মাসুক হেলালের অলংকরণ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
মাসুক হেলালের অলংকরণ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

গল্প

কালো নদীর মতো সড়ক

রাস্তার পাশের প্রতিটি বড় গাছের গায়ে শক্ত ছালবাকল একটুখানি চেঁছে সাদা অংশ বের করে তার ওপর লাল রং দিয়ে নম্বর বসানো হয়েছে—৭২, ৭৩, ৭৪, ৭৫। এই নম্বর আসলে মৃত্যুপরোয়ানা। যেকোনো দিন ইলেকট্রিক করাত নিয়ে কন্ট্রাক্টরের লোকজন এসে নিমেষের মধ্যে গাছগুলো কেটে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। কী বড় বড় একেকটা বয়সী গাছ! বেশির ভাগই ঝিরঝিরে চিরল পাতার মোটাসোটা কড়ই। দু-একটা বট, কৃষ্ণচূড়া, মেহগনি, আম, জামের গাছও আছে। গাছদের বোধ হয় মানুষের মতো মৃত্যুভয় নেই। মাথায় নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড নিয়েও কেমন অটল অবিচল ভঙ্গিতে স্থির দাঁড়িয়ে আছে! ওদের যেহেতু কবর হয় না, তাই কবর আজাবের ভয়ও নেই। পরকালের বিচার, দোজখ, বেহেশত ইত্যাদি নিয়েও কোনো হেলদোল নেই। অবশ্য বিচার তো হয় অপরাধীদের, যারা সারা জীবন এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে থেকে নীরবে শুধু সবার উপকার করে যায়, তাদের আবার বিচার কী? কড়া রোদে কড়ইগাছের নিচের ঘন ছায়ার শীতলতায় নিজের রিকশার সিটের ওপর পা তুলে আরাম করে আধশোয়া ভঙ্গিতে বসে ওদের মতো নির্ভয়-নির্ভার হতে ইচ্ছা করে মোতালিব মিয়ার। গাছের পাতাদের নাড়িয়ে দিয়ে একপশলা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেলে ঘুমে তার ক্লান্ত চোখ দুটো জড়িয়ে আসতে চায়। কিন্তু ট্রাক ড্রাইভারদের প্যাঁ-পোঁ শব্দে কি আর ঘুমানোর উপায় আছে? একেকটা গাড়ি যেন ইস্রাফিলের শিঙায় ফুঁক দিতেছে। আর একটু জায়গা খালি পাইলেই এমন জোরে টান দেয়, সেই টানের চোটে যেন দুই মণ বালু আসমানে-জমিনে ছড়ান দিয়া যায়। মোতালিব মিয়া বিরক্ত হয়।

রাস্তা বড় হচ্ছে বলে গ্রামের সবাই খুব খুশি। এমনকি মোতালিব মিয়ার বউ হালিমা, যে কিনা কালেভদ্রে বাড়ির বাইরে বের হয়, সেও খুশিতে ডগমগ হয়ে পান খাওয়া দাঁত বের করে স্বামীকে বলেছে, ‘আমাগো রাস্তা নাকি বড় হইব!’

‘হইলে হইব। তোমার কী? তুমি কি হেই রাস্তা দিয়া মোটরগাড়ি চালাইবা?’

‘কী যে কন! আপনে বরং একটা ব্যাটারি গাড়ি কিনেন। তাইলে আর প্যাডেল মাইরা কষ্ট করন লাগব না!’

ব্যাটারি মানে অটো! ওই সব চালায় তো উঠতি বয়সের ছোকরারা। জিনসের প্যান্ট পিন্দা, আন্ধাগোন্ধা যেদিকে ইচ্ছা টান মারে। রাস্তার আওভাও কিচ্ছু মানে না, চিপাচুপায় গাড়ি হান্দায়া জ্যাম বাজায়া বইয়া থাকে। মোতালিব মিয়ার প্যাডেলই ভালো। গতি কম, চালাইতে শক্তি ক্ষয় হয়, কিন্তু তারপরও তার শান্তি লাগে।

আজকাল অবশ্য প্যাসেঞ্জারদের মনমানসিকতাও পাল্টে গেছে। তারাও প্যাডেল মারা রিকশায় উঠতে চায় না। অটোর জন্য অপেক্ষা করে আর মোতালিবের রিকশাকে পাশ কাটিয়ে অটোতে চড়ে মদনপুরের দিকে রওনা দেয়। মোতালিবের বান্ধা প্যাসেঞ্জার ‘নতুন পাতা কিশলয় স্কুলে’র অঙ্ক দিদি সুমিতা সাহা। প্রতিদিন সকালে তাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বিকেলে আবার বাড়িতে নিয়ে আসে মোতালিব।

‘ওই সব অটোফটো যারে নাকি এখন মানুষে টেসলাফেসলা বলে, ওই সবে উঠলে আমার খালি বুক কাঁপে। মনে হয় উড়ায়া নিয়া কই না জানি ফালায়া দিব,’ দিদি বলে। ‘আমার বাবা অত তাড়াহুড়া নাই, তুমি আস্তেধীরে যেমনে চালাও তেমনেই আমার চলব।’

‘কত্ত সুন্দর ঝকঝকা রাস্তা হইতাছে, এই রাস্তায় কি আপনের লক্কড়ঝক্কড় রিকশা মানায়? সময় থাকতে রিকশা বদলান চাচা, এই যুগে পায়ের রিকশা অচল। সবকিছু চলে যন্ত্রে, আপনের কষ্ট কইরা পা চালাইতে হবে না, খালি ব্রেক ধইরা বইসা থাকবেন...’

এ রকম দু-চারজন বাঁধা খদ্দের আছে বলেই মোতালিবের অসুবিধা হয় না। কষ্টেসৃষ্টে দিন চলে যায়। মোতালিবের ছেলে জনিও মায়ের মতোই ব্যাটারি গাড়ির পক্ষে। রাস্তা বড় হইলে, খানাখন্দ বন্ধ হইলে অটো চালাইলেই সুবিধা, সাঁই কইরা যাইব, পাশাপাশি রোজগারপাতিও বাড়ব বলে বাপকে বোঝায় সে। জনির জ্ঞান-বুদ্ধি ভালো, প্রাইমারি স্কুলে ফাইভ কেলাশে পড়ে, সে বাপকে হিসাব করে দেখিয়েছে, সাধারণ রিকশায় প্যাডেল মেরে সারা দিনে ১০-১৫টির বেশি ট্রিপ দেওয়া যায় না, সেখানে প্যাডেল মেরে ডাবল মানে ৩০-৩২টি ট্রিপ মারা যায়। ট্রিপ বেশি, টাকাও বেশি। তা ছাড়া রিকশা টানার চেয়ে খাটুনিও কম। ছেলের কথায় ভুল নেই জানে মোতালিব, কিন্তু অটো কেনার টাকা কই পাবে সে? কম কইরা হইলেও লাখ–দেড় লাখ টাকার মামলা। ভিটাবাড়ির আড়াই শতক জায়গা ছাড়া বিক্রি করার মতোও তো তেমন কিছু নাই তার। ভাড়ায় একটা অটো চালাতে পারে, কিন্তু মহাজনরে জমার টাকা দিয়া হাতে তখন তেমন কিছু থাকে না।

আবার প্যাঁ করে হর্ন দিয়ে একটা ছয় চাকার ট্রাক আসতে দেখে মোতালিব মিয়া সিট থেকে নেমে রিকশায় প্যাডেল মারে। এখানে বসে থেকে প্যাসেঞ্জার পাওয়া যাবে না বোঝা হয়ে গেছে তার। রাস্তার পাশে হলুদ হেলমেট আর কমলা ভেস্ট গায়ে দিয়ে শ্রমিকেরা রডের ওপর রড জোড়া দিয়ে ফুটপাত বানায়। ঘরঘর শব্দ করে ঢালাই মেশিন চলে। একদল শ্রমিক ঢালাইয়ের কাজ করে। তাদের পেরিয়ে অলিপুরের কাছে এসে একজন প্যাসেঞ্জার জোটে মোতালিবের। কালো বোরকায় সর্বাঙ্গ ঢাকা এক নারী। শুধু চোখ দুটো ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান না হওয়ায় মোতালিব তার বয়স আন্দাজ করতে পারে না। রিকশা একটু এগোতেই পেছন থেকে সেই নারী রিনরিনে কণ্ঠে বলে,

 ‘চাচা মিয়া, মেশিনের রিকশা নিতে পারেন না? আজকাল কি আর এই রিকশা চলে? আপনেরে পিছনে ফালায়া দেখেন সবাই আগে চলে যাইতেছে!’

‘মেজাজটা কেমন লাগে? নিজের চোক্ষে দেইখাই তো উঠছস, এখন আবার এই সব কস কেন?’ রাগে মোতালিবের গা জ্বলে। সে কোনো উত্তর না দিয়ে আরও জোরে জোরে, আরও ঘন ঘন প্যাডেল মারে। নারী অবশ্য থামে না। যেন আপন মনেই বকে যায়।

‘কত্ত সুন্দর ঝকঝকা রাস্তা হইতাছে, এই রাস্তায় কি আপনের লক্কড়ঝক্কড় রিকশা মানায়? সময় থাকতে রিকশা বদলান চাচা, এই যুগে পায়ের রিকশা অচল। সবকিছু চলে যন্ত্রে, আপনের কষ্ট কইরা পা চালাইতে হবে না, খালি ব্রেক ধইরা বইসা থাকবেন...’

এই অযাচিত উপদেশ তার একটুও ভালো লাগছে না, পারলে এখনই এই প্যাসেঞ্জার নামিয়ে দিত মোতালিব মিয়া, কিন্তু সেইটা ভালো দেখায় না বলে সে তার কথা কানে না দিয়ে কুঁজো হয়ে ঝুঁকে একমনে রিকশা টানতেই থাকে। তার রিকশার গা ঘেঁষে ভোঁ-ভোঁ করে অটোগুলো সামনে ছুটে যায়। হাতুরাপাড়ার কাছে এসে বোরকা পরা যাত্রী নেমে গেলে মোতালিব বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। উফ্, এদিককার চেনা পথঘাট একদম অচেনা হয়ে গেছে, রাস্তা বড় করার জন্য দোকানপাট ভেঙে, গাছপালা কেটে, মাটি খুঁড়ে কোথাও ঢিবি বানিয়ে, কোথাও গর্ত করে, যা–তা অবস্থা।

মোতালিব বউয়ের কথার পিঠে কিছু বলে না। লুঙ্গির খুঁটে তার ছোট্ট বাটন ফোনটা গুঁজে অটো নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে রওনা হয়। পেছন থেকে হালিমা কেমন খুশি খুশি গলায় বলে ওঠে, ‘যাক, ওই দিন একসিডেনটা হইছিল দেইখ্যা না আপনে অটো কিনতে রাজি হইলেন!

মোতালিব একটু অন্যমনস্ক অবস্থায় বাঁ দিকে রিকশার মুখ ঘোরাতেই কোথা থেকে ঘোঁত ঘোঁত করে বুনো শূকরের মতো একটা মোটরসাইকেল এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল তার রিকশার ওপর। মুহূর্তের মধ্যে মোটরসাইকেলের দুই আরোহী ছিটকে পড়ল রাস্তায়, রিকশার সামনের চাকা, শিক ভেঙে দুমড়েমুচড়ে কাত হয়ে পড়ে গেল। তবে ভাগ্য ভালো যে মোতালিবের গায়ে, হাতে, পায়ে সামান্যই আঘাত লাগল। আশপাশ থেকে মানুষজন ছুটে এসে মোটরসাইকেল আরোহীদের ধরে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে থাকলে নিজের ছড়ে যাওয়া রক্তাক্ত হাঁটু–কনুইয়ের ব্যথায় নয় বরং রিকশার দুরবস্থা দেখে নীরবে কেঁদে ফেলল মোতালিব। 

ছেলে জনি আর বউ হালিমা মিলে একমত হয় যে টাকা খরচ করে এই রিকশা ঠিক করিয়ে আর লাভ নেই, ভাঙা রিকশাটা বেচে দিয়ে, আরও কিছু টাকা জোগাড় করে একটা অটো কিনে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। হালিমার সৌদিপ্রবাসী ভাগনিজামাই খালাশাশুড়িকে ৫০ হাজার টাকা হাওলাত দিতে রাজি হয়েছে। ৭০ হাজার নেওয়া যাবে লাভের ওপরে মানে মেম্বরের ছেলের কাছ থেকে সুদে। তাতে হচ্ছে ১ লাখ ২০ আর বাকি ৩০ হাজার টাকা হালিমা সমিতি থেকে কিস্তিতে লোন নেবে।

এভাবে দৌড়াদৌড়ি শেষে দেড় লাখ টাকা জোগাড় করে একটা খটখটে লৌহময় চেহারার সেকেন্ড হ্যান্ড অটোর মালিক ও চালক বনে গেল মোতালিব। শরীরটা একটু রেহাই পেল, কামাই রোজগারও একটু বাড়ল (যদিও লাভের গুড় কিস্তি আর সুদ দিতে দিতেই শেষ)। তবে ছেলে–ছোকরাদের মতো আন্ধাগোন্ধা গাড়ি চালায় না মোতালিব। দেখেশুনে ধীরেসুস্থে টানে। রাস্তা বড় করার কাজ চলছেই, মূল সড়ক এখনো এবড়োখেবড়ো, এখানে–সেখানে খানাখন্দ, গর্ত। একটু অসাবধান হলে অটোও উল্টে যেতে পারে। মাঝে মাঝে আনাড়ি ড্রাইভারদের হাতে পড়ে চোখের নিমেষে কত অটো উল্টে যেতে দেখেছে মোতালিব। এত দিনকার পরিচিত রাস্তাটাকে মাঝে মাঝে কালো নদীর মতো মনে হয় তার, যেই নদীতে ছোট ছোট নৌকার মতো অটো চলে, সিএনজি চলে, ছিপছিপে ডিঙির মতো খেয়াল–খুশিতে ভাসে হোন্ডা, মোটরসাইকেল, বড় জাহাজের মতো হেলেদুলে চলে যায় বাস–ট্রাক, ছোট লঞ্চের মতো মোটরগাড়ি। যে যেমনে পারে কালো স্রোতের ওপর কাঠের টুকরার মতো ভাসতে থাকে। রাতের বেলা মোতালিব স্বপ্ন দেখে তার টিনের ঘরের ওপর দিয়ে, মালসামানা ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দিয়ে, মাটি সমান করে বন্যার পানির মতো লকলকিয়ে, কল কল করে, এঁকেবেঁকে রাস্তা চলে যাচ্ছে।

হালিমাকে সকালবেলা স্বপ্নের কথা বললে সে মোতালিবকে ভাত বেড়ে দিতে দিতে বলল,

‘যা দেখছেন ভালোই দেখছেন। সারা দিন রাস্তার মইধ্যে থাকেন, স্বপ্নে রাস্তা দেখবেন না তো কি? রাস্তাই আপনের ঘরবাড়ি।’

মোতালিব বউয়ের কথার পিঠে কিছু বলে না। লুঙ্গির খুঁটে তার ছোট্ট বাটন ফোনটা গুঁজে অটো নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে রওনা হয়। পেছন থেকে হালিমা কেমন খুশি খুশি গলায় বলে ওঠে, ‘যাক, ওই দিন একসিডেনটা হইছিল দেইখ্যা না আপনে অটো কিনতে রাজি হইলেন! সব মন্দেরই কইলাম একটা ভালো দিক থাকে!’

ব্যস, ওইটুক মাত্র সময়। পকেট থেকে টাকা বের করে কিশোরের হাত থেকে মলমটা নেওয়া পর্যন্ত, ফিরে এসে মোতালিব দেখে তার অটো নাই। কিরে ভাই? একটু আগেও তো এইখানে আমার গাড়িটা ছিল, এখন কই গেল?

আকাশটা সেদিন একটু মেঘলা ছিল। ছোট ছোট দুইটা ট্রিপ মেরে গোলাকান্দাইলের হাটে যাওয়ার দুজন প্যাসেঞ্জার পেয়ে গেল মোতালিব। এই হাটের ভারি নামডাক, দরকারি সবকিছুই এখানে পাওয়া যায়, প্রতি বৃহস্পতিবার হাট জমে ওঠে। প্যাসেঞ্জারদের হাটের সামনে নামিয়ে গাড়িতে বসেই ফিরতি প্যাসেঞ্জারের জন্য অপেক্ষা করছিল মোতালিব। আরও অনেক অটোই সেখানে ছিল লাইন ধরে। হাটের এ মাথায় ঝাঁকাভর্তি হাঁস নিয়ে বসেছে বিক্রেতারা। পাশের একটু ঢালু জায়গাটা এতক্ষণ ফাঁকাই ছিল। হঠাৎ যেন সেখানে মাটি ফুঁড়ে উদয় হলো এক আজব মানুষ, আধময়লা, কোঁচকানো লাল জামা–পায়জামা পরনে, থুতনিতে পাখির পালকের মতো ফিনফিনে দাড়ি, মাথায় লম্বা কোঁকড়া চুল, হাতে চোঙা, কাঁধে ব্যাগ, সঙ্গে পায়ে ঘুঙুরবাঁধা এক মিষ্টি কিশোর। চোঙা ফুঁকে লোকটা সুর করে গান ধরে, সঙ্গে নেচে নেচে, অভিনয় করে, হাতের ডুগডুগি বাজিয়ে ধুয়া ধরে সেই চটপটে কিশোর—    

‘আরে ভাই, কত মানুষ কত ভাবে খাউজানির জ্বালায় বাঁচে না,

চামড়া ছিঁড়া রক্ত বাইর অয় খাউজানি তো থামে না,

শইল্যের চিপায়–চিপায়, বগলতলায়, ভাঁজে ভাঁজে, খাঁজে খাঁজে...

মা-বোনেরা খাউজানিতে কাজ করতে পারে না

আমার কথা সত্যি কি না যাচাই করে দেখেন না...’

একজন–দুজন করে তাদের ঘিরে কৌতূহলী মানুষ জমা হতে থাকে। তাদের চোখে বিশ্বাস–অবিশ্বাসের দোলা। মোতালিবের তখন হঠাৎ মনে পড়ে হালিমাও একবার তার চুলকানির উপসর্গের কথা জানিয়েছিল। বলেছিল, বাজার থেকে মলম আনতে। মোতালিব ভুলেই গিয়েছিল সেই কথা। হাটের লোকজন এরই মধ্যে ওই ক্যানভাসারকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। লোকটা এবার তার ঝোলা থেকে বের করে এনেছে আশ্চর্য মলম। মাত্র ৩০ টাকার এই মলম সমস্ত দাউদ, এগজিমা, খুজলি, পাঁচড়া নিমেষে ভালো করে দেবে। বিফলে মূল্য ফেরত। মোতালিব গাড়ি থেকে নেমে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওই জটলার দিকে এগিয়ে যায়। এই ওষুধে যদি হালিমার চুলকানি ভালো হয় তবে আর দেরি কেন? লোকটা সুর করে গান গাইছে, ‘আরে, বন-বনাজির গুণে ভরা এমন মলম পাইবেন না, জাপান গেলেও মিলত না ,’ ব্যস, ওইটুক মাত্র সময়। পকেট থেকে টাকা বের করে কিশোরের হাত থেকে মলমটা নেওয়া পর্যন্ত, ফিরে এসে মোতালিব দেখে তার অটো নাই। কিরে ভাই? একটু আগেও তো এইখানে আমার গাড়িটা ছিল, এখন কই গেল? মোতালিব কেমন হতবিহ্বল হয়ে যায়। অটো তো আর ছোটখাটো কিছু জিনিস না যে কেউ এত মানুষের চোখের সামনে চাদরের তলে ভরে নিয়ে যাবে, সে পাগলের মতো মাথা থাপড়ায়। বিষ খাওয়া ইঁদুরের মতো এদিক–সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। হাট করতে আসা মানুষজন এসে তাকে ঘিরে ধরে, ‘কী হইছে ভাই? কী হইছে?’

মোতালিবের হয়ে কয়েকজন উত্তর দেয়, ‘হের আটো চুরি হইছে!’

‘হায় হায়, কয় কী? ও মিয়া, অটোখান কই রাখছিলা? কেডা নিল? এইডা একটা কথা...’

চারপাশ থেকে টুকরা টুকরা মন্তব্য ভেসে আসে। ‘পুলিশ ফাঁড়িতে যাও। বাজার কমিটিরে জানাও। হেরাই পারব অটো উদ্ধার করতে।’ 

মোতালিবের দিশাহারা কানে এসব কথার কিছুই পৌঁছায় না। তার হঠাৎ মনে হয়, হাত–পা অবশ হয়ে তার চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। কালো সড়কটা এইবার বড় হতে হতে তার বুকের ওপর দিয়ে রক্ত, মাংস, হাড়, পাঁজর গুঁড়ো করে সামনের দিকে চলে যাচ্ছে।