স্বপ্নে গল্প অযৌক্তিক হয়, বিচ্ছিন্ন হয় আর তাই তা আমাদের কাছে অধরা থেকে যায় এবং উঁকি দিতে দিতে মিলিয়ে যায়। বুঝিয়ে বলি, আমার জানালা থেকে কিছু দূরের একটা দালান দেখা যায়, সবচেয়ে ওপরের তলায় একজন মানুষের ছায়া দেখা যায়, মাঝেমধ্যে সেই ছায়াটা বারান্দায় দাঁড়ায়, হাঁটাহাঁটি করে, আলোর বিপরীতে অন্ধকার সেই আবছা অবয়বটা দেখতে আমার ভালো লাগে; কিন্তু একদিন কেউ এসে আলো জ্বেলে দেয়, ছায়াটা মানুষ হয়ে ওঠে, জাদুটা ভেঙে যায়। স্বপ্ন এমন নয়, সেখানে কেউ আলো জ্বালতে পারে না, তাই হয়তো স্বপ্ন দেখতে আমি ভালোবাসি কিংবা এ–ও হতে পারে কিছুক্ষণের জন্য একটা অবাস্তব জীবনযাপন করতে পারাটা আমাকে আনন্দ দেয়।
এই যেমন, আমি এখন একটা স্বপ্নের ভেতর, এতক্ষণ ইফেসাসের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, টিকিট কাউন্টার ছিল, অস্পষ্ট চেহারার টিকিট চেকার ছিল, তবু চল্লিশ ইউরোর টিকিট না কেটে নিজেকে আবিষ্কার করলাম ইফেসাসের সীমানার ভেতরে, স্বপ্নের এই অসীম স্বাধীনতাই আমাদের কল্পনা ও বাস্তবতা ছাপিয়ে একটা অধরা গল্প তৈরি করে নেয়।
স্বপ্নে অবশ্য ইফেসাস দেখার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। দুবছর আগে এসেছিলাম এখানে। তুর্কির পশ্চিমে একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন শহর ইফেসাস, যার পরতের পর পরত তৈরি করে গেছে লিডিয়ান, পারসিয়ান, গ্রিক আর রোমানদের মতো নানান সভ্যতা, চলেছে দখল আর পাল্টা দখল; কিন্তু মাটির নিচে চলে যাওয়ার কারণে যার আশি ভাগই উদ্ধার করা হয়নি এখনো। এখানে-ওখানে সাদা পাথুরে কিছু কাঠামো, কিছু মসৃণ রাস্তা, মূর্তি, ভাঙা মন্দির, ময়দান, এই তো! একবারের বেশি দেখার কিছুই নেই। তবে পাথরগুলো নিয়ে আমি ভেবেছিলাম। দিন যায়, রাত যায়, বছর যায়—এরা অনড় পড়ে থাকে। আমি এমন কিছু পারি না বলে পাথরগুলোকে হিংসা করেছিলাম। লিখব লিখব করে ইফেসাস নিয়ে কিছু লিখেও উঠতে পারিনি। কিন্তু কী এক অজানা কারণে আজকে রাতে ইফেসাসই হয়ে উঠেছে আমার অবচেতনে ঢোকার রাস্তা!
স্বপ্নটা পুরোপুরি লুসিড নয়, আমি বুঝতে পারছি স্বপ্ন দেখছি তবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য না। ধ্বংসস্তূপ মৃত্যুভয়ের রূপক তাই বাকি সব আমার ভয়সংক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, আপাতত এই তথ্যটা মাথায় রেখে আমি পা বাড়ালাম।
এমনিতে ইফেসাসে উত্তর দক্ষিণ দুই দিক দিয়েই ঢোকা যায়; তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা যেহেতু দক্ষিণ দিকের তাই দক্ষিণ দিক থেকেই আমাকে এগোতে হচ্ছে। প্রচুর মানুষ আসছে এখন, কারও চেহারাই বোঝা যাচ্ছে না। সামনে হাঁটতে থাকা ছেলেটাকে দেখে অবশ্য আমি চিনতে পারলাম।
তুমি শান্ত না? গত বছর ছাত্র আন্দোলনে তোমার নিহত হওয়ার খবরগুলো দেখে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।
হু দা হেল ইজ শান্ত! আমি ডিফেন্সের লোক।
গত বছর তুমি গণ-অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছ, তোমাকে নিয়ে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় গ্রাফিতি আছে, তুমি তোমার বন্ধুদের সাহায্য করতে করতে শহীদ হয়ে গেলে, আহা। পার্মানেন্ট মেমোরিতে আছ বলেই শুধু তোমার চেহারাটা এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ওহ, বলাই হয়নি, তুমি বেঁচে নেই, আমি তোমাকে স্বপ্ন দেখছি।
ছেলেটা রেগে গেল কিন্তু পকেট থেকে হাত না বের করে বলল, দেখুন, অনেক কষ্ট করে আমার বাবা আমাকে আপনার স্বপ্নের একটা প্রক্সি আইটেম হিসেবে উপস্থিত হতে বড় করেনি। আমি ব্যক্তিগত ট্যুরে আছি নয়তো স্বপ্নে হাজত কেমন, তা বুঝিয়ে দিতাম।
ছেলেটা তার পকেট থেকে ঝাপসা কিছু বের করেছে, যা অস্ত্রও হতে পারে আবার আইডি কার্ডও হতে পারে। আমি হতাশ কণ্ঠে বললাম, তাহলে এটা দুঃস্বপ্নই হতে যাচ্ছে! আমার হয়তো নাক বন্ধ কিংবা হাত–পা ঠিক পজিশনে নেই, বালিশ থেকে মাথা পড়ে গেলেই স্লিপ এপনিয়া হয় আমার।
হুট করেই দৃশ্য বদলে গেছে, আমি একা দাঁড়িয়ে আছি। ছেলেটা কোথায় যেন চলে গেছে! আমি ইফেসাস ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। এখানে অনেক কিছু আছে সীমানা ছাড়া, যার মাথামুণ্ডু বোঝার উপায় এখন আর নেই, ফলকে ফলকে বিস্তর লেখা আছে, সবই প্রায় ভাঙাচোরা। আমার সামনে এখন যেটা দেখতে পাচ্ছি, এটা ওয়াটার প্যালেস ছিল, যাকে বলা হতো হাইড্রো-ডোকিহন। এটা একটা সুসজ্জিত রিজরভার ছিল, মাঝখানে সমুদ্রের দেবতা নদীর দেবতা আর সামুদ্রিক জীবদের মূর্তি ছিল, ওগুলো সব মিউজিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর মাঝখানের বর্গাকার জায়গাটায় যে পাথরের সারি সারি কলাম দাঁড়ানো, এটা স্টেট আগোরার ধ্বংসাববেষ। এখানে কেনাবেচা হতো, ব্যবসা হতো।
এরপরের কাঠামোগুলো পাবলিক বাথের টুকরোটাকরা। মানে শহরে কেউ ঢুকেই যাতে পরিষ্কার হয়ে নিতে পারে, তাই প্রবেশমুখেই ছিল গোসলের ব্যবস্থা, শুধু তা–ই না, জিমও ছিল। রোমানরা শরীরচর্চায় বাতিকগ্রস্ত ছিল। পুরো শহরের অনেক জায়গায় এগুলো ছিল।
এবার আমি সামনের অক্ষত ছোট অডিটরিয়ামের দিকে একটু দ্রুতই ছুটে গেলাম। একে বলা হতো অডিয়ন, অড শব্দ থেকে অডিয়ন, মানে মূলত গীতিকাব্যের পসরা বসত এখানে, আবৃত্তি হতো, অবশ্য রাজনীতি নিয়েও সভা হতো, দার্শনিকেরাও বক্তৃতা দিত। আমি একটা সিঁড়িতে বসলাম। বাস্তবে এখানেই আমার একটা ছবি আছে। চারদিকে তাকিয়ে ভালো লাগল। বসন্তকালই হবে, এমন সময়েই এসেছিলাম কি না।
ব্রো, আপনার কাছে পানি হবে?
ছেলেটা আবার এসেছে, কিন্তু এবার তার হাবভাব নিরীহ ছাত্রের মতোই। যদিও আমি একজন নারী তবে তার ব্রো বলে সম্বোধন করাটা আমাকে আরাম দিল। নারী-পুরুষ সরলীকরণ করা হচ্ছে স্বপ্নটায়।
এতক্ষণ আমার কাছে পানি ছিল না; কিন্তু আবিষ্কার করলাম আমি তাকে একটা ব্যাগ খুলে পানি দিচ্ছি। আমি হাসলাম আর ছেলেটা কাঁদতে শুরু করল, তার মনে হচ্ছে তার শরীরে গুলি লেগেছে, কিন্তু কোথায় লেগেছে, তা সে বুঝতে পারছে না। কান্না থামিয়ে সে এবার জিজ্ঞেস করল, ব্রো, আমি তো আন্দোলনে ছিলাম, অনেকের মতো আমিও কি মারা গেছি? এটা কি হেভেন না হেল?
এটা একটা স্বপ্ন, যেখানে একটু আগে তুমি বলে গেছ তুমি ছাত্র নও।
না, না! আমি ছাত্রই; তবে চিরকালীন ছাত্র, আমার বাবা বলেছেন কখনো বড় হবি না, চাকরি করবি না, আজীবন ছাত্র থাকবি, পড়াশোনা শেষ হলেই মেরুদণ্ড বিক্রি করে চাকরি করতে হয়, বাবাকে নাকি তাই করতে হয়েছিল।
তা ঠিক, আমিও একজন মেরুদণ্ড বিক্রি করা মানুষ। মেরুদণ্ড বিক্রি না করে বেঁচে থাকা আসলেই কঠিন।
তাই বুঝি আমি বেঁচে নেই, ছেলেটা হতাশ মুখে বলল।
ঠিক তা না, যেতে তোমাকে একদিন হতোই, জীবন হচ্ছে পিলো পাসিং খেলার মতো, মানুষ তার জীবন পাস করে যাবেই। এখন তুমি তোমার জীবন একবারে দিয়ে গেছ বন্ধুদের জন্য আর আমারটা একটু একটু করে দিচ্ছি সংসারে-সন্তানে, এই যা। তবে প্রসেস যত স্লো, সাফারিং তত বেশি।
ম্যাক সেন্স, কিন্তু ব্রো আমার মনে হচ্ছে এটা মান আরাফাহ। বেহেশত আর দোজখের মাঝামাঝি জায়গা। তা ছাড়া স্বপ্ন কি এমন গোছানো হয়? এত যৌক্তিক কথাবার্তা থাকে?
হয়তো, এই যে হচ্ছে, তবে সমস্যাটা হচ্ছে ঘুম থেকে উঠে আমরা বেশির ভাগ ভুলে যাই। আমাদের হিপোকাম্পাস তখন অ্যাকটিভ কম থাকে, তাই ঘটনাগুলো লং টার্ম মেমোরিতে ইনক্লুড করে না। আমাদের ছিটেছুটোই মনে থাকে। আর এটা যে একটা স্বপ্ন তার একটা প্রমাণ দিই। চারদিকে তাকিয়ে দেখ, ইফেসাসে মোট চব্বিশটা দর্শনীয় স্থান আছে; কিন্তু দেখ অনেক জায়গাই খালি, বোঝাই যাচ্ছে দশের কম হবে। কেন জানো?
কেন?
কারণ ওইটুকুই আমি মনে রেখেছি। আমার স্মৃতির বাইরে তুমি এখানে একটা চুলও পাবে না।
আই সি।
শান্ত, এসব বাদ দাও তো, আমার স্বপ্নে যখন চলেই এসেছ, চল, আমরা এফিসাস শান্তিপূর্ণভাবে ঘুরে দেখি। আমি এখন তোমাকে নিয়ে যাব রোমানদের গণ শৌচাগারে। যেখানে অনেক লোক একসঙ্গে মলমূত্র ত্যাগ করত। অনেক ট্যুরিস্ট এখানে ওই ভঙ্গিতে ছবি তোলে।
ছি!
শুধু তা–ই না, এখানে পলিটিকসের আলোচনাও হতো।
হেহে। শান্ত শব্দ করে হাসল।
জায়গাটা তেমন কিছু না এখন। একটা বড় কামরা যেখানে সারি সারি কমোড বসানো। শান্ত দ্রুত বের হয়ে এল। আমার অপরাধ বোধ হলো, তাই আমি তাকে পা চালাতে চালাতে বললাম, এবার সোজা কুরেতেস স্ট্রিটে চল তোমাকে লাভ হাউসে নিয়ে যাই।
লাভ হাউস! শান্তর চোখ চকচকে।
মানে তখনকার পতিতালয়ের ভদ্র নাম।
ছি! শান্ত আবার বিরক্ত হলো।
হারকিউলিস গেট পার হয়ে আশপাশে নানান মাথা ভাঙা মূর্তি পার করে আমি শান্তকে রাস্তার মাঝে খোদাই করা একটা পায়ের ছাপ দেখালাম আর একটা কিম্ভূতদর্শন মেয়ের ছবিও দেখালাম।
দেখলে, এটা হলো ইতিহাসের প্রথম থ্রিডি বিজ্ঞাপনের একটা, এই পায়ের ছাপ মানে এখান দিয়ে যেতে হয় লাভ হাউস।
জানি না কেন, লাভ হাউসে না গিয়ে আমরা চলে এসেছি আর্তিমিসের মন্দিরে, যা কিউরেতেসের রাস্তায় না, একটু দূরে। আমার অবচেতনের মাতব্বরিতে আমি বিরক্ত হয়ে শান্তকে বললাম, থাক লাভ হাউস দেখে কী করবে, এর চেয়ে এটা দেখ, এটা আর্তিমিসের মন্দির মানে দেবী ডায়ানার সম্মানে বানানো, আর্তিমিস বা ডায়ানা প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবী। ইফেসিয়ানরা বিশ্বাস করত ডায়ানা এখানেই জন্ম নিয়েছিল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, যেখানে রোমান আর গ্রিকরা ডায়ানাকে শিকারের দেবী হিসেবে মানত, সেখানে ইফেসিয়ানরা উর্বরতা, মাতৃত্ব আর পশুপাখির জননী হিসেবে দেখত, মানে এককথায় প্রাচুর্যতার দেবী, জীবন বৃদ্ধির দেবী। এই মন্দির এত সুন্দর ছিল বলে এটা প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটা। একনাগাড়ে কথাগুলো বলার পর খেয়াল করলাম, শান্ত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। সে বলল, কী দেখব!
জায়গাটার দিকে তাকিয়ে মনে পড়ল আসলে এখানে এখন দেখার কিছু নেই, পুরো জায়গাটা খালি, মাঝখানে শুধু একটা কলাম কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে, যার মাথায় আবার একটা পেলিকান বাসা বেঁধে, সম্ভবত ডিম পেড়ে বসে আছে। আমি অসহায়ের মতো যুক্তি খুঁজতে লাগলাম, এটা একটা দুঃস্বপ্ন, শান্ত। দুঃস্বপ্নের কাজ আমাদের সম্ভাব্য হুমকি ও বিপদের ব্যাপারে সাবধান করে দেওয়া, মানসিকভাবে সচেতন করা। মনে হচ্ছে আমার অবচেতনের গভীরে গেঁথে থাকা অস্তিত্বজনিত দুশ্চিন্তা ছিল এই জায়গাটা ঘিরে।
শান্ত বাকিটা শুনতে আগের মতোই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে, আমার মস্তিষ্ক জায়গাটা আমাকে আবার দেখাতে চাইছে সাবধান করতে যে আমাদের অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে আছে, দেখাতে চাইছে কীভাবে প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটা আশ্চর্যজনকভাবে খালি হয়ে যায়, একটামাত্র খুঁটি পড়ে থাকে আর তার ওপর একটি বাদামি পেলিকান আশ্চর্য সব ডিম পেড়ে গর্বিত ভঙ্গিতে তা দেয়...
শান্ত হাসি আটকানোর চেষ্টা করল আর আমি চেষ্টা করলাম হাসতে।
আমি এখন মার্বেল রোডের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা লাইব্রেরি অব সেলসাসের ভেতর। এটা রোমানদের প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত লাইব্রেরির একটা। স্থাপত্যে রোমান ও গ্রিক দুই ধরনের ছাপই আছে দালানটায়। দুইতলা ভবন। সামনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, গুণ আর অন্তর্দৃষ্টির চমৎকার চারটা গ্রিক দেবীর মূর্তি আছে। টাইবেরিয়াস সেলসাসের সমাধি আছে কোথাও। ১২০০ স্ক্রল ছিল একসময়, এখন কিছু নেই, এখন এর ভেতরের বর্তমান খালি জায়গাটায় আমি আরও কিছু ছাত্রের সঙ্গে পরীক্ষা দিচ্ছি। আশপাশে শান্ত নেই। কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে আমাকে। প্রথমটা, লাইব্রেরি অব সেলসাস কীভাবে ধ্বংস হলো? অনেক ধারণা আছে এ নিয়ে, কেউ বলে ভূমিকম্পে, কেউ বলে গথদের হামলায়। প্রশ্নের উত্তর দেব কিন্তু আমার কলমে কালি আসছে না। পরীক্ষার সময় চলে যাচ্ছে। আমি সবার কাছে কলম চাইছি কেউ শুনতে পাচ্ছে না।
লাইব্রেরি অব সেলসাস থেকে হঠাৎ সবাই একসঙ্গে বের হয়ে পালাচ্ছি। শান্তকে হঠাৎ পাশে পেলাম। কেন পালাচ্ছি বোঝার জন্য দাঁড়াতেই দেখতে পেলাম গ্রিক দেবীর মূর্তিগুলো কিছু লোক ভাঙছে।
শান্তর চোখে ভয়। আমি তাকে সাহস দিলাম—
আরে এগুলো সত্যি না, আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার রেপ্লিকা। চল সোজা মার্বেল রোডের দিকে যাই, দ্য বাথ অব স্কলাসটিকা নামে একটা ভাস্কর্য দেখাব, এখন অবশ্য মহিলাটার মাথা ভাঙা, মাথা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
আমরা সাবধানে মানুষ এড়িয়ে হাঁটছি। বেশ কোলাহল আর উত্তেজনা মানুষজনের মধ্যে। ওখানে গ্র্যান্ড থিয়েটার কাছাকাছি যেতেই বোঝা গেল চোর ধরা পড়েছে, জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে পিটুনি দিচ্ছে; শুধু এক জায়গায় না গ্র্যান্ড থিয়েটার পঁচিশ হাজার মানুষ জায়গা দেওয়ার মতো বড়, দেখা গেল সেখানে অন্তত দশ–বারো জায়গায় এমন গণপিটুনির আয়োজন করা হয়েছে। আমরা ভিড় এড়িয়ে বাঁ দিক দিয়ে এগোতে থাকলাম; পাছে আবার কেউ আমাদের গণপিটুনি দেওয়া শুরু করে, দুঃস্বপ্নে সবই সম্ভব। আহা! শান্তকে দেখানো হলো না কী চমৎকার একটা আর্ট, দ্য বাথ অব স্কলাসটিকার মূর্তিটাও ভাঙতে মানুষ চলে এসেছে।
শান্ত অবাক হয়ে বলল, ব্রো, ইট ডাজন্ট ম্যাক সেন্স, মনে হচ্ছে সবাই বাংলাদেশি। তুমি না বললে ইফেসাস না যেন কী!
আমি লজ্জা পেয়ে বললাম, সরি, কিছু মনে করো না, স্বপ্নটা মনে হচ্ছে শেষের দিকে, দ্রুত শেষের দিকে যেতে থাকলে এমন হয়, তবে এটা গোঁজামিল ভেবো না, স্বপ্ন স্বাধীন, এখানে বাংলাদেশ থেকে তুর্কিতে মব করতে মানুষ চলে আসাটা অস্বাভাবিক কিছু না।
শান্ত কিছু বলল না, তবে আমার হাত ঝাঁকি দিয়ে আকাশে আঙুল তুলে দেখাল, এটা কি আকাশে আগুনের গোলার মতো?
ওহ ওটা! কি আর, আমার মনের অমূলক ভয়, এস্টরয়েড বা কমেটজাতীয় কিছু হবে হয়তো কিংবা এলিয়েনদের আক্রমণও হতে পারে—এসব আবার আমি খুব পড়ি। এই যেমন থ্রি আই এটলাস, ওমুয়ামুয়া...
আরে ব্রো, জিনিসটা মনে হচ্ছে নেমে আসছে আর এটা তো বাচ্চাদের ওপর পড়বে! শান্তর আঙুল অনুসরণ করে আমি দেখলাম কিছু দূরে স্টাডি ট্যুরে আসা একদল শিশু মাটিতে গোল হয়ে বসে আছে। একজন শিক্ষক তাদের কিছু বোঝাচ্ছে। নেমে আসতে থাকা আগুনের গোলা নিয়ে তাদের যেন কোনো মাথাব্যথা নেই।
শান্ত চিৎকার করে উঠল, সর্বনাশ, বাচ্চাগুলোকে সরাতে হবে। সে দৌড় দেবে দেবে আর আমি তার শক্ত করে ধরলাম, কিছুই হবে না। আমার স্বপ্নে আমার সন্তান আর আমার পোষা পাখিটা প্রায়ই বিপদে পড়ে। আমার যখন মনে হয় আমি তাদের হারিয়ে ফেলব কিন্তু ঠিক এই সময় আমি মেনে নিতে পারি না। স্বপ্নেও আমার মাতৃত্ববোধ সজাগ হতে থাকে, স্বপ্নটা পুরো লুসিড হয়ে যায়, মানে আমি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিই আর কাহিনি ঘুরে যায়। প্রশ্ন যখন শিশু, ওরা আমার স্বপ্নে ঠিক বেঁচে থাকবে।
শান্ত তবু আমার হাত থেকে ছুটে শিশুদের কাছে যেতে ছটফট করছে।
আমি বেশ অস্বস্তি বোধ করলাম, মনে হচ্ছে আমি আমার বেঁধে রাখা শরীর ছাড়াতে চেষ্টা করছি, কোনো একভাবে স্বপ্নকে চাপ দিচ্ছি আর আবিষ্কার করলাম দৃশ্য একেবারেই পাল্টে গেছে, শান্ত নেই। আমি ইফেসাসের বাইরে একদল শিশুর সঙ্গে এজিয়ান সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে আছি, প্রচুর বাতাসে সবার চুল উড়ছে। আমি বাচ্চাদের বললাম, বাচ্চারা, এই সমুদ্রের নাম কী?
সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, এজিয়ান।
এজিয়ান সাগরের পানির রং কী?
এজিয়ান ব্লু!
এত জোরে চিৎকার করল শিশুগুলো যে আমার কান ব্যথা করে উঠল।
রাত তিনটা:
কানব্যথা নিয়ে ঘুম থেকে উঠলাম, কান ভাঁজ হয়ে বালিশের সঙ্গে সেঁটে ছিল। প্রায় রাতেই এমন কিছু না কিছু হয় আর লম্বা লম্বা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায়, বেশির ভাগ ভুলে যাই, তবে মনে হচ্ছে সকালেও এই স্বপ্নটা মনে থাকবে, বোঝাই যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ একটা স্বপ্ন, শুরুটা যদিও ঝাপসা...
সকাল, সাতটা পনেরো:
অ্যালার্ম বাজেনি। এখন আমাকে রান্নাঘরে দৌড়াতে হবে। রাতে অনেক স্বপ্ন দেখেছি, ওই, যেমনটা দেখি প্রায়ই কিন্তু কী যেন দেখেছি, কী যেন! ও হ্যাঁ, শুরুটা হাবিজাবি, মনে রাখার মতো না, বেশ জটিল, শেষের দিকে আকাশ থেকে আগুন নামছিল, কিছু বাচ্চা ছিল, কিছুটা দুই নাম্বারি করেছিলাম, তবু তো শিশুগুলো বেঁচেছিল!