আবদুল গফুরের বয়স ২৯ বছর হলো। বাপ বলল, ‘এইবার বিয়া কর।’
আবদুল গফুর বলল, ‘করব।’
বাপ বলে, ‘করব লয়, আষাঢ় মাসের মধ্যেই বিয়া করা লাগবে।’
এখন বৈশাখ।
আবদুল গফুর আবার বলে, ‘করব।’
বাপ বিরক্ত হয়ে বলে, ‘খালি করব করব করিস ক্যা?’
বাপের নাম আবদুল গাফফার মণ্ডল। রূপনগর টাউনের মাঝখানে এক বিঘা জমির ওপরে তার পাকা বাড়ি। বাড়ির দরজায় নকশা করে লেখা ‘গফুর কটেজ’। বাড়ির আঙিনা দখল করে আছে বিশাল এক ফজলি আমগাছ; প্রতিবছর আম দেয়, কোনো কোনো বছর প্রচুর পরিমাণে। আঙিনার পুব পাশে রান্নাঘর, রান্নাঘরের এক কোণে ডালিমগাছ। ডালিমগাছে ডালিম ধরে না। ফুল আসে, ঝরে যায়, ফল আর আসে না। বাড়ির পুব পাশে পুকুর। পুকুরে অনেক মাছ। পুকুরের পুব পাড়ে ঘন বাঁশঝাড়; তার মধ্যে পারিবারিক গোরস্থান, গোরস্থানে দিনরাত আবছায়া ও অন্ধকার; অন্ধকারে শিয়ালেরা ডাকে, জোনাকেরা থোকায় থোকায় জ্বলে, ভূত-পেতনিদের আনাগোনা চলে। পুকুরের বাকি তিন পাড় আম, জাম, কাঁঠাল, সফেদা, শজনে ও পেয়ারাগাছের দখলে। পেয়ারাগাছে দোয়েল পাখি গান গায়।
আবদুল গফুর গাফফার মণ্ডলের একমাত্র পুত্রসন্তান। অন্যগুলো কন্যা। কন্যাদের সংখ্যা নয়, তারা শ্বশুরবাড়ি থাকে। মাঝেমধ্যে বাপের বাড়ি আসার জন্য তাদের মন কাঁদে, কিন্তু তারা আসে না। কারণ, তাদের মা বেঁচে নাই এবং আবদুল গফুরের মা তাদের দুই চক্ষে দেখতে পারে না। বিমাতার বিমাতাসুলভ দুর্ব্যবহারে মেয়েগুলোর দুঃখ নাই। কারণ, তাদের ধারণা সৎমায়েরা খারাপই হয়ে থাকে। কিন্তু তারা দুঃখ করে এই বলে যে বাপটা তো আর সৎবাপ নয়, আপন বাপের অন্তরে কেন মেয়েদের জন্য এক রত্তিও মায়াদয়া থাকবে না। বাপ মেয়েদের বেড়াতে আসতে বলা দূরে থাক, তাদের কোনো খোঁজখবরই নেয় না, তাদের অসুখবিসুখ হলে দেখতে পর্যন্ত যায় না। সবচেয়ে বড় যে অবিচারটা সে করেছে, তা হলো মেয়েদের হক থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করা। বাপ ষাট বিঘা জমির মালিক, সে মরে গেলে মেয়েরা সেই জমির ভাগ পাবে—এই ভয়ে সব জমি হেবা করে লিখে দিয়েছে একমাত্র বেটা আবদুল গফুরের নামে।
আবদুল গফুর অবশ্য এই সমস্ত ব্যাপারে স্টোইক দার্শনিকদের মতো উদাসীন। বছরখানেক হলো সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিষয়ে এমএ পাস করেছে; এই ঘটনার সঙ্গে তার উদাসীন্যের কোনো সম্পর্ক আছে কি না তা বলা যায় না। এমএ পাস করে কেন সে বেকার বসে আছে, কেন চাকরির খোঁজে একটুও নড়াচড়া করে না, তা-ও বলা যায়। বাপ তার চাকরির কথা তুললে কেন সে বোবার মতো চুপ করে থাকে—এই প্রশ্নেরও কোনো উত্তর নাই।
ছেলে লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পায়নি, রূপনগর টাউনের মাঝখানে রেলগুমটির কাছে বাপের যে ভাতের হোটেল আছে, সেইটার হাল ধরেনি, টাউনের পুব ও দক্ষিণ পাথারে বাপের যেসব আবাদি জমি আছে, সেগুলোর তদারকিতে মন দেয়নি, কখনো দিবে এমন লক্ষণও প্রকাশ করেনি; ফলে গাফফার মণ্ডলের মনে বেজায় অশান্তি। ছেলেটা এ হেন অথর্ব হলো কেন, এই ভেবে তার আফসোসের শেষ নাই।
না। পড়া শ্যাস হলো, কিন্তুক চাকরি পালু না। হুটালত বসবার পারিস, তা-ও বসিস না। জমিজমা দেখা, তাও লয়। মতলবডা কী তোর, ক দিনি? ক তোর মতলব কী?’
‘কেছু লয়।’ আবদুল গফুর বাপের সঙ্গে সব সময় এ রকম শর্টকাটে কথা সারার চেষ্টা করে।
বাপ আরও খেপে ওঠে। ছটফট করতে করতে বলে, ‘কেছু লয় কী রে গরুডা? কেছু লয় কী? বয়েস কতটি হলো সে হিসাব আছে?’
গফুর নির্বিকার স্বরে বলে, ‘উনতিরিশ।’
বাপের পিত্তি জ্বলে যায়। বাপ চিৎকার করে বলে, ‘কেছুই কি তোর গাওত লাগে না? হামি মরে গেলে কী করে খাবু তুই?’
গফুর চুপ করে থাকে। বাপ আবার বলে, ‘ক, কী করে খাবু।’
গফুর বরাবরের মতো শান্ত ও নির্বিকার স্বরে বলে, ‘কেছু লয়।’
‘দূর হয়া যা হারামজাদা!’ হুঙ্কার দিয়ে ওঠে বাপ, ‘মোর চক্ষের আগ থ্যাকে দূর হয়া যা!’
আবদুল গফুর দূর হয়ে যায় না। চুপচাপ থাকে। খায়দায়, শুয়ে থাকে। শুয়ে শুয়ে চিন্তা করে। কী নিয়ে চিন্তা করে, বাপ তা জানার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। বাপ যখন জিজ্ঞাসা করে ‘কী লিয়ে এত চিন্তা করিস?’ কিংবা ‘এই বয়েসে কিসের এত চিন্তা?’ তখন গফুর চুপ করে থাকে। ছেলের উত্তর আদায় করার জন্য বাপের জেদ চেপে গেলে যখন সে বারবার বলতেই থাকে, ‘ক, কিসের এত চিন্তা? কওয়াই লাগবে, ক,’ তখন একপর্যায়ে ছেলে মুখ খোলে এবং নির্বিকারভাবে আবারও বলে ‘কেছু লয়।’ বাপ ‘দূর হয়া যা, হারামজাদা!’ বলে চিৎকার ছেড়ে নিজেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় পুকুরের পাড়ে। আর ছেলে যায় বন্ধুদের আড্ডায়।
তাদের মা বেঁচে নাই এবং আবদুল গফুরের মা তাদের দুই চক্ষে দেখতে পারে না। বিমাতার বিমাতাসুলভ দুর্ব্যবহারে মেয়েগুলোর দুঃখ নাই। কারণ, তাদের ধারণা সৎমায়েরা খারাপই হয়ে থাকে। কিন্তু তারা দুঃখ করে এই বলে যে বাপটা তো আর সৎবাপ নয়। আপন বাপের অন্তরে কেন এক রত্তিও মায়াদয়া থাকবে না।
আড্ডার জায়গা একটা দোকান। দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা : ‘ফরমান অটো হাউস’। দোকানের মালিক আবদুল গফুরের অন্যতম বাল্যবন্ধু এমডি ফরমান আলি।
ফরমান অটো হাউসে মোটরসাইকেলের খুচরা যন্ত্রাংশ, হেলমেট, অকটেন, পেট্রল, মবিল ইত্যাদি বিক্রি হয়। আশপাশে মোটরসাইকেল মেরামতের অনেকগুলো গ্যারেজ, দিনমান কাজকর্মের বিরাম নাই। ফরমানের ব্যবসাপাতি সারা বছরই ভালো। তাই সব সময় তার খোশমেজাজ। দোকানটা ছোট, কিন্তু ফরমান মোটেও ছোটলোক নয়, বরং দিলদরাজ বন্ধুবৎসল স্মার্ট যুবক। তার বউ সুন্দরী, মেয়ের বয়স পাঁচ বছর। ফরমান আলি রোটারি ক্লাবের নেতা, স্যুট-টাই পরে মিটিং করে। উপরন্তু, রূপনগরের আমলা, উকিল প্রমুখ অভিজাত নাগরিকদের ওয়াইফেরা যখন পুষ্পপ্রদর্শনীর আয়োজন করে, তখন ফরমান তাদের দিকে সর্বপ্রকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
আবদুল গফুরের স্কুলজীবনের বন্ধুদের অনেকে ইতিমধ্যে দেশের প্রথম শ্রেণির নাগরিক। এক গন্ডা ডাক্তার, একজন আর্মি অফিসার, এক বন্ধু বড় ব্যবসায়ী, বিদেশে আলু আর কলা রপ্তানি করে, আর একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রনেতা ছিল, এখন চট্টগ্রামে কোরিয়ানদের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ইন্ডাস্ট্রি খুলেছে, আর একজন রাশিয়ায় পড়তে গিয়ে পুরোদমে ব্যবসায়ী বনে গেছে। রূপনগরে যারা রয়ে গেছে, তারাও কেউ বেকার বসে নাই। একজনের ভুসি মালের ব্যবসা জমজমাট। একজন ঠিকাদারি করছে। একজন ওষুধ ব্যবসায়ী। একজন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে শহীদুল্লাহ অ্যাসোসিয়েটস-এ মোটা বেতনে চাকরি করছে; একজন এনজিও খুলেছে। যারা ডাক্তার হয়েছে, তাদের একজন নিজেই ক্লিনিক খুলে বসেছে, পটাপট রোগীদের পেট কাটছে আর টাকা বানাচ্ছে।
অর্থাৎ আবদুল গফুর একাই শুধু গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়, বন্ধুদের আড্ডায় চুপচাপ বসে থাকে, আর কী যেন ভাবে। কী ভাবে তার বন্ধুরা জানে না।
আবদুল গফুর খুবই সাধারণ মানুষ। তার স্বভাব-চরিত্রে এমন একটাও গুণ বা দোষ নাই যা উল্লেখ করার যোগ্য। মানুষটা ছোটখাটো, মাত্র পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। গায়ের রং মোটামুটি কালো, চেহারা এমন সাধারণ যে নজরেই পড়ে না। চলে-ফেরে ধীরে ধীরে, যেন তার জীবনে কোনো কিছুতেই কোনো তাড়া নাই। কথা ও বলে আস্তে-ধীরে, নিচু স্বরে আর আঞ্চলিক টানে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও সে রূপনগরের আঞ্চলিক টানে কথা বলত। এ নিয়ে তার সহপাঠীদের কেউ কেউ টিটকারি করত, কিন্তু সে লজ্জা পেত কি না, বিচলিত হতো কি না, কিংবা রেগে যেত কি না, কেউ তা বুঝতে পারত না।
আবদুল গফুর খই খাচ্ছে আর রহস্যপত্রিকা পড়ছে। পিয়ন এসে চিঠি দিয়ে গেল (হ্যাঁ, এটা হাতে লেখা চিঠিযুগের গল্প)। বাপ বারান্দায় বসে ছিল, চিঠি দেখে তার মন উৎসুক হয়ে উঠল: ছেলের কাছে কি অবশেষে একখানা প্রেমপত্র এল?
‘কার চিঠি, আবদুল গফুর?’ বাপের জিজ্ঞাসা। বাপ চিঠির খাম ছেঁড়ার শব্দ শুনতে পেল, তার পর শুনতে পেল একটিমাত্র কথা: ‘বন্ধুর’।
তার পর কম-কথা-বলা ছেলেটা একদম চুপ। কারণ, তার বন্ধু লিখেছে সে পিএইচডি করার জন্য জার্মানি যাচ্ছে। গফুর বোঝার চেষ্টা করছে এই খবরটা তাকে জানানোর কী কারণ থাকতে পারে। কারণ, এই সহপাঠীর সঙ্গে তার সম্পর্ক চিঠি লেখালেখির মতো ঘনিষ্ঠ ছিল না।
গফুর বন্ধুর চিঠির দিকে চেয়ে বন্ধুর কথা ভাবছে। বাপ তার দিকে চেয়ে আছে। চেয়ে থাকতে থাকতে বাপের বুকে ভিতরটা হাহাকার করে উঠল: ‘আটটা বছর ধরে ভার্সিটিত পড়লু, ক্যা রে, একখানা বান্ধবীও জোগাড় করা পারলু না?’
ছেলে যথারীতি নীরব। তার চোখের সামনে বন্ধুর চিঠি, মনের মধ্যে বন্ধুকে নিয়ে গবেষণা।
‘বান্ধবী থাকলে বিয়া করে লিয়ে আলু হিনি! এমএ পাস বউ! কী ফাইন হলো হিনি!’
ছেলে সাড়া শব্দহীন।
‘হামার ব্যাটা হয়া তুই এত বড় অকর্মা হলু ক্যাংকা করে, ক দিনি?’
ছেলে নির্বিকার।
‘এমএ পাস না হোক, পাত্রী অবশ্যই বিএ পাস হওয়া লাগবে। মেয়ে হওয়া চাই লম্বা, ফর্সা, খুব সুন্দরী। ফ্যামেলি হওয়া লাগবে খাঁটি বড়লোক। লতুন বড়লোক লয়, আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া বড়লোক লয়। স্বাধীনের পরের বড়লোক হলে চলবে না। আদি খানদানি বড়লোক হওয়া চাই।’
‘হবে না।’ অবশেষে নীরবতা ভাঙল ছেলে।
‘কী?’ বাপ আর্তনাদ করে উঠল, ‘কী কলু তুই?’
‘কেছু লয়।’
বন্ধুর চিঠিটা হাতে নিয়ে ছেলে উঠে চলে গেল।
গফুরদের পাড়ার শেষ প্রান্তে রূপনগর সরকারি মহিলা কলেজ। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শুরু হলো। দূরের এক গ্রাম থেকে পরীক্ষা দিতে এল এক মেয়ে, উঠল আত্মীয়ের বাড়িতে। বাড়িটা গফুর কটেজের কয়েকটা বাড়ি পরেই। মেয়েটা ফর্সা, মুখচোখ সুন্দর, নাকটা আরও সুন্দর, থুতনির মাঝখানে খাঁজ, হাসলে গালে টোল পড়ে। লম্বা নয়, খাটোই বলা চলে; হাঁটে এমনভাবে, যেন তার পায়ের তলায় স্প্রিং লাগানো আছে। গফুরকে দেখে সে একটুখানি হেসে হেলেদুলে চলে যায়।
মেয়েটার নাম শাহানা। তার সঙ্গে আবদুল গফুরের দৃষ্টিবিনিময় হয়। তারপর থেকে গফুর শাহানাকে দেখার জন্য গফুর কটেজের দুয়ারে দাঁড়িয়ে গলির দিকে চেয়ে থাকে। শাহানা আবদুল গফুরকে দেখা দেওয়ার জন্য গলি দিয়ে হেঁটে যায়, আড়চোখে তাকায়, দূরে গিয়ে পেছন ফিরে চেয়ে মুচকি হেসে ঝট করে চলে যায়।
গফুর কটেজের দুয়ারের কাছে আমগাছের ছায়ায় ইজিচেয়ার পেতে দিনমান বসে থাকে আবদুল গফুর। বিকেলে বন্ধুদের আড্ডায় আর যায় না। শাহানা গলিতে ঘুরঘুর করে, আড়চোখে তাকায়, দূরে গিয়ে পেছন ফিরে চেয়ে মুচকি হেসে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
গফুর বিড়বিড় করে বলে, ‘আর পারা গেল না।’
গফুর কটেজের সামনের গলি দিয়ে বিকেলটা গড়িয়ে গড়িয়ে পশ্চিম দিকে চলে গেল। পুব দিক থেকে শাহানাকে নিয়ে গড়াতে গড়াতে এল সন্ধ্যা। গফুর কটেজের দরজার কাছে ইজিচেয়ারে আধশোওয়া আবদুল গফুরকে প্রথমে সচকিত ও পরে বিহ্বল করে দিল শাহানার বাঁকা হাসি, গালের টোল, ঘামে ভেজা ট্যালকম পাউডারের সুবাস।
তার পর হঠাৎ মসজিদের মিনার থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি এসে এক নিমিষেই ভাসিয়ে নিয়ে গেল সন্ধ্যা ও শাহানাকে। গলির এই মাথা থেকে ওই মাথা পর্যন্ত বয়ে গেল আবদুল গফুরের হু হু নিশ্বাস। সন্ধ্যার আবছায়া মিলিয়ে গেল। আঁধার ঘনিয়ে এল।
গফুর ইজিচেয়ার থেকে ওঠে না। শাহানার চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে বসেই থাকে; সেই পথে আঁধার আরও ঘন হয়ে আসে।
বাপ বলে, ‘কী হলো তোর, বাবা আবদুল গফুর?’
ছেলে বলে চুপ করে থাকে, বলে না ‘কেছু লয়।’
রাতের মাঝপ্রহরে নির্জন-নিঃশব্দ গলিপথে পা টিপে টিপে চলল আবদুল গফুর। থমকে দাঁড়াল শাহানার জানালার পাশে। জানালাটা খোলা, ঘরের ভিতরে নিকষ আঁধার। গফুর জানালার দুটো শিক ধরে উদগ্রীব হলো : ঘরের ঘন জমাট আঁধারে তার দৃষ্টি হারিয়ে গেল।
সে চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস নিল; তার নাকে এসে লাগল ঘামের সুরভি, ট্যালকম পাউডারের সুবাস। তার বুক ধক করে উঠল, চোখ গেল খুলে। সে দেখতে পেল ডাগর দুটি নয়ন অপলক চেয়ে আছে। পৃথিবীর মাটি কেঁপে উঠল, সেই কম্পন কাঁপুনি ধরিয়ে দিল গফুরের দুই পায়ে। সে টের পেল জানালার দুই শিক শক্ত করে চেপে ধরা তার হাত দুটি থির থির করে কাঁপছে।
গভীর রাতের অন্ধকারে ভোরের কুয়াশার মতো জেগে উঠল শাহানার দাঁতের সারি :
‘আসলেন তাহলে?’
আবদুল গফুরের বুকের গভীর থেকে এক পৃথিবী আনন্দ উঠে এসে গলার মাঝপথে দলা পাকিয়ে আটকে গেল। তার বেপথু দুই হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরল জানালার দুটো ঠান্ডা শিক।
বাতাসে ফিস ফিস ধ্বনি : ‘কিছু কন না যে?’
বাতাস টের পেল আবদুল গফুরের দম বন্ধ হয়ে গেছে।
‘থাক, কিছু কওয়া লাগবে না।’
গফুর ঢোক গিলল, তার হলকুম এক ধাক্কায় উপরে উঠেই ফের নিচে নেমে এল। সে ভয় পেল : শাহানা কি অভিমান করে কথাটা বলল? কিন্তু তার মুখে কোনো কথা এল না। সে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল শাহানার মুখের দিকে, তার দুই চোখ অন্ধকারে জ্বলছে।
দূরের এক গ্রাম থেকে পরীক্ষা দিতে এল এক মেয়ে, উঠল আত্মীয়ের বাড়িতে। বাড়িটা গফুর কটেজের কয়েকটা বাড়ি পরেই। মেয়েটা ফর্সা, মুখচোখ সুন্দর, নাকটা আরও সুন্দর, থুতনির মাঝখানে খাঁজ, হাসলে গালে টোল পড়ে। লম্বা নয়, খাটোই বলা চলে; হাঁটে এমনভাবে, যেন তার পায়ের তলায় স্প্রিং লাগানো আছে।
দুজন নীরবে পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে রইল। গফুর নিজের বুকে শব্দ শুনতে পাচ্ছে। শব্দটা এত জোরে হচ্ছে যে তার মনে হচ্ছে, শাহানাও বুঝি তা শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু শাহানার জগৎ জুড়ে নিশুতি রাতের নৈঃশব্দ্য, একটা ঝিঁঝিঁর ডাক পর্যন্ত নাই।
‘তুমি খুব সুন্দর।’
শাহানার জ্বলজ্বলে দুই চোখ অন্ধকারে পিটিস করে একবার ডুব দিয়ে ভুষ করে ভেসে উঠল।
গফুর গুবগুশ করে একটা ঢোক গিলে বলল, ‘তুমি খুবই সুন্দর।’
কালো অন্ধকারে শাহানার সাদা দাঁত ভোরের মতো ফুটে উঠল।
ছেলে বলল, ‘বিয়া করব।’
শুনে খুশির চোটে চমকে উঠল বাপ : ‘তাই নাকি?’ ছেলেকে সে আব্বা সম্বোধন করতে লাগল : ‘পাত্রী কোন্টে, আব্বা? পাত্রী কোন্টে পাওয়া গেল?’
গফুর শাহানার কথা বলল : ‘মোজাম্মেল চাচার ভাগনি, ইন্টার পরীক্ষা দিচ্ছে।’
মোজাম্মেলের নাম শুনে গাফফার মণ্ডলের উৎসাহী মুখটা দপ করে নিভে গেল। পাড়ার সবচেয়ে গরিব ঘরগুলোর একটা হলো মোজাম্মেলদের ঘর। এক কালে মোজাম্মেলের বাপ গাফফার মণ্ডলের বাপের জমিতে কামলা খাটত, মোজাম্মেল বাজারে সাইকেলের মেকারি করে। সেই মেকার মোজাম্মেলের ভাগনিকে বিয়ে করতে চায় গাফফার মণ্ডলের একমাত্র ছেলে—এই কথা শুনে গাফফার মণ্ডলের মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কান্না শুরু করার ইচ্ছা হলো। ছেলের মুখের দিকে চেয়ে সে কাঁদো কাঁদো সুরে বলল, ‘আট বছর ধরে ভার্সিটিত পড়ে এমএ পাস দিয়ে এই হলো তোর আক্কেল?’
গফুর বাপের কথাটার ইঙ্গিত ধরতে পারল না; বরাবরের মতো শান্ত, ধীর ও নির্বিকার স্বরে বলল, ‘এডা আক্কেলের বিষয় লয়।’
গাফফার মণ্ডলের হুঙ্কার দিয়ে উঠল : ‘তালে কিসের বিষয়? বিয়া করব, মেয়ের বংশপরিচয় কী?’
‘বংশপরিচয় দিয়ে কী হবে।’ গফুর এমন দুর্বল মিনমিনে স্বরে কথাটা বলল যেন সে যুক্তির দাবিতে প্রশ্ন করছে না, আপনমনে স্বগতোক্তি করছে।
বাপ খেপে উঠে বলল, ‘কী হবে মানে? কোন বংশের বেটা তুই সে খেয়াল আছে?’
ছেলে চুপ করে রইল। মিনিটখানেক পার হয়ে গেল, তবু ছেলে আর মুখ খুলল না। বাপ ধৈর্য হারিয়ে বলল, ‘কথা কস না ক্যা? কোন বংশের বেটা তুই, জানিস?’
ছেলে তবু নিষ্কম্প নীরব।
বাপ চিৎকার করে উঠল, ‘তুই কি মনে করিছু তোর বাপ-দাদার মান-ইজ্জত বলে কেছু নাই?’
‘তা লয়।’
‘তাহলে কী?’
‘কেছু লয়।’
গাফফার মণ্ডলের জানে, ছেলে যখন তার প্রশ্নের উত্তর ‘কেছু লয়’ বলে এড়িয়ে যেতে আরম্ভ করে, তখন আর তাকে কিছুতেই যুক্তিতর্কের লাইনে আনা যায় না, সে ক্রমাগত পিছলে পিছলে দূরে সরে যেতে থাকে। কিন্তু সে মনে মনে যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তা থেকে আর কিছুতেই সরে না।
তাই গাফফার মণ্ডলের এবার একটু নরম হওয়ার চেষ্টা করে : ‘বিয়া করব, খুবই ভালো কথা। কিন্তু ওই মেয়েকে লয়। হামরা কি কামলা-কিশাণের বংশের সাথে আত্মীয়তা করবার পারি, বাবা?’
গফুর কথা বলে না। তার বাপ বলে, ‘কী চুপ করে থাকলু ক্যা? বংশের মান-ইজ্জতের কথা কি তুই চিন্তা করব না?’
গফুর বলে, ‘বংশ দিয়ে কাম নাই। মেয়ে সুন্দর।’
গাফফার মণ্ডলের আবার খেপে ওঠে : ‘যতই সুন্দর হোক, ওই মেয়েকে বিয়া করা যাবে না।’
‘ওই মেয়েকেই।’
‘তালে বাড়ি থ্যাকে বার করে দেওয়া হবে।’
‘হবে না।’
‘দূর হয়া যা, কুলাঙ্গার!’
ছেলে নড়ে না।
বাপ বলে, ‘হবে না। এই বিয়া হবার পারে না।’
ছেলে বলে, ‘হবে।’
বাপ বলে, ‘হামি বাঁচে থাকতে লয়।’
ছেলে বলে, ‘আমি তাক কথা দিছি।’
‘ক্যা? কথা দিলু ক্যা? প্রেম করব কর, কিন্তু বিয়া করবু এই কথা দিবার গেলু কিশক? আহারে খোদা, তোক লিয়ে হামার কত আশা! লিয়ে-দিয়ে তুই হামার এক ব্যাটা!’
আবদুল গফুর নীরব।
গাফফার মণ্ডল ভীষণ উত্তেজিত: ‘হবে না। এক্কিবারে লয়! এই বিয়া হবার পারে না। এমএ-বিএ পাস না হলে হামার ছেলের বউ হওয়ার যোগ্যতা কারও নাই। হামার পুত্রবধূ হওয়া লাগবে সুন্দরী, ফরসা, লম্বা, উঁচা খানদানি বংশ, আদি বড়লোক...!’
আবদুল গফুর নিরুত্তেজ-নির্বিকার স্বরে বলে, ‘কথার বরখেলাপ করা যাবে না।’
গাফফার মণ্ডল হুংকার দিয়ে ওঠে, ‘দূর হয়া যা, কুলাঙ্গার! হামার চক্ষের সামনে থ্যাকে দূর হয়া যা!’
গফুর বাপের চোখের সামনে থেকে সরে যায়, নিজের ঘরে গিয়ে ঢোকে এবং দরজায় খিল এঁটে দেয়।
তার পর থেকে গাফফার মণ্ডলের মনে অস্থিরতা শুরু হয়। এত দিন সে এই আশঙ্কায় ভুগেছে যে তার একমাত্র ছেলেটার সম্ভবত এমন জটিল কোনো সমস্যা আছে, যে কারণে সে বিয়ের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়। তার জন্য এটা চূড়ান্ত নৈরাশ্যজনক বিষয়; কারণ সে মনে করে গফুর তার বংশের একমাত্র বাতি, এই বাতি নিভে গেলে সে নির্বংশ হবে।
কিন্তু এখন সে দেখতে পাচ্ছে সে আশঙ্কা অমূলক: তার বংশের একমাত্র বাতিটা আরও অনেক বাতি জ্বালাতে সক্ষম। নইলে কেন সে আপনা থেকেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেবে এবং একাই পাত্রী পছন্দ করার পর সেই সিদ্ধান্ত বাপকে জানাবে এবং বলবে এই সিদ্ধান্তের কোনো নড়চড় হবে না।
গাফফার মণ্ডল সব সময় তার ছেলেকে এ রকম দৃঢ়চেতাই দেখতে চেয়েছে; তাই এখন তার আনন্দ বোধ করার কথা। কিন্তু তার মনে আনন্দ আসছে না, কারণ তার ছেলেটা যা করার জন্য গোঁ ধরেছে, তা তাকে করতে দেওয়া হলে মণ্ডলবংশের মুখে চুনকালি পড়বে।
বংশের জন্য সর্বনাশা এই সিদ্ধান্ত থেকে ছেলেকে কীভাবে ফেরানো যায়—এই চিন্তায় গাফফার মণ্ডলের রাতে ঘুমাতে পারে না। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে অন্ধকার বারান্দায় পায়চারি করে, তার মাথায় চিন্তার ঝড় বয়ে যায়।
এভাবে দুই রাত নির্ঘুম কাটানোর পর তৃতীয় রাতের অর্ধেকটা পেরিয়ে গেলে সে পায়চারি থামিয়ে ছেলের ঘরের দরজায় টোকা দিয়ে আদরের সুরে ডাকে, ‘বাবা আবদুল গফুর! ওঠ দিনি, ওঠ! দুডা কথা কই।’
তাই গাফফার মণ্ডলের এবার একটু নরম হওয়ার চেষ্টা করে : ‘বিয়া করব, খুবই ভালো কথা। কিন্তু ওই মেয়েকে লয়। হামরা কি কামলা-কিশাণের বংশের সাথে আত্মীয়তা করবার পারি, বাবা?’ গফুর কথা বলে না। তার বাপ বলে, ‘কী চুপ করে থাকলু ক্যা? বংশের মান-ইজ্জতের কথা কি তুই চিন্তা করব না?’
কিন্তু গফুরের কোনো সাড়াশব্দ মেলে না। ডাকাডাকি, দরজায় থাবড়ানো ইত্যাদি করার পরে যখন দেখা গেল গফুর ঘরে নাই, তখন গাফফার মণ্ডল চেঁচামেচিতে শুধু তার বাড়ির লোকজনের নয়, পাড়া-প্রতিবেশীদেরও ঘুম ভেঙে যায়। মাঝরাতে এমন শোরগোল ওঠে যেন পাড়ায় ডাকাত পড়েছে। গাফফার মণ্ডলের প্রতিবেশীদের ‘মনে হয় চোর আসছিল’, ‘কেছু লেওয়া পারেনি’, ‘কেছু হয়নি, যাও ঘুমাও’ ইত্যাদি বলে বিদায় করে দেয়, কিন্তু গফুরের মাকে কিছুতেই শান্ত করতে পারে না। একমাত্র ছেলে মাঝরাতে ঘর থেকে উধাও হয়ে গেছে দেখে আমিনা বেগম যে কান্না শুরু করে, তা ভোর হওয়ার আগপর্যন্ত থামে না।
ভোর হতে না হতেই গাফফার মণ্ডল তার গৃহকর্মী সালামতকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে যায় মোজাম্মেল মেকারের বাড়িতে; দরজায় লাথি মেরে তার নাম ধরে চিৎকার করে ডাকাডাকি শুরু করে। কিছুক্ষণ পর মোজাম্মেল দরজা খুলে গাফফার মণ্ডলের অগ্নিমূর্তি দেখে অবাক হয়ে জানতে চায় কী হয়েছে। গাফফার মণ্ডল মারমুখী ভঙ্গিতে বলে, ‘হারামির বাচ্চা, অভিনয় আরম্ভ করিছু?’
গালি শুনে মোজাম্মেলের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়, কিন্তু সে গাফফার মণ্ডলকে সমীহ করে বলে নিজেকে সামলায়। স্বাভাবিক কৌতূহলের সুরে বলে, ‘ভাইজান, কী সমস্যা?’
গাফফার মণ্ডল গম্ভীর কণ্ঠে বলে, ‘তোর ভাগনি কোন্টে?’
মোজাম্মেল বিস্মিত হয়, কারণ সে বুঝতে পারে না গাফফার মণ্ডল কেন তার ভাগনির কথা জানতে চাইবে, কারণ আবদুল গফুর ও শাহানা পারভিনের ব্যাপারটা সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। সে বলে, ‘আমার ভাগনি? বুঝলাম না। কী ব্যাপার ভাইজান?’
গাফফার মণ্ডল ধরে নেয় মোজাম্মেল সব জেনেও না-জানার ভান করছে। সে তাকে ধমক দিয়ে বলে, ‘বদমাশ! অভিনয় বাদ দে। তোর ভাগনি কোন্টে গেছে, ক। না হলে কিন্তু এক ঘণ্টার মধ্যে তোর বাড়িত পুলিশ চলে আসবে।’
মোজাম্মেল আঁতকে ওঠে: ‘পুলিশ! ক্যা? পুলিশ আসবে ক্যা?’
‘তালে ক, কোন্টে গেছে তোর ভাগনি?’
‘যাবে কোন্টে? ওর পরীক্ষা তো শ্যাষ হয়নি।’
‘বাড়িত আছে?’
‘আশ্চর্য! পরীক্ষা শ্যাষ না করে যাবে কোন্টে! আপনে এসব কী বলিচ্ছেন, কী জন্যে শাহানার খোঁজ করিচ্ছেন, কিছুই তো বুঝা পারিচ্ছি না, ভাইজান।’
‘তোক বুঝা লাগবে না। ডাক দে, তোর ভাগনিক ডেকে লিয়াই।’
মোজাম্মেল সমীহ করে বলে, ‘আপনে এটেই খাড়ায়ে থাকবেন? ভিতরে আসে বসেন।’
গাফফার মণ্ডল তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হুকুম করে, ‘লাগবে না, লাগবে না। ডাক দে তোর ভাগনিক।’
মোজাম্মেল বাড়ির ভেতরে যায়। গাফফার তার দরজার সামনে পায়চারি শুরু করে। সে নিশ্চিত যে মেয়েটা এখন বাড়িতে নাই, কারণ গফুর তাকে নিয়ে ভেগেছে। মোজাম্মেলের এতক্ষণের অভিনয় এবার ধরা পড়ে যাবে। কিন্তু সে বাড়ির ভেতর থেকে ফিরে এসে কী জবাব দেয় সেটাই এখন গাফফার মণ্ডলের দেখার বিষয়। গাফফার মনে মনে বলে, সে ফিরে এসে যদি ‘মেয়েটা তো বাড়িত নাই, কাক্কো কেছু না কয়া কোন্টে যে গেল...’ ইত্যাদি বলে নতুন অভিনয় শুরু করে, তাহলে সোজা থানায় যেতে হবে। পুলিশকে ঘুষ দিয়ে হলেও এই বদমাশকে অ্যারেস্ট করিয়ে আচ্ছামতো ধোলাই দেওয়াতে হবে যেন সে আজকের মধ্যেই পুলিশকে বলতে বাধ্য হয় গফুর মেয়েটাকে নিয়ে কোথায় গেছে।
কিছুক্ষণ পর মোজাম্মেল বেরিয়ে এল, তার পাশে শাহানা। মেয়েটিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে গাফফার মণ্ডলের সমগ্র সত্তা প্রচণ্ড এক ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠল, একটা অর্ধস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে। শাহানা তার মুখের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাল যেন সে তার বহু দিনের চেনা। গাফফার মণ্ডলের পায়ের নিচে পৃথিবী দুলতে লাগল; সে তার পাশে দাঁড়ানো গৃহকর্মীর উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বলল, ‘সালামত, আমাক ধর!’
আবদুল গফুর দুপুরবেলা ফিরে আসে। গাফফার মণ্ডল তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে; ছেলেটা গত রাতে কখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, সারা রাত কোথায় ছিল এসবের কিছুই জানতে চায় না; শুধু কাঁদে আর বলে, ‘তুই যা চাস তাই হবে, বাবা। তুই ছাড়া আমার আর কে আছে?’
তারপর সে লোক পাঠায় গফুরের নয় বোনের বাড়িতে; বলে পাঠায়, তারা এসে যেন মহা ধুমধাম করে তাদের একমাত্র ভাইটির শুভ বিবাহ সম্পন্ন করে। সবার আগে চলে আসে সবচেয়ে বড় বোন জেবুন্নেসা। সে এসে কৌতূহল সামলে রাখতে পারে না, ছুটে যায় শাহানাকে দেখতে। মেয়েটিকে দেখে তারও অবস্থা হয় প্রায় তার বাপের মতোই। সে ফিরে এসে বাপকে বলে, ‘আব্বা, এ মেয়ে তো হুবহু আমাদের মা!’ গাফফার মণ্ডল মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমি তার ওপর অনেক অত্যাচার করেছি রে মা!’
একটা ছেলেসন্তানের দাবিতে গাফফার মণ্ডল তার প্রথম স্ত্রী সালমা বানুকে দশবার গর্ভবতী করেছিল, তবু সেই নারী সে দাবি পূরণ করতে পারেনি বলে গাফফার মণ্ডলের সংসারে তার নিগ্রহের শেষ ছিল না—এই তিক্ত সত্য জেবুন্নেসার চেয়ে ভালো আর কে জানে। বাপের কান্না দেখে তার সেইসব দিনের কথা মনে পড়ে গেল। শেষবার যখন মায়ের পেটে বাচ্চা আসে, তখন জেবুর বিয়ে হয়ে গেছে, মায়ের প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে সে বাপের বাড়ি এসেছিল। তার খুব স্পষ্ট মনে আছে: শ্রাবণ মাস, উঠানজুড়ে থিকথিকে কাদা, জায়গায় জায়গায় শ্যাওলা জমে উঠেছে। একদিন দুপুরে কী এক কথা প্রসঙ্গে বাপ রেগে গিয়ে নয় মাসের পোয়াতি মাতাকে মারতে উদ্যত হলো, মা পেটের বাচ্চাটাকে বাঁচাতে গিয়ে উঠানে পিছলে পড়ে এমন আছাড় খেল যে সঙ্গে সঙ্গে উঠান রক্তে ভেসে গেল। ব্যস! সন্ধ্যার আগেই পেটের বাচ্চাসুদ্ধ মরে গেল মা। আর বছর না ঘুরতেই বাপ আরেকটা বিয়ে করে নিয়ে এল। তার ছেলে চাই। বংশের বাতি চাই। আবদুল গফুর হলো সেই বাতি।
বাপের কান্না থেমে এল। কিন্তু মেয়ে কেঁদেই চলল : সমস্ত অতীতটাই যেন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মায়ের নিগ্রহ ছাড়া আর কিছু নাই।
বিয়ের আয়োজন চলছে। রঙিন কাগজ, লতাপাতা, ফুল, বেলুন ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হচ্ছে ‘গফুর কটেজ’। ক্যাসেট প্লেয়ারে গান বাজছে, মিনিটে মিনিটে পটকা ফাটছে। গাফফার মণ্ডলের একুশটা নাতি-নাতনির মধ্যে অন্তত দশ-বারোটা মেতে উঠেছে আতশবাজিতে। একদম ছোটরা হইচই করতে করতে ছুটে বেড়াচ্ছে; মেয়েরা ঢেকিতে চালের আটা কুটছে আর বিয়ের গীত গাইছে। প্রত্যেকে কথা বলছে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে। বিপুল কর্মযজ্ঞ ও শোরগোলের মধ্যে ডুবে রয়েছে ‘গফুর কটেজ’।
হঠাৎ গাফফার মণ্ডলের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। তার মনে হয়, বুক ভরে শ্বাস নিতে পারলে বুঝি একটু স্বস্তি পাওয়া যেত। সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুকুরপাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। পুকুরের পানি স্থির হয়ে আছে। পুকুরপাড়ের গাছগুলো সব চুপচাপ। একটা পাতাও নড়ছে না। গাছেদের মাথার উপরে নির্মেঘ নীল আকাশ একদম শূন্য। কোথাও কিছু নাই, আক্ষরিক অর্থেই অসীম মহাশূন্য।
পুকুরের ঠিক ওহ পাড়ে বাঁশঝাড়ের মধ্যে মণ্ডলদের পারিবারিক কবরস্থান অন্ধকারের মতো ঘন আবছায়ায় ডুবে আছে। গাফফার মণ্ডল নিজের অজান্তে সেদিকে তাকায়, শূন্য চোখে অপলক চেয়ে থাকে, কিছু দেখে না। তার বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে, মাথায়ও যেন কিছু নাই, সবকিছু তার শূন্য মনে হয়। সে কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কিছু ভাবে না; দাদা, বাবা, মা, বড় ভাই, এক চাচা—কেউ তার মনে কোনো স্মৃতি বা আবেগ জাগাতে পারে না। এমনকি জেবুর মা, অর্থাৎ প্রথম স্ত্রী সালমা বানুর কবরের দিকে তাকিয়েও তার ভাবলেশহীনতা কাটে না। যেন তার চৈতন্য অবশ হয়ে গেছে।
হঠাৎ সে দেখতে পেল, কবরস্থানে হেঁটে বেড়াচ্ছে শাহানা। খুব ঘন বাঁশঝাড়ের মধ্যে সূর্যের আলোর পক্ষে দুর্ভেদ্য জায়গাটার আবছায়া এত ঘন যে কবরগুলো এবং তার চারপাশের বাঁশ ও ঝোপঝাড় ভালো দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যে সালোয়ার-কামিজ পরা শাহানার ছবিটা ঝলমলে উজ্জ্বল। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে নাই, দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছে। কিন্তু জায়গাটা মোটেও হাঁটার উপযোগী নয়।
একটু পর সে হাঁটা থামাল এবং গাফফার মণ্ডলের দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর শূন্যে ভেসে উঠল এবং পুকুরের বুকের ওপর দিয়ে ভেসে আসতে লাগল সোজা গাফফার মণ্ডলের দিকে। গাফফার মণ্ডলের মনে হলো তার মাথার শূন্য খুলির ভিতরে একটা ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে, ফড়িংয়ের পাখার ফরফরর শব্দের সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
সে ঘুরে বাড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করল। বাড়ির দরজার চৌকাঠে হোঁচট লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল এবং দুই হাতে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে চিৎকার বলতে লাগল:
‘মায়েরা, কে কোন্টে আছিস, হামার মাথাত পানি ঢালো, মা! হামি আর নাই! হামি শ্যাস!’