
মেরি অলিভার (১৯৩৫—২০১৯) একজন প্রধান আমেরিকান কবি। হেনরি ডেভিড থরো আর ওয়াল্ট হুইটম্যানের প্রভাব দেখা যায় তাঁর কবিতায়। এমিলি ডিকেনসনের সঙ্গেও তুলনা করা হয় মেরি অলিভারকে।
মেরি অলিভারের কবিতায় বারবারই মানুষ ও প্রকৃতি একজন আরেকজনের শরীর জড়িয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তারপর সে মানুষ জীবন-মৃত্যু-অস্তিত্বের সব প্রশ্নের ভেতর দিয়ে নির্ভয়ে এক অপূর্ব শান্তির পথে হেঁটে গেছে। প্রতিবার যখনই পড়ি ‘ইউ ডু নট হ্যাভ টু ওয়াক অন ইয়োর নিস ফর আ হানড্রেড মাইলস থ্রু দ্য ডেজার্ট রিপেন্টিং; ইউ ওনলি হ্যাভ টু লেট দ্য সফট অ্যানিমেল অব ইওর বডি লাভ হোয়াট ইট লাভস’, এক অদ্ভুত ভরসা পাই। মনে হয়, সত্যিই বুঝি ক্ষমা আছে, আছে মুক্তি।
• ভাষান্তর: কল্যাণী রমা
অমন ভালো মানুষটি হতে হবে না তোমায়।
দুহাঁটুতে ভর করে, অনুতাপ করতে করতে
মরুভূমির মাঝ দিয়ে শ খানেক মাইল হেঁটে যেতে হবে না।
শুধু শরীরের ভেতর নরম জন্তুটা যা ভালোবাসে,
তাকে তা ভালোবাসতে দাও।
আমায় তোমার হতাশার কথা বলো, তোমার,
আমি তোমায় আমারটুকু বলব।
এবং এর মাঝে পৃথিবী এগিয়ে যাবে।
এর মাঝে সূর্য আর বৃষ্টিভেজা ঝকঝকে নুড়িপাথর
ভুদৃশ্যের মাঝ দিয়ে...চলেছে প্রেইরি, ঘন গাছপালা,
পাহাড় আর নদীর ওপর দিয়ে
এর মাঝে নির্মল, নীল বাতাসে
বুনো হাঁস উঁচু থেকে উঁচুতে উড়ে যাচ্ছে, আবার ওরা ঘরে ফিরছে।
তুমি যে–ই হও না কেন, যতই নিঃসঙ্গ
পৃথিবী নিজেকে তোমার কল্পনার কাছেই উৎসর্গ করে,
সে তোমায় বুনো হাঁসের মতো ডাকে। কর্কশ, রোমাঞ্চকর—
সবকিছুর মাঝে তোমার স্থানটুকু ঘোষণা করে
সে শুধু বারবার ডাকে।
[‘ওয়াইল্ড গিজ’ কবিতার বাংলা ভাষান্তর। কবিতাটি ‘ড্রিম ওয়ার্ক’ (১৯৮৬) বই থেকে নেওয়া।]
কাল রাতে অন্ধকারে
মাঠে শুয়ে ছিলাম
মৃত্যুর কথা ভাববার জন্য,
কিন্তু তার বদলে ঘুমিয়ে পড়লাম,
যেন এক বিশাল আর ঢালু ঘরের ভেতর
ঘরটা ভর্তি সেই সব সাদা ফুলে
সারা গ্রীষ্মকাল ধরে যারা ফুটে থাকে,
আঠালো, এলোমেলো,
উষ্ণ মাঠের মাঝে।
যখন আমি উঠলাম
তারাদের সামনে
ভোরের আলো
মাত্র গলে গলে
পড়তে শুরু করেছে,
আর আমি ঢেকে ছিলাম ফুলে।
কী জানি কীভাবে এমনটা হয়েছিল—
জানি না আমার শরীরটা
মধু-মাখা–লতাগুলোর
নিচে ডুব দিয়েছিল কি না
ঘুমে তীক্ষ্ণ হয়ে যাওয়া
কোনো এক আসক্তিতে
গভীরতার মাঝে, কিংবা
ওই সবুজ প্রকৃতি বুঝি
ঢেউয়ের মতো উঠে এসেছিল
আমাকে মুড়ে দিতে,
আমাকে নিয়ে নিয়েছিল
তার বলিষ্ঠ বাহুর ভেতরে।
আমি তাদের ঠেলে সরিয়ে দিলাম,
কিন্তু উঠে দাঁড়ালাম না।
জীবনে কখনো এমন মখমলের পরশ পাইনি
কিংবা এমন মসৃণতার
অথবা এমন চমৎকার শূন্যতার
জীবনে কখনো ওই সরন্ধ্র রেখার
এত কাছাকাছি যেতে পারিনি
যেখানে আমার নিজ শরীর শেষ হয়েছিল
আর শুরু হয়েছিল শিকড় কাণ্ড আর ফুল।
[‘হোয়াইট ফ্লাওয়ারস’ কবিতার বাংলা ভাষান্তর। কবিতাটি ‘নিউ পোয়েমস’ বই থেকে নেওয়া। ]
সে আমাকে ব্লু-জে পাখি, নীহারকণা,
তারা আর এখন টিলার ওপরে উঠে যাওয়া
যে কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ, তার খবর পাঠায়।
কথাচ্ছলে বলে ঠান্ডার কথা, বেদনার কথা,
যা কিছু এত দিনে হারিয়ে গেছে তার ফর্দ বানায় সে।
এখানে আমার জীবন কঠিন, ধীরে ধীরে চলে তা,
আমি পড়ে চলি দরজার পাশে
স্তূপীকৃত আরক্ত তরমুজের কথা,
ঝুড়িভর্তি ফেনল, রোজমেরি, ডিল,
আর এদিকে যা কিছু সে তুলতে পারেনি
কিংবা যা পাতার ফাঁকে লুকিয়ে ছিল, তা কালো হয়ে ঝরে যায়।
এখানে আমার কঠিন আর অদ্ভুত জীবনে
আমি ওর পাগল করা আনন্দর কথা পড়ি
যখন তারা ফোটে, নীহারকণা ঝরে পড়ে, ব্লু-জে গান গায়।
বিক্ষিপ্ত সময় তার প্রাজ্ঞ আর ঘূর্ণি খাওয়া হৃদয়ে
কোনো ছাপই ফেলবে না;—
সে জানে কীভাবে মানুষ তাদের জীবন কাটানোর নানা পরিকল্পনা করে
আর তারপর তেমন জীবন সে কোনো দিন কাটায় না।
সে কাঁদে কি না, তা কখনো আমায় বলবে না।
আমি ওর নামের পাশের ক্রসগুলো ছুঁয়ে যাই।
উঠতে গিয়ে পৃষ্ঠাগুলো ভাঁজ করে রাখি।
খামটা একপাশে কাত করতেই বাতাসে ভেসে বেড়ায় টুকরো টুকরো
বর্যাজ, উডবাইন আর রু।
[‘আ লেটার ফ্রম হোম’ কবিতার বাংলা ভাষান্তর। কবিতাটি ‘নো ভয়েজ অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ (১৯৬৩ এবং ১৯৬৫) বই থেকে নেওয়া।]