ভরা পুন্নিমার রাত আছিলো, উঠানে হাস্নাহেনা গাছ ভইরা ফুল আসছিল সেইবার। ফুলের সুবাসে এমনেই ঘুমাসতে পারতেছিলাম না, হঠাৎ শুনি বাইরে কিসের যেন শব্দ…
কিসের শব্দ মা?
তখন কি আর জানি কিসের শব্দ। দরজা খুইলা বাইরে গেছি, দেখি ফকফকা চান্দের আলোয় একটা পরির বাচ্চা গাছের নিচে শুইয়া রইছে। তার গায়ে হাস্নাহেনার কী যে সুন্দর গন্ধ…
এই পর্যায়ে পরি খিলখিল করে হাসত, তুমি খালি বানায় বানায় কথা কও কেন মা?
শুকনো, ফ্যাকাশে, রক্তশূন্য মুখ। তবু মা হাসত, আল্লার কিরা একটুও মিথ্যা কই না। নাইলে তর নাম পরি হইল কেন? ক দেখি। বুঝা আমারে...
পরি নিজের পেটের ওপর হাত রাখল। মানবশিশু কীভাবে জন্ম হয়, এখন সে জানে। মা তার পরিকে রেখে চলে গেছে, সেই বারো বছর বয়সে। সে যাবে না। কোথাও যাবে না।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। এত এত তরকারি, পোলাও ভাত দুটোই রান্না করা আছে, তবু আপামণির ইচ্ছা করছে এখন রুটি খাবে। কে যেন আটার বড়, ভারী জারটা তিন তাকের ওপরে রেখে দিয়েছে। পেটে বাবু নিয়ে তার লাফাতে ইচ্ছা করে না। টুলের ওপর দাঁড়াতেও ইচ্ছা করে না। ভারী কিছু বহন করতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু তার না করে উপায় নেই। এসব করেই খেতে হয় তাকে। আর এখন না খেয়ে থাকার জো নেই। তার বাবুর খাবার দরকার আছে।
সেদিন গভীর রাতে ফোন করেছে তাকে, বলেছে, পরিবু একটু আসতে পারবা? তোমার আপামণি তো সেমাই খেতে চায়। আমার বা মার বানানো খাবে না। তোমাকেই লাগবে। গভীর রাতে রজব নিজের রিকশায় নিয়ে এসেছিল তাকে। তবে এরা মানুষ ভালো, খুব বারবার ধন্যবাদ বলেছে। বকশিশ দিয়েছে।
আপামণি দাঁড়িয়ে আছে রান্নাঘরের সামনে দেয়াল ধরে। মেয়েটির চেহারা এমনিই ভীষণ আদুরে, এখন আরও বেশি হয়েছে। যেকোনো কথাই সে বলে ঠোঁট ফুলিয়ে, বলতে নেই, সেটা দেখে ভাইয়া গলে গলে পড়ে। সেদিন গভীর রাতে ফোন করেছে তাকে, বলেছে, পরিবু একটু আসতে পারবা? তোমার আপামণি তো সেমাই খেতে চায়। আমার বা মার বানানো খাবে না। তোমাকেই লাগবে।
গভীর রাতে রজব নিজের রিকশায় নিয়ে এসেছিল তাকে। তবে এরা মানুষ ভালো, খুব বারবার ধন্যবাদ বলেছে। বকশিশ দিয়েছে।
যাওয়ার পথে সে অবশ্য বলেছিল রজবকে, এই সময় নাকি হঠাৎ হঠাৎ খাইতে ইচ্ছা করে...
রজব সারা দিন রিকশা চালিয়ে ঘুমিয়েছিল, ভীষণ ক্লান্ত। তার ওপর গভীর রাতে এসব কাণ্ড। সে বিরক্ত গলায় বলেছিল, বড়লোকদের করে মনে হয়। আমি জানি না।
যদিও মনে মনে ভাবছিল পরি, আমারও ইচ্ছা করে। আমার মায় গুঁড়া শুঁটকি দিয়া শাপলা রান্না করত, সেইটা...আর একদিন আপায় আইসক্রিম খাওয়াইছিল, সেইটা...আর...
ধ্যান ভাঙল, আপা বলছে, টেনে টেনে, পরিবু, আর কতক্ষণ?
একটা চেয়ার টেনে রান্নাঘরে বসেছে মেয়েটা, ‘প্রথম তিন মাস কিছু খেতে পারিনি। গন্ধ। বমি। তাই এখন উশুল করে নিচ্ছি’, হেসে নিজের পেটে হাত বুলাল সে।
কয় মাস চলে আপা? পরি ফিসফিস করল। কেন যেন মনে হচ্ছে ঠিক তার মতোই ওনারও চার মাস। অবশ্য তার নিজের পেট দেখে কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই এখনো।
চার মাসের কিছু বেশি। তোমার ভাইয়া কিছুতেই চাকরিটা রাখতে দিল না, দেখলে না? হায় রে, ছেলে আর ছেলের মা মিলে কান্নাকাটি। হাহাহাহা। ওনাদের বংশ কিনা...
রজবের বাবা–মা আছে। মহিলা মাঝে মাঝে এসে থাকে তাদের সঙ্গে। তবে বান্দীর বেটি ছাড়া পরিকে সম্বোধন করতে পারেন না। কথা সত্য, তাই এর প্রতিবাদ করা হয়ে ওঠে না। পরির কখনো বাবা ছিল না। তার এই অত্যধিক সুন্দর চেহারার রহস্য কোনো দিন জানা যায়নি। ওসব পাড়ায় পেট বেঁধে গেলে বাবার নাম বলা নিষিদ্ধ।
সে খুব খুশি, বুঝেছ? প্রথম যেদিন টেস্ট করে কনফার্ম করেছি, সেদিন তো কোলে করে ঘরে এনেছে। এখনো এমন করে...পাগল একটা…
রজব অখুশি হয়নি। কিন্তু খুশি কি হয়েছিল? খুব খুশি? মনে হয় না।
শারীরিক সৌন্দর্য তাকে কোনো একটা জায়গায় বেশি দিন কাজ করতে দেয় না। পুরুষেরা ছোক ছোক করে, আর না করলেও নারীরা নিরাপদবোধ করে না। বস্তির ঘর, তবু ভাড়া দেওয়া কষ্ট। না খেয়ে থাকা, হয়তো দিনে এক বেলা। গরমে শীতে বৃষ্টিতে একই পোশাক। তাই হয়তো স্বামী খুশির চেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল বেশি।
পরির বাঁধা কোনো কাজ ছিল না। শারীরিক সৌন্দর্য তাকে কোনো একটা জায়গায় বেশি দিন কাজ করতে দেয় না। পুরুষেরা ছোক ছোক করে, আর না করলেও নারীরা নিরাপদবোধ করে না। বস্তির ঘর, তবু ভাড়া দেওয়া কষ্ট। না খেয়ে থাকা, হয়তো দিনে এক বেলা। গরমে শীতে বৃষ্টিতে একই পোশাক। তাই হয়তো স্বামী খুশির চেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল বেশি, বাড়তি কোনো আগ্রহ দেখায়নি।
ছোটবেলা থেকে আমার বাবুর শখ জানো? গত তিন বছর উফ... কী যে খারাপ গেছে… প্রতিবার পিরিয়ড হতো, আমি, সুমন, আম্মা কাঁদতে বসতাম...হাহাহাহা...
পরিরও খুব শখ ছিল নিজের বাবুকে আদর করার। তার মা করতে পারেনি। বেঁচে ছিল যখন, তখনো পারেনি। পরিকে বাইরে বসিয়ে ঘরে অচেনা পুরুষ নিতে হতো তাকে। তবে মা কাঁদত খুব। কেন আল্লাহর দান পরিকে তার যোগ্য আদর দিতে পারছে না, এই ভেবে।
পরি দেবে, একটা শিশুকে যা যা দেওয়া দরকার, যা যা দেওয়া যায় সব দেবে। আর সে ছেড়ে যাবে না। মা মরে যাওয়ার পর তার যে কষ্ট হয়েছিল, যে কষ্টের দিন তার গেছে, সেই কষ্ট সে কাউকে দেবে না।
মেয়েটা খেলো না। একটা রুটি কোনোমতে গিলেছে। সে নিজের ঘরে চলে যেতেই পরি হামলে পড়ল। কেউ দেখছে না।
‘খাও, তুমি খাও’—সে আবার নিজের পেটে হাত রেখে বলল।
সাত মাসের সময় আপামণির মা–ও চলে এলেন। বাকি দুই–তিন মাস এখানেই থাকবেন। তিনি এসেই অবশ্য পরিকে নিয়ে পড়লেন, আরে এই মেয়ে প্রেগন্যান্ট, তোরা বুঝতেই পারলি না? বিদায় কর শিগগিরই, এখন নিজেদের ঝামেলা, এর মধ্যে কাজ করা মানুষের দরকার, দুদিন পর অসুস্থ হয়ে বসে থাকলে তো আমাদের চলবে না...
পরি শুনতে পায় আপামণি ফিসফিস করে, এখন ছাড়িয়ে দিলে কাজ পাবে কোথায়? না খেয়ে থাকবে এই সময়?
আর পরিকে বলে, তুমি কেন এত দিন বললে না? এখন থেকে কাপড় ধোয়ার জন্য ছুটা বুয়া রাখব আরেকটা, তোমাকে ধুতে হবে না।
শেষে তিনজন বুয়া হওয়ার কারণে পরির বেতন কমে গেল একটু। কিন্তু এটা সত্যি, এখন পেট নিয়ে আরেকটা কাজ পাওয়া সত্যি মুশকিল হবে। কিন্তু বাবুটা যখন চলে আসবে পৃথিবীতে? তখন কীভাবে কলিজার টুকরাটাকে রেখে কাজ করবে পরি? জন্মান্তরের স্মৃতির মতো এক টুকরা স্মৃতি তার মস্তিষ্কে ঢুকে আছে। সে কাঁদছে গলা ফাটিয়ে, মা নগ্ন শরীরে বিছানায় ব্যস্ত।
বাচ্চা হয়ে গেলে তো আসতে পারবে না। আমার জন্য তোমার মতো লক্ষ্মী একটা মানুষ খুঁজে দিয়ে যাবে, কেমন? ঠোঁট ফুলিয়ে মেয়েটা বলে।
পরি ঘুরে ঘুরে তাদের ঘর দেখে। যার এখনো জন্ম হয়নি, তার জন্য বিশাল একটা ঘর সাজাচ্ছে ওরা। গোলাপি বিছানা, গোলাপি ঘরের দেয়াল। গোলাপি জামা, ছোট ছোট গোলাপি জুতো, আর ফোমের পুতুল শ খানেক। এগুলোর দাম কত হতে পারে, পরি ভাবে। তাদের কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছরের খাবার খরচ উঠে আসত না?
কিন্তু আজ তার কিছু ভালো লাগছে না। ওই বাড়ির সুন্দর, পরিষ্কার ঘর চোখে ভাসছে। এখানে নর্দমার গন্ধ, মশা। ইশ্, বাবুটা বের হওয়ার পরপরই মশা কামড়াবে না তো? আচ্ছা, তার বুকে দুধ আসবে তো? আপামণি যে দুধ আসবার জন্য কী কী সব খেত? তারপরও ভাইয়া ফর্মুলা না কী যেন এনে ঘর ভরাল?
ভাইয়া পেটে হাত দিয়ে হাসে, অনাগত সন্তানের সঙ্গে কথা বলে। একেকবার বাচ্চাটা নড়ে উঠলে আপুমণি ঠোঁট ফুলিয়ে ডাকে, কই, এসো...আর উনি দৌড়ে আসেন। রজবকে এক রাতে ডেকে পরি বলেছিল, দেখো দেখো কেমন নড়তেছে...
রজব বিরক্ত হয়ে পাশে ফিরে শুয়েছিল। ঢঙের কথা বাদ দাও, বলেছিল সে।
পানি ভাঙা, ব্যথা ওঠা—ইত্যকার নানা কথা শুনেছে পরি। পেটের ভেতর ছোট মানুষটা একটু নড়ে উঠলেই তাই সে বলত, আরেকটু অপেক্ষা করো। পানি ভাঙুক। অথচ এদের রকমসকম আলাদা। একদিন সকালে উঠে বলল, আজ হাসপাতালে যাবে, কাল অপারেশন।
কাপড়চোপড় এমনকি মেকআপের সরঞ্জাম গুছিয়ে দিয়েছে পরি। মেয়েটা তার হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলল, তোমারও তো দেরি নেই। আজ বাড়ি চলে যাও। পরে কথা বলে দেখব কী করা যায়...
অনেক দিন পর সকাল সকাল বাড়ি ফিরল পরি। বস্তির তাসলিমা আপাকে বলা আছে, ব্যথা উঠলেই রাত হোক দিন হোক খবর দিলেই হয়ে যাবে। কিন্তু আজ তার কিছু ভালো লাগছে না। ওই বাড়ির সুন্দর, পরিষ্কার ঘর চোখে ভাসছে। এখানে নর্দমার গন্ধ, মশা। ইশ্, বাবুটা বের হওয়ার পরপরই মশা কামড়াবে না তো? আচ্ছা, তার বুকে দুধ আসবে তো? আপামণি যে দুধ আসবার জন্য কী কী সব খেত? তারপরও ভাইয়া ফর্মুলা না কী যেন এনে ঘর ভরাল?
আচ্ছা পরির বাবু কি পেট ভরে খেতে পারবে কোনো দিন? আর সুন্দর জামা জুতো? স্কুলে যেতে পারবে? টাকাপয়সার জোগান হবে?
রাতভর বৃষ্টি হচ্ছে আজ। পরি টের পাচ্ছে চিনিক দেওয়া একটা ব্যথা একটু পরপর এসে আবার চলে যাচ্ছে। অথচ ছনের ফাঁকা দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ভিজিয়ে যাচ্ছে তাকে। ঘরের ভেতরেই কাদা হয়ে গেছে। উফ্। আজ মনে হচ্ছে বাবুটা না এলেই হতো। শুধু শুধু ডেকে এনে কষ্ট দেওয়া... আলতো করে রজবের গায়ে হাত রাখল সে।
শুনতেছ? যদি হাসপাতালে আপার বাচ্চাটা মইরা যায়, সবচেয়ে ভালো হইব। আমি বলমু, আমারটা নেন, আপায় খুশি হইব। অন্তত আমার চান্দের টুকরাটা সুখে থাকব...
কী সব আজেবাজে কথা কও, ঘুমাইতে দাও...
না মরলেও তুমি গিয়া মুখে লবণ দিয়া মাইরা আসতে পারবা না? আমার বাবুর কষ্ট আমি সহ্য করতে পারব না। আমি জানি কষ্ট কারে বলে...
চুপ থাক।
তুমি জানো সব বাচ্চার চেহারা এক হয়, এরা সব ফেরেশতা। একদিন আপার বাবুরে দেখতে যাবার নাম কইরা বাচ্চাটা পাল্টাপাল্টি কইরা দিই যদি? তালে কেমন হয়?
রজব চুপ। হয়তো বুঝতে পারছে, এসব কথা শোনার বা উত্তর দেবার কোনো মানে নেই।
পরি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তাসলিমা আপারে ডাকো। আমার সময় হইছে।