আর ছাদের ফাটলগুলো আরও গভীর আর মারাত্মক হয়ে উঠেছে। এটাকে অবশ্য সেই অর্থে শোবার ঘর বলা যাবে না, বরং ভাঁড়ারঘর বললেই মানানসই হয়। ঘরের একদিকে বাড়ির যত সব অকেজো জিনিসপত্র স্তূপ করে রাখা আর আরেক দিকে ছোট একটা চৌকি, একটা মিটসেফ আর একটা টেবিল। দেয়ালের এক কোনায় পুরোনো আয়না ঝুলে আছে, ধুলো জমা আয়না, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে বহু বছর তাতে কেউ মুখ দেখে না।

অনেকটা তাড়াহুড়া করেই বিছানা থেকে নামল খায়রুন। অভ্যাসবশতই মাথার পাশের টেবিলের কোনায় রাখা চশমাটা তুলে নিল। অসংখ্য দাগ পড়া ভারী লেন্সগুলোকে যে মোটা কালো ফ্রেম ধরে রেখেছে, সেই ফ্রেমের একটা ডাঁট অনেক আগেই ভেঙে গেছে। এই ভাঙা চশমাই অনেক দিন তার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল। পাশে রাখা বাক্স থেকে নতুন চশমাটা বের করে, খুব যত্ন করে ভাঙা চশমাটা সেই বাক্সে রাখল খায়রুন। জীবনের কম হলেও ত্রিশ বছর এই চশমা দিয়েই পৃথিবী দেখেছে সে। কত অসংখ্য মুহূর্তের কান্নার জল এটার কাচ ধুয়ে গাল বেয়ে নেমে গেছে, তার হিসাব নেই খায়রুনের কাছে। সেই নির্ভরশীল সঙ্গীরও প্রয়োজন আজ ফুরিয়েছে। আজ খায়রুন নতুন চশমা পেয়েছে আর চোখের ছানি কাটিয়ে পেয়েছে নবীন দুটি চোখ। চোখের ছানির অপারেশন করে গতকাল রাতেই ফিরেছে বাড়িতে। অনেক বছর পর সকালের প্রখর রোদের মতো পৃথিবীটা তাই আজ তার কাছে এত স্পষ্ট, এত ঝলমলে।

নতুন আর পুরোনো চশমার হিসাব-নিকাশ মেলাতে মেলাতেই ধুলোর প্রলেপ পড়া আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। শাড়ির আঁচল দিয়ে আয়নাটা পরিষ্কার করে নিজেকে দেখল খায়রুন আর নিজের অজান্তেই আঁতকে উঠল। আয়নায় যাকে দেখা যাচ্ছে, সে-ই কি সত্যিকারের খায়রুন, খায়রুন সুন্দরী!

নতুন আর পুরোনো চশমার হিসাব-নিকাশ মেলাতে মেলাতেই ধুলোর প্রলেপ পড়া আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। শাড়ির আঁচল দিয়ে আয়নাটা পরিষ্কার করে নিজেকে দেখল খায়রুন আর নিজের অজান্তেই আঁতকে উঠল। আয়নায় যাকে দেখা যাচ্ছে, সে-ই কি সত্যিকারের খায়রুন, খায়রুন সুন্দরী! নিজের চেহারা এত পরিষ্কারভাবে দেখা হয়নি অন্তত দশ বছর। এই দশ বছরেই সে এতটা বুড়িয়ে গেল! গোলগাল মুখটা শুকিয়ে এমন অবস্থা যে ওপরের পাটির দাঁতগুলো যেন ঠেলে বের হয়ে আসবে মুখের ভেতর থেকে। চোখের নিচের, নাকের দুপাশের আর গলার চামড়া অনেকটাই ঝুলে পড়েছে আর সামনের চুল উঠে গিয়ে পোড়া কপালটা বিশালাকৃতি হয়ে গেছে।

নিজেকে দেখে এত বড় ধাক্কা খেল খায়রুন, ঠিক আঠারো বছর আগের ধাক্কাটার মতো। সিদ্ধার্থের কথা জানা থাকলে, সে নিজেই বুঝত এই কয়েক সেকেন্ডের অনুধাবন খুব সাধারণ কিছু নয়, এই অনুধাবন গৃহত্যাগী। গৃহত্যাগী অবশ্য খায়রুন হয়েছে সেই দেড় যুগ আগেই। নিজের বুড়িয়ে যাওয়া চেহারাটা দেখে প্রথমেই সেই বাড়ি ছাড়ার কথা মনে হলো তার। বাড়ি ছাড়ার ইচ্ছাটা আবার পেয়ে বসল তাকে।

নিজেকেই নিজে বলে উঠল, যে মুখ আর কোনো দিন কাউকেই দেখাতে চাইনি, সে মুখ তো এই মুখ না। সে মুখের মৃত্যু হয়েছে কত আগে, সেটার হিসাব খায়রুনের কাছে নেই। অতীতের কথা মনে হতেই প্রথম চোখে ভেসে উঠল আট বছরের মেয়েটার মুখ, যাকে সে ফেলে রেখে এসেছিল, যার চেহারা মনে করে এত বছর চোখের পানিতে চশমার কাচ ভিজিয়েছে। সেই শিশুর মুখও তো আর সে রকম নেই, এখন তো সে তরুণী! মেয়েটা এখন দেখতে কেমন হয়েছে? এই প্রশ্ন মাথায় আসতেই, একে একে অন্য সব সন্তানদের চেহারা ভেসে উঠল খায়রুনের চোখে। নিজের জীর্ণ চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঝল, মৃত্যু কাছাকাছি কোথাও হয়তো ঘাপটি মেরে বসে আছে। মৃত্যুর আগে অন্তত একবার সন্তানদের দেখার জন্য বুকের ভেতরে হু হু করে উঠল। বুকের ওপর যেন চেপে বসল ভারী পাথর, হঠাৎ দম বন্ধ হয়ে এল।

সন্তানদের দেখার ইচ্ছাটা এতটাই অদম্য হয়ে উঠল যে হাঁটুর ব্যথা উপেক্ষা করে একছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদে যাবার সিঁড়িগুলো প্রায় দৌড়েই পার হলো সে। ছাদের এক কোণে বসে সুর করে ঝুঁকে ঝুঁকে পুঁথি পড়ছে রাহেলা বেওয়া। যতটা দ্রুত ছুটে এসেছিল, ঠিক ততটাই ধীর পায়ে খায়রুন ঠিক তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। মনের সবটুকু সাহস জড়ো করে ডাকল, ‘বু, ও বু...’

খায়রুন অন্য কিছু বললে হয়তো রাহেলা বেওয়ার প্রতিক্রিয়া অন্য রকম হতো। কিন্তু, ‘বাড়ি যাব’, এই শব্দ দুটো এত অচেনা হয়ে রাহেলা বেওয়ার কানে লাগল, সে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে খায়রুনের দিকে তাকিয়ে থাকল। এ এত বছরে অসংখ্যবার খায়রুনকে সে কাঁদতে দেখেছে। কিন্তু কখনোই বাড়ি যাবার কথা মুখে তোলেনি।

রাহেলা বেওয়া এই বাড়ির মালিক। আঠারো বছর ধরে খায়রুনই তার ছায়াসঙ্গী, আবার তাকেই সবচেয়ে ভয় পায় খায়রুন। খুব বড় কিছু না হলে সকালের এই সময়ে রাহেলা বেওয়াকে অযথা কেউ বিরক্ত করার সাহস দেখায় না। মনের সব শক্তি এক করে খায়রুন এবার গলায় আরেকটু জোর দিয়ে ডাকল, ‘ও বু...’

পুঁথি পড়া বন্ধ করে পেছনে ফিরল রাহেলা বেওয়া। পুঁথির কাপড় জড়াতে জড়াতেই কড়া গলায় প্রশ্ন করল, ‘কী সমস্যা?’

‘আমার জিও ক্যামবা করিচ্ছে, বাড়ি যাব বু’, ফুপিয়ে কেঁদে উঠল খায়রুন।

খায়রুন অন্য কিছু বললে হয়তো রাহেলা বেওয়ার প্রতিক্রিয়া অন্য রকম হতো। কিন্তু, ‘বাড়ি যাব’, এই শব্দ দুটো এত অচেনা হয়ে রাহেলা বেওয়ার কানে লাগল, সে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে খায়রুনের দিকে তাকিয়ে থাকল। এ এত বছরে অসংখ্যবার খায়রুনকে সে কাঁদতে দেখেছে। ভাত খেতে বসে, টিভি দেখতে দেখতে, রান্না করতে করতে, ঘরের অন্য সব কাজ করতে করতে সুর করে ইনিয়ে–বিনিয়ে কেঁদেছে খায়রুন। কিন্তু কখনোই বাড়ি যাবার কথা মুখে তোলেনি। অনেকবার রাহেলা বেওয়া আর তার ছেলেমেয়েরাই তাকে বলেছে, বাড়ি ফিরে যেতে। খায়রুন রাজি হয়নি।

খায়রুনের মুখের দিকে তাকিয়ে আঠারো বছর আগের এ রকমই এক সকালে ফিরে গেল রাহেলা বেওয়া। চারদিকে কেবল সকালের আলো ফুটেছে। বাড়ির বেশির ভাগ মানুষ তখনো ঘুমে, এমন সময় কর্কশ শব্দে বেজে উঠল কলিং বেল। রাজ্যের সব বিরক্তি নিয়ে রাহেলা বেওয়া নিজেই সদর দরজা খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে অচেনা এক নারী, বয়স চল্লিশের মতো, শক্তসমর্থ। চেহারায় অযত্ন আর ক্লান্তির ছাপ, তবু একটা শোভা আছে। রাহেলা বেওয়াকে দেখেই ভিক্ষার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল নারীটি।

নিজের স্বভাবসুলভ গম্ভীর স্বরে চিৎকার করে উঠল রাহেলা বেওয়া, ‘লজ্জা করে না তোমার? জোয়ান মানুষ, কাজ করে খেতে পারো না?’

রাহেলা বেওয়াকে অবাক করে কান্নায় ভেঙে পড়ল খায়রুন। রাহেলার হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে ধরে দরজার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। হেঁচকির মতো শব্দ করে কাঁদতে কাঁদতে কোনোরকমে বলল, ‘তুমি একটা কাজ দাও বু, কাজ প্যালে কাজ ক্যোরাই খামু।’

সেদিন থেকেই খায়রুনের আশ্রয় হয়েছে এই বাড়ির ভাঁড়ারঘরে। তারপর পেরিয়ে গেছে আঠারোটা বছর। এই বাড়ির সঙ্গে সঙ্গে সে বৃদ্ধ হয়েছে, জীর্ণ হয়েছে। এ বাড়ির দেয়ালের ফাটলের মতো খায়রুনের চেহারায় পড়েছে বলিরেখা। রাহেলা বেওয়া নিজেও বৃদ্ধ হয়েছে, তার পিঠ বেয়ে সাপের ফণার মতো নেমে যাওয়া সাদা-কালো চুলের গোছা এখন পুরোটাই সাদা হয়েছে। দুই হাতে সেই চুলের গোছা খোঁপা করতে করতে রাহেলা এই প্রথম নরম চোখে তাকাল খায়রুনের দিকে।

একটা ছোট্ট বাক্যে কথা শেষ করল, ‘ঠিক আছে, কাল পাঠিয়ে দেব।’ এই কাল শব্দটা এত ভারী হয়ে মনের ওপর চেপে বসল খায়রুনের যে সারাটা দিন, সারাটা রাত গত দেড় যুগের সমান দীর্ঘ হয়ে ঝুলে থাকল মাথার ওপর। রাতে দুই চোখের পাতা একবারের জন্যও এক করতে পারল না সে। যখন বাড়ি ছেড়েছিল, তখন জীবন যত অনিশ্চিত ছিল, এই আশ্রয় ছেড়ে বের হলে জীবনটা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে, সেই আশঙ্কাও হলো মনে। তবু বাড়ি খায়রুনকে ফিরতেই হবে। একেই হয়তো বলে ডাক আসা।

গনগনে দুপুরে ট্রেন গিয়ে যখন থামল ফুলবাড়ি স্টেশনে, অনেকটা ঘোরের মধ্যে টলতে টলতে খায়রুন প্ল্যাটফর্মে পা রাখল। চারদিকে সবকিছুই অপরিচিত। বাড়ি ছেড়ে যে পথে স্টেশনে এসেছিল, সে পথ আর চিনে বের করতে পারল না সে। বাড়ি ছাড়া যতটা সহজ ছিল, বাড়ি ফেরা ততটা সহজ হলো না।

এ বাড়িতে ঠিক যেভাবে কাঁদতে কাঁদতে ঢুকেছিল খায়রুন, পরদিন সেভাবেই কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিল। রাহেলা বেওয়া, তার ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের জন্য মনের মধ্যে আজ যে হাহাকার, ঠিক আঠারো বছর আগে নিজের সন্তান আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য এই হাহাকার নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিল খায়রুন।

শহরের বুক চিরে ট্রেন ছুটে চলছে গ্রামের দিকে, খায়রুন সুন্দরীর ফুলবাড়ির দিকে। যে পথে শহরে এসেছিল, সে পথেই আজ সে বাড়ি ফিরছে। কিন্তু এত বছরে সবকিছুই পাল্টে গেছে, পথের কিছুই চিনতে পারছে না খায়রুন। পথের কথা মনে হতেই স্টেশন থেকে বাড়ি ফেরার পথের একটা অবয়ব তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সে পথের শেষেই যে বড় বটগাছ, যেটাতে ফাঁস নিতে গিয়ে শরীর শিউরে উঠেছিল খায়রুনের। ফাঁসিতে ঝোলার সাহস তার সেদিন হয়নি, তবে ঘর ছেড়ে সেই পথ ধরে স্টেশনে আসার সাহস জোগাড় করেছিল সে।

পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে মোটামুটি সচ্ছল সংসার ছিল খায়রুনের, মোটামুটি সুখী দাম্পত্য জীবনও ছিল। বড় মেয়ে আর বড় ছেলের বিয়েও দিয়েছিল। এর মধ্যেই একদিন সতিন সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে হাজির স্বামী। বয়স চল্লিশের কোঠায় হলেও তখনো খায়রুন যথেষ্ট লাবণ্যময়ী। গ্রামের লোক তাকে চিনতই খায়রুন সুন্দরী বলে। সেই খায়রুন সুন্দরীর স্বামীই বিয়ে করে ঘরে তুলেছে তার চেয়ে অন্তত বছর চারেকের বড় সতিনকে। মুহূর্তেই খবরটা গ্রামে ছড়িয়ে গেল। যতটা না সতিন আনার খবর, তার চেয়ে হাস্যরসের খবর হলো, বয়সে বড় সতিন আনার ব্যাপারটা।

দুপুর গড়িয়ে রাত হতে হতে বিষয়টা এমন পর্যায়ে গেল যে খায়রুনের সন্তানেরাও তাকেই সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন বাড়ি বয়ে এসে বলে গেল, ‘বেয়ানের দোষ না থাকলে এমনিতেই কি বেয়াই এ রকম বয়স্ক মহিলা বিয়ে করে আনে!’

সারা দিনের কোলাহল, টিটকারি, অপমান—সব শেষ হলে সবাই যখন ক্লান্তি নিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে, খায়রুন তখন বের হয়ে এসেছে বাড়ি ছেড়ে। নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করেছে, এই মুখ আর কাউকেই দেখাবে না সে। একবার গিয়েছিল পুকুরে ঝাঁপ দিতে, আরেকবার বাড়ির পেছনের ভুতুড়ে বটগাছটায় ফাঁস নিতে। সাহসে কুলায়নি তার। অনেকক্ষণ হতবিহ্বল বসে থেকে পা বাড়িয়েছিল স্টেশনের দিকে। সকালে যখন শহরে নেমেছে, তখন স্টেশনের ভিক্ষুকেরা যে যার এলাকায় ভিক্ষার জন্য যাওয়া শুরু করেছে। এ রকম একটা দলের সঙ্গেই খায়রুন গিয়ে দাঁড়ায় রাহেলা বেওয়ার বাড়ির দরজায়।

গনগনে দুপুরে ট্রেন গিয়ে যখন থামল ফুলবাড়ি স্টেশনে, অনেকটা ঘোরের মধ্যে টলতে টলতে খায়রুন প্ল্যাটফর্মে পা রাখল। চারদিকে সবকিছুই অপরিচিত। বাড়ি ছেড়ে যে পথে স্টেশনে এসেছিল, সে পথ আর চিনে বের করতে পারল না সে। বাড়ি ছাড়া যতটা সহজ ছিল, বাড়ি ফেরা ততটা সহজ হলো না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত একটা ভ্যানে চেপে বসল সে।

চারদিকে খবর ছড়িয়ে গেল। বড় মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এসেছে, ছেলেরা বাজারের দোকান বন্ধ করে বাড়িতে ছুটে এসেছে। কান্নার আওয়াজে চারদিক ভারী হয়ে উঠেছে আর এর মধ্যেই মেয়েরা কাঁদতে কাঁদতে কয়েকবার মূর্ছাও গেছে। তাদের কান্না আর আহাজারির শব্দে যে কেউ ভাবতে পারে, এ বাড়িতে কেউ মারা গেছে।

বাড়ির পেছনের রাস্তায় গিয়ে ভ্যানটা থামল। ভ্যান থেকে নেমে কেমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল খায়রুন। সম্পূর্ণ অচেনা আরেকটা জগতে যেন চলে এসেছে। শুধু বটগাছটাই তেমনই আছে, যেমন আগেও ছিল। গাছের নিচে দাঁড়ালে পেছনের ঘরের বারান্দাটা স্পষ্ট দেখা যায়। সেখানে বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। তরুণীকে চিনতে পারল না খায়রুন। একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করতে লাগল। ততক্ষণে তরুণীটি খায়রুনকে দেখে ফেলেছে।

প্রথমে চোখাচোখি হতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য কিছুটা বিভ্রান্ত দেখাল মেয়েটিকে। এরপর ‘ও মারো’ বলে চিৎকার করে বাড়ির দিকে দৌড়ে যেতে গিয়ে বাচ্চা নিয়ে হুড়মুড় করে পড়ে গেল, জ্ঞানও হারাল। বাচ্চার কান্নার শব্দে বাড়ির ভেতর থেকে আরেক নারী বাইরে এসে খায়রুনকে দেখে থমকে গেল কিছুক্ষণের জন্য, তারপর ‘ও মারো’ বলে চিৎকার দিয়ে খায়রুনের বুকে এসে আছড়ে পড়ল। একটু সময় লাগলেও তরুণীদের চিনতে ভুল হলো না খায়রুনের। এরা তার মেজ আর ছোট মেয়ে। যাদের বারো আর আট বছর বয়সে রেখে বাড়ি ছেড়েছিল একদিন, এখন তারাও সন্তানের মা।

মুহূর্তে চারদিকে খবর ছড়িয়ে গেল। বড় মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এসেছে, ছেলেরা বাজারের দোকান বন্ধ করে বাড়িতে ছুটে এসেছে। তাদের কান্নার আওয়াজে চারদিক ভারী হয়ে উঠেছে আর এর মধ্যেই মেয়েরা কাঁদতে কাঁদতে কয়েকবার মূর্ছাও গেছে। তাদের কান্না আর আহাজারির শব্দে যে কেউ ভাবতে পারে, এ বাড়িতে কেউ মারা গেছে। মেয়েরা একবার চিৎকার করে কাঁদে, আরেকবার মায়ের কাছে ক্ষমা চায়। কখনো মাকে আদর করে আবার পরমুহূর্তেই মায়ের গলা টিপে মারতে যায়।

গতকাল সকালে সন্তানদের জন্য যে ব্যাকুলতা ছিল তার মনে, সেই বিশাল আবেগের ঢেউ হঠাৎ পুকুরের পানির মতো স্থির হয়ে গেছে। এত শান্ত, এত স্থির তার মন গত আঠারো বছরে এক দিনও ছিল না। ছেলেমেয়েদের মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে তাদের শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে গেল খায়রুন।

সব উত্তেজনা যখন কিছুটা থিতু হয়ে এসেছে, তখন চোখ মুছতে মুছতে ছোট মেয়েটা খায়রুনকে প্রশ্ন করল, ‘আব্বা কো?’

যে মানুষটার অপমান সহ্য করতে না পেরে একদিন ঘর ছেড়েছিল, এতক্ষণ পর এই প্রশ্ন শুনে তার কথা মনে পড়ল খায়রুনের। খুব স্বাভাবিকভাবেই শান্ত গলায় বলল, ‘কো তুমাদের আব্বা? সে কি আমি অ্যাসেছি বুল্যা আর বাড়িত অ্যাসপে না?’

খায়রুনের প্রশ্ন শুনে ছেলেমেয়েরা অবাক হয়ে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে বলল, ‘আব্বা তুমাক খুঁজতে পরদিন সকালেই বাহির হলো। আমাদের বুল্যা গেল, তুমাকে না লিয়ে আর বাড়িত ফিরবেই না।’

কথাটা শুনে বুকের ভেতর এমন ছ্যাত করে উঠল খায়রুনের, যেন ঠান্ডা একটা ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে বুকে। ভ্যাবাচেকা খেয়ে বটগাছের পাশ দিয়ে যে পথ স্টেশনের দিকে গেছে, সেদিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল খায়রুন, যেন কেউ এক্ষুনি এ পথে বাড়ি ফিরবে।

পাথর হয়ে বসে থাকা খায়রুনের দুই বাহু ধরে ঝাঁকি দিল ছোট মেয়েটা, চিৎকার করে প্রশ্ন করল, ‘আমার আব্বা কো? আমার আব্বাক না লিয়া তুমি ফিরল্যা ক্যান?’