অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গল্প

ঘোড়াপীর

বটগাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে মীর মৌলা বকশ থেলো হুক্কায় ধূমপান করেন। দুপুরের সুরুজ তেতে উঠছে। একটু আগে চলতি-চুলায় তৈরি করে নিয়েছেন এক পেয়ালা চা। ধোঁয়া ওড়া চায়ের কালাই করা মগে চুমুক দিতেই নাসারন্ধ্র দিয়ে বিচিত্র আওয়াজ করে তাঁর ঘোড়া—চৈতালি। অশ্বটি ফের নাল ঠুকে শব্দ তুললে, বটের ঝুরি বেয়ে নেমে আসা একটি কাঠবিড়ালি তাজ্জব হয়ে লেজ বাঁকিয়ে তাকায়। মীর মৌলা পুবের পাহাড়ের প্রান্তঘেঁষা একটি গেরাম থেকে বাদ-ফজর মেলা দিয়ে, ক্রোশ দুয়েক হেঁটে, মঙ্গলপাশার নদীতীরে এসে পৌঁছেছেন। এ গেরামে তাঁর নানাবাড়ি। আরও খানিকটা পথ হাঁটতে হবে তাঁকে। তাঁর ঘোড়া চৈতালি এক চোখে কিছু দেখে না। আধেক-অন্ধ এ অশ্বটি বছর কয়েক হলো বাতব্যাধিতে পঙ্গুপ্রায়। তাকে টেনেহিঁচড়ে হাঁটিয়ে এনেছেন বলে মীর মৌলার বড্ড পেরেশানি লাগে। নানাবাড়িতে যাওয়ার আগে তিনি এক পেয়ালা চা পান করে জিরিয়ে নিচ্ছেন।

বুক অব্দি নেমে আসা দীর্ঘ দাড়িওয়ালা গৌরবর্ণ পুরুষ মীর মৌলার ত্রিসংসারে খেশকুটুম বলতে মঙ্গলপাশার একমাত্র মামাতো ভাই মাজেদ জাহান চৌধুরী। মৌলা ঘুরে বেড়ানো পছন্দ করেন। মাজারে-খানকায় রাত কাটান। গঞ্জে, বাজার-হাটেও চক্কর পাড়েন, নদীর ঘাটে বসে মাঝিদের পুঁথি পড়ে শোনান। তাঁর সঙ্গে কম্বল, নকশিকাঁথা, বালিশ, দোয়াত-কলম, কাগজপত্র, হুক্কা, বদনা, কিছু পুঁথিপুস্তক, চলতি-চুলা, চায়ের কেটলি প্রভৃতি নিয়ে সামানাদি বিস্তর। চৈতালির পিঠে চড়েন তিনি কদাচিৎ। তবে নির্বাক জানোয়ারটি বিনা প্রতিবাদে তাঁর মালমাত্তা বহন করে। ঘোড়াটির বল্গা টেনে টেনে হাঁটাচলা করেন বিধায়, এ অত্রাফের লোকজন তাঁকে ঘোড়াপীর সম্বোধন করে থাকে। গাঁওগেরামের মানুষ তাঁকে পীর হিসেবে ইজ্জত করলেও তিনি পীরমুরিদির বিশেষ কিছু জানেন না। ধর্মকর্ম নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা আছে বলেও মনে হয় না।

ঘোড়াপীর গলার স্বরে লেহেন লাগিয়ে পুঁথি পড়তে ভালোবাসেন। এক জায়গায় কয়েক দিন বসবাস করলে তাঁর ফাফরা লাগে। পথেঘাটে খামোখা তিনি ঘুরে বেড়ান। অনেক বছর আগের কথা, মীরজাংগাল গেরামে তাঁর জনম-ভিটাটি প্রতিবেশীর চুগলখোরিতে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলে মৌলা বাস্তুহারা হন। তখন পুবের পাহাড়ের নুন-ছড়া নামে লবণাক্ত জলের ঝোরার পাশে গিয়ে হামেশা তিনি বসে থাকতেন চুপচাপ। প্রস্রবণের গোড়ায় বলকে ওঠা পানির বড় বড় বৃত্ত ভেসে যেত ভাটিতে। তখন তাঁর মাঝে ভর করত কবিতা লেখার উফ্রি। ভেতর থেকে বুদ্‌বুদের মতো বিস্ফোরিত হতো পাথরতলায় চাপা পড়ে থাকা আবেগ। তিনি দিওয়ানা হয়ে মুসাবিদা করতেন পদ্য।

চৈতালির পিঠে চড়েন তিনি কদাচিৎ। তবে নির্বাক জানোয়ারটি বিনা প্রতিবাদে তাঁর মালমাত্তা বহন করে। ঘোড়াটির বল্গা টেনে টেনে হাঁটাচলা করেন বিধায়, এ অত্রাফের লোকজন তাঁকে ঘোড়াপীর সম্বোধন করে থাকে। গাঁওগেরামের মানুষ তাঁকে পীর হিসেবে ইজ্জত করলেও তিনি পীরমুরিদির বিশেষ কিছু জানেন না।

ঘোড়াপীরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষা কতটুকু, সঠিক করে বলা মুশকিল। তাঁর জনম-ভিটা মীরজাংগাল গেরামের ইশকুলে কিছুদিন তিনি ছাত্র হিসেবে হাজিরা দিয়েছিলেন। সে আমলে ডেস্কে ডেস্কে বসানো থাকত কলির দোয়াত। ছাত্ররা তাতে হ্যান্ডল পেনের নিব চুবিয়ে লেখাজোখা করত। কালির গন্ধ ভালোবাসতেন মীর মৌলা। খাতায় হাতের লেখা মশকো করতে করতে মাঝেমধ্যে তিনি ঠোঁটে কলমের নিব চুষে নিতেন। তাঁর ফতুয়া-পিরানে হামেশা লেগে থাকত এন্তার কালিমা। বিষয়টি ডাকসাইটে হেডমাস্টার চপলাবাবুর গোচরীভূত হলে, তিনি মীর মৌলাকে বেত্রাঘাতে জর্জরিত করেন। প্রতিবাদে মৌলা ছুটির পর ইশকুল–ঘরের দেয়ালে কালি দিয়ে আঁকেন, চপলাবাবুর কাছা-কোঁচা খোলা একাধিক তসবির। তার পর থেকে তাঁকে আর কখনো ইশকুল–ঘরের ত্রিসীমানায় যেতে দেখা যায়নি। বছর দেড়েক আওয়ারা ঘুরে বেড়ানোর পর তিনি দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলেন। তখন আসমানে মহররমের চাঁদ দেখা দিলে, তিনি উদ্বেল হয়ে মুখে মুখে তাইয়ার করেন কিছু জারিগান। তা বেকরার হয়ে গাইতে শুরু করলে, বিষয়টি বেদাত বিবেচনা করে মাদ্রাসার মদরিসরা তাঁকে জারুলগাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেন্ধে কঞ্চিপেটা করেন। নিশিরাতে কীভাবে যেন দড়ির বান্ধন খুলে মৌলা ভেগে যান আসামের অঘোর জঙ্গলে। বছর কয়েক কামরূপ-কামাখ্যায় দিন গুজরান করে ফিরে আসেন জনম-ভিটা মীরজাংগালে।

জাদুটোনার নানাবিধ টনটন-মনটরে সিদ্ধি হাসিল করে মৌলা ঘরে ফিরেছেন—এ ধরনের একটি গুজব হাটে-বাজারে চালু হয় তখন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে পাশের গেরাম নয়নরাঙার দুঁদে জমিদার ব্রজেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী মহাশয়ের। কংগ্রেসের কাট্টা সমর্থক ব্রজবাবু মাজার-মসজিদে আওয়ারা ঘুরপাক করা মৌলাকে পেয়াদা পাঠিয়ে ডেকে নিতেন তাঁর কাছারি-বাংলোয়। তাঁকে জলখাবার খাইয়ে বলতেন, ‘তোমার পরিবারর মীররা নবাবি আমলোর মিরাশদার। আমার গেছ থাকি ইতিহাস হুন, মৌলা। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ সানসেট ল তাইয়ার করোইন, তোমার খানদানোর পূর্বপুরুষ হকল হাইনজার আগে খাজনা দিতা পারোইন না, এর লাগি জাগা-মিরাশ, হাওর, জলমহাল তাবৎ কিছু খুয়াইয়া তারা এক্কেবারে মিসকিন অই যাইন। এই আত্রাফোর আদি রইস আইলা তুমি, আমি ঠিক বুঝতাম পারি না, তোমার লাখান বুনিয়াদি খানদানোর পুয়া কিতার লাগি আটে-বাজারে অজাত-কুজাতের লগে আড্ডা দিয়া দিন কাটাও।’ ব্রজবাবু তাঁকে তাঁর সেরেস্তায় মুহুরি হিসেবে চাকরির প্রস্তাব করলে মৌলা তেমন একটা গা করেননি। বাবু এ ব্যাপারে তাঁকে জোরাজুরি করা থেকে বিরত থাকেন। তবে কোনো কোনো দিন সন্ধ্যাবেলা শরাব পানে বেহেড হলে তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে বলতেন, ‘মৌলা, একটু পুঁথি পড়িয়া হুনাও চাইন।’

এভাবেই একদিন মৌলার নুন–ছড়ার পাড়ে বসে রচিত তাড়া তাড়া পদ্যের সঙ্গে পরিচিত হন ব্রজবাবু। কখনো বাবুমশাইয়ের মেজাজ তেড়িয়া হলে, মৌলাকে পাল্কিতে তুলে নিয়ে যেতেন সন্ধ্যারানির দিঘির পাড়ে। বড়শির ভাসমান ফাতনার দিকে তাকিয়ে নোনাধরা ঘাটলায় বসে থাকতেন দুই অসমবয়সী পুরুষ। একদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটলায় বসে, চার ফেলেও মাছের নিশানা করতে না পেরে মনে মনে চটে উঠছিলেন বাবুমশাই। মৌলা দিঘির জলে একখণ্ড মেঘের ছায়ায় কাজলা হয়ে ওঠা জলের দিকে—একসঙ্গে তিন-তিনটি ফুল ফোটা কচুরিপানার ছোবা ঠেলে দিয়ে, কামরূপে শেখা মাছ-বান্ধার তন্ত্রমন্ত্র পাঠ করেন। বাবুমশাই ঘাটলার সিঁড়ি বেয়ে নেমে কচুরিপানার ছোবার কাছে বড়শি ফেলতেই প্রথমে টোপ গেলে মহাশোল। তারপর ধরা পড়ে দুটি পাকা মৃগেল। ওই রাতে মৃগেল মাছের কোফতা-কালিয়া খাওয়ানোর নিমন্ত্রণ দিয়ে বাবুমশাই মৌলাকে খোশখবরটি জানান। নুন-ছড়ার পাড়ে বসে লেখা পদ্যগুলোর পাণ্ডুলিপি গোমস্তাকে দিয়ে পাঠানো হয়েছে জেলা সদরের ছাপাখানায়। ওখান থেকে মাস তিনেক পর প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ, সাড়ে চার আনা দামের ‘কিশতি ভাসে নয়ন জলে’।

বছর দেড়েক আওয়ারা ঘুরে বেড়ানোর পর তিনি দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলেন। তখন আসমানে মহররমের চাঁদ দেখা দিলে, তিনি উদ্বেল হয়ে তাইয়ার করেন কিছু জারিগান। তা বেকরার হয়ে গাইতে শুরু করলে, বিষয়টি বেদাত বিবেচনা করে মাদ্রাসার মদরিসরা তাঁকে জারুলগাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেন্ধে কঞ্চিপেটা করেন।

দেশ-খেশ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার ধাত নেই মীর মৌলার। তারপরও বেখবর হালতে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে তিনি কীভাবে যেন জড়িয়ে পড়েছিলেন খেলাফত আন্দোলনে। আলী ব্রাদার্সের ডাকে মিছিলের রাজদ্রোহিতায় শামিল হলে তাঁর ওপর জারি হয় হুলিয়া। তো মৌলা আশ্রয় নেন বাবুমশাইয়ের দ্বিতল বৈঠকখানার পেছনের কামরায়। ওখানে বসবাসের সময় চৈত্র মাসের পয়লা দিন আস্তাবলের গুমটির নিচে জন্ম হয় চৈতালির। বাবুমশাইয়ের ভুটিয়া ঘুড়ির সন্তান চৈতালি শিশু বয়স থেকে হয়ে পড়ে মৌলার নেওটা। তিনি আঙিনায় শিরীষগাছের বাঁধানো গোড়ায় এসে বসলে, ছোট্ট ঘোটকটি ছুটে এসে লেহন করত তাঁর পায়জামার পায়া। পার্টিশনের পরও ব্রজবাবু বছর দুয়েক থেকে গিয়েছিলেন এপারে। কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের রায়টের পর ওপারে চলে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন। তরুণ বয়স থেকেই তিনি কংগ্রেসি, এদিকে মুসলিম লীগের সদ্য গজানো রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তাঁর বনিবনা হচ্ছিল না। তাঁরাও ব্রজবাবুর সঙ্গে সলুক খারাপ করছিল। তো তিনি গৌহাটির এক মুসলিম ব্যবসায়ী পরিবারের সঙ্গে সম্পত্তি বিনিময়ের বন্দোবস্ত করেন। ওপারে পাড়ি দেওয়ার আগের দিন, তিনি কিছু অস্থাবর সম্পত্তি, যেমন সিন্ধি গাই গরু, পাঠনাই বরবরি ছাগল ইত্যাদি সেরেস্তার কর্মচারীদের মধ্যে বিতরণ করে দেন। কিন্তু শিকারের সময় অসাবধানে ছিটাগুলির টুকরা পড়ে এক চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়া, বাত বিমারিতে অথর্ব চৈতালির দায়িত্ব কেউ নিতে চাচ্ছিল না। অধৈর্য হয়ে ব্রজবাবু ভাবছিলেন, বুক নিশানা করে গুলি করে চৈতালিকে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেবেন। তখন তাঁকে বিদায় জানাতে হাজির হন মীর মৌলা। সবকিছু শুনে তিনি ঘোড়াটির দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে বাবুমশাইকে আশ্বস্ত করেন।

বট-বিরিক্ষের তলায় বসে নানা কিছু ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়েছিলেন মৌলা। টুপ করে তাঁর চায়ের মগে লাল একটি বটের ফল এসে পড়লে, তিনি গর্দান বাঁকিয়ে ওপরের দিকে তাকান। সবুজ রঙের ঝিলিক পেড়ে একটি তোতাপাখি পত্রালির ঝোপে মিশে যায়। ঠিক তখনই চৈতালি ফের নাসারন্ধ্র দিয়ে বিচিত্র আওয়াজ তোলে। মৌলা এনামেলের তস্তরিতে বাকি চাটুকু ঢেলে তার মুখের সামনে রাখেন। চৈতালি চুকচুকিয়ে চা চেটে নিলে, তিনি একখানা ত্যানা দিয়ে মুছিয়ে দেন তার নষ্ট চোখ থেকে গড়িয়ে নামা অশ্রুজল। গেরামের কাদামাখা দুটি ছেলে হেঁটে যেতে যেতে ঘোড়া দেখতে পেয়ে গেয়ে ওঠে, ‘তোমার ঘোড়ায় ঘাস খায় কাঞ্চিকাটা দিয়া/ অই ঘোড়াতে চড়িয়া পরির লগে অইব তোমার বিয়া।’

মৌলা আলখাল্লার মতো দেখতে পিরানের পকেট থেকে নোটবুক বের করে ছড়াটি টুকে নেন। লিখতে গিয়ে খেয়াল হয় যে বুকপকেটে রাখা রাইটার কলমটি ফেটে গিয়ে তাঁর হাতের আঙুল ভরিয়ে দিচ্ছে কালিমায়। তিনি আঙুল চুষে পরিষ্কার করতে গিয়ে তাঁর মামাতো ভাই মাজেদ জাহানের কথা ভাবেন। দোয়াতে চুবিয়ে হ্যান্ডল-পেন দিয়ে লিখতে পছন্দ করেন মৌলা। তবে এ ফাউন্টেন পেন ও নোটবুকটি মাজেদের দেওয়া। গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় পাস দেওয়া ছেলে মাজেদ, বয়সে তাঁর চেয়ে সাত বছরের ছোট, তাঁর প্রবন্ধ লেখার ধাত আছে। তিনি কাফেলা বলে একটি বার্ষিক পত্রিকায় গাঁও-গেরামে মুখে মুখে প্রচলিত ছড়া ও প্রবাদবাক্য ইত্যাদি নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখতে চান। এ বাবদে মৌলার সাহায্য চাইলে, উনি মাজেদকে রসদ জোগাড় করে দেবেন বলে কথা দিয়েছেন। তাই ঘোড়া-বিষয়ক ছড়াটি নোটবুকে টুকতে পেরে তাঁর ভালো লাগে।

এক চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়া, বাত বিমারিতে অথর্ব চৈতালির দায়িত্ব কেউ নিতে চাচ্ছিল না। অধৈর্য হয়ে ব্রজবাবু ভাবছিলেন, বুক নিশানা করে গুলি করে চৈতালিকে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেবেন। তখন তাঁকে বিদায় জানাতে হাজির হন মীর মৌলা। সবকিছু শুনে তিনি ঘোড়াটির দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে বাবুমশাইকে আশ্বস্ত করেন।

দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, খিদাও পেয়েছে। মৌলা উঠে নানাবাড়ির দিকে হাঁটার কথা ভাবেন। অনেকটা পথ হেঁটে এসেছেন, তাই তাঁর পায়ের গোড়ালি ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে। তিনি পাহাড়ের প্রান্তিকে তাঁর পরিচিত এক চাষির বাড়িতে বেলগাছের সঙ্গে ঘোড়াটি বেঁধে রেখে সীমান্তের ওপারে ধর্মনগরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসেছেন কাল রাতে হরেক রঙের কয়েক গাছি রেশম নিয়ে। মাজেদের স্ত্রী চেমন আরা তাঁর খুব নেওটা। সে তার সইয়ের বিয়ে উপলক্ষে সেলাই করতে চায় একখানা আরশিলতা—যা দিয়ে সই মেয়েটি বিয়ের পর তার আয়না-চিরুনি-কাজলদানি ইত্যাদি পেঁচিয়ে সংরক্ষণ করবে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়—এপারের হাট-বাজারে ভালো মানের রেশম পাওয়া না গেলে। তো মৌলা তাঁর পিরানের পকেটে হাত দিয়ে রেশমের মসৃণ সুতা স্পর্শ করেন।

চেমন আরা পয়সাওয়ালা মহালদারের মেয়ে বলে তার ডাঁটিয়াল বদনাম আছে। তবে তার মুখখানা গোধূলিতে ভেসে ওঠা জ্যোৎস্নাহীন চাঁদের মতোই স্নিগ্ধ। একটু পর তিনি হেঁটে নানাবাড়িতে পৌঁছাবেন। ভ্রাতৃবধূ হিসেবে চেমন আরা তাঁর খুব যত্নআত্তি করে। তিনি উঠে পড়ার কথা ভাবতেই, তাঁর ভেতরে কী যেন এক প্রত্যাশা স্যাঁতসেঁতে জমিনে ব্যাঙের ভুঁইফোড় ছাতাটির মতো ফুটে ওঠে। আর চৈতালির বল্গা ধরে টান দিতেই মনের নিভৃতে ভেসে ওঠে পদ্যের কিছু চরণ, ‘আশা আমার পুব পাহাড়ের পাখি/ দিবানিশি উইড়া আসে/ করে ডাকাডাকি।’

নানাবাড়িতে পৌঁছামাত্র চেমন আরা তাঁর খেদমতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। চৈতালিকে দেওয়া হয় গামলাভর্তি গরম ভাতের ফেন। রেশমের বর্ণাঢ্য লাছিগুলো হাতে নিয়ে খুশি হয়ে চেমন রান্নাঘর থেকে বানিয়ে নিয়ে আসে তেঁতুলগুলা শরবত। ভ্রাতৃবধূটি আজ পরে আছে বেগুনি তাঁতের আটপৌরে শাড়ি। ডান কাঁধের ওপর ফেলা আঁচলে চাবির গোছা বাঁধা থাকায় অল্পবয়সী এ তরুণীকে গিন্নিবান্নির মতো দেখাচ্ছে। সে গেল মাসের বেগম পত্রিকা বের করে, তাতে ছাপা হওয়া ছোট্ট ছেলে এহতেশামের ছবি দেখায়। মৌলা ‘মাশা আল্লাহ’ বলে মুদ্রিত আলোকচিত্রের তারিফ করে চোখ তোলেন, দুই বছরের এহতেশাম সারা কামরায় তুরুত তুরুত করে ছুটে বেড়াচ্ছে। চেমন আজ পোখরাজ পাথরের নাকফুল পরে আছে। তার বিচ্ছুরিত আভাকে ম্লান চাঁদের পাশে ফুটে ওঠা শুকতারার মতো বর্ণিল মনে হয়।

ঝকঝকে র‍্যালি কোম্পানির বাইসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়ি ফেরেন মামাতো ভাই মাজেদ। তাঁর পিঠে বাঁধা এয়ারগান। সাইকেলের ক্যারিয়ার থেকে ঝুলছে, একটি রক্তাক্ত সরালি, দুটি বক ও একটি তিলাঘুঘু। বেলের ক্রিংক্রিং আওয়াজে উৎসাহিত হয়ে খিলখিলিয়ে হেসে বাপের বাহনের দিকে ছুটে যায় শিশু এহতেশাম।

আগামীকাল পালিত হবে সাধারণ ধর্মঘট, মিছিলে সে অবশ্যই মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন ও প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের নাম উল্লেখ করে ‘নুরুল-নাজিম মুর্দাবাদ’ আওয়াজ তুলবে, আর এক সুযোগে আদালতের দেয়ালে এ পোস্টারটিও সাঁটবে। সুরুৎ সুরুৎ করে তপ্ত চায়ের পেয়ালাটি শেষ করে পোস্টারটি নিয়ে উঠে পড়ে মুফিদ।

তেল মেখে পুকুরে গোসলের পর—কুমড়া ফুলের বড়া, মাগুর মাছের ঝোল ও তিসির খাট্টা দিয়ে ভরপেট ভোজন করে মৌলা বৈঠকখানায় আয়েশ করে বসেন। মাজেদ জাহান নোটবুকে টুকে আনা গাঁওগেরামে প্রচলিত ছড়া ও প্রবাদবাক্য প্রভৃতি চশমা চোখে খুঁটিয়ে পড়ছেন। কামকাজের বেটি তাঁর সামনে বৃন্দাবনী হুক্কাটি এনে রাখলে মৌলা তার নল মুখে তুলে নিয়ে চোখ মোদেন। সঙ্গে সঙ্গে, অবচেতন থেকে জ্যোৎস্নাহীন চাঁদের কাছাকাছি জ্বলজ্বলে শুকতারাটির দৃশ্যপ্রতিমা ভেসে ওঠে মনের সায়রে। তৎক্ষণাৎ অন্দরমহলের বাগিচায় ফোটা দোপাটির কাছাকাছি ভ্রমরের মতো তাঁর কর্ণকুহরে গুঞ্জরণ ছড়ায় কয়েকটি আবেগ-মর্মরিত শব্দ, বাঙ্ময় হয়ে ওঠে ছন্দও। এ ধরনের ভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়া বেঠিক বিবেচনা করে, মৌলা আড়াল থেকে যিনি সৃজন করেন এ কিসিমের মায়াবী বিভ্রম, তাঁর দিকে মনকে রুজু করে, স্বরচিত একটি হামদের পঙ্‌ক্তি বারবার জপে মনকে প্রশান্ত করতে চেষ্টা করেন।

নোটবুকে সংগৃহীত ছড়া-পাঠে সন্তুষ্ট হয়ে মাজেদ মৌলাকে মজা করে ‘ঘোড়া ভাইসাব’ সম্বোধন করে বলেন, ‘এইবার তোমার লাগি একটা পারকার কলম কিনতাম অইব। সুন্দর করিয়া একটা পদ্য লেখিয়া দেও। তোমার নামে ইটা আমি কাফেলা পত্রিকাত পাঠাইমু।’ এ মন্তব্যে মৌলা কোনো উৎসাহ না দেখিয়ে গুরুত-গুরুত শব্দে নাকমুখ দিয়ে ছাড়েন তামাকের ধোঁয়া।

উঠে দাঁড়ান মাজেদ জাহান। দুই কদম সামনে বাড়তেই চক্কর দিয়ে ওঠে মাথা, দেয়ালে হাত দিয়ে তিনি পতন ঠেকান, কিন্তু চোখে অনভিপ্রেত আলোর ফুলঝুরিতে বেজায় বেদিশা লাগে তাঁর। মৌলা উঠে পড়ে, মামাতো ভাইটিকে ধরে বসিয়ে দেন তক্তপোশে। হাঁকডাকে এসে পড়ে চেমন আরা ও কামকাজের ঝি-বেটি। হাতে ধরে থাকা সওগাত পত্রিকাটি বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে শুইয়ে দেওয়া হয়। মনে হয়, রোদে ঘুরেফিরে শিকার করাতে মাথায় হয়তো গর্মির ছড়ছাম চড়ে গেছে। বালিশে শিশুপুত্র এহতেশামের ওয়েলক্লথ বিছিয়ে, বদনা-চিলিমচি জোগাড় করে শুরু হয় ঠান্ডা পানি ঢালা। আঁচল ভিজিয়ে স্বামীর মুখ মুছিয়ে দিতে দিতে আর্দ্র গলায় চেমন আরা জানায়, এ রকম প্রায়ই বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ইদানীং মাঝেমধ্যেই ঘটছে। কিন্তু মাজেদ জাহানকে বলে-কয়ে শত অনুরোধেও সিলেট জেলা সদরের ডাক্তারের কাছে পাঠানো যাচ্ছে না।

মঙ্গলপাশার আশপাশের পাঁচ গ্রামে কলকাত্তা বা গৌহাটিতে পাস দেওয়া কোনো ডাক্তার নেই। তবে পাশাপাশি গ্রামের পরিমল চৌধুরী ঠেকা-বেঠেকায় হোমিওপ্যাথিক ওষুধ দিয়ে রোগবালাই সামলান। পরিমলবাবু মৌলার পরিচিত, স্বদেশি করা এ কংগ্রেসি খেলাফত আন্দোলনের সময় মিছিলে মৌলার পাশে পাশে হেঁটেছেন। তাঁর তালাশে বেরোতে হয় এখনই। শিরীষগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রীতিমতো ঝিমাচ্ছে চৈতালি। তার ওপর ভরসা না করে বন্দের আইল ধরে পয়দলে তিনি রওনা হন। বাড়িতেই পাওয়া যায় পরিমলবাবুকে। পুকুরপাড়ের মিঠেকড়া রোদে শীতলপাটিতে বিরাট দুটি বালিশে ঠেসান দিয়ে বসে ঘাঁটছেন, আনন্দবাজারের শারদীয় সংখ্যা, পাশেই অগোছালোভাবে পড়ে আছে, স্টেটসম্যান পত্রিকার মফস্বল সংস্করণের দুটি পুরোনো সংখ্যা। মাজেদ জাহানের স্বাস্থ্য-সংকট শুনে রিমলেস চশমাটি কপালে তুলে, ভুরু কুঁচকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন; কিন্তু তখনো আহার গ্রহণ করেননি, বিকেলের দিকে অবশ্যই তাঁকে দেখতে আসবেন প্রতিশ্রুতি দিয়ে মৌলার দিকে বাড়িয়ে দেন গোয়া-পানের বাটা। কিঞ্চিৎ খাজুল হয়ে অতঃপর নানাবাড়িতে ফিরতে ফিরতে মৌলা ভাবেন, সুভাষচন্দ্র বসুর ভাবশিষ্য এ মানুষটি নেতাজির অন্তর্ধানে বোধ করি রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন, অবশ্য পাকিস্তান সৃষ্টির কারণে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, এতে তাঁর মতো মানী-সম্মানী মানুষের রাজনীতি করার কোনো কুদরতও থাকেনি। নানাবাড়িতে ফিরে দেখেন, মাজেদ জাহান খানিকটা চাঙা হয়ে বৈঠকখানায় বসে খাচ্ছেন বেলের শরবত।

রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে, পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে কয়েকজন মানুষের—এ ঘটনার বিবরণ শুনে মাজেদ ও মৌলা দুজনে নির্বাক হয়ে যান! যদি নুরুল আমিনের সরকার আন্দোলন দমন করতে সমর্থ হয়, তাহলে কি বাংলায় পত্রপত্রিকা, বইপুস্তক কিছুই আর প্রকাশ পাবে না?

কথা রাখেন পরিমলবাবু। মাগরিবের নামাজাদির বেশ পর, গলা খাঁকারি দিয়ে এসে বৈঠকখানায় ঢোকেন তিনি, তাঁর পেছন পেছন ক্যাম্বিসের ব্যাগ ও লন্ঠন হাতে কামরায় ঢোকে গামছা-কাঁধে এক রায়ত। প্রচুর প্রশ্নাদি করে রোগের আলামতগুলো শুনে নেন। তারপর ম্যাটেরিয়া মেডিকা নামক প্রকাণ্ড একটি পুস্তক থেকে ইংরেজিতে লেখা পুরো একটি প্যারাগ্রাফও পড়ে শোনান। ব্লাড প্রেশার শব্দটি শুনে মৌলা, মাজেদ জাহান ও পর্দার আবডালে দাঁড়ানো চেমন আরা সকলের উদ্বেগ বাড়ে বৈ কমে না। পরিমলবাবুর ক্যাম্বিসের ব্যাগ থেকে বের হয় কাঠের ছোটখাটো একটি হাতবাক্স, ওটিই তাঁর ফার্মেসি, ওখানে অনেকগুলো খোপে খোপে ছোট্ট ছোট্ট শিশিগুলোতে সংরক্ষিত আছে হরেক রকমের ওষুধবিসুদ। একটি শিশির লেভেলে লেখা ‘রোওয়ালফিয়া সারপেনটিনা’, দিলে ভয়ভীতি জাগানো শব্দ দুটি বার তিনেক আউড়িয়ে, পরিমলবাবু মাজেদ জাহানকে হাঁ করিয়ে নিজ হাতে হলকুমে ঢালেন এক টেপরা তরল।

তিন দিন বিছানায় বিশ্রামের বিধান দিয়ে, অতঃপর পরিমলবাবু জানতে চান, রেডিওতে কেউ আজকের কোনো খবর শুনেছেন কি না। জানা যায়, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে নাকি পূর্ব বাংলাব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা সম্প্রচার থেকে দিনভর নাকি একই ধরনের সংগীত বারবার বাজানো হচ্ছে, এক দিনের বাসি সংবাদও নাকি পুনঃপ্রচার করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, রেডিওর বাঙালি স্টাফ, সংবাদপাঠক ও শিল্পীরা ধর্মঘটে শরিক হয়েছেন, তাই কর্তৃপক্ষ আগের দিনের রেকর্ড করা অনুষ্ঠান দিয়ে রেডিও চালাচ্ছেন। আকাশবাণীতে রাতের সংবাদ শোনার পরামর্শ দিয়ে, ভরপেট জলখাবার খেয়ে, নাকে এক টিপ নস্যি নিয়ে প্রচণ্ড জোরে বার তিনেক হেঁচে বিদায় নেন পরিমলবাবু।

পরিমলবাবুর রোগ নির্ণয়ের ধকল কাটতে না কাটতে বৈঠকখানায় হুড়মুড়িয়ে ঢোকে মুফিদ দেওয়ান। পশমি চাদরের তলা থেকে চোঙাটি বের করে টেবিলের ওপর রেখে, অন্দরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে হাঁকডাক করে সে খোঁজ নেয় চেমন আরার, আবদার করে গরম আদা চায়ের। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শামিল হয়ে জেলখাটা মুফিদ হরেক রকমের আন্দোলনে চোঙা-ফুঁকে হাটে-বাজারে, থানা ও জেলা সদরে সর্বত্র পরিচিত হয়ে উঠেছে চোঙা-মুফিদ নামে। সিলেটের গণভোটের সময় সে মৌলানা ভাসানীর সভা-সমাবেশে সুদীর্ঘ চোঙায় মুখ রেখে তারস্বরে স্লোগান দিত, বর্তমানে সে গণতন্ত্রী দলের সদস্য হয়েছে। চেমন আরা মুফিদের কী এক সম্পর্কে আত্মীয়। এখনো তার ঘরসংসার হয়নি। আওয়াজ শুনে চেমন আরা নিয়ে আসে বড়সড় একটি পোস্টার। মুফিদের অনুরোধ মোতাবেক তাতে সে খাগের কলম দিয়ে বিরাট করে লিখেছে, নওবেলাল পত্রিকার একটি কার্টুনের তলা থেকে নেওয়া ছড়ার মতো একটি ক্যাপশন, ‘চালের বদলে গুড়/ লবণের কথা না–ই বললাম/ এবার সাড়ে চার কোটি লোকের মুখের ভাষাটি কেড়ে নিতে সাহস কোরো না...।’ খুশি হয়ে মুফিদ চেমন আরার হাতে তুলে দেয় একটি ভদ্র-ছালা, তা থেকে বেরোয় দেওয়ানদের পারিবারিক বাগানের কয়েকটি কমলা, বাতাবিলেবু, পেঁপে প্রভৃতি।

কামকাজের ঝি-বেটি নিয়ে আসে তপ্ত টি–পট। আদা–চা খেতে খেতে জেলা সদর থেকে বিকেলের ট্রেনে ফেরা মুফিদ পরিস্থিতির আপডেট করে। ঢাকা নগরীতে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না হলেও, সিলেটের জেলা রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমনকি আরবি হরফে বাংলা লিখনপদ্ধতি প্রচলনের গোপন ষড়যন্ত্রের তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাবেরও যে খসড়া হয়ে আছে, এসব তথ্য দিয়ে মুফিদ জানায়, ভোরবিহানের মেইল-ট্রেনে সে সিলেটে যাচ্ছে। তার ধারণা, আগামীকাল পালিত হবে সাধারণ ধর্মঘট, মিছিলে সে অবশ্যই মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন ও প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের নাম উল্লেখ করে ‘নুরুল-নাজিম মুর্দাবাদ’ আওয়াজ তুলবে, আর এক সুযোগে আদালতের দেয়ালে এ পোস্টারটিও সাঁটবে। সুরুৎ সুরুৎ করে তপ্ত চায়ের পেয়ালাটি শেষ করে পোস্টারটি নিয়ে উঠে পড়ে মুফিদ। চোঙাটি বগলদাবা করে হাপরের মতো উত্তেজনা নিয়ে বেরিয়ে যায় সে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের আলামত নিয়ে মৌলা ও মাজেদ জাহান নিচু গলায় টুকটাক আলাপ করেন, ঠিক বুঝতে পারেন না কোন দিকে যাচ্ছে স্বদেশ, পত্রিকার মফস্‌সল সংস্করণ এসে মঙ্গলপাশায় পৌঁছাবে দিন দুয়েক পর। গরমজল ভরা দুধদানিতে বুরুশ দিয়ে ঘষামাজা করতে করতে বৈঠকখানায় এসে ফের ঢোকে চেমন আরা। জানতে চায়, ‘ভাইজানে কিতা কইলকাত্তার খবর হুনতাইননি?’ নোটবুকে ফাউন্টেন পেনের ক্লিপ আটকাতে আটকাতে ঘাড় হেলিয়ে তিনি সম্মতি জানান। চেমন আরা রেডিওগ্রামের ওপর থেকে নকশি করা ঢাকনাটি উঠিয়ে নব টিপে অন করে যন্তরটি। মিটার খানেক নাড়াচাড়া করতেই পাওয়া যায় আকাশবাণী। কিছুক্ষণ যন্ত্রসংগীতের পর শোনা যায় সংবাদপাঠকের গলা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে, পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে কয়েকজন মানুষের—খবরে এ ঘটনার বিবরণ শুনে মাজেদ ও মৌলা দুজনে নির্বাক হয়ে যান! মনে মনে মাজেদ ভাবেন, যদি নুরুল আমিনের সরকার আন্দোলন দমন করতে সমর্থ হয়, তাহলে কি বাংলায় পত্রপত্রিকা, বইপুস্তক কিছুই আর প্রকাশ পাবে না? মৌলা বিরক্তিতে উসখুস করে আরামকেদারায় শিরদাঁড়া সোজা করে বসেন। তাঁর মনে একটা বিষয় ঘুরপাক করে, জিন্নাহ পুঞ্জার বেটা নিজে উর্দু ভালো বলতে পারতেন না। তাঁর একগুঁয়েমির কারণে পাকিস্তান হলে সূত্রপাত হয়েছে নানা রকমের গর্দিশের। এখন ওপারের ধর্মনগর বা কৈলাসের কুটুমখেশকে দেখতে যেতেও পাসপোর্ট-ভিসা লাগে। ইংরেজ সব ধরনের দমন চালালেও তারা কিন্তু মানুষের ভাষার ওপর হাত দিতে হিম্মত পায়নি। পূর্ব বাংলার মানুষ কি তাদের বাপ-দাদার জবানের ওপর এ রকমের দিনদুপুরে ডাকাতি মেনে নেবে?

পাশের কামরা থেকে নাকি সুরে চেমন আরার কান্না ভেসে এলে, মাজেদ উঠেপড়ে খোঁজ নিতে যান। একটু পর জানা যায়, চেমন আরার বড় ভাই আশরাফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছে। এ ধরনের মিছিলে তার শরিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর। মৌলা উঠে নিজ হাতে ফের হুক্কার ছিলিম বদলান। ঢাকা শহরে মেইল-ট্রেন ধরে গিয়ে আশরাফের খোঁজ নিতে দুই-তিন দিন লেগে যাবে। সহজ উপায় হচ্ছে, সাত ক্রোশ দূরের থানা শহরে গিয়ে ডাকঘর থেকে টেলিগ্রাম পাঠানো।

এত দূরে হেঁটে রওনা হলে দুপুর গড়িয়ে যাবে, ভরসা একটাই, ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হওয়া, সচরাচর চৈতালি মৌলার মালমাত্তা বহন করে থাকে, কালেভদ্রে তার পিঠে চাপলে সে যে তেমন আপত্তি করবে, তা নয়। কথা হয়, ভোরবিহানের চৈতালিকে খাওয়ানো হবে ছোলা। তারপর ঘোড়াটির পায়ের গুছি দলাইমলাই করে তাতে চাপবেন মৌলা। ডাকঘর থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে, তারের অফিসে বসে থেকে আশরাফের রিপ্লাই নিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ তিনি ফিরে আসবেন মঙ্গলপাশায়, পারলে আগের দিনের পত্রিকাগুলোও কিনে আনবেন। মাজেদ জাহান খাতা খুলে ফাউন্টেন পেন দিয়ে ইংরেজিতে একটি টেলিগ্রাম ড্রাফট করার চেষ্টা করেন। চেমন আরার কান্না থেমেছে, তবে এখনো সে বৈঠকখানায় ঝাড়ন দিয়ে খামোখা ঝাড়পোঁছ করছে আর থেকে থেকে তাকাচ্ছে নীরব রেডিওগ্রামটির দিকে। তার উসখুস আচরণে কাচের বয়ামে বন্দী ভোমরার কথা মনে পড়ে মৌলার। নিজের অজান্তে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসকে সামলান তিনি। রাত বাড়ে আর সঙ্গে সঙ্গে সঠিক সংবাদের অপেক্ষায় মঙ্গলপাশার একটি পরিবারের সবার উদ্বেগও বেনোজলের মতো বাড়তে থাকে।