অলঙ্করণ: মাসুক হেলাল
অলঙ্করণ: মাসুক হেলাল

গল্প

গল্পেরা কোথায় থাকে

ঘটাংঘট, ঘটাংঘট, ঘটাংঘট। একটানা শব্দ করে যাচ্ছে মেশিনটা। যে বাসায় থাকি, তার নিচেই মেশিনটা; তারকাঁটা বানানোর মেশিন। সেখান থেকেই ক্রমাগত আসছে শব্দটা। আওয়াজের চোটে লিখতে পারছি না। অথচ গল্পটা শেষ করা জরুরি। কাল বাদে পরশু জমা দিতে হবে।

মুনেম ভাই মানে মুনেম শাহরিয়ার ফোন দিয়ে সেদিন গল্প চাইলেন। পাঁচ তরুণের গল্প ছাপবেন তিনি ‘সময়ের সংলাপ’ নামের মাসিক পত্রিকায়। মুনেম ভাই এখানকার সাহিত্য সম্পাদক। তাঁর ফোন পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। যদিও গল্পকার হিসেবে আমার তেমন পরিচিতি নেই। তবু সময়ের সংলাপের মতো জায়গায় নিজের নাম কালো কালিতে দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না।

গত ছয় মাস যাবৎ একটা গল্প মাথায় নিয়ে ঘুরছি, কিন্তু লেখা হচ্ছিল না। একজন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য সম্পাদকের কাছ থেকে কমলা ছিলবার মতো গল্প লেখার মৃদু অনুরোধে তাড়া অনুভব করে লিখতে বসে গেলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গল্পটা আর আমার হাতে নেই। চাইছি এক রকম, কিন্তু লেখা হচ্ছে আরেক। চরিত্রগুলো মাথা থেকে কাগজে নেমে আসার পর আমাকে আর চিনছেই না যেন। বৃদ্ধ মা–বাবার প্রতি দায়িত্বজ্ঞানহীন সন্তানের মতো আচরণ করছে তারা। এদিকে শব্দটা ক্রমাগত বেড়েই যাচ্ছে।

রাত এখন ১০.৩০ মিনিট। মুনেম ভাই ফোন দিয়েছিলেন কিছুক্ষণ আগে। সম্পাদক সুলভ ভঙ্গিতে জানতে চাইলেন, গল্পের কদ্দুর? তাঁকে আশা-নিরাশার মাঝামাঝি ঘোলাটে একটা উত্তর দিয়ে ফোন রেখে দিলাম। তিনি কী বুঝলেন, সেটা আর বোঝার চেষ্টা করিনি। তবে ইতিবাচক কিছু ভেবে হয়তো রাতে ভালো ঘুমাবেন তিনি! কিন্তু তিনি জানেন না, নিচের শব্দটা আমার সব ইন্দ্রিয়কে কবজা করে রেখেছে এই মুহূর্তে।

সিগারেট ধরাব বলে প্যাকেট হাতে নিয়ে দেখি, শেষ হয়ে গেছে। মাথাটা হালকা করার জন্য নিচে নামা দরকার। নিচে নামতেই কারখানার মালিক রফিক মোল্লার সঙ্গে দেখা। তিনি আমার বাড়িওয়ালাও বটে। আমাকে দেখে অবাক হয়ে জানতে চাইলেন কিছু। কিন্তু নিদারুণ শব্দের কারণে কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। আমি হেসে উঠে মুখ নেড়ে কিছু একটা বললাম। তিনিও হেসে উঠলেন, আমার শুনতে না পাওয়া কথায়।

নিচে নামার পর কোথায় যাব বা কী করব, সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারকাঁটা বানানো দেখতে লাগলাম। একটা গোলাকার লোহার বৃত্তের মাঝখানে পেঁচিয়ে রাখা মোটা তার। সেখান থেকে আরেক মেশিনে চালান করে দেওয়া হচ্ছে তারগুলোকে। যে মেশিনে ঢুকছে তারগুলো, সেটার নিচ দিয়ে বের হচ্ছে মুহুর্মুহু তারকাঁটা। এ দৃশ্য কিছুক্ষণ দেখে সামনে এগিয়ে গেলাম।

নাখালপাড়ার এ অঞ্চলে কম টাকায় বাসা ভাড়া পাওয়া যায় বলে মাস দুয়েক হলো উঠেছি এখানে। নানা ধরনের আওয়াজ এদিকটায়, তাই ভাড়াও কম। চিপাঘিঞ্জি রাস্তা। মানুষগুলোও কেমন তেল–চিটচিটে চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়! খুব সকালে অফিসে চলে যাই, ফিরি রাতে। তাই এই আওয়াজ আর এখানকার মানুষদের সঙ্গে তেমন দেখা-সাক্ষাৎ হয় না আমার। কিন্তু আজকের মতো আওয়াজ আগে কখনো প্যারা দেয়নি।

তাদের ফিসফিস আওয়াজ বেড়ে চলছে। এদিকে রুমের দরজাটাও খোলা দেখতে পেলাম। ঘুরতে থাকা মানুষগুলো হঠাৎ আমাকে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে নিয়ে দরজার দিকে হাঁটা দিল। কেন এমন হচ্ছে আমার সঙ্গে?

গলির মুখে সেলিমের সঙ্গে দেখা। রফিক মোল্লার বাসায় কাজ করে সেলিম। কারখানায়ও সময় দেয়। দেখি, সিগারেট ফুঁকছে ছেলেটি। আমাকে দেখে সিগারেট লুকিয়ে বলল, ‘ভাইজান, এখানে কী করেন?’ তার দিকে তাকিয়ে বললাম, তোদের কাজ শেষ হবে কখন রে? আওয়াজে তো টেকা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। সেলিম হেসে বলল, ‘বন্ধ হইয়া যাইব এখনই। একটা বড় অর্ডার পাইসে তো কাকায়… তাই রাইত কইরা কাজ চলতাসে।’

সেলিমের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে সামনে পা বাড়ালাম। উদ্দেশ্য, একটু হেঁটে আসা। ইতিউতি ঘুরলাম কিছুক্ষণ। রাস্তার মিটমিটে সাদা বাতি, কুকুরের দল ঘুমানোর জন্য জায়গা নিচ্ছে। একটা রিকশা ছুটে গেল সাঁই করে পাশ দিয়ে, পাশের কোনো বাসা থেকে শিশুর বিকট কান্না, অন্য বাসা থেকে ডালে বাগার দেওয়ার শব্দ এবং রসুন ভাজার ঘ্রাণ। এ সবকিছুর মধ্যে আবার ফিরে এলাম। কারখানার মেশিন এখন বন্ধ। গোছানোর কাজ চলছে। সেলিমকে দেখলাম, কিছু একটা মাপছে। রফিক মোল্লা পান খাওয়া লাল দাঁতে হেসে উঠল আমার দিকে তাকিয়ে। ওপরে ওঠার মুহূর্তে রফিক মোল্লার হাঁটুর বয়সী স্ত্রীকে দেখতে পেলাম। লাল শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে দোতলার সিঁড়িতে। আমাকে দেখে মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে গেল। এসব দৃশ্যের ভেতর দিয়ে ঘরে ফিরে আবার লিখতে বসলাম। সবই ঠিক আছে, শান্ত চারপাশ। কিন্তু মাথার ভেতর ঘটাংঘট, ঘটাংঘট, ঘটাংঘট আওয়াজটা করেই যাচ্ছিল।

২.

যে গল্প লিখব ভাবছিলাম, সেটা বোধ হয় আর লেখা হয়ে উঠবে না। একধরনের হতাশা কাজ করছে। অন্য গল্প যে লিখব, সেটাও হচ্ছে না। কারণ, আমি যে তরুণ গল্পকার। প্রতিষ্ঠিত লেখকদের মতো কিছু একটা লিখে ফেলতে পারছি না আর তাঁদের মতো প্রতিভাও নেই আমার। যেকোনো মানুষ বা ঘটনা নিয়ে ফেঁদে ফেলব গল্প, এমনটাও নয়। তাহলে উপায়? এই মুহূর্তে নিজেকে বেশ লোভী মনে হচ্ছে। নিজের নামটা একটু প্রকাশের জন্য কী আপ্রাণ চেষ্টাটাই না করছি! কিন্তু আমি যে হাল ছাড়ছি না, সেটার জন্য আবার নিজেকে কঠিন সংকল্পের মানুষও ভাবছি। এই ধন্দের দোলাচালে খাতায় নানান কিছুর আঁকিবুঁকি চলছে। কিন্তু গল্প; সেটা হচ্ছে না।

এদিকে আবার নতুন ভাবনা ঘুরতে লাগল মাথায়; আচ্ছা, গল্প আসলে কী? সবই তো নানান ঘটনাকে, নানান মানুষকে ভিন্নভাবে বানানো কথার মোড়কে বিশেষভাবে বিশেষায়িত করে তোলার চেষ্টা। এ ছাড়া আর অন্য কিছু কী! আচ্ছা, গল্প কেন লেখে মানুষ? গল্প লিখে কি সমাজ বদলানো যায়? অনেক টাকা পাওয়া যায়? অমানুষকে মানুষ বানানো যায়? কিছুই তো করা যায় না, তবু কেন লেখে মানুষ, যেমনটা আমি এখন করছি! প্রসববেদনায় কাতরাতে থাকা মায়ের উদর থেকে পৃথিবীর আলো দেখতে চাওয়া অভূমিষ্ট শিশুটির মতো বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন সব বাধার দেয়াল ভেঙে। নিজেকে ওই মায়ের জায়গায় আর আমার গল্পের ভাবনাকে শিশুর জায়গায় বসিয়ে দিলাম। ডাক্তার, নার্স, পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষায় আছে, কখন আসবে সে; কিন্তু সে আসতে পারছে না। যদিও নিজের উপস্থিতির কথা, নিজের অস্তিত্বের কথা জানান দেওয়ার জন্য তার আসা খুব প্রয়োজন।

কিছু থেকে কিছু হচ্ছে না দেখে খাটে সটান শুয়ে পড়লাম। কোনো এক বিখ্যাত সাহিত্যিকের লেখায় পড়েছিলাম, তিনি খাটে লম্বা হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে গল্পের ধ্যান করতেন। কিছুক্ষণ পর নাকি তরতর করে গল্প নাজিল হতে থাকত। আমিও সেটা চেষ্টা করে দেখলাম। চোখ বন্ধ করে লম্বা হয়ে শুয়ে আছি। অনেকক্ষণ হলো কিছুই হচ্ছে না। হাল ছাড়ছি না। নিচ থেকে রফিক মোল্লার গলার আওয়াজ পাচ্ছি। সেলিমকে কিছু নিয়ে গালি দিচ্ছেন, ‘বান্দির পোলা, কিছুই করতে পারো না। ভাত তো খাও সোয়া সের।’ হঠাৎ ভাবনা খেলে গেল, আচ্ছা রফিক মোল্লাকে নিয়ে একটা গল্প লিখলে কেমন হয়! কেমন যেন উত্তেজনা কাজ করতে লাগল। তাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম।

আমার বাড়িওয়ালা এবং তারকাঁটা ফ্যাক্টরির মালিক রফিক মোল্লা। বয়স ৬৫ হবে। মোটামতন বেটে গড়নের মানুষটি ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ঠেলাগাড়ির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। ভাইবোন কয়জন, জানি না। শুনেছি দুই বোন ছিল, মারা গেছে ডায়রিয়ায়। তিনিও তাদের সঙ্গে মরতে মরতে বেঁচে গেছেন। কাজের ফাঁকে মক্তবে যেতেন বিধায় নামের শেষে ‘মোল্লা’ উপাধি যুক্ত হয়েছে। ফলে রফিক মোল্লা হিসেবেই সবাই তাঁকে ডাকে। তাঁর পুরো নাম জানি না। এসবই সেলিমের কাছ থেকে শোনা। সেলিম আরও জানিয়েছে, ‘ভাইজান, মামায় কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় রেজাকার আছিল।’ এ তথ্যের সত্য-মিথ্যা যাচাই করা হয়নি কখনো। এই করেই নাকি নাখালপাড়ার এ অঞ্চলের কিছু জায়গার দখল নিয়েছেন। এখানে নাকি খাল ছিল আগে। খাল ভরাট করার কুশীলবদের একজনও তিনি হবেন হয়তো। আচ্ছা, রফিক মোল্লাকে নিয়ে কি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একটা গল্প লিখব, নাকি অন্য কিছু। ভাবছি, কিন্তু কূল করে উঠতে পারছি না। তাঁকে আরেকটু স্টাডি করা প্রয়োজন। তাঁর সম্পর্কে তথ্যগুলো আগে জোড়া দিয়ে নেওয়া যাক বরং। নাখালপাড়ায় রফিক মোল্লার বাড়ি আছে আরও দুটি। মানুষটি বিয়ে করেছেন তিনটি। দুই বউ ছেলে–মেয়ে নিয়ে ওই দুই বাসায় থাকে। তৃতীয় বউকে নিয়ে তিনি থাকেন এই বাসায়। তাঁর ছেলে-মেয়ের সঠিক হিসাব জানি না। এটা জানতে হবে। আমার সঙ্গে দেখা হলে, বেশ আন্তরিক ভঙ্গিতে কুশলাদি জানতে চান। যদিও অন্য ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, কেউ তাঁকে তেমন একটা পছন্দ করে না। কারণ, তিনি নাকি ‘খাটাশ’ স্বভাবের। এ স্বভাবের মানুষেরা কী করে বা কেমন, তা ঠিক আমি জানি না। এটাও জানা জরুরি।

সেলিম আরও একটা গোপন তথ্য জানিয়েছে, ‘মামায় কিন্তু মেসি!’ প্রথমে বুঝি নাই ওর কথা। পরে ভেঙে বলার পর সেলিমকে ঝাড়ি দিয়েছিলাম একটা। সে নাকি চুপি চুপি তাঁদের সহবাসক্রিয়া দেখে। এ কথায় বোঝা গেল, রফিক মোল্লার শারীরিক ক্ষমতা এখনো বিদ্যমান। দাড়ি-টুপি-পাঞ্জাবি পরা আর পান খেয়ে মুখ লাল করে রাখা কালো রঙের মানুষটি তথা সেলিম মোল্লাকে নিয়ে কী গল্প লিখব, ভেবে পাচ্ছি না। তাঁকে চরিত্র হিসেবে ভাবতেও কেমন যেন লাগছে আসলে। বুঝে গেলাম, নাহ, তাকে নিয়ে হবে না গল্প কিংবা আমি পারব না লিখতে তাঁকে নিয়ে।

এরপর নানাভাবে ওকে বোঝাতে চেয়েছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমার জন্য ১০৮টা নীলপদ্ম নিয়ে আসব পৃথিবীর দুর্গম সব অঞ্চল থেকে। আফসানা শেষমেশ বলেছিল, ‘তোমার আসলে কোনো যোগ্যতাই নেই। কল্পনাবিলাসী তুমি একটা অপদার্থ। আর যোগোযোগ করবে না আমার সঙ্গে। আগামী মাসের ১০ তারিখে আমার বিয়ে।’

আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের ভাবনাগুলো পিংপিং বলের মতো লাফাচ্ছে এই মুহূর্তে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে তো আছি। কিন্তু তখনই কল্পনায় আমার অসহায়ত্বের দরজায় দেখতে পেলাম, মুনেম ভাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তাকে কী জবাব দেব? তিনি কি আমার বদলে অন্য কাউকে ভেবে রেখেছেন ব্যাকআপ প্ল্যান হিসেবে? নাহ, ভাবতে পারছি না। আচ্ছা, মুনেম ভাইকে গল্পের চরিত্র করে তোলা যায় কি না, সেটা একবার ভেবে দেখা যাক বরং।

মুনেম শাহরিয়ার, ঢাকার প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য সম্পাদক। নামকরা সব জাতীয় দৈনিকে কাজ করেছেন প্রায় বিশ বছরের মতো। নতুন-পুরোনো, প্রতিষ্ঠিত-অপ্রতিষ্ঠিত প্রায় সব সাহিত্যিকর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং ওঠাবসা। কিন্তু তাঁকে নিয়ে সাহিত্যপাড়ায় অনেক রকম কথা শুনি। অর্থ ও নারী বিষয়ে তিনি নাকি অনেক দুর্বল। অর্থসংক্রান্ত ঝামেলায় শেষবার নাকি চাকরি গিয়েছিল তাঁর।

এ ছাড়া নতুন লিখতে আসা এবং গল্প-কবিতা ছাপতে চাওয়া মেয়েদেরও নাকি মুনেম ভাই ঘুরতে যাওয়ার জন্য কিংবা কখনো কখনো কফির প্রস্তাব দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে মাঝেমধ্যেই নারীরা ইনিয়েবিনিয়ে নানান অভিযোগ করেন। তাঁর একটা পেটোয়া বাহিনী আছে, যখনই এসব অভিযোগ ওঠে, তখনই তারা হামলে পড়ে ওই নারীর চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধারে নেমে পড়ে। তবে সেটা ভার্চ্যুয়ালি সীমাবদ্ধ থাকে বলেই রক্ষা! সরকারি কী কী সব প্রকল্পেও নাকি তিনি কাজ করেন, কাজ পাইয়ে দিতেও তদবির করে থাকেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাহিত্যমনা সচিবগোষ্ঠী নাকি তাঁকে এ সুবিধা দেয়। তার বদলে তিনি তাদের সাহিত্যপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করিয়ে দেওয়ার চোয়ালবদ্ধ সংকল্পে চুপি চুপি কাজ করে যান। এসবই শোনা এবং কিছু দেখা আমার। এ ছাড়া মুনেম ভাই নিজেও লেখেন। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ, সাহিত্য সমালোচনা ইত্যাদি নিয়ে অনলাইন-অফলাইন সবখানেই সরব তিনি। প্রায়বছরই বইমেলায় নতুন নতুন বই আসে তাঁর। সেসব আবার কোনো কোনোটা মেলাতেই পুনর্মুদ্রণ করতে হয় দু–তিনবার। কিন্তু তাঁর কবিতা আমার ভালো লাগে না মোটেই। গল্প-উপন্যাসও তেমন টানে না। শুধু লেখা ছাপানোর জন্যই ফেসবুকে আহ্-উহ্ করে কমেন্ট করেছি কয়েকবার।

মুনেম ভাইকে নিয়ে নানান কথা ভাবতে ভাবতে মনে হলো, নাহ, তাঁকে নিয়েও গল্পটা লেখা যাবে না। তাহলে উপায়! গল্পের সম্ভাব্য দুই চরিত্র মাথা থেকে ঘরের ভেতর নেমে এসে আমাকে নিয়ে যেন উপহাসে মেতেছে। আমি অনুভব করতে পারলাম তাদের উপস্থিতি। এমন সময় সেলিমের বাঁশির শব্দ শুনতে পেলাম। রাত একটু গভীর হলে ছাদে বসে ছেলেটা বাঁশি বাজায় মাঝেমধ্যে। খুব একটা ভালো বাজাতে না পারলেও কেমন যেন একটা দুঃখবোধ আছে সুরের মধ্যে। সেলিমের বয়স কত হবে? উনিশ বা কুড়ি? ভোলায় নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েছে সেই ছোটবেলায়। সেলিমের কাছ থেকেই শোনা, গৃহস্থ পরিবারের সন্তান সে। কিন্তু এক রাতেই মেঘনার বুকে বিলীন হয়ে যায় তার পরিবারের তিলে তিলে জমানো স্বপ্ন। এ দুঃখ সইতে না পেরে তার বাবা মারা যান স্ত্রী আর দুই পুত্রকে রেখে। সেলিমের চাচারা এরপর নাকি তাদের ভার বইতে পারবে না মর্মে ঘোষণা দিলে দুই ভাইকে নিয়ে তাদের মা তাঁর বাপের বাড়িতে চলে যান। নানা-নানি না থাকায় মামাদের সংসারেও থিতু হতে পারেনি তারা। ফলে শেষ উপায় হিসেবে রাজধানী ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য হয় সেলিম, তার ভাই ও মা। কিন্তু এ নগরও তাদের জন্য ফুলের বিছানা নিয়ে বসে থাকেনি। কোনো এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে আগারগাঁওয়ের বস্তিতে ওঠে তারা। তাদের মা অন্যের বাসায় কাজ করত আর সে ও তার বড় ভাই বস্তিতেই থাকত। এভাবে বছরখানেক যাওয়ার পর তাদের জীবনে নামে অন্য দুর্যোগ। সেলিমের বড় ভাই এ জীবন সহ্য করতে না পেরে ঘর ছাড়ে। কোথায় গেছে এবং আদৌ বেঁচে আছে না মারা গেছে, তার খবর জানে না কেউই। শুনেছে, সে নাকি কোনো এক পাচারকারীর মাধ্যমে ভারতে চলে গেছে। এ তথ্যের সত্য-মিথ্যা জানে না সেলিম। কারণ, তার বয়স তখন বেশ কম। এদিকে তার মা যে বাসায় কাজ করত, সেই বাসার মানুষেরা তাদের বৃদ্ধ বাবার সার্বক্ষণিক সেবার জন্য তাঁকে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে রেখে দিতে চায়। এ সবকিছু ছোট্ট সেলিমের মাথার ওপর দিয়ে গেলেও সে ভেবেছিল, এবার বুঝি কষ্টের অবসান হবে। কিন্তু বাদ সাধল ওই বুড়োর ছেলেরা। তারা তাদের নতুন মায়ের ছেলেকে কিছু্তেই নিজের সঙ্গে রাখতে চায় না। অগত্যা তার ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাকে রফিক মোল্লার কারখানায় কাজে লাগিয়ে দেয়।

সেই থেকে প্রায় দশ বছর এখানে আছে সেলিম। থাকা-খাওয়া আর মাসে কিছু বেতন। মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যেত আগে প্রায়ই। সেলিম ভেবেছিল, বুড়োটা মারা গেলে মাকে নিয়ে আবার একসঙ্গে থাকবে। কিন্তু বুড়োটা মারা যায় কয়েক বছর পর। তত দিনে ওই পরিবারকে নিজের ভাবতে শুরু করেন সেলিমের মা। কিংবা ওই জৌলুশ ছেড়ে এই কষ্টের জীবনে আর ফিরতে চান না। একটু বড় হবার পরে সেলিম আর যায়নি কখনো মাকে দেখতে। তবে মাঝেমধ্যে ওই বাসার সামনে নাকি যায় সে। কোনোভাবে মাকে একঝলক দেখেই চলে আসে সে। সবই সেলিমের কাছে শোনা। রফিক মোল্লা খাটাশ প্রকৃতির হলেও তাকে কথা দিয়েছেন, এই ব্যবসার ছোট্ট একটা দিক তাকে ধরিয়ে দেবেন। সেলিমের বেতনের একটা অংশ নাকি তার কাছে জমা থাকে। সে আশায় সেলিম বুক বাঁধে, একদিন তারও নিজের কিছু হবে। এখন সেলিমের সময় কাটে দিনরাত তারকাঁটার কারখানায় কাজ করে, রফিক মোল্লার ঘরের ফরমাশ খেটে আর গলির মুখে দাঁড়িয়ে গার্মেন্টসের মেয়েদের যাওয়া-আসার সময় তাদের সঙ্গে লাইন মেরে।

সেলিমকে নিয়ে এসব ভাবছি কেন? অবচেতনে সেলিমকেও কি তবে গল্পের চরিত্র হিসেবে ভাবতে শুরু করেছি! হতে পারে, কারণ আমি তো এখন ধ্যানে আছি; গল্পের ধ্যানে। সবকিছু নিয়েই ভাবতে পারি, লিখতে পারি; কিন্তু এর কোনোটাই আমার আয়ত্তে নেই আর। শোয়া বাবা হয়ে শুয়ে আছি আর ভাবছি, আয় গল্প, আয় আয়… কিন্তু গল্প আসছে না। কল্পনায় হাজারটা রং চড়িয়েও একটা চরিত্র কিংবা একটা প্লটকে মানুষ করে তুলতে না পারার ব্যর্থতায় নিজেকে খুব শূন্য ও নিঃস্ব মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই লেখালিখি, গল্পকার হওয়ার কাজটা আমাকে দিয়ে ঠিক হবে না। চিরদিনের আড়ালবাসী এই আমার আসলে তেমন কোনো যোগ্যতাও নেই। যেমনটা বলেছিল আফসানা। আফসানা আমার এক্স গার্লফ্রেন্ড। অনার্স জীবন একসঙ্গে কাটিয়ে বিয়ের সময় হয়েছে, এ কথা মনে করিয়ে দেওয়ার পর আমি তাকে বলেছিলাম, চাকরি দেবে কে আমাকে? আফসানা বোকার মতো তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। তখনো ভাবিনি, তার সেই তাকিয়ে থাকার আড়ালে চলছিল অন্য ভাবনা। ছয় মাসেও একটা চাকরি জোগাড় করতে পারিনি। এদিকে আমাদের দেখাদেখিও কমে আসছিল অনেকটা। তখন তারই এক বান্ধবীর কাছে শুনতে পাই, আফসানার তো বিয়ে! এরপর নানাভাবে ওকে বোঝাতে চেয়েছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমার জন্য ১০৮টা নীলপদ্ম নিয়ে আসব পৃথিবীর দুর্গম সব অঞ্চল থেকে। আফসানা শেষমেশ বলেছিল, ‘তোমার আসলে কোনো যোগ্যতাই নেই। কল্পনাবিলাসী তুমি একটা অপদার্থ। আর যোগোযোগ করবে না আমার সঙ্গে। আগামী মাসের ১০ তারিখে আমার বিয়ে।’ আফসানার সঙ্গে সেটাই আমার শেষ দেখা। আমার মতো যোগ্যতাহীন অপদার্থকে পেছনে ঠেলে আমেরিকাপ্রবাসী ছেলেকে বিয়ে করে সুখেই আছে সে। আফসানা আর আমার ব্যর্থ প্রেমের আখ্যান নিয়ে একটা গল্প লিখলে কি খাবে পাঠক? উম… মনে হয় না। বাংলাদেশের ব্যর্থ প্রেমিকদের গল্পগুলো তো প্রায় আমার মতনই। তারা প্রেমিকাকে জয় করতে পারে না, উল্টো প্রেমিকার সন্তানের মামা হয়েই বাকিটা জীবন কাটাতে হয় তাদের।

আম্মাও মনে করতেন, আমি একটা আমড়া কাঠের ঢেঁকি, ‘তোরে দিয়া কিসসু হবে না, রতন।’ এই মুহূর্তে আম্মার কথা খুব মনে পড়ছে। আম্মাই যে আমার মাথায় গল্পের পোকা ঢুকিয়ে দিয়েছেন, সে কথা কি আম্মা জানেন? কী সুন্দর করেই না গল্প বলতেন আমার মা। এত ডিটেইলিং থাকত তার গল্প বলায়। প্রতিটা চরিত্রকে আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করে শ্রোতাকে ধন্দের মধ্যে রেখে শেষমেশ একটা চমক রাখতেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা যেন ও’হেনিরির কোনো গল্প শুনছি! কিংবা হতে পারে, এটা আমার আবেগপ্রবণ মস্তিষ্কের অতি কল্পনা। আমার প্রথম গল্পের বইটা আমি আম্মাকে উৎসর্গ করব, ভেবে রেখেছি। শিউলিগাছের নিচে চিরতরে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটার যদিও এসবে কিছুই আসে যায় না এখন।

নিজেকে নিয়ে ভাবতে আর ইচ্ছে করছে না। শুয়ে থাকতেও ইচ্ছে করছে না। গল্পটা আর বোধ হয় লেখা হয়ে উঠবে না। মুনেম ভাইকে সকালে একটা টেক্সট করে দিতে হবে, ‘ভাই, আমারে মাফ করেন এবারের মতো।’ তরুণ গল্পকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার এই সুবর্ণ সুযোগ মাঠেই মারা যাচ্ছে ভেবে হতাশই লাগছে। আপ্রাণ এই চেষ্টায় এবার ক্ষান্ত দেওয়া প্রয়োজন। উঠে পড়া যাক ধ্যান থেকে!

খেয়াল করলাম, বিছানা থেকে যে উঠব, সেটা কেন যেন পারছি না এই মুহূর্তে। চোখ খোলা আছে কি বন্ধ, সেটাও ঠাহর করতে পারছি না। কারণ, চারদিকে ভীষণ অন্ধকার। আর ঘরের মধ্যে কে যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে। পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। একজন না, আসলে অনেকের পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। হাত-পা নাড়াতে পারছি না কিছুতেই। গলা দিয়েও কোনো আওয়াজ করতে পারছি না। শুধু ভাবনাটা চলমান আছে। অবশ হয়ে গেলাম নাকি আমি? এতক্ষণ গল্পের পেছনে ছুটতে গিয়ে এসব তো খেয়াল করিনি। কেমন যেন ভয় লাগতে শুরু করল। ভয় ভীষণ সংক্রামক একটা বিষয়। একবার মাথার কোনো জায়গা করে নিতে পারলে, পুরো মনে এমনকি শরীরে ছড়িয়ে পড়তে সময় নেয় না। আমার খুব ভয় করছে এখন। আমি কি মারা যাচ্ছি তাহলে? এমন কেন হচ্ছে? পায়ের আওয়াজগুলো এতক্ষণ একটু দূরে থাকলেও এই মুহূর্তে খুব কাছে চলে এসেছে। ফিসফিস করে তারা নিজেদের মধ্যে কথাও বলছে। কিছুই বুঝতে পারছি না, কী বলছে তারা। খুব জোরে একটা চিৎকার দিলাম। কিন্তু গলা ফুঁড়ে সেটা বের হলো না মনে হয়। গোঙানির মতো একটা আওয়াজ পেলাম নিজেই। হঠাৎ নিকষ অন্ধকার কেটে গিয়ে একটা হালকা আলোয় ভরে উঠল চারপাশ। খাটের কাছে ঘুরতে থাকা মানুষগুলোকে আবছা দেখতে পেলাম। সাদা কাপড় জড়ানো গায়ে তাদের। চেহারা দেখা যাচ্ছে না।

তাদের ফিসফিস আওয়াজ বেড়ে চলছে। এদিকে রুমের দরজাটাও খোলা দেখতে পেলাম। ঘুরতে থাকা মানুষগুলো হঠাৎ আমাকে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে নিয়ে দরজার দিকে হাঁটা দিল। কেন এমন হচ্ছে আমার সঙ্গে? তবে কি স্বপ্ন দেখছি? কিন্তু একবারের জন্যও ঘুমাইনি তো আমি। লোকগুলো আমাকে নিয়ে বাসার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। ওই তো, দোতলায় রফিক মোল্লার বাসার দরজা দেখা যাচ্ছে। ‘সেলিম… সেলিম…’ বলে চিৎকার দিলাম। ছেলেটা আছে আশপাশে কোথাও নিশ্চয়ই। কিন্তু না, কেউ নেই আশপাশে। হঠাৎ ধাতব একটা আওয়াজ কানে এল। বেশ পরিচিত লাগছে। আরে এ তো তারকাঁটা ফ্যাক্টরির মেশিনের আওয়াজ- ঘটাংঘট, ঘটাংঘট, ঘটাংঘট… আমাকে লোকগুলো এখানে নিয়ে এল কেন, বুঝতে পারছি না। যে মেশিনের নিচ দিয়ে তারকাঁটা পড়তে থাকে, নিজেকে তার সামনে আবিষ্কার করলাম। যেখান দিয়ে মোটা তার পাচার করে দেওয়া হয় মেশিনের, মানুষগুলো আমার একটা হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে সেখান দিয়ে। প্রচণ্ড ব্যথায় চিৎকার করে উঠলাম। প্রচণ্ড আওয়াজ ছাড়া কিছুই শোনা গেল না। আর খেয়াল করলাম, একটু একটু করে আমি মেশিনের ভেতরে চলে যাচ্ছি। আর টুংটাং শব্দ করে তারকাঁটা হয়ে পড়ছি নিচে। একটা, দুইটা, তিনটা, চারটা, পাঁচটা… মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমার অঙ্গপ্রতঙ্গগুলোকে আলাদা আলাদা করে চেনা যাচ্ছে। ওই তো আমার আঙুল, আমার হাত, পা, নাক, চোখ, কান, আমার মাথা, আমার মগজ... সবই তারকাঁটা হয়ে গেছে। নিজেই একটা তারকাঁটার স্তূপ যেন। সেলিম এসে কিছুক্ষণ পরে হয়তো আমাকে ওজন করে কাগজের প্যাকেটে ঢুকিয়ে বাজারে বিক্রি করে দেবে। তারপর আমি মানুষের ঘরে ঘরে, দেয়ালে, কাঠের খাট-টেবিল, ঘরের চালায় গেঁথে থাকব, আটকে রাখব একের সঙ্গে অন্যকে।

এই ভাবনা ভেবে খুব হাসি পাচ্ছে, যে মানুষ নিজের জীবনের কিছুই আগলে রাখতে পারেনি, সেই মানুষ তারকাঁটা হয়ে গিয়ে সবকিছু জোড়া লাগাতে চায়। হা হা হা...খুব হাসলাম কিছুক্ষণ। পরাবস্তব এই জগতে এসে খারাপ লাগছে না। হঠাৎ চিন্তা খুলে গেল যেন আমার। আচ্ছা, এই অবস্থা নিয়েই গল্পটা লিখি না কেন! এই তো, এই তো… দারুণ প্লট হবে এটা। এখনই লিখে ফেলতে হবে, এখনই। কিন্তু, কিন্তু, কীভাবে লিখব আমি? আমি তো আর আমার শরীরের মধ্যে নেই। হঠাৎ খেয়াল করলাম, তারকাঁটা হয়ে যাওয়া আমার হাতের আঙুলগুলো কী যেন নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে দেখি, আমার কলম ধরে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। আমি উঠে বসার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাকে যে লিখতে হবে, লিখতে হবে এখনই।