অলংকরণ : এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ : এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

রম্য গল্প

এলিয়েন গরু

মকবুল সাহেব হতভম্ব হয়ে গরুর ব্যাপারীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। লোকটা রসিকতা করছে বলে মনে হলো না। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, লোকটা তাঁর সামনেই তাঁর মতো গরু কিনতে আসা আরও দুজনকে ওই একই পরামর্শ দিল।

কিন্তু পরামর্শটা কী?

পরামর্শটা এ রকম: ‘স্যার, আপনি যে ট্যাকা নিয়া আইছেন গরুর হাটে, তাতে আপনার এই ঈদে গরু কেনা হইব না... এর চায়া এক কাজ করেন (এই পর্যায়ে সে গলা নামিয়ে ফেলে আরেক ধাপ) আপনে বাজার থাইকা পাঁচ কেজি গোস্ত কিইনা লন। আর কসাইয়ের কাছ থাইকা একটা গরুর চামড়া কিইনা লন, ব্যস, ঈদের দিন নামাজ
পইড়া আইসা ওই চামড়া ভিজায়া বাইরে টাঙ্গায়া দিবেন; সবাই বুঝব, আপনার কোরবানি হয়া গেছে...!’

মকবুল সাহেব যখন মন খারাপ করে ফিরছিলেন, তখনই লোকটার সঙ্গে দেখা। পোশাক-আশাকে বেশ স্মার্ট। তাঁকে দেখে এগিয়ে এসে বলল, ‘আঙ্কেল, গরু কিনতে এসেছিলেন নিশ্চয়ই?’

‘হ্যাঁ’

‘কেনা হলো না দামের জন্য, তা–ই তো?’

‘তা–ই।’

‘চলুন, আমি আপনাকে গরু কিনে দিচ্ছি।’

মকবুল সাহেব ভেতরে ভেতরে সতর্ক হয়ে গেলেন। এ নিশ্চয়ই গরুর দুই নম্বর দালাল, নতুন কোনো ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেবে। ঈদের আগে আগে এ সময় নানা রকম ধান্দা থাকে মানুষের। লোকটা যেন তার কথা বুঝতে পারল; বলল, ‘আঙ্কেল, আপনি যা ভাবছেন, তা নয়। আমি ঠিক গরুর দালাল নই। আপনাকে সত্যি কথাটাই বলি। একটা গরুর চালান এসেছে টাইফাস গ্রহ থেকে।’

‘মা-মানে?’

‘হ্যাঁ। বিশ্বাস না হওয়ার মতোই ঘটনা। প্রায় দশ লাখ আলোকবর্ষ দূরের এই গ্রহ, টাইফাস গ্রহ, পৃথিবীর মতো পরিবেশবান্ধব গ্রহ। সেখান থেকে একটা ইউএফওতে করে গরুর চালান এসেছে। এলিয়েন গরু বলতে পারেন। তবে একদম আমাদের দেশের গরুর মতোই... হুবহু। নামমাত্র মূল্যে ছেড়ে দিচ্ছি। এই ধরেন, আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দিলেই চলবে। লাখ টাকার গরু মাত্র পাঁচ হাজার টাকায়, বুঝতে পারছেন?’

মাইক্রোবাস এসে থামল একটা নির্জন জায়গায়। আশপাশে ধু ধু ফাঁকা মাঠ, পেছনে একটা পাহাড়ের মতো দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের নিচে, যাকে বলে পাদদেশে, সত্যি সত্যি একটা ইউএফও দাঁড়িয়ে। সিনেমায় যেমনটা দেখা যায়, ঠিক সে রকম। ইউএফওর ওপরে একটা সবুজ লাইট জ্বলছে আর নিভছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তার আশপাশেই বেশ কিছু গরু দাঁড়ানো।

মকবুল সাহেব বুঝে গেলেন, তিনি এক মহা টাউটের পাল্লায় পড়েছেন। এখনই কেটে পড়তে হবে, নইলে তাঁর সব টাকা হাপিস হয়ে যাবে। কিন্তু বাই দিস টাইম লোকটা আরও দুজনকে ফিট দিয়ে ফেলেছে। তাঁর মতোই আরও দুজন গরু না কিনে হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়া পাবলিক এবং দেখতে দেখতে আরও দুজন। সংখ্যায় এখন তাঁরা পাঁচজন। মকবুল সাহেব বেশ বুঝতে পারছেন, লোকটা ভয়ংকর ধরনের টাউট। কিন্তু তিনি তাহলে চলে যাচ্ছেন না কেন?

লোকটা তখন বলে উঠল, ‘ব্যস, ব্যস, গুড এনাফ। আমরা পাঁচজন কাস্টমার পেয়েছি। পাঁচ হচ্ছে ফিবনাক্কি সংখ্যা...এতেই চলবে। চলুন।’

একটা ঝকঝকে মাইক্রো পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। তাঁরা সবাই উঠে পড়লেন। মকবুল সাহেব একফাঁকে লোকটাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, টাইফাস গ্রহের লোকজন হঠাৎ কেন পৃথিবীতে এই বাংলাদেশে গরুর চালান পাঠাল? একটু ব্যাখ্যা করবেন?’

‘আসলে এটা আন্তগ্রহ-নাক্ষত্রিক সৌহার্দ্যের একটা প্রজেক্ট।’

‘আপনি কীভাবে এখানে যুক্ত হলেন?’

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লোকটা চেঁচিয়ে উঠল, ‘এসে গেছি। এই, গাড়ি সাইড করো... নামুন আপনারা।’

মকবুল সাহেবের পাশের লোকটা ফিসফিস করে বলল, ‘এটা কোনো ট্র্যাপ নয় তো?

‘বুঝতে পারছি না।’

‘তবে আমরা দলে পাঁচজন আছি। তেমন দেখলে প্রতিরোধ করব। আমি তো রীতিমতো জিম করি, এই দেখেন বাইসেপ... প্রস্তুত থাকবেন।’

মাইক্রোবাস এসে থামল একটা নির্জন জায়গায়। আশপাশে ধু ধু ফাঁকা মাঠ, পেছনে একটা পাহাড়ের মতো দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের নিচে, যাকে বলে পাদদেশে, সত্যি সত্যি একটা ইউএফও দাঁড়িয়ে। সিনেমায় যেমনটা দেখা যায়, ঠিক সে রকম। ইউএফওর ওপরে একটা সবুজ লাইট জ্বলছে আর নিভছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তার আশপাশেই বেশ কিছু গরু দাঁড়ানো। দু–একজন ক্রেতাও দেখা যাচ্ছে, এরা মনে হয় আগেই এসেছে। গরুগুলো বেশ তাগড়া, উঁচা, লম্বা, সুন্দর। এই গরুর দাম লাখ টাকা না হলেই নয়।

‘মানে তুমি যে গরুটা কিনে এনেছ, সেটার সামনের দুই পায়ের মাঝখানে একটা অতিরিক্ত পা আছে। সেটা সে কীভাবে যেন ভাঁজ করে গলকম্বলের ভেতর লুকিয়ে রাখে। এতক্ষণ লুকোনোই ছিল, কেউ বুঝতেই পারিনি। এখন হঠাৎ সেটা বের করেছে। এই গরু কি কোরবানি হবে?’ হতভম্ব মকবুল সাহেব বাইরে এসে দেখেন, হ্যাঁ, তাঁর কেনা এলিয়েন গরুটাই। দিব্যি পাঁচ পায়ে দাঁড়িয়ে আছে।

‘নিন, এখন আপনারা যাঁর যাঁর গরু পছন্দ করুন। আর টাকাটা ... মানে পাঁচ হাজার টাকা ওই বাক্সে ফেলুন।’

একটা ফোল্ডিং চেয়ারের ওপর একটা বাক্স দেখা গেল। সেটার ওপরের অংশে টাকা ফেলার জন্য আড়াআড়ি করে কাটা।

‘আমি কি দুটো গরু নিতে পারি?’ একজন জানতে চায়।

‘পারেন। ওই পাঁচ হাজার করে দিতে হবে।’

আরও দু–একজন দুটো করে কিনল। একজন তিনটে কিনে ফেলল। মকবুল সাহেব অবশ্য একটাতেই সন্তুষ্ট থাকলেন। দেখতে দেখতে এলিয়েন গরু সব বিক্রি হয়ে গেল। তখনই ঝিঁঝি পোকার মতো একটা তীব্র শব্দ কানে এল । সবাই অবাক হয়ে দেখল, পাহাড়ের নিচ থেকে ইউএফওটা মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল।

... সন্ধ্যার দিকে ঘুমটা ভাঙল মকবুল সাহেবের। তিনি ধড়মড় করে উঠে বসলেন। যাক, তাহলে পুরোটাই স্বপ্ন ছিল। টাইফাস গ্রহ ... পাঁচ হাজার টাকায় এলিয়েন গরু কেনা—তা–ই কি হয় নাকি? এসব তো স্বপ্নেই হওয়ার কথা।

তখনই স্ত্রী ঘরে ঢুকলেন। চোখেমুখে বেশ একটা আতঙ্কের ভাব।

‘একটা সমস্যা হয়েছে।’

‘কী সমস্যা?’

‘তুমি খুব সুন্দর গরু কিনে এনেছ, সবাই খুব প্রশংসা করছিল, কিন্তু... কিন্তু... গরুটার না পাঁচটা পা!’

‘মা-মানে?’

‘মানে তুমি যে গরুটা কিনে এনেছ, সেটার সামনের দুই পায়ের মাঝখানে একটা অতিরিক্ত পা আছে। সেটা সে কীভাবে যেন ভাঁজ করে গলকম্বলের ভেতর লুকিয়ে রাখে। এতক্ষণ লুকোনোই ছিল, কেউ বুঝতেই পারিনি। এখন হঠাৎ সেটা বের করেছে। এই গরু কি কোরবানি হবে?’

হতভম্ব মকবুল সাহেব বাইরে এসে দেখেন, হ্যাঁ, তাঁর কেনা এলিয়েন গরুটাই। দিব্যি পাঁচ পায়ে দাঁড়িয়ে আছে।