‘তোর পার্পল কালারের মাইসোর সিল্কটা ধার দিবি?’
ফোনে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে নাদিয়া বলে। সাবরিনা তখন মাত্র অফিস থেকে ফিরে লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে নেটফ্লিক্স ঘাঁটছিল সুবিধামতো একটা সিনেমা খুঁজে পাওয়ার আশায়। ফোনটা নাদিয়ার না হলে সে ধরতও না।
‘ওটা তো লন্ড্রিতে দিয়েছি, শেষবার পরার সময় পাড়ে কাদা লেগেছিল। অন্য কোনো শাড়ি হলে চলবে?’
‘উমম…তাহলে বেগুনি কাঞ্জিভরমটা দে। প্রীতি আর রায়হানের রিসেপশনে যাব। ওরা কালার কোড দিয়েছে পার্পল।’
রায়হান বিয়ে করেছে এই খবর সে জানত না।
‘তাই নাকি? কবে বিয়ে করল ওরা?’ নিস্পৃহভাবে জিজ্ঞেস করে সে।
‘আক্দ হয়েছে গত পরশু দিন। কেন তুই ফেসবুকে দেখিসনি? প্রীতি ছবি দিয়েছিল তো।’
সাবরিনা কোনো সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে না বহুদিন ধরেই। অনলাইনে যোগাযোগের পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে বিরক্তিকর লাগে। কিছুদিন বিদেশে থাকা বন্ধু আর কাজিনদের সঙ্গে কথাবার্তা চালানোর জন্য সে মেসেঞ্জার ব্যবহার করেছিল, এখন সেই আগ্রহটাও নেই। সময় মেলে না, রাত–দিনের ফারাক প্রচুর আর সবাই এত ব্যস্ত যে নয় মাসে ছয় মাসে ‘কেমন আছ?’ কিংবা ‘কেমন চলছে?’ ধরনের মামুলি কথাবার্তা চালাতে তার আর ইচ্ছাই করে না।
‘আমি তো ফেসবুক–ইনস্টা সব ডিঅ্যাকটিভেট করে রাখছি, তাই দেখি নাই।’ নিজের নিরাসক্ত ভাব বজায় রাখার জন্য বলে, ‘বেগুনি হলে চলবে? প্রোগ্রাম কবে? পার্পলটাই এনে দিই লন্ড্রি থেকে?’
‘তাহলে তো খুবই ভালো হয়। শুক্রবারে রিসেপশন। কিন্তু তুই যাচ্ছিস না? তোকে ওরা বলেনি?’
ফোন নম্বর খুঁজে নেওয়া কোনো কঠিন ব্যাপার না, চাইলেই পাওয়া যায়। হয়তো রায়হান অস্বস্তি বোধ করেছে। হবু স্ত্রীর মনে সন্দেহের কাঁটা ঢোকাতে কে চায়? বউয়ের কোনো কাছের ছেলেবন্ধু কিংবা বরের কোনো বিশেষ মেয়েবন্ধুকে সহ্য করতে অনেকেই পারে না।
নাদিয়ার প্রশ্নে সে সামান্য বিরক্ত হয়। তাকে বললে সে তো জানতই আক্দ হয়ে গেছে আর রিসেপশন শুক্রবার। রায়হানের দিক থেকে নিমন্ত্রণ সে পেতেই পারত। কিন্তু প্রীতি কেন তাকে বলবে? এমন কিছু কাছের বান্ধবী সে নয় ওর। এক হলে থাকলে যেটুকু চেনাশোনা হয়, ডাইনিং ক্যানটিনে দেখা হলে হাই হ্যালো হয়—সেটুকুই ছিল তাদের মধ্যে।
‘না, রায়হান তো বলেনি। আসলে সেভাবে যোগাযোগ নাই তো, আমার নতুন ফোন নম্বরও মনে হয় নাই ওর কাছে।’
বলেই সে বোঝে রায়হানের অপরাধ লঘু করার চেষ্টা করছে সে। ফোন নম্বর খুঁজে নেওয়া কোনো কঠিন ব্যাপার না, চাইলেই পাওয়া যায়। হয়তো রায়হান অস্বস্তি বোধ করেছে। হবু স্ত্রীর মনে সন্দেহের কাঁটা ঢোকাতে কে চায়? বউয়ের কোনো কাছের ছেলেবন্ধু কিংবা বরের কোনো বিশেষ মেয়েবন্ধুকে সহ্য করতে অনেকেই পারে না।
‘কিন্তু তুই তো রায়হানের ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিলি।’
নাদিয়া কি ন্যাকামি করছে, নাকি জেনুইনলি জানতে চাইছে, তা সে বুঝতে পারে না। ছাত্রজীবনেও নাদিয়া একটু সোজাসরলই ছিল। কিন্তু কারও কাছের বন্ধু নিজের বিয়েতে দাওয়াত না দিলে সেটা নিয়ে অনাহূতকে প্রশ্ন করা যে প্রায় অভদ্রতা, এটুকুও বুঝবে না?
‘হুম...সে তো ছিলামই ক্যাম্পাসে থাকতে। এখন তো আর অতটা ইয়ে নাই, কী বলে, কানেকশন আরকি…অনেক কমে গেছে।’
‘তুই ওকে ফোন করে জিজ্ঞেস কর না, বিয়ে করল তোকে জানাল না কেন?’
সাবরিনা বুঝতে পারে না নাদিয়ার এমন ইমম্যাচিউর কথাবার্তার কারণটা কী। দিন দিন ওর বুদ্ধিশুদ্ধি কমছে নাকি?
‘আরে ধুর, কেউ দাওয়াত না দিলে কি চেয়ে নেওয়া যায় নাকি? কেমন দেখায় সেটা?’
‘কেন খারাপ দেখাবে? বিয়ের ঝামেলায় ভুলে গিয়ে থাকলে তুই বন্ধু হিসেবে মনে করিয়ে দিতেই পারিস।’
‘শোন নাদিয়া, জোর করে মনোযোগ আদায় করার ফেইজ আমরা পার করে এসেছি। এখন আমি টিনএজার নাই যে ফোমোতে ভুগে ঝগড়ঝাঁটি করব।’
নাদিয়া একটু থেমে বলে, ‘আচ্ছা শাড়ি নিতে কবে আসব বল।’
আগামীকাল বৃহস্পতিবার, অফিস থেকে ফেরার সময় ভয়ানক জ্যাম হবে। লন্ড্রিটা পথেই পড়ে, থেমে নিয়ে আসা যাবে চাইলে। কিন্তু এতটা ঝক্কি পোহাতে তার ইচ্ছা করছে না। সে বলে, ‘আমি রিসিপ্টের ছবি তুলে তোকে দিই, সেটা দেখিয়ে তুলে নিস। আর ফেরত দেওয়ার সময় টাকা দিয়ে দেবোনে আমি।’
এই ব্যবস্থাটা নাদিয়ার জন্য সুবিধাজনক কি না, তা সে জিজ্ঞেস করে না। বাসা থেকে শাড়ি নিলেও তো এদিকে আসতেই হতো ওকে। তা ছাড়া শাড়ি ধারও দেবে আবার ওর সুবিধামতো স্থানকালে দিতে হবে—এত ঠেকা কী পড়েছে তার?
‘ওকে, দে তাহলে।’
‘দিচ্ছি হোয়াটসঅ্যাপে, গিয়ে একটা ফোন করিস, কথা বলিয়ে দিস ওদের সঙ্গে।’
সবাই যখন ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তিত, কেউ বিসিএস দিচ্ছে, কেউ পার্টটাইম চাকরি খুঁজে নিয়েছে, অনেকে বিদেশে মাস্টার্স করছে আবার কেউ কেউ করছেই না, সেই সময়ে বন্ধুদের সার্কেল ভেঙে গিয়েছিল। যে যার মতো একা একা নিজের লড়াই করছে। সেই সময়ে রায়হান মুষড়ে পড়েছিল প্রীতির ব্যাপারে।
নাদিয়া ফোন রাখার পর সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে টিভির রিমোট হাতে নিয়ে। আসলেই কি তার রায়হানকে জিজ্ঞেস করা উচিত কেন তাকে বিয়ের কথা জানাল না? শুধুই পারিবারিকভাবে বিয়ে হতো, বন্ধুদের কাউকেই না ডাকত, তাহলে না হয় এর একটা যৌক্তিক কারণ বোঝা যেত।
একই ক্লাসে ছিল তারা, ফার্স্ট ইয়ার থেকে একই সার্কেলে। মাস্টার্সে উঠে সবাই যখন ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তিত, কেউ বিসিএস দিচ্ছে, কেউ পার্টটাইম চাকরি খুঁজে নিয়েছে, অনেকে বিদেশে মাস্টার্স করছে আবার কেউ কেউ করছেই না, সেই সময়ে বন্ধুদের সার্কেল ভেঙে গিয়েছিল। যে যার মতো একা একা নিজের লড়াই করছে। সেই সময়ে রায়হান মুষড়ে পড়েছিল প্রীতির ব্যাপারে, সে ভাবছিল কানাডা থেকে হয়তো সে আর ফিরবে না। যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে আসছে, প্রীতির কথাবার্তায়ও মানসিক দূরত্ব প্রকাশ পাচ্ছে…এসব কথা বন্ধুরা কেউ জানত না, শুধু সাবরিনাই জানত। মাস্টার্স ফাইনালের আগে রায়হান সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল পরীক্ষাই দেবে না, প্রিপারেশন নেই। সাবরিনা তাকে জোর করে ফরম ফিলআপ করিয়ে নিজের জোগাড় করা সব ম্যাটেরিয়াল দিয়ে ঘাড়ে ধরে পড়তে বসিয়েছিল।
সেই সময় কেটে গেছে, প্রীতি দেশে ফিরেছে, পড়ালেখা শেষ করে সবাই যে যার ক্যারিয়ার বানাতে ব্যস্ত। তাই কথাবার্তা কম হওয়া নিয়ে অত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই, এমনই হয় জীবনের এই পর্যায়ে। ঈদের চান্দে অ্যাপয়েন্টমেন্ট সেট করে দেখা করতে হয়, রিইউনিয়নের গেট টুগেদারেও সবাই আসতে পারে না। কিন্তু বিয়ের খবর না দিয়ে রায়হান কি রীতিমতো অবহেলাই করল না তাকে? সুপার সেনসিটিভ কেউ হলে অপমান হিসেবেই নিয়ে নিত এটাকে। বিছানা থেকে উঠে শাড়ির রিসিপ্ট খুঁজে বের করে সেটার ছবি তোলে সে। নাদিয়াকে পাঠানোর জন্য হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে দেখে, নাদিয়া তাকে রায়হান আর প্রীতির আক্দের ছবি পাঠিয়েছে। রায়হানকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে ছবিতে, হাসিতেই বোঝা যাচ্ছে কতটা তৃপ্ত সে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা হিসেবে জ্যাম কমই বলা যায়। ঘড়ি দেখে সাবরিনা, মাত্র পঞ্চান্ন মিনিটে বাসায় চলে এসেছে সে। রাস্তা আসলে বিশ মিনিটের হলেও ঘণ্টাখানেক লেগে যায় রাশ আওয়ারে। আজকে তার বাইকার বেশ দক্ষ ছিল। ভাড়া মিটিয়ে গেট দিয়ে ঢুকতেই সে দেখে লিফটের সামনে নাদিয়া দাঁড়িয়ে। তাকে দেখে একগাল হেসে ও বলে, ‘শাড়ি নিতে আসলাম এত দূর, ভাবলাম তোর সঙ্গে দেখা করেই যাই।’ মনে মনে বিরক্ত হলেও সে প্রকাশ করে না কিছুই, চেষ্টা করে মুখের এক্সপ্রেশনেও যেন কিছুতেই দেখা না যায় তার অপ্রসন্নতাটুকু।
লিফটের বোতাম চেপে সে বলে, ‘চল, বাসায় চল।’
চাবি দিয়ে যখন সে ঘরের দরজা খুলছে, ততক্ষণে নাদিয়ার রানিং কমেন্ট্রিতে সে জেনে গেছে রিসেপশন কোথায়, কে কে যাচ্ছে সেসবের বিস্তারিত। ওর কথায় মনে হলো সাবরিনা বাদে ঢাকা শহরে বসবাসরত সব বন্ধুবান্ধবকেই সম্ভবত দাওয়াত দিয়েছে ওরা।
‘চা খাবি না কফি?’
নাদিয়ার কোনো কথায় কোনো রকম অংশগ্রহণ না করে সে ব্যাগ রেখে কিচেনের দিকে এগোয়।
‘চা খাব…আচ্ছা তুই রায়হানকে ফোন করেছিলি?’
‘বেচারা?’ যে নিজের বহু সাধনার নারীকে বিয়ে করছে, সে কীভাবে বেচারা হয়? সাবরিনা বুঝতে পারে না কী করে পোলাইটলি এই কনভারসেশন থেকে বের হওয়া যায়। চা বানিয়ে দুই হাতে দুই মগ নিয়ে ভেতরের ঘরে যায় সে। নাদিয়া শাড়িটা বের করে তার ওপর কয়েক জোড়া কানের দুল রেখে দেখছে কোনটা মানায়।
সাবরিনার মনে হলো ছোটবেলা আব্বা একবার বলেছিলেন, ‘বোকা বন্ধুর চেয়ে বুদ্ধিমান শত্রু থাকা ভালো।’ নাদিয়া আদতে সহজ–সরল মেয়ে, মনের মধ্যে প্যাঁচ নেই এ কথা সত্যি, তবে ওর এই অতিসরলতা এখন বোকামির পর্যায়ে চলে গিয়ে অসহনীয় লাগছে, সেটাও ঠিক।
‘না, করিনি। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে ও করতেই পারত।’
‘কীভাবে করত? তুই–ই না বললি তোর ফোন নম্বর নতুন আর ফেসবুক–ইনস্টা সব ডিঅ্যাকটিভেটেড?’
‘তোকে জিজ্ঞেস করলে তুই আমার নতুন নম্বর দিতি না ওকে?’
‘আরে তুই সেন্টি খায়া যাইতেছিস কেন? আমার কাছে যে নম্বর পাওয়া যাবে, সেটা ওর মনে না আসতে পারে। বেচারা চৌদ্দ রকম ঝামেলায় আছে এখন।’
‘বেচারা?’ যে নিজের বহু সাধনার নারীকে বিয়ে করছে, সে কীভাবে বেচারা হয়? সাবরিনা বুঝতে পারে না কী করে পোলাইটলি এই কনভারসেশন থেকে বের হওয়া যায়। চা বানিয়ে দুই হাতে দুই মগ নিয়ে ভেতরের ঘরে যায় সে। নাদিয়া শাড়িটা বের করে তার ওপর কয়েক জোড়া কানের দুল রেখে দেখছে কোনটা মানায়। তার একবার ইচ্ছা করে রুবি কালারের সেটটা বের করে দেয়—ভাইয়া নেপাল থেকে এনেছিল, পাথরের হলেও খুব চমৎকার। কিন্তু নিজেকে সামলায় সে, এত উদারতা দেখানোর দরকার নেই। মাইসোর সিল্কটা যে সে দিচ্ছে, সেটাই অনেক, নিজের আলমারি ভরা শাড়ি থাকতে কেউ বান্ধবীর শাড়ি ধার চায় নাকি? পার্পল শাড়িও কি দু–একটা নেই নাদিয়ার? নিজেকেই একটু শাসন করে সে এই পর্যায়ে…বেচারা সিধাসাধা মানুষ, আপন ভেবেই ধার চেয়েছে। বান্ধবীরা সবাই জানে পার্পল তার পছন্দের রং, তার কাছে আধডজন শাড়ি আছে এই শেডের। খুশির দিনে রায়হান নিজের দুঃসময়ের বন্ধুর কথা ভুলে গেছে, সেই ক্ষোভ এই মেয়ের ওপর ঝাড়ার তো কিছু নেই।
চায়ের মগ হাতে নিয়ে নাদিয়া আবার একই প্রসঙ্গ তোলে, ‘তোকে ফোন নম্বর দিছিলাম তো, ফোন করিস নাই ক্যান তাইলে?’
‘বিজি ছিলাম, আচ্ছা করবোনে কালকে দিনের বেলা,’ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সে।
‘আচ্ছা দাঁড়া, আমিই করতেছি।’
চমকে উঠলেও প্রকাশ করে না সে। বেশি জোরালোভাবে মানা করলে নাদিয়া সন্দেহও করতে পারে কিছু, ‘ডালমে কুছ কালা হ্যায়’ ভাবতে পারে… যত দূর সম্ভব নিরাসক্ত কণ্ঠে সে বলে, ‘কী দরকার? তুই–ই না বললি ও চৌদ্দ ঝামেলায় আছে এখন?’
নাদিয়া ফোন হাতে নিয়ে ফেলেছিল, তারপর বলল, ‘সেটাও ঠিক, আচ্ছা আমি টেক্সট করে রাখতেছি।’
আল্লাহ জানেন কী লিখবে এই মেয়ে। যা–ই লিখুক, সাবরিনার বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। রায়হানকে ফেস করতে তার কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সে ডাম্প করেনি ওকে, সুদিন আসার পরে দুর্দিনের বন্ধুকে ভুলে সে যায়নি। কিন্তু রায়হান যদি ভেবে নেয় নাদিয়াকে সে বলেছে টেক্সট করতে? খুব অস্বস্তিকর হবে না পুরো ব্যাপারটা? ফোনের চেয়ে মেসেজ বেশি কনফিউজিং সব সময়ই। কথা বললে গলার স্বরে অনেক কিছুই বোঝা যায়, লেখা বরং ভুল অর্থ তৈরি করতে পারে। সে বলে, ‘আচ্ছা আমিই টেক্সট করতেছি বরং, অভিনন্দন জানাই, নাকি?’
নাদিয়া হাসে, ‘এটাই ভালো।’
চা শেষ করে ওঠে নাদিয়া, ওর বিউটি পারলারে টাইম নেওয়া আছে, আগামীকালের অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি ভালোই নিচ্ছে, বন্ধুর বিয়ে বলে কথা।
সামান্য খুঁজেই প্লে লিস্টটা পেয়ে যায় সে। মাস্টার্স পরীক্ষার সময় প্রতিটি পরীক্ষার আগে রায়হানের হলের সামনে অপেক্ষা করার সময় এই গানটা সে শুনত কানে হেডফোন লাগিয়ে। রায়হান গড়িমসি করতে করতে কোনোমতে বের হয়ে এসে রোজই বলত, ‘কী হবে পরীক্ষা দিয়া, ধুর।’ সে বলত, ‘ফেল করলে কেউ তোরে মাইরা ফেলবে না, চল তো।’
জামাকাপড় পাল্টে ফোনে মেসেঞ্জার রিইনস্টল করে রায়হানকে টেক্সট দেওয়ার জন্য ইনবক্সে ঢোকে। বছরখানেক আগের কনভারসেশন দেখতে পায়। প্রীতি কানাডা থেকে ফিরবে বলে ঘোষণা দিয়েছে কিন্তু তখনো ফেরেনি এমন সময়ের কথা। দীর্ঘ কথোপকথন অনেকটা পড়ে সে আবার। রায়হান জিজ্ঞেস করেছিল সে ঠিকঠাক আছে কি না, সে উত্তর দিয়েছিল সে ভালোই আছে। চাকরি নিয়ে সামান্য টেনশনে ছিল, আগের অফিস বিভিন্ন ঝামেলা করছিল আর সে নতুন জব খুঁজছিল…সেই সব মামুলি কথাবার্তা দেখতে পায়। শেষে রায়হান দেখা করতে ডেকেছিল, ক্যাম্পাস ছাড়ার পর দেখাসাক্ষাৎ একেবারেই কমে যাচ্ছে বলে উষ্মা প্রকাশ করেছিল। আশ্চর্য, এই সব সে ভুলে গিয়েছিল। এখন মনে পড়ছে, শুধু রায়হানের সঙ্গেই মেসেঞ্জারে আলাপ হতো তার। প্রীতির ফিরে আসা নিয়ে রায়হানের উচ্ছ্বাস আর সমান্তরালে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব ধরে রাখার চেষ্টা—এই দুটি প্রায় বিপরীতমুখী ব্যাপার থেকে বের হওয়ার জন্যই কি সে মেসেঞ্জার ডিলিট করে দিয়েছিল? ফ্রেন্ডজোনড হয়ে অনেকগুলো মাস পাশে থেকে সাপোর্ট তো সে দিয়েইছে। যখন রায়হান তার প্রিয় নারীকে ফিরে পাচ্ছে, তখন তার সরে আসাই বিধেয় ছিল। এই ব্যাপারে নিজেকে একটা পিঠ চাপড়ানি সে দিতেই পারে। ওয়েল ডান সাবরিনা, ইউ ডিড দ্য রাইট থিং! রায়হানের ওপর রাগ করারও আসলে কিছু নেই, সে নিজেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল আর ভুলেও গিয়েছিল বিচ্ছেদের সেই অপ্রীতিকর অধ্যায়।
ছোট একটা টেক্সট লেখে সে, ‘শাদি মোবারাক হো।’
তারপর ফোন অফ করে টিভিতে ইউটিউব ছাড়ে। সামান্য খুঁজেই প্লে লিস্টটা পেয়ে যায় সে। মাস্টার্স পরীক্ষার সময় প্রতিটি পরীক্ষার আগে রায়হানের হলের সামনে অপেক্ষা করার সময় এই গানটা সে শুনত কানে হেডফোন লাগিয়ে। রায়হান গড়িমসি করতে করতে কোনোমতে বের হয়ে এসে রোজই বলত, ‘কী হবে পরীক্ষা দিয়া, ধুর।’ সে বলত, ‘ফেল করলে কেউ তোরে মাইরা ফেলবে না, চল তো।’ তারপর দুজন মিলে নাশতা করে পরীক্ষার হলে যেত। রিকশায় বসে রায়হান পড়ালেখার ব্যাপারে একটা শব্দও বলত না, হয় ঝিম ধরে বসে থাকত, না হয় প্রীতির সঙ্গে কী কী কথা হয়েছে জানাত…আর সে নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার জন্যই হয়তো, বিশেষ একটি গানই শুনত। মজার ব্যাপার হলো, রায়হান কখনো জিজ্ঞেস করেনি সে কী গান শুনছে। সেই দিনগুলো এখন গত জন্মের স্মৃতির মতন সুদূর। অবশ্য সে জানতই, ‘ইয়ে নাওয়াজিশে মুখতাসার’…এই সঙ্গ, এই সময় যে ‘ক্ষণস্থায়ী’, সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিল তখনই।
অনেক দিন পর রায়হানকে ভাবনায় আসার অনুমতি দেয় সে। বেগম আখতার তাঁর কিন্নরকণ্ঠে গাইতে থাকেন—
‘মেরে দাগ-এ-দিল সে হ্যাঁয় রউশনি, উসহি রউশনি সে হ্যাঁয় জিন্দেগি
মুঝে ডর হ্যাঁয় অ্যায় মেরে চারআগার, ইয়ে চারাগ তু হি বুঝা না দে
মেরে হামনাফাস, মেরে হামনাওয়া, মুঝে দোস্ত বনকে দাগা না দে,
ম্যায় হু দার্দ-এ-ইশক সে জাঁ-বা-লাব, মুঝে জিন্দেগি কে দুয়া না দে।’