
লায়লা আল-ওথম্যান কুয়েতের একজন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক। সামাজিক ও সাহিত্যিক বিষয় নিয়ে তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে, স্থানীয় সংবাদপত্রে। এ পর্যন্ত তিনি চৌদ্দটি ছোটগল্প সংকলন এবং নয়টি উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর সর্বাধিক পরিচিত উপন্যাস ওয়াসমিয়া কামস আউট অব দ্য সি প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে এবং পরবর্তীতে ইতালীয় ও রুশ ভাষায় অনূদিত হয়। তাঁর একাধিক গল্প ফরাসি, স্প্যানিশ, যুগোস্লাভীয়, পোলিশ, রুশ, জার্মান ও আলবেনীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এই গল্পটি আরবি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ইব্রাহিম ফাওজি।
• ভাষান্তর: মুহসীন মোসাদ্দেক
আমি বেশ মোটাসোটা আর নাদুসনুদুস—একটা ভেড়া পাহারা দেয়া কুকুরের মতো। বহু বছর আমি এক সহৃদয় ও সুন্দরী মহিলার সঙ্গে থেকেছি, যার কাছে আমি ছিলাম সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত। কিন্তু একদিন আমি মারাত্মক ভুল করে ফেলি। নিজের কৃতকর্মের অপরাধবোধে এতটাই জর্জরিত হয়ে পড়েছিলাম যে কী করেছি তা দেখানোর সাহসই পাইনি। আমার শাস্তি ছিল আমার পাপের মতোই ভারী। মালকিন আমাকে তাড়িয়ে দিলেন। ফলে আমি হয়ে পড়লাম গৃহহীন—অনাহারে, দুর্ভোগে, ময়লায় ডুবে গেলাম—যেখানে আগে প্রতিদিন আমাকে পরিষ্কার করা হতো, সুগন্ধি মাখানো হতো, আর পরানো হতো ঝলমলে কলার।
এই দুর্দশার মধ্যেই, রাস্তায় কয়েক সপ্তাহ কাটানোর পর—যা আমার কাছে অনন্তকালের মতো মনে হয়েছিল—একজন সাদামাটা চেহারার নারী আমাকে তুলে নিল। তার চেহারা আমার পছন্দ হয়নি। তবু ভাগ্য মেনে নিলাম। মাথার ওপর একটা ছাদ, খাবার দেওয়ার হাত, আর একটু মাতৃসুলভ হৃদয়—এটুকুই আমার প্রয়োজন ছিল।
ঘরে ঢোকার পর প্রথম মুহূর্তেই আমি তার নিষ্ঠুরতা টের পেলাম। আমার মুখ শুকিয়ে কাঠ, পেট ক্ষুধায় কুঁকড়ে গেছে—তবু সে আমাকে পানি বা খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো মনোযোগ দিল না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে আমাকে দরজার কোণে ফেলে রাখল। তারপর হঠাৎ চিৎকার করতে করতে আমার মুখের সামনে একটা স্টেক নাড়িয়ে আমাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করল।
‘শোন! আজ থেকে তুই আমার দাস আর প্রহরী।’ তার কণ্ঠ ছিল কঠোর।
আমি তখন এমন অবস্থায় ছিলাম যে ভাগ্য মেনে নেওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না। মাথা নিচু করলাম। তখনো বুঝতে পারিনি যে আমি এক ভয়ঙ্কর ফাঁদে পা দিয়েছি—যতক্ষণ না তার কুটিল ইচ্ছেগুলো ধীরে ধীরে আমার ভেতরে শিকড় গেড়ে বসতে লাগল। সে আমাকে পুরুষদের দেখে ঘেউ ঘেউ করতে, আর তার চেয়ে সুন্দর নারীদের আক্রমণ করতে শেখাল। এরপর শেখাল ব্যাগ থেকে কাগজ চুরি করতে, ধনীদের পকেট কাটতে।
আমি পোষা প্রাণী; অপরাধ করা আমার স্বভাব নয়। কিন্তু তার অদ্ভুত প্রশিক্ষণ আমাকে তারই প্রতিবিম্বে রূপান্তরিত করল। তার বৈশিষ্ট্যগুলো আমার গায়ে লেগে গেল। তবু মাঝে মাঝে বিবেক জেগে উঠত। আমি কাঁদতাম।
খোলাখুলি বলি—আমি মাঝেমধ্যে বিদ্রোহ করতাম। আগেই বলেছি, আমি পোষা প্রাণী; অপরাধ করা আমার স্বভাব নয়। কিন্তু তার অদ্ভুত প্রশিক্ষণ আমাকে তারই প্রতিবিম্বে রূপান্তরিত করল। তার বৈশিষ্ট্যগুলো আমার গায়ে লেগে গেল। তবু মাঝে মাঝে বিবেক জেগে উঠত। আমি কাঁদতাম। অনুশোচনা আমাকে প্রায় গ্রাস করেই ফেলত।
একদিন আমি পালিয়ে গেলাম—আদর আর নিরাপত্তার আশায় নতুন কোনো ঘর খুঁজতে। বন্ধুহীন অবস্থায় বাড়ির সামনে খেলতে থাকা শিশুদের কাছে গিয়েছিলাম, মনে মনে চেয়েছিলাম, যদি ওদের কেউ আমাকে ভালোবেসে ফেলে আর পরিবারকে জোর করে আমাকে আশ্রয় দিতে বাধ্য করে। কিন্তু সব দরজা বন্ধ ছিল। শেষ যে কথাটা শুনলাম, এক মা তার ছেলেকে বকছে, ‘এই নোংরা জিনিসটা থেকে দূরে থাকো। এই কুকুরের কুকীর্তির কথা পুরো পাড়াই জানে।’
ভেঙে পড়ে, অপমানিত হয়ে, আমি আবার সেই কুৎসিত নারীর কাছেই ফিরে গেলাম। আমাকে দেখামাত্রই সে অমানুষিক নির্যাতন শুরু করল। নখ কেটে দিল, লেজের একটা অংশ বিকৃত করল, লোমের ওপর কালো রং লেপটে দিল। তারপর বেজমেন্টের বাথরুমে তালাবদ্ধ করে রাখল। না খাবার, না পানি। যখন মনে হলো মৃত্যু কাছাকাছি চলে এসেছে, আমি জোরে ঘেউ ঘেউ করে কাকুতি-মিনতি করলাম। অবশেষে সে আমাকে মুক্ত করল।
‘তোকে যথেষ্ট শাস্তি দিয়েছি,’ সে কুটিল হাসি হাসল। ‘আর কখনো এমনটা করবি না, খবরদার!’
দুঃখজনকভাবে, আমি মাথা নিচু করে হামাগুড়ি দিয়ে তার পায়ের কাছে গেলাম, নিজেকে তার পায়ে ঘষলাম। বিনীত স্বরে ঘেউ ঘেউ করে জানালাম, তার সব আদেশ আমি মেনে চলব।
সে শিরোনামগুলো সোনালি পদকের মতো বুকে এঁটে নিল, ভিড়ের করতালির শব্দ কল্পনা করতে করতে। আমি নীরবে ঘৃণাভরে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। সে আমার কান টেনে ধরল। আমি যন্ত্রণায় কাতরালাম, তবু মুখ শক্ত করে চেপে রাখলাম।
সে খুশি হলো। নিশ্চিত হলো, আমি চিরদিনের জন্য তার দাস। আমাকে দিয়ে আরও কাজ করানোর লোভে সে আমার কলারের ভেতর একটা ঘড়ির মতো ছোট রেকর্ডার লুকিয়ে রাখল। তারপর আমাকে আশপাশের বাড়িগুলোতে পাঠাতে লাগল, লোকজন তার সম্পর্কে কী বলে তা শোনার জন্য। কিন্তু তার চেষ্টা ব্যর্থ হলো। কারণ আমি রেকর্ডারটি কামড়ে ধরেছিলাম, আর সেখানে উপস্থিত লোকজন নিজেদের কাজকর্মে এতটাই মগ্ন ছিল যে, তারা তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে যায়।
এক সকালে সে এমনভাবে হাততালি দিল, যেমন করে ক্যাফেতে কেউ ওয়েটারকে ডাকে। আমি দৌড়ে গিয়ে তার পায়ের কাছে গুটিসুটি হয়ে বসে পড়লাম। সে আমাকে লাথি মেরে বলল, ‘শোন, এই দেশে মানুষ শুধু উপাধিওয়ালাদেরই সম্মান করে। আমার কিছু নেই, তাই আমাকেও উপাধি জোগাড় করতে হবে।’
আমি জিভ বের করে নরম করে ঘেউ ঘেউ করলাম, বুঝেছি বোঝানোর মতো।
সে বলল, ‘অবশ্য আমি “মহামান্য” ধরনের কেউ বা “মন্ত্রী” হতে পারব না। সেগুলো আমার নাগালের বাইরে। কিন্তু কিছু উপাধি তো ফ্রি পাওয়া যায়, অনেকেই সেগুলো পাওয়ার দাবি রাখে। আমিই বা কেন তাদের একজন হতে পারব না?’
আমি যথারীতি মাথা নিচু করলাম। শরীর কেঁপে উঠল। সে ভাবল আমি ঠাট্টা করছি। চিৎকার করে বলল, ‘মাথা তোল! শোন মন দিয়ে। এখনই উপাধির বাজারে যা। যত পারিস উপাধি কুড়িয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে আয়।’
আমি ছুটে বেরিয়ে পড়লাম। কল্পনায় দেখছিলাম, সে সোফায় এলিয়ে পড়ে আছে, অহংকারের পালক ফুলিয়ে। হাত তুলছে। সুগন্ধির বদলে তার বগল থেকে টক দুধের গন্ধ ছড়াচ্ছে। চোখ বন্ধ করে সে স্বপ্ন দেখছে, এইসব উপাধি তাকে অনুষ্ঠান-উৎসবে বড়াই করার সুযোগ দেবে, সামনের সারির আসন আদায় করে নেবে, দরিদ্র সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে প্রথম পাতায় নিজের ছবি ছাপাবে।
ক্লান্ত শরীরে ফিরলাম। মনে হলো সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। দরজা খুলেই আমাকে টেনে সোফার দিকে নিয়ে গেল।
‘হুম। কী এনেছিস দেখা। তারপর ঠিক করব, তুই পুরস্কার পাবি না শাস্তি।’
আমি তৃষ্ণায় কাতর ছিলাম। তবু পানি দিল না। বড় করে ঘেউ ঘেউ করতেই মুখে রাখা কাগজগুলো ঝরে পড়ল। সে আনন্দে কাঁপতে কাঁপতে পড়তে লাগল—
‘ডক্টর। গবেষক। কবি। লেখক। রাজনৈতিক কর্মী। মানবাধিকার কর্মী। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর। সমাজের অভিজাত মহিলা, সেলুন, দাতব্য সমিতি ও পুরুষকল্যাণ সংস্থার নেত্রী...’
চোখ বন্ধ করে সে স্বপ্ন দেখছে, এইসব উপাধি তাকে অনুষ্ঠান-উৎসবে বড়াই করার সুযোগ দেবে, সামনের সারির আসন আদায় করে নেবে, দরিদ্র সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে প্রথম পাতায় নিজের ছবি ছাপাবে।
সে শিরোনামগুলো সোনালি পদকের মতো বুকে এঁটে নিল, ভিড়ের করতালির শব্দ কল্পনা করতে করতে। আমি নীরবে ঘৃণাভরে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। সে আমার কান টেনে ধরল। আমি যন্ত্রণায় কাতরালাম, তবু মুখ শক্ত করে চেপে রাখলাম।
‘তোর মালকিনের জন্য খুশি না তুই? কিছু তো বল!’ সে চেঁচাল।
আমি চুপ থাকলাম। সে জোর করে আমার মুখ খুলতে চেষ্টা করল, কিন্তু আমি অনড় থাকলাম। সে আমাকে চড় মারল।
‘মুখের ভেতরে আর কী কী উপাধি লুকিয়ে রেখেছিস? মুখ খোল, বের কর, নইলে তোকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলব।’
আমি তার কথায় কান দিইনি, ফলে সে উত্তাল ঢেউয়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে আমাকে লাথি মারল, আর আমি ফুটো হয়ে বাতাস ফুরিয়ে যাওয়া বলের মতো তার পায়ের কাছে এদিক-ওদিক ছিটকে পড়তে লাগলাম। আমাকে মাটিতে ফেলে রেখে সে দৌড়ে গেল রান্নাঘরে। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এল একটি বড় হাড় হাতে, যার একাংশে তখনো মাংস লেগে আছে, আর সেটি আমার সামনে নাড়াতে লাগল। কিন্তু আমি অনড় নীরবই থাকলাম; আমার দৃষ্টিতে ফুটে ছিল তাচ্ছিল্য।
‘এই শয়তান কুকুরটা নিশ্চয়ই কোনো অদ্ভুত গোপন কিছু লুকিয়ে রেখেছে মুখের ভেতরে।’
সে একটি মোটা লাঠি তুলে নিল। লাঠি তুলতেই বুঝে গেলাম, আমার অনিবার্য পরিণতি এসে গেছে। তাই আমি জোরে ঘেউ ঘেউ করে উঠলাম। আমার মুখের ভেতর থেকে ভাঁজ করা ছোট ছোট কাগজের টুকরো ঝরে পড়ল। সে সঙ্গে সঙ্গে লাঠি ছুড়ে ফেলে দিল এবং পড়ার আগ্রহে উদগ্রীব হয়ে কাগজগুলো কুড়িয়ে নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু পড়তে গিয়েই সে আতঙ্কিত হয়ে উঠল; বাজার থেকে আমি আরও যে উপাধিগুলো কুড়িয়ে এনেছিলাম সেগুলোর ভয়াবহতায়।
‘চোর। বিদ্বেষী। মিথ্যুক। ভণ্ড। দুষ্ট। জাদুকরী। অশুভের জননী। হিংসুটে। কৃপণ। সুযোগসন্ধানী...’
এই অভিশপ্ত উপাধিগুলো আগুনের গোলার মতো জ্বলছিল যা ধরার মতো নয়, ছোঁয়াও যায় না।
স্বাভাবিকভাবেই সে আমাকে খুন করার অভিপ্রায়ে ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু আমি জোরে হেসে উঠলাম। কারণ, দরজা তখন একেবারে খোলা।
অল্পের জন্য আমি পালিয়ে বাঁচলাম।